বিশ্বজিত সেন : মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা

বাংলা সাহিত্য নিয়ে যাঁরা ভাবাভাবি করেন, তাঁদের কিছু মজার প্রবণতা আছে। তাঁরা কবিতাকে গদ্য থেকে একেবারে আলাদা করে দেখেন, ও সেই দেখা চিরস্হায়ি করতে নানাবিধ সাংস্কৃতিক প্রপেরও আয়োজন রয়েছে। যেমন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বেশিরভাগ অনুষ্ঠানেরই নাম— কবিপ্রণাম । রবীন্দ্রনাথকে মূলত দেখা হয় কবি হিসাবে। গল্পকার, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ তেমন গুরুত্বপূর্ণ লোক নন। আমাকে প্রশ্ন করলে আমি বলব, গল্পলেখক রবীন্দ্রনাথই আমার কাছে সর্বাধিক গ্রাহ্য । যদিও রবীন্দ্রনাথের গল্প লেখার দর্শন আমার কাছে একেবারেই গ্রহণীয় নয়, তবু ‘কবি’ রবীন্দ্রনাথের চেয়ে, এই লোকটি আমার চোখে ঢের বাস্তব।

কবিতাকে আলাদা করে দেখা, তাকে সুউচ্চ বেদিতে বসিয়ে রাখা, অহরহ গুজগুজ-ফিসফিস, আরে আজও যাচ্ছেতাই কাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে বাংলা সাহিত্যে ও মধ্যবিত্ত জনজীবনে । এ নিয়ে চিন্তা করেছি, আজও মাঝে-মাঝে করি। এ ভাবনার উৎস কোথায়?কিছুটা কি “ভারতীয় অতীত”- এর ব্যাপার রয়েছে এর মধ্যে। বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত— সবই কবিতায় । কবিকে রহস্যময় মানুষ মনে করা হত, যিনি নিজের চিন্তা-ভাবনাকে ছন্দবদ্ধ করতে সক্ষম। মনে করা হত স্বয়ং ঈশ্বর তাঁর কাছে বার্তা পাঠিয়ে থাকেন। ভগবানের স্পেশাল মেসেঞ্জার তিনি, ‘নট টু বি টেকন লাইটলি’। তার বহু পরে, ‘ভক্তি’ যুগে ভারতীয় সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কয়েকজন কবিকে সাধক বানিয়ে কুলুঙ্গিতে লাল শালু মুড়ে রেখে দেওয়া হল।কবীর, দাদু, নানক, সুরদাস, রহিম, জয়দেব, চণ্ডীদাস । তুলসীদাসকে ‘গোঁসাই’ বানিয়ে তাঁরও একই হাল করা হল।’রামচরিতমানস’কে ধর্মগ্রন্হ মনে করে গদগদ আপামর হিন্দিভাষী জনসাধারণ। তার দোহায় দোহায় শব্দের যে অদ্ভুত খেলা, