আসমা অধরা : প্রেমের কবিতার নায়িকা

Posted in Uncategorized | Tagged , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

সোনালী চক্রবর্তী : প্রেমের কবিতার নায়িকা

Posted in Uncategorized | Tagged , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

অ্যালেইনা হোসেন : প্রেমের কবিতার নায়িকা

ভালো করে দেখিনি তোমার মুখ, আবছা মনে পড়ে,

দেহ ও পোশাকও মনে নেই, কেমন ভাসাভাসা যেন–

অথচ মনে আছে তোমার দশটি আঙুলের খেলা

আমি তো স্তম্ভিত হতবাক থ, তালুতে রক্তসূর্য আঁকা

প্রতিটি আঙুলও আলতায় অর্ধেক রাঙানো

ত্রিশূল তাম্রচূড় মুকুল সামদাম হংসাস্য ভ্রমর কাঙ্গুল

আঙুলে খেলাচ্ছ তুমি আমার হৃদপিণ্ডে নিঃশব্দ দামামা বাজিয়ে

সিংহমুখ মৃগশীর্ষ সর্পশীর্ষ চন্দ্রকলা সূচী কপিথ্থ ময়ূর

বুঝতে পারছিলুম বসে এক ঠায় তোমাকে নয়

ওই দশটি রক্তাভ আঙুলের অপার্থিব ইশারাকে ভালোবাসি

Posted in Uncategorized | Tagged , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

কৌশিক সরকার-এর আঁকা মলয় রায়চৌধুরীর পোরট্রেট

Posted in Uncategorized | Tagged , , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

সম্বরণ দাশ-এর আঁকা মলয় রায়চৌধুরীর পোরট্রেট

Posted in Uncategorized | Tagged , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

সোনালী মিত্র : মলয় রায়চৌধুরীর জন্মদিন

প্রিয় মানুষ, প্রিয় কবি, অজস্র সৌরবছর তোমার জন্মদিনের উৎসব আলোক বর্তিকা হয়ে ফুটে থাকুক প্রতিটি সাহিত্যমননে। প্রেম জেনো, শ্রদ্ধা জেনো,প্রণাম জেনো, ভালোবাসা জেনো। কিই বা দিতে পারি! বারবার উৎসর্গ হোক কলম তোমার পায়ের কাছে।

ক্রমশ উর্দ্ধ সত্তরের প্রেমে ডুবে যাচ্ছে বসন্তবর্ষীয় আয়ু,
সারসার দিয়ে রক্তকীট …বাস্তুতন্ত্রের বিষাক্তফণা ধেয়ে গেল
গঠনপক্ত মধ্যে তিরিশের দিকে ,তাদেরও
হারিয়ে দিতে পারে বুকে লাটখেয়ে যাওয়া
তোমার সাদা চুলের ঘোড়া।
ছুটছে ,ছুটছে ছত্রপতি শিবাজি চত্বর পেরিয়ে মহানভারত দরজায়
উড়িয়ে দিচ্ছে সবুজ পতাকার স্নেহ।
পতাকার দন্ডে আত্মমৈথুনরত সাহিত্যচেতনা।
থ্রিজি নেটওয়ার্কেও কেন গিলে নিতে পারছি না সমগ্র তুমিকে!
পিচ্ছিলজাত পরমান্নে ফসকে যাওয়ার খেলা।
উফ! আর পারছি না কেন!জ্বলে যাচ্ছে সৃষ্টিশীল তুরুপ?
কেন ডুবে যাচ্ছি তোমার মধ্যে?
তোমার থেকে তোমার আগুন জ্বলানো বীর্যক্ষয়ী শব্দের শরীরে?
সেখানে আউসের শীষে সোনালী শিল্পের ক্ষণজন্ম তেমন ভাবে
জরুরী কি?
সেখানে আমাদের মত সহস্র তামাটে চামড়ার ছড়াছড়ি
যারা চিচিং ফাঁক মেলে ধরে সিঁধিয়ে নিয়েছিল ছয় ফুট
আট ইঞ্চির আত্মঘাতী ধাতব সমীকরণ …
দশেরার রাবণ মারতে মারতে আমিও পুরুষ বিরোধী
হয়ে উঠছি সময়?
আমিও সেঁটে নিচ্ছি তকমা !নারীবাদী হলে
কতটুকু লাভ চেটেপুটে নেওয়া যায় ক্যালকুলেশনে বইয়ে দিচ্ছি
ফেসিয়ালে লোমতোলা মোম ত্বক!
আমার শিরায় -প্রতিশিরায় একশ ছিনে জোঁক বাসা
বাঁধবে বলে নি,
আমার জঙ্ঘার মধ্যবিত্ত গুহায় ঘোলা রসে তোমার নাম নিয়ে
প্যান্টি ভিজিয়ে যাবে এমন ও ঘটে নি প্রিয় পুরুষ।
তবুও তোমার প্রেমে পড়া যায়!
গত এককুড়ি রমনীর মত
বুকের ওড়না সরিয়ে বলতেই পারি আমিই বা কম কিসে!
যারা তোমার শীতঘুম ভাঙণের অহরহ নায়িকা , চোখ তুলে
দেখ নব্বই মিলিয়ন উষ্ণতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি শূন্যদশকের
খাতা জুড়ে।একশ শ্বাপদ হামলে পড়েছে নারীর
রাসালো খাদ্যের দিকে। সন্ধ্যারতি থেকে ভোরের নামাজে
তক ছুড়ে দিচ্ছে মুঠোমুঠো উপঢৌকন উপাচারে।
আমি ওদের পাত্তা দিই না….
তোমার কথা ভেবে,বালিসে চুমু খেতে খেতে এটা তো জানি
কগজের গায়ে উষ্ণতা দিতে সক্ষম বলেই আমার আগে ও পিছের
রাধাবিন্দুর একচ্ছত্র সম্রাট তুমি।
অগ্রজ “শুভা” মহলক্ষ্মী হলে তুমি শঙ্খ -চক্র -গদা – পদ্মে তেভাগার নারায়ন ,
রূপের পরে কয়েকটা শূন্য বসালেই জলন্ত সূর্যের তাপ ক্রমশ হ্রাস।
তখন কাকে আগ্রাধিকার দিয়ে বলবে প্রিয়
তোর শ্রীমুখ ঐশ্বর্যের উপর অন্নপূর্ণা!
ঐশ্বর্যের উপর নিটোল ফিগার এঞ্জেলিনা তথাস্ত ঠোঁটের আগমন!
না মশাই কেবল রূপের মহিমা নই…
সন্ন্যাসী এবং শরীরখোড় ঈশ্বর এলেও তরতর করে
লিখে যেতে পারি বিশ্বাসঘাতিনী শব্দ।
তোমার মত একচাদরের নীচে নারী ও শিল্পকে সঙ্গমরত করে
বলতে পারি নারী ও শিল্পের মত বিশ্বাসঘাতিনী আর কিছু নেই.
প্রেমিকার চোখের দিকে চোখ রেখে জেগে ওঠা পুরুষাঙ্গের মত
অস্থির কলমের দিব্যি -ঘাড়ের নীচে কামড়ে ধরে থাকা ক্ষুদার্থ
বাঘিনীরদল
তোমার শিরদাঁড়া ভাঙা জন্তুটাকেও নাড়িয়ে চাড়িয়ে
তারাও বলতে পারে-
যৌবন থেকে শিল্প পযর্ন্ত গল্পকে টেনে নিয়ে যাওয়াও একটা আর্ট,
যৌনতা থেকে কবিতা পর্যন্ত সৃষ্টিকে সফলতা দেওয়াও একটা আর্ট।
শুধু সেখানেই তুমি-আমি কি সফল!
“ওরা”বলে, নষ্ট শব্দের কচকচি ঘাঁটার চেয়ে তোমার
আর্থ্রাইটিস ভোগা অঙুল ঢের বেশি ভাল।
যাদের জড়িয়ে বলতে পারি, যে
শিশুদের জন্ম দিয়েগেল বাতক্ষয়িত আঙুল তারা তোমার বীর্যের
চেয়েও দামী।
শ্লেষ্মা কষ্টে হৃদপিণ্ড জাগা বুকে শেষ বারের মত ভরে নাও
বিশুদ্ধ অক্সিজেন আর একবার তোমার নীচে
আরাম গ্রহণকারিনী নারীটিকে ভেবে ছড়িয়ে দাও বীর্য
৩০০০০০০ শিশু উড়ে যাক গ্রিক মিথোলজির দিকে
সাবর্ণ লাম্পট্য আমপ্লিফিয়ার ছিঁড়েখুড়ে
নারীর পরম মমতার দিকে বেঁচে থাক মাইলের পর মাইল
নায়িকা ও পুরুষের পুনঃমিলনের পরে সৃষ্টি ইতিহাস।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল : মলয় রায়চৌধুরীর রাজনৈতিক কবিতা

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল : মলয় রায়চৌধুরীর রাজনৈতিক কবিতা

মলয় দা, মলয় রায়চৌধুরী এক অদ্ভূত মানুষ। ৮২ বয়সেও ২৮ বছরের তরুণ কবিদের মতো তারুণ্য লালন করেন। আমি তাঁর এক সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তার জবাবে আরো তা টের পেয়েছি।

তাঁর সাথে আমার দেখা হয়। বাংলাদেশে কবিদের দৌঁড় কলিকাতা পর্যন্ত। আমার মতো সাধারণ কবির পক্ষে কি স্বর্গীয় দিল্লি যাওয়া তো কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমার কবিতায় মলয় দা ঢুকে গেছেন, আবার মলয় দা আমাকে নিয়েও কবিতা লিখেছেন, ফেইসবুক লাইভে আমার কবিতা পাঠ করেছেন।

কি সব অদ্ভূত কাণ্ডই না করেন মলয় দা। গুণ দা’র মতো তাঁর পাগলামির শেষ নাই। শাশুড়িকে নিয়ে প্রেমের কবিতা লিখেন। প্রেমিকাকে বলনে- ‘মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো’। আমি বলেছিলাম, মাথা নাকি নুনু? তিনি যে জবাব দিয়েছিলেন, তাতেও টাশকি খেয়েছি।

‘১৯৬০-এর দশকের হাংরি আন্দোলন হাংরিয়ালিজম— তথা বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জনক ১৯৬০-এর দশক থেকেই ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে তিনি বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। গতানুগতিক চিন্তাধারা সচেতনভাবে বর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে উত্তর আধুনিকতাবাদ চর্চা এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার জন্যে রাষ্ট্রবিরোধী মামলায় গ্রেফতার ও কারাবরণ করেন।

সম্প্রতি তাঁর একটি কবিতা পড়ে থ মেরে যাই। সাম্প্রদায়িকতা, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা এবং দেশ বিভাগ নিয়ে অনেক কবিতা লেখা হয়েছে। কিন্তু মলয় রায়চৌধুরীর এই কবিতার অসাধারণ মর্মান্তিক এবং ভায়াবহ চিত্রকল্প চমকে দেয়! ফাঁসিতে ঝুলন্ত লাশ ঝুলতে ঝুলতে এক বার পাকিস্তান আবার হিন্দুস্থানের দিকে ঝুলছে!! কবিতার শিরোনাম “কে একজন ঝুলছে !”

—————————————

মেজদা বলল, “চল চল দেখে আসি, টিনের কারখানায় ঝুলে-ঝুলে

পাক খাচ্ছে কেউ”। দৌড়োলুম, ম্যাজিক দেখবো ভেবে—

ক্যানেস্তারা কেটে টিনগুলো কাঠের হাতুড়ি পিটে সোজা করে।

অতো উঁচুতে কেমন করে চড়েছিল ধুতি-শার্ট পরা রোগাটে লোকটা?

চশমা রয়েছে চোখে! ভালো করে দেখে বললুম, “মেজদা

ইনি তো আমাদের ক্লাসের অরবিন্দর বাবা ; ওরা দেশভাগে

পালিয়ে এসেছিল ফরিদপুর থেকে, সেখানে ইশকুলে পড়াতেন,

কিন্তু সার্টিফিকেট-টিকেট ফেলে জ্বলন্ত ঘর-দালান ছেড়ে

চলে এসেছেন বলে কোথাও পাননি কাজ, শেষে এই টিনের

শব্দ প্রতিদিন বলেছে ওনাকে, কী লজ্জা, কী লজ্জা, ছিছি…”

কিন্তু অতোটা ওপরে উঠলেন কেমন করে! টিনবাঁধার দড়ি খুলে

গলায় ফাঁস বেঁধে ঝুলছেন এখন, পাকও খাচ্ছেন, একবার বাঁদিকে

হি…ন..দু…স…তা…ন…আরেকবার ডানদিকে…পা…কি…স…তা…ন

হি……ন…..দু…..স…..তা…..ন…..পা…..কি…..স…..তা…..ন

………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল Saifullah Mahmud Dulal কবি, সাংবাদিক, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক। অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক আলহাজ্ব মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও সারা শহীদুল্লাহ (বি.এ.) সংসারে ৩০ মে ১৯৫৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাদের জন্মভিটা শেরপুর জেলায়। তার স্ত্রী অপি মাহমুদ; দুই কন্যা অনাদি নিমগ্ন ও অর্জিতা মাধুর্যকে নিয়ে সপরিবারে কানাডায় বসবাস করছেন।

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল ছাত্রাবস্থায় দৈনিক ইত্তেফাকের মফস্বল সংবাদদাতা হিসেবে সাংবাদিকতার জীবন শুরু। পরে দেশের বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় কাজ করেন। ১৯৮০ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদান। ১৯৯৬-এ তদানন্তিন সরকার তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসর দিলে প্রবাসী জীবন বেছে নেন। প্রবাসী বাঙালিদের জন্য নিউজ এজেন্সি ‘স্বরব্যঞ্জন’ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রবাস থেকে প্রকাশিত (যুক্তরাষ্ট্র থেকে অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক প্রবাসী, সাপ্তাহিক আমার পক্ষে, মাসিক পরিচয়, সাহিত্য পত্রিকা আকার-ইকার, মাসিক অভিমত; কানাডার থেকে সাপ্তাহিক প্রবাস বাংলা, সাপ্তাহিক ঢাকা পোস্ট, পাক্ষিক দেশ দিগন্ত, মাসিক বাংলাদেশ, সাহিত্য পত্রিকা বাংলা জর্নাল; জাপানের মাসিক মানচিত্র, মাসিক আড্ডা টোকিও, বিবেক বার্তা; অস্ট্রেলিয়ার সাপ্তাহিক স্বদেশ বার্তা প্রভৃতি) পত্রিকার সাথে যুক্ত। টরেন্টো থেকে প্রকাশিত অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক বাংলা রিপোর্টারে প্রধান সম্পাদক ছিলেন। তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের কানাডার বিশেষ প্রতিনিধি। টরন্টো থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলা মেইল এবং সিবিএবন২৪’এর উপদেষ্ঠা সম্পাদক। এছাড়াও কানাডার একটি প্রডাকশন হাউজে কর্মরত! তার দু’টি প্রকাশনা সংস্থা রয়েছে। যথাক্রমে- স্বরব্যঞ্জন এবং পাঠশালা। তিনি অনুস্বর, ছোটকাগজ, প্রচ্ছদ, সূচিপত্র এবং উপদেষ্টা সম্পাদক: বৈঠা।

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন, একুশে টিভি, চ্যানেল আইসহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত। বিটিভির শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘দৃষ্টি ও সৃষ্টি’র উপস্থাপক। বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারিত নাটকসমূহ সাযযাদ আমিনের কথা (প্রচারঃ ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯); জাকির, সাদিকের জীবন ও সাহিত্য (১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯); বৃক্ষ বন্দনা (১২ ডিসেম্বর ১৯৯৯); মুহম্মদ আলির চিঠি ( ১২ এপ্রিল ২০০০); ভালোবাসি ভালোবাসি (ফেব্রিয়ারি ২০০১); ওডারল্যান্ড (২ জুন ২০০১); বনসাই (ফেব্রুয়ারি ২০০৭); বৈশাখী (এপ্রিল ২০০৯); জাদুকর (১৭ আগষ্ট ২০১৩); শাখা ও শেকড়।

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় অবদান রাখার জন্য তিনি দেশ-বিদেশ থেকে বেশ কিছু পুরষ্কার পেয়েছেন। তিনি সূচিপত্র সাহিত্যপত্রের জন্য তিনবার মুক্তধারা একুশে পুরস্কার ১৯৮৭, ১৯৮৮ এবং ১৯৯২; শিল্প সাহিত্যে শেখ মুজিব গ্রন্থের জন্য জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র পুরস্কার ১৯৯৭, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু পদক ১৯৯৬; জাপান থেকে বিবেক সাহিত্য পুরষ্কার ২০০৫, পশ্চিমবঙ্গ থেকে কাব্যশ্রী খেতাব ১৯৭৭ এবং মাইকেল মধুসূদন পদক ২০০৫ সালে। শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্মৃতি পদক ২০১৩ সালে এবং আবু হাসান শাহীন স্মৃতি শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০১৮। আন্তর্জাতিক রূপসী বাংলা পুরস্কার ২০১৮, পূর্ব মেদনীপুর, পশ্চিম বঙ্গ। সাহিত্য দিগন্ত সন্মাণনা ২০১৯, ঢাকা।

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল এর প্রকাশিত বইয়ে সংখ্যা প্রায় ৬০টি। বই কবিতা : তৃষ্ণার্ত জলপরী, ফেব্রুয়ারি ১৯৮২, রুণা প্রকাশনী। তবু কেউ কারো নই (নাসিমা সুলতানের সাথে যৌথ), এপ্রিল ১৯৮৫, ছোটকাগজ। অপেক্ষায় আছি প্রতীক্ষায় থেকো, ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭ এবং ১৯৮৯, অনিন্দ্য। শহরের শেষ বাড়ি, জানুয়ারি ১৯৯১, ব্রাদার্স লাইব্রেরি। ঘাতকেরহাতে সংবিধান, ফেব্রুয়ারি ১৯৯০, মুক্তধারা। একি কাণ্ড পাতা নেই, ১৯৯৫, বিশাখা প্রকাশনী। দ্রবীভূত গদ্যপদ্য, ১৯৯৯ এবং ২০০১, স্বরব্যঞ্জন। ঐক্যের বিপক্ষে একা, ফেবুয়ারি ২০০০, ম্যাগনাম ওপাস। মুক্তিযুদ্ধের পঙক্তিমালা, ২০০১, কলম্বিয়া প্রকাশনী। এলোমেলো মেঘেরমন, ফেব্রুয়ারি ২০০০, অনন্যা প্রকাশনী। নির্জনে কেনো এতো কোলাহল, ২০০০, অনন্যা প্রকাশনী। পরের জায়গা পরের জমি, ২০০৪, উৎস প্রকাশন। নিদ্রার ভেতর জেগে থাকা, ২০০৪, সাংস্কৃতিক খবর, কলকাতা। ঘৃণিত গৌরব, ২০০৫, জাগৃতি প্রকাশন। কবিতাসমগ্র,ফেব্রুয়ারি ২০০৬, অনন্যা প্রকাশন। নীড়ে নিরুদ্দেশে, ২০০৮, স্বরব্যঞ্জন। সাতে নেই, পাঁচে আছি, ফেব্রুয়ারি ২০১২। প্রেম বিরহের কবিতা, (শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সাথে এক বক্সে), ১৯৯৬ শিখা প্রকাশনী। রবি ঠাকুরের প্রাইভেসি, ২০১৫, নওরোজকিতাবিস্তান। পাখিদের গ্রামে আজ একটি গাছে সাথে সাক্ষাৎ করার কথা, জানুয়ারি ২০১৭, কবিতাপাক্ষিক, কলকাতা। ফেরোমনের গন্দে নেশাগ্রস্থ প্রজাপতি, জানিয়ারি ২০১৭, আবিষ্কার প্রকাশনী, কলকাতা। তোমার বাড়ি কত দূর, অন্যপ্রকাশ, ২০১৭। প্রেমের আগে বিরহে পড়েছি, পাঞ্জেরি, ২০১৮। সঙ্গমের ভঙ্গিগুলো, বেহুলা বাংলা, ২০১৯। তিন মিনিটের কবিতা, ২০২০, স্বরব্যঞ্জন। আমার সঙ্গে শেখ মুজিবের দেখা হবে আজ, ২০২০ অন্যপ্রকাশ। অন্যান্য বই : সাহিত্যের শুভ্র কাফনে শেখ মুজিব, ১৯৯৩ অনিন্দ প্রকাশ। শিল্প সাহিত্যে শেখ মুজিব, ১৯৯৬ এবং ১৯৯৬, শিখা প্রকাশনী। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ : মুজিব হত্যা মামলা, শিখা প্রকাশনী ২০০০, শিখা প্রকাশনী এবং আহমদ পাবলিশিং হাউস ২০২০। বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবন, ২০০২, পাঠশালা। কানাডায় যাবেন কেনো যাবেন, ফেব্রুয়ারি,২০১২, প্রকাশনী। কানাডার কাশিমপুরে খুনি নূর চৌধুরী, ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, চন্দ্রদ্বীপ প্রকাশনী এবং ২০১৮ অনিন্দ্য প্রকাশন। কানাডার হাডির খরব নাড়ীর খবর, ফেব্রিয়ারি ২০১৭, সময় প্রকাশন। হারিয়ে যেতে নেই মানা (ভ্রমণকাহিনি) অনন্যা প্রকাশনী, ২০১৭। নাটকের বই : আজ আমাদের ছুটি, মার্চ ১৯৯৭, ২০১৭ শিশু একাডেমী। ওডারল্যান্ড, ২০০২, কলম্বিয়া প্রকাশনী। জাদুকরের উদ্দেশ্যে যাত্রা, ফেব্রুয়ারি ২০০১, আদিত্য অনিক প্রকাশনী। গল্পের বই : তুমি, ১৯৮৭, বিউটি বুক হাউজ। যাদুকর, ২০১৬, কথা প্রকাশ। কয়ড়া গ্রামে বুনো হাতি, ফেব্রিয়ারি ২০১৭, পাঠশালা। ভূতের পাসওয়ার্ড, ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বাংলাপ্রকাশ। রেসকোর্সের অশ্বারোহী ২০২০, অনন্যা। উপন্যাস : বীর বিচ্ছু, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, বংলাপ্রকাশ। যুদ্ধশিশুর জীবনযুদ্ধ, ২০১৭, বাংলাপ্রকাশ। গাছখুন, ২০১৯, পাঞ্জেরি পাবলিকেশন। স্মৃতিকথা : কাছের মানুষ দূরের মানুষ, ২০১৬, বাংলাপ্রকাশ। দূরের মানুষ কাছের মানুষ, ২০১৯, চৈতণ্য। ছড়ার বই : একাত্তরের দত্যি, ১৯৮৯, মুক্তধারা। কবি ঠাকুর রবি ঠাকুর, পাঠশালা ২০০৫। টাকডুমা ডুম ডুম, ২০০৫। পড়ার বই ছড়ার বই, ২০১০, ভাষাচিত্র। এক যে ছিলো শেখ মুজিব, ২০২০ পাঠাশালা। সম্পাদনা বই : মুক্তিযুদ্ধ : নির্বাচিত কবিতা, ১৯৮৭ নওরোজ কিতাবিস্থান। মুক্তিযুদ্ধ : নির্বাচিত ছড়া, ১৯৯০ পল্লব পাবলিশার্স। Poems of Liberation World ॥ Tren by Kabir Choowdhury, ২০০২, অন্যপ্রকাশ। বিভিন্ন ভাষায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা, স্বরব্যঞ্জন ২০০৫। মুক্তিযুদ্ধ :নির্বাচিত কবিতা (বাংলাদেশ, ভারত এবং ভিবিন্ন ভাষায়), জাগৃতি ২০০৫। কথাশিল্পীদের কবিতা, স্বরব্যঞ্জন ২০০৫। বঙ্গবন্ধুঃ ১০০ কবির ১০০ কবিরা, স্বরব্যঞ্জন ২০১৯। বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত ১০০ ছড়া, পাঠশালা ২০২০। বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত নির্বাচিত গল্প, স্বরব্যঞ্জন ২০২০। অন্যান্য বই : কবিতা সমগ্র ১ অনন্যা ২০০৯। বঙ্গবন্ধু সমগ্রঃ, স্বরব্যঞ্জন, ২০২০। শিশু কিশোর সমগ্র, ২০২০।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

অজিত রায় : কালচারাল হাইব্রিড মলয় রায়চৌধুরী

একটা জিনিশ মার্ক করেছি, মলয়দাকে নিয়ে, ইভন আমাকে নিয়েও, যাঁরাই লেখালেখি করেছেন, তাঁদের কেউই আমার বা মলয়ের ‘কালচারাল হাইব্রিড’-বোধের ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করেননি, বা, সেটাকে হাইলাইট করেননি। অনেকে হয়ত অজ্ঞানে, বা কলকাতাকেন্দ্রিক অনুশাসনিক ভাবুকতার কারণে সজ্ঞানে বাদই দিতে চেয়েছেন ব্যাপারটিকে। অথচ আমাদের দুজনেরই তামাম জীবন, পড়াশোনা, লেখাচর্চা, রাগ, ঘৃণা, তিক্ততা, আক্রমণের টার্গেট, বেঁচে থাকার বজহ বা অজুহাত, বেস, হয়ে ওঠা ইত্যাদির মূলে এই সাংস্কৃতিক দো-আঁশলাপনার বোধই যুগপৎ সুপ্ত ও মুখর থেকেছে। আজন্ম তথাকথিত ‘বহির্বঙ্গে’ লালিত এবং বহির্বঙ্গ-ফেরত মূল সংস্কৃতিতে বহিরাগত না-হলে হয়ত আমাদের লেখার নিজস্ব চিন্তাবিশ্বই গড়ে উঠত না। বিগ্রহ বা প্রতিষ্ঠান ভাঙা, প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে মাস্তানি ফুটপথিয়া বিহারি ভাষায় মলয়ের কবিতায় দুর্যোধন চ্যালেঞ্জ জানায়, দ্যাখো তোমরা —–

“আব্ববে পাণ্ডবের বাচ্চা যুধিষ্ঠির

বহুতল বাড়ি থেকে নেবে আয় গলির মোড়েতে

নিয়ায় ল্যাঙবোট কৃষ্ণ ভীম বা নকুল কে কে আছে

পেটো হকিস্টিক ক্ষুর সোডার বোতল ছুরি সাইকেল চেন

বলে দে দ্রৌপদীকে আলসে থেকে ঝুঁকে দেখে নিক

আমাদের সঙ্গে আজ কিছু নেই কেউ নেই ….

কবিতা বা অন্যবিধ লেখালেখিতে কোনো পূর্বাদর্শ বা বিশুদ্ধতার চর্চা না করে মলয় আগাগোড়া নিজের প্রতি সৎ থাকার চেষ্টা সহ নিজের আহরিত জ্ঞান, মেধা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক রাজনীতিক আর্থিক ও সাংস্কৃতিক তত্ত্বগুলোকে বিশ্লেষণ করেছেন এবং আধুনিকতার এইসব উপাদানের অসারতা প্রতিপন্ন করার মাধ্যমে সীমানা ভাঙার কাজ করে এসেছেন বলেই আজ তিনি মনোযোগ ও বিতর্কের বিষয়। আর এসবের পেছনে স্বাভাবিক ও পরোক্ষ ভিত্তি হিশেবে, অনুঘটকের কাজ করেছে তাঁর শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য, যৌবন ও প্রোঢ়ত্ব জুড়ে বিহার ও ভারতবর্ষের অন্যান্য ভাষা-সংস্কৃতির রাজ্যে সুদীর্ঘ যাপন। এই যাপনই তাঁকে দো-আঁশলা সাংস্কৃতিক জীব হিশেবে নিজেকে দেখার স্বচ্ছতা ও অকপটতা দিয়েছে ভাবলে ভুল হবে না।

বিহার-বাংলার যৌগ-সংস্কৃতি থেকে উঠে এসেছিলেন বলে, দুষ্কৃতী অধ্যাসিত বস্তিতে প্রতিপালিত হয়েছিলেন বলে, এবং ক্ৰমে-ক্ৰমে বঙ্গসংস্কৃতির বদলায়মান স্বরূপ জলবৎ দেখে ফেলেছিলেন বলে, বাংলা কবিতা ও আখ্যান সাহিত্যে কলকাতার ঔপনিবেশিক প্রভুমুখী দাসত্ব লক্ষ করেছিলেন বলেই, চেতোমান মলয় প্রথম থেকেই তাঁর লেখায়, বিশেষত কবিতায়, সন্ত্রাস অথবা তাঁর স্বীয় ভাষায় ‘ছুরি চাকু চালানো’ রপ্ত করেছেন। তাঁর বহু কবিতায় ওই সেলাখানার বিবরণ আছে, এবং সেই সন্ত্রাসী চিত্রকল্প। আর এইসব চিত্রকল্পের ধারাবাহিক অনুশীলনে তাঁকে স্বাভাবিক ভাবেই সাহায্য করেছে তার বাস্টার্ড কালচার। তাঁর আশৈশব-আহরিত প্রায় হাজার খানেক অঘোরি ছোটলোকি অশ্লীল কুৎসিৎ কুচেল অসৎ অভাগা দুর্ব্যবহৃত শব্দাবলি ও তার অভ্যন্তরীণ ইথস। বর্তমানের প্রতিফলনের দরুন সন্ত্রাসী ইমেজ, যা নিছক জান্তব বা যৌন নয়, এ এক মলয় রায়চৌধুরীর কবিতাতেই মেলে। যৌগ-সংস্কৃতির ডামাডোল অবস্থান থেকে সীমালঙ্ঘনের, বিগ্রহ ও মসনদ ভাঙার, যৌক্তিকতা ও আধুনিকতার দর্শনকে এভাবে গুমখুন পাল্টাখুন করার কাজটি, ফালগুন রায়কে মনে রেখেও বলা যায় —- ইতিপূর্বে বাংলা কবিতায় অন্য কেউ করেছেন বলে মনে হয় না। যৌগ-সংস্কৃতিতে মানসিক দীর্ঘ যাপনের কারণেই, বাংলার তাবৎ শব্দাবলিতে তাঁর নিবাস থাকা সত্ত্বেও, তিনি যখনই কিছু লেখেন, ওই দোআঁশলা সাংস্কৃতিক নিবাসটি তাঁর সদরে এসে কড়া নাড়ে। এই সততা, এই অকপটতা আমরা আর কার মধ্যে দেখেছি?

আসলে, আমার মনে হয়, যে-কথা আজিজুল হকও বলেছেন, মলয় রায়চৌধুরী এক অন্য পেরিফেরির জীব। মলয়ের হার্ট খুব স্ট্রং, রক্তে দুর্নিবার তেজ। মলয়ের চাইতে অনেক গুণ বড়ো ভাবুক ও মেধাবান চরিত্র ছিলেন সমীর রায়চৌধুরী। কিন্তু, আমার মনে হয়, মলয় আগাগোড়াই ‘হয়ে উঠতে’ চেয়েছেন। এই হয়ে-ওঠা সবার ‘বশের’ কথা নয়। হয় ক্ষমতার অভাব, নয় তষ্টির। মলয়ের ফলাফলটা বিলকুল যাকে বলে, রেস্পন্সিবল ইরেন্সিবলিটি। এই সূত্রেই একটা না-তোলা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। যে, মলয় রায়চৌধুরী কীসের জোরে নিজেকে হয়ে ওঠালেন, বিগ্রহের বিরুদ্ধে দাঁড় করালেন, হাতুড়ি চালালেন — সেই মানসিক, চেতনিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটটি সমগ্রতার আলোকে অনুসন্ধানের তাগিদ একটা তাই থেকেই যাচ্ছে গবেষকদের কাছে। আর কিছুদিন সময় নিচ্ছি। হয়ত ২০১৯-এর শেষদিকে এই নিয়েই আমার একটি গদ্যগ্রন্থ আসবে। তাতে আমার এই গর্ব অবশ্যই নথি থাকবে, যে, একদিকে জাঁদরেল মূর্খ প্রতিষ্ঠান, ব্রিটিশ গুরুর বীর্যিত পচাগলা মূল্যবোধে আকণ্ঠ বাঙালি বুদ্ধিজীবী-আলোচকের কেরবালা যাঁকে বুঝতে না পেরে, বা সভয়ে, এড়িয়ে রয়েছেন, মুখ ফিরিয়ে, তাঁকে সহ্য করতে না-পারা রঙরুট বন্ধুদের রিসালা, তাঁদের সম্মিলিত করাল মেঘের সামনে একটি সেলাই-না-পড়া লেখকের দ্বারা এই অঘটন তাঁদের দিনদাহাড়ে চাক্ষুষ করতে হবে।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

স্নেহা গুহ : লাভ ইউ মলয় রায়চৌধুরী

“আমি আজও আমার প্রথম বইটা লেখার চেষ্টায় বাংলা ভাষাকে আক্রমণ করে চলেছি । ইমলিতলায় ছিলুম বামুনবাড়ির মহাদলিত কিশোর।দেখি খুল্লমখুল্লা লেখার চেষ্টা করে কতোটা কি তুলে আনতে পারি। উপন্যাস লিখতে বসে ঘটনা খুঁড়ে তোলার ব্যাগড়া হয় না জীবনেকচ্ছা লিখতে বসে কেচ্ছা-সদিচ্ছা-অনিচ্ছা মিশ ধরে খেয়ে যেতে পারে তার কারণ আমি তো আর বুদ্ধিজীবি নই জানি যে মানুষ ঈশ্বর গণতন্ত্র আর বিজ্ঞান হেরে ভুত।”

এরকম অত্যাচারীত কথাবার্তা বলার হিম্মত দেখানো ছুতারের আজ ৮১তে পা,তাঁকে নিয়ে অসম্ভব রকমের রিসার্চ,অণুপ্রেরণা,হ্যানো-ত্যানো প্রচুর হয়েছে,হবেউ …আফটারঅল ৬০এর আগুনে দশকে বাংলা কবিতার খোলনলচে জুতোর বাস্কে ভরে পার্সেল করতে পেরেছিলেন যে তিনিই…হাংরি আন্দোলনের উদগাতা…কনট্রোভার্সিয়াল,লার্জার দ্যান লাইফ ক্যারেক্টার হয়ে স্বমহিমায় বিরাজ করছেন তিনি এখনো…অনবরত প্রতিআক্রমণ হয়েছে,তিনি সরে এসেছেন বারবার তার লেখার স্টাইল পাল্টে–দুর্দান্ত ক্রাফ্টসম্যান তিনি…

সম্ভবত আমি বাংলায় আভাঁ গার্দ নিয়ে পরিচিত হয়েছি প্রথম তাঁর লেখা পড়েই,একটি পত্রিকার লেখাটা(উৎসর্গীকৃত জর্জ গর্ডন বাইরন,ষষ্ঠ ব্যারন বায়রন)

“কে বলতো তুমি? দেখি আবার ডাক দেও! আমরা তার কাছে নাগিয়া খালি হাসিতাম। মজার বিষয় হইল আম্মুর ফোনে প্রথম দিকটায় কনফিউজ যাইতো,কার সাথে কথা বলতেছে সে।আরো অনেক ফোনালাপে আমরা দুজনেই অংশগ্রহণ করছি কিন্তু অপর‌ প্রান্তের লোকগুলা বুঝতোনা।”

এইধরনের বিষয়হীনতা লেখার মধ্যে ভাসতে ভাসতে জাম্পকাট করে সোশ্যাল ডিলেমা বিশেষায়িত একটা পরম্পরা তার নতুন লেখাগুলোয়…

(কিছু পরে ওই সেম লেখাতে পাওয়া যাচ্ছে)

“সেও শরীরে যতদিন তার রস ফেলে আমাকে নিংড়েছে, ততদিন আমাকে তার নিচে চেপে নিষ্পেষণ করেছে, তারপর নতুন কচি ফুল পেতে চলে গেছে…তাতে কিন্তু কারুর একটাও কোঁকড়ানো বাল ছেঁড়া যায় নি। আর আমার একটা বড় মাই (আপনাদের ভাষায়) দেখে আপনাদের প্যান্ট ফেটে যাচ্ছে। আজ আমার সাজানো সাজঘরে কালো আঁধারবিদাগ।”

কি বিলকুল সুন্দর জিহ্বায় উচ্চারিত পরপর দৃশ্যগুলো,ইনসাইড,আউটসাইড ডজ করে ওভারল্যাপিং…হ্যাঁ হাংরি শুরুর দিকে লেখায় এবং তারোপর এসোব লেখা তাঁর ছিল না,তাই আমাকে ভাবায় আরো কিভাবে তিনি নিজের চরিত্রের অণ্বেষণ করে গ্যাছেন,কোনোরকম ডিপ্লোম্যাসির ধার না ধারা অবয়ব ফুটফুটে ইস্ট্রোজেন।আমি এই লেখাটা কমপ্লিটলি অ্যাবসেন্স অব মাইন্ডে টুকছি,বন্ধুর দেওয়া কয়েকটা কবিতার দুর্বিসহ ইলাস্ট্রেশন যন্ত্রণার খোশগল্পে সীমাহীন মলয়ালম,আহা কি খাসা,ঠাঁসা ঠাঁসা…

তাঁর কবিতা একেবারেই নয় যা তিনি তার আমেজের ৮০ভাগ হয়তো তার উপন্যাসেই আছে,সরজমিনে তদন্তের খাশনবিশি,তবুও মলয় রায়চৌধুরী বাংলা কবিতার প্যারাসিটামল,আর তাঁর গদ্য-প্রবন্ধ অনবরত ইস্তেহার,এসোব আমার একটা বিকট থিসিস লেখার আগে ওনার সাথে চাকনার কাজ করুক,সিঙ্গেল মল্ট ইজ দ্য ক্লোজেস্ট থিঙ্গ টু হিজ হার্ট,খাবেন তাহলে,লাভ ইউ মলয় রায়চৌধুরী।

“জুরাসিক যুগের শেষ দিকে এক শ্বাসরুদ্ধকর এক্সপায়ারি ডেট

যতটা অবিশ্রান্ত হ্যাংলামি আদুরে প্রথমোক্ত ঘরাণার ঘরের

বউরা দুপুরে আমার ভেতর, যেন চিরবিরহী ম্যাড়ম্যাড়ে

ওই তেলে দ্রবীভূত সোনা দিয়া বান্ধানো পদযুগলে বাঃ ,

অনবদ্য ইত্যাদি ইত্যাদি এতটাই বেপরোয়া পুদুচেরির খুদে

মুরগি হুহুহু হিহিহি হাহাহা হোহোহো, তিনটি মাত্রাই রুদ্ধ র‍্যাম্পাট

কেলিয়েছে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পিরথিবি ছাইড়া চইলা যামু উউউউম্মাহহহ”

বাংলা কবিতার ভাববাদী চেতনার ডাইরেক্টনেস থেকে এক্কেবারে ঘুরপথে অ্যান্টি-এস্টাবলিষ্ড কঠিন বিমূর্ততার হ্যান্ডবিল প্রকৃতভাবে উজ্জল,অমলিন আকাঙ্ক্ষা হয়ে বেজে যাচ্ছেন হরবখত…

[ধন্যবাদ আমার চেনা-পরিচিতদের যারা আমায় পরিচিত করিয়েছেন হাংরি মলয়ের দৌড়ের রাশ চিনতে এবং এই লেখা একটা হোমাজ টু মাই প্রিডেসিসর,লাজোয়াব চুড়মুড়।]

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

অনুপম মুখোপাধ্যায় : মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে ১টি পুনরাধুনিক কাজ

এই মুহূর্তে, অর্থাৎ ২০১৯-এর পশ্চিমবঙ্গে এই যে উত্তপ্ত মে মাস চলছে, লোকসভা নির্বাচনের দামামাকে দূরাগত ঢক্কানিনাদ মনে হচ্ছে, যেন আমরা যে ট্রাইবের অন্তর্গত তার বিরাট পরবটি এসে পড়েছে, ঠিক এখনই, এই ভূতের নাচের মধ্যে, অশীতিপর মলয় রায়চৌধুরীকে আমার ভারতের একমাত্র বাংলাভাষী আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক বলে মনে হয়। আজ তিনিই একমাত্র জীবিত আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক ভারতীয় বাংলা ভাষায়। এটা আবেগ থেকে বলছি না। ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকেও বলছি না। এটা ঘটনা।

ষাটের দশক থেকে আজ অবধি মলয় রায়চৌধুরীর সারাজীবনের সাহিত্যিক কাজকর্ম দেখলেই সেটা বোঝা যাবে। এই মুহূর্তেও তিনি প্রচুর লিখছেন, কিন্তু, মৃত্যুচেতনার সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করছেন। সোশ্যাল নেটওয়ার্কে তাঁর সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছে এই বয়সে এসে একরকম অনিশ্চিত হতাশাও হয়ত তাঁকে ঘিরেছে। কিছুদিন আগে আমাকে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে লিখেছেন- ‘আমাকে নিয়ে তো কেউ লেখে না! কী হল এত লিখে?’ এই জিজ্ঞাসার ন্যায্য হতাশা হয়ত শেষ জীবনে সবারই প্রাপ্য থাকে। যদি খুব ভুল না করে থাকি, রবীন্দ্রনাথও তাঁর শেষ জীবনে এই বোধটা থেকে মুক্তি পাননি।

এটা বাংলাদেশ। এখানে বড় গাছগুলোকে আগাছারা আড়াল করতে পারে, কী করে পারে সেটা একটা দীর্ঘ প্রবন্ধের বিষয় হতে পারে, এখানে অপ্রাসঙ্গিক। তাছাড়া এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি পচে যাওয়া মাখনের মতো। তার বিশ্লেষণ হয়, কিন্তু ব্যাখ্যা হয় না। মলয় রায়চৌধুরীও সেই ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করে অসফল। তাই, যেটা তাঁর সফলতা, শেষ অবধি সেটা তাঁর কবি আর গল্পকার সত্বার জয়। প্রাবন্ধিক মলয়ের নয়।

মলয় রায়চৌধুরী সেই ধুরন্ধর সাহিত্যিক যিনি জানেন সারা পৃথিবীতে কী লেখা হয়েছে, কী লেখা হচ্ছে, এবং সেই অনুসারেই তিনি জানেন আর কী লেখা যেতে পারে। কোন লেখা তাঁর অপেক্ষায় আছে, লিখতে বাকি আছে, এই মোক্ষম সচেতনতা ব্রিটিশ ভারতে বাঙালি সাহিত্যিকদের অনেকের মধ্যে ছিল। স্বাভাবিকভাবেই ছিল, কারণ তখন কলকাতা ছিল পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর, উপমহাদেশের রাজধানী, সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শহর, রামমোহন-বিদ্যাসাগর-ডিরোজিও-মাইকেল-বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দের শহর, তখন সারা ভারতের মধ্যে কোনো চিন্তা প্রথম জাগ্রত হত বাঙালির ধূসর পদার্থে।

আজ যা পরিস্থিতি, মলয় রায়চৌধুরীর মতো একজন লেখকের লেখা বোঝার লোক খুব কমে গেছে। তিনি জনসাধারণের জন্য লেখেন না, এটাই যদি সাধারণ চিন্তা হয়, সেটা আমি মেনে নিতে পারি না।

মলয়ের কবিতার মধ্যে ‘পিপল’স পোয়েট’ হয়ে ওঠার শক্তি এখনকার যে কোনো কবির চেয়ে বেশি। মানুষ যে তাঁর কবিতা পড়ল না, তার একমাত্র কারণ তাঁর কবিতাকে মানুষের কাছে যেতে দেওয়া হল না। তাঁর উপন্যাস বেস্ট সেলার লিস্টে পাকাপাকিভাবেই থাকত, যদি তিনি প্রতিষ্ঠানের কাছে মাথা বিকোতেন, অথবা, প্রতিষ্ঠান তাঁর জন্য নিজের দিশা বদলাত, যদি তার আদৌ কোনো দিশা থেকে থাকে।আজ সেই লংকা নেই, কারণ অন্যরূপে রাবণ থাকলেও তার দশ মাথা নেই, অথচ যেদিকে তাকাবেন দেখবেন রাবণ টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে, এই হয়ত মলয় রায়চৌধুরীর ব্যাখ্যাকৃত পোস্টমডার্ন পরিসর। যদিও, আমার মতে, যেমন আমি আমার পুনরাধুনিক বিষয়ক গ্রন্থে দেখিয়েছি, এই পরিসর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরেই কলকাতায় এসে পড়েছিল।

মলয় রায়চৌধুরী এবং সমীর রায়চৌধুরী সেটাকে শনাক্ত করেন নব্বইয়ের দশকে, কিন্তু এমনভাবে করেন যেন সেটা সেই মুহূর্তেই প্রকটিত হল। জীবনানন্দ দাশ বা সমর সেনই যে তিরিশের দশকেই বাংলা কবিতার পোস্টমডার্ন এনে ফেলেছিলেন, মোটেই ৯০ দশকীয় কোনো পত্রিকার কাজ সেটা নয়, এটা কেন বলে ওঠেননি, আমার কৌতূহল আছে।

ষাটের দশকে মলয়েরই নেতৃত্বাধীন হাংরি আন্দোলন কি প্রথম পোস্টমডার্ন সাহিত্য আন্দোলন নয় বাংলা ভাষার? অবিশ্যি পোস্টমডার্নে কোনো নেতা তো থাকতে পারে না। তাতে আর অসুবিধা কোথায়? ওই আন্দোলনের অন্তর্ভুক্তজনেদের মধ্যে অধিকাংশই তো মলয় রায়চৌধুরীকে তাঁদের নেতা আজ আর মানেন না, তাঁকে হেয় করেন, তাঁদের কার কারও সন্তানরাও মলয়ের প্রতি বিদ্বিষ্ট, এমনকি এমন অনেকেই আছেন যাঁরা মলয়কে হাংরি আন্দোলনের ইতিহাস থেকে বাদ দিয়ে স্বস্তি পেতে চান। শ্রীকৃষ্ণকে বাদ দিয়েই কুরুক্ষেত্র হয়ে যাবে, সেই চেষ্টাটাও ভেরি মাচ পোস্টমডার্ন, তাই নয় কি?

হাংরি আন্দোলনের শত্রুরাই আজ ঠিক করে দিচ্ছে হাংরি আন্দোলনের ইতিহাস, এ এক প্যারাডক্স। আবার এটাও ঠিক, মলয় এগুলো নিয়ে না ভাবলেই পারেন। হাংরি আন্দোলন নিয়ে তিনি এই ২০১৯-এও বেশ অবসেসড্‌। ৫০ বছর আগে ফেলে আসা আন্দোলনটিকে তিনি আজও ভুলতে পারেননি। নিজেই ব্লগ বানিয়ে তার আর্কাইভ করেন। আজও হাংরি নিয়ে গদ্যের পর গদ্য লেখেন। এই অবসেসন তাঁর সাম্প্রতিক সাহিত্যকর্মে কিছুটা হলেও ছায়া ফেলে থাকবে, এমন আশঙ্কা মাঝেমধ্যে আমার মাথায় এসেছে। আত্মবিস্মৃত বাঙালিকে তিনি কি কিছুটা পটাতে চাননি এই একটা ব্যাপারে?

এই একটাই ব্যাপারে?দিল্লিতে ভারতের রাজধানী চলে যাওয়ার পরে, দেশভাগের দ্বারা বাঙালিকে ২ টুকরো করে দেওয়ার পরে, কংগ্রেস-নকশাল-সিপিএম-মাওবাদ-তৃণমূল-বিজেপি বিন্দুগুলিকে স্পর্শ করে করে আজ বাঙালি ভারতের একটি প্রান্তিক রাজ্যের অবহেলিত ফতুর জনসাধারণে পুনরায় রূপান্তরিত হয়েছে, পলিটিক্স সাহিত্য আর সংস্কৃতির দিক থেকে বাঙালি আজ অধঃপতিত হয়েই চলেছে, যেমন অবস্থায় সে প্রাক্‌-ব্রিটিশ যুগে ছিল, কোনো মোগল সম্রাটের তখন বাংলাদেশে পা রাখার প্রয়োজনই হত না, আজ পশ্চিমবঙ্গের রাষ্ট্রীয় মূল্য ৪২টা লোকসভা আসনেই চুকিয়ে ফেলা যাচ্ছে। তার ফলেই সিনেমা বা সাহিত্যের চেয়ে পলিটিক্স আজ অনেক বেশি অন্তঃসারশূন্য ও দক্ষিনী সিনেমার চেয়েও এন্টারটেইনিং। মন খারাপ হলে মুখর নেতা বা মুখরা নেত্রীর স্ট্যান্ড আপ কমেডি ভিডিও দেখে নেওয়া যাচ্ছে ইউটিউবে গিয়ে, এবং হা হা হো হো করে নেওয়া যাচ্ছে।

মলয় রায়চৌধুরী এটাকেই পোস্টমডার্ন পরিসর বলবেন, যথার্থই বলবেন, কিন্তু এই পরিসর তাঁকেও যথেষ্ট হেনস্থা করছে, কারণ, তাঁকে এখানে অনেকেই বুঝতে পারছে না, না বুঝে রিঅ্যাক্ট করছে, বুঝেও চুপ করে থাকছে, তাঁরই ব্যাখ্যা করা পরিসরে তিনি স্বয়ং কি যথেষ্ট বেমানান নন? সেটা না হলে তিনি বড় নন।

মলয় রায়চৌধুরীর স্বাভাবিক বিরোধাভাসটা এই যে, তিনি নিজেকে ছোটলোক ইত্যাদি দাবি করেও, বাঙালির সামগ্রিক হড়কে যাওয়ার কবন্ধ শরিক হননি, বিশেষ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক খুড়োর কলে নিজেকে জুড়ে ফেলেননি, বরং নিজেকে সারা পৃথিবীর সাপেক্ষে জায়মান লেখক করে তুলতে পেরেছেন। তাঁর উপন্যাস এবং কবিতা এবং প্রবন্ধকে প্রাদেশিক চেতনার বাইরে দাঁড়িয়ে পড়া যায়। এটা এই মুহূর্তে জীবিত দ্বিতীয় কোনো বাঙালি সাহিত্যিক সম্পর্কে আমি বলতে পারছি না। এটা আমার অজ্ঞতাপ্রসূত হলেও, দৃঢ় ধারণা, এবং কোনো প্রশংসাবাক্য নয়। একজন লেখকের জীবনে প্রায়ই এটা ঘটে যে, তিনি নিজের জন্য একটি লাগসই ভাবমূর্তি বেছে নিলেন, কিন্তু নিজেকে সেই মাপে ঢালতেই পারলেন না।

মলয় রায়চৌধুরীর ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে। তিনি নিজেকে বিহারের ইমলিতলা থেকে উঠে আসা ছোটলোক হিসাবে পেশ করতে চাইলেন, কিন্তু হাড়ে হাড়ে বোঝা গেল এই লেখকটি সাবর্ণ রায়চৌধুরীর বংশপরিচয়েই অধিক মানানসই, কারণ, মলয়ের মধ্যে যে আভিজাত্য আছে, যে আত্মসচেতন উদাসীনতা আছে, তা গত ১০০ বছরের বাংলা সাহিত্যে যথেষ্ট দুর্লভ, তাঁর মধ্যে অস্তিত্বের উৎকণ্ঠা থাকলেও বাংলা বাজারের ইতরতা নেই, প্রান্তিকতা যদি কিছু থেকে থাকে, সেটা স্বরচিত। তাঁর আচরণের মানবিক স্তরটিতে আছে এক আশ্চর্য খেঁকুরেপনা, অমরত্বের অদ্ভুত উদাসীন বাসনা আর দুর্দান্ত সেন্স অফ হিউমারের মিশ্রণ, যেটা তিক্ত যোদ্ধাকে মানায়, ব্যর্থ প্রেমিককে মানায়, প্রতিষ্ঠার ভিখারী বা প্রতিষ্ঠানের দালালদের কিন্তু মানায় না।

মলয় নিছক ছোটলোক নন। তিনি একজন অভিজাত ছোটলোক। ছোটলোক অভিজাত নন। বলা বাহুল্য এখানে আমি জাতপাতের কথা বললাম না।মলয় রায়চৌধুরী যে শঙ্খ ঘোষ, দেবেশ রায় বা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়দের চেয়ে ঢের বড় মাপের সাহিত্যিক এটাও মুক্তকন্ঠেই বলতে চাই। কারণ এঁদের মতো তিনি বিগত শতাব্দীর কবিলেখক নন। তিনি একবিংশ শতাব্দির সঙ্গে তুমুলভাবে যাচ্ছেন। হ্যাঁ, তাঁর উপন্যাস থেকে বাংলা সিরিয়াল হবে না। সিনেমাও হওয়া মুশকিল। তাঁর কবিতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে উদাত্ত আবৃত্তি করা চলবে না।

মলয় মেজর সাহিত্যিকের ধারণাকে অস্বীকার করেন, সেটা তাঁর কিছুটা গড়ে তোলা এবং কিছুটা আমদানিকৃত তত্ববিশ্বের ব্যাপার। আমি মলয় রায়চৌধুরীর তত্বকে মলয়ের কবিতা আর উপন্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা খুব জরুরি মনে করি না। আমি মেজর সাহিত্যিকের ধারনায় কঠিনভাবে বিশ্বাস করি, এবং, মলয় রায়চৌধুরীকে একজন যথার্থ মেজর সাহিত্যিক বলে মনে করি। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। একবার সোশ্যাল নেটওয়ার্কে বলেছিলাম কবি হিসেবে শঙ্খ ঘোষের জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পাওয়ার কথা ছিল না, বাঙালি কাউকে দিতেই হলে ওটা নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে দেওয়া যেত। আমার এই উক্তিতে ভীমরুলের চাকে ঢিল পড়ে যায়, এবং অনেকের দ্বারা আক্রান্ত হই। তাঁদের মধ্যে একজন বদমেজাজি সম্পাদক বলেছিলেন আমি মলয় রায়চৌধুরীর নাম কেন করলাম না জ্ঞানপীঠের যোগ্য প্রাপক হিসেবে। সম্ভবত এই উক্তি যিনি করেছিলেন আমাকে তিনি মলয় রায়চৌধুরীর নিকটস্থ গুণমুগ্ধ একজন ঠাউরেছিলেন এবং ভেবেছিলেন মলয়ের নাম না করাটা আমার অবস্থানের ভণ্ডামি ধরিয়ে দেবে। মজার ব্যাপার হল, সেদিন দেখলাম মলয় রায়চৌধুরী ওই ব্যক্তির ওই উক্তিকে নিজের ব্লগে সযত্নে জায়গা দিয়েছেন, অর্থাৎ গুরুত্ব দিয়েছেন, যদিও নিজে কোনো মন্তব্য করেননি।

আজ এই লেখায় স্পষ্ট বলতে চাইব, মলয়কে আমি এই মুহূর্তের বাংলাভাষায় একমাত্র আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক মনে করলেও শুধু জ্ঞানপীঠ কেন অন্য যে কোনো ভারতীয় পুরস্কারের প্রাপক হিসাবেই মলয়ের নাম কল্পনা করতে পারি না। পুরস্কার সর্বদাই উপর থেকে আসে, এবং হাত পেতে সেটা নিতে হয়। সেই পুরস্কারই নেওয়া চলে যেটার উচ্চতা লেখকের চেয়ে বেশি, এবং সেটায় তাঁর কোনো গ্লানি নেই। রবীন্দ্রনাথকে নোবেল প্রাইজে মানায়, রবীন্দ্র পুরস্কার তাঁর নেওয়া চলে কি? জ্ঞানপীঠও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কেই মানাত, তিনি পেয়েওছিলেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে মানাত না।

মলয় রায়চৌধুরীকে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার দেওয়ার অর্থ তাঁর স্তরকে মাঝারিয়ানায় নামিয়ে এনে তাঁর জায়মানতাকে খতম করে দেওয়া। মলয়ের মতো সাহিত্যিকরা পুরস্কৃত হতে জন্মান না। পুরস্কার তাঁদের মৃত্যুঘন্টা বাজিয়ে দ্যায়। যে কোনো সাহিত্যিকেরই বারোটা বাজায় একটা প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার, কিন্তু তাতে সামগ্রিক বাংলা সাহিত্যের খুব একটা ক্ষতি হয় না।

মলয় রায়চৌধুরীকে পুরস্কৃত করলে, কোনো সাহিত্যসভায় ধরে নিয়ে গিয়ে ফিতে কাটালে, কোমর নুইয়ে প্রদীপ জ্বালালে মলয়ের ব্যক্তিগত ক্ষতি কী হবে সে তো বললামই, বাংলা সাহিত্যের অনেক কিছুই ঘেঁটে ঘ হয়ে যাবে, সেই বিচ্ছিরি জট আর খোলা যাবে না। প্রতাপশালী কোনো প্রতিষ্ঠানের দেওয়া মুকুট পরলেই যে ওঁর মাথাটি হাতছাড়া হয়ে যাবে, মলয় সেটা নিজে খুব ভাল জানেন। যে কোনো মুকুটই আসলে একটি সাব্লিমেটেড টুপি। উনি যদি কাউকে মাথা কেটে পাঠান, সেটা প্রেমের উপহার হবে, লোভের নয়। সম্প্রতি ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাসে উনি লিখেছেন- ‘প্রতিষ্ঠান কখন আপনাকে টুপি পরিয়ে দেবে আপনি বুঝতেই পারবেন না।’ সম্ভবত এই উক্তি উনি শৈলেশ্বর ঘোষের প্রসঙ্গে করে থাকবেন, এটা আমার অনুমান, কারণ মাথায় শীতের টুপি পরে প্রয়াত শৈলেশ্বর ঘোষ কোনো একটা সাহিত্যমেলা উদ্বোধন করছেন, এমন একটা ছবি সেই সময়ে ফেসবুকে ভেসে উঠেছিল।

মলয় এভাবেই খোলাখুলি কথা বলতে পারেন এই বৃদ্ধ বয়সেও, এমনকি, নিজের তথাকথিত রাইভ্যালদের নিয়ে খিল্লি করতেও উনি কোনো দ্বিধা দেখান না। আমার মনে হয়, এটা শিক্ষণীয়। সোনার হরিণের প্রতি এই বেপরোয়া সাহিত্যিকের কোনো লোভ নেই, কারণ তিনি জানেন সোনার হরিণ হয় না, সেটার পিছনে অবশ্যই কোনো মায়াবী ফাঁদ লুকিয়ে থাকে, অনেক বড় কিছু কেড়ে নেওয়ার জন্য। বঙ্কিম পুরস্কার, আকাদেমি পুরস্কার পেয়ে মলয়ের আখের কিছুই গোছানো হবে না। যেটার প্রতি ওঁর আসল লোভ, সেই ইতিহাস তাহলে ভড়কে যাবে। মলয় তাই নিজেকে ইতিহাসে রাখার দায়টা নিজেই নিয়েছেন, এবং ঝাঁপিয়ে পড়েছেন পত্রিকাগুলোর পাশাপাশি ইন্টারনেটকে সম্পূর্ণ ব্যবহার করে নিতে।

ইন্টারনেটকে মলয় রায়চৌধুরী যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তা শিক্ষণীয়। এটা তাঁর কাছে বাঙালির শেখার আছে। একটা কথা মলয়ের বিরোধিরা প্রায়ই বলে থাকেন, যে মলয় খুব আত্মপ্রচার করেন। নিজের ব্লগ, নিজের উইকিপিডিয়া, নিজের সমস্ত লেখার সংরক্ষণের ব্যাপারে উনি সর্বদা যত্নশীল। নিজের লেখা নিজেই গিয়ে লোককে পড়তে বলেন। নিজের লেখার লিংক কেউ না চাইলেও তার ফেসবুক টাইমলাইনে গিয়ে পোস্ট করে আসেন। বলা বাহুল্য, একজন কিংবদন্তি সাহিত্যিকের কাছে বাঙালি এই আচরণ আশা করে না, এটা বাঙালির অভ্যাস আর প্রত্যাশার বাইরের ব্যাপার।

আমি আগেই বলেছি মলয় রায়চৌধুরী অমরত্বের বাসনা রাখেন, ইতিহাসে থাকতে চান নিজের মর্জি অনুসারী ইমেজে। সেটাকে লোভ বললেও কি খুব খারাপ হয়? আমার মতে, মলয়ের অতীতচারিতা অর্থাৎ হাংরি-অবসেসন যদি বাদ দিই, একজন সাহিত্যিকের অমরত্বের বাসনা, যশের আকাঙ্ক্ষা থাকা উচিত, সে বঙ্কিম যাই বলে থাকুন, সাহিত্যক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সফলতার লোভ খুবই প্রয়োজনীয় একটা ব্যাপার। লেখক কোনো সন্ন্যাসী তো নন! কাম ছাড়া যেমন পরিবার হয় না, ক্রোধ ছাড়া যুদ্ধ হয় না, সঠিক লোভ ছাড়া একজন শিল্পীর অগ্রগতি হয় না। ‘অগ্রগতি’ শব্দটাও মলয় রায়চৌধুরীর তত্ববিশ্বে বেমানান। কিন্তু আমার প্রিয়। পরিমিত ও সুনির্বাচিত লোভের দিকে একজন স্রষ্টা এগোবেন, এটা আমি সমর্থন করি। সেই লোভ বাঘের, তাজা রক্ত আর গরম মাংস নিজের সামর্থে লাভ করার, সেই লোভ হায়নার নয় যে যে কোনো একটা মৃতদেহ হলেই চলে যাবে। কেন একজন লেখক তাঁর লেখা একজন পাঠকের সামনে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেবেন না?

কেন একজন পাঠককে শিকার করবেন না তিনি! বাঘ যেভাবে তার হরিণকে ধরে, একজন লেখকেরও কাজ তাঁর পাঠককে ধরা, দাঁত এবং নখের সার্বিক প্রয়োগ করে। সভ্যতা ভব্যতা প্রোটোকল এসব ছাপোষা আর ক্রীতদাসদের মানায়, কবিকে নয়।এবং মলয় জানেন, তিনি হাংরি আন্দোলনের পুরোধা পুরুষ হলেও, তাঁর উপরে অজস্র লেখালেখি হলেও, গবেষণা হলেও, তাঁকে নিয়ে কাজ করে পিএইচডি নিয়ে কেউ কেউ ঘুরে বেড়ালেও, তিনিই স্বাধীন পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র জেলখাটা কবি হলেও, সাধারণ বাঙালি তাঁর নামই আজ অবধি জানে না। তারাই মলয়ের নাম জানে যারা স্বয়ং লেখালেখি করে, অথবা বাংলা সাহিত্যের হার্ডকোর পাঠক।

আজ থেকে প্রায় বছর পনের আগে আমি প্রথম মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে আলাপিত হই একজন বিখ্যাত সাহিত্যিককে বিশেষ দরকারে ফোন করতে গিয়ে রং নাম্বার ডায়াল করে ফেলায়। মলয় বুঝতে পেরেছিলেন আমি কাকে ফোন করতে গিয়ে তাঁকে ফোন করেছি। কিন্তু আমি লজ্জিত হলেও, তিনি রাগ করেননি। বরং সাগ্রহে আমার মতো একজন আনকোরা ছোকরাকে জানিয়েছিলেন তাঁর নাম মলয় রায়চৌধুরী, এবং ‘তিনিও’ লেখালেখি করে থাকেন। আমার মনে হয়েছিল নিজের এই পরিচয় তাঁকে দিতে হয়, নিজের পরিচয় নিজেই দিতে তিনি অভ্যস্ত, কারণ তাঁর সঙ্গে জনসাধারণের পরিচয় করে দেওয়ার এজেন্সি তাঁর কাছ থেকে কোনো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান নেয়নি, তিনিও দেননি। এটা শিক্ষণীয়। আমি তাঁর কাছে এটা শিখেছি।

আমি যে আজ নিজের ঢাক বাজাতে কোনো দ্বিধা করি না, কারণ আমিই প্রথম নই, আমার আগে মলয় আছেন। পোস্টমডার্ন মলয় নন। বাঘ মলয়।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান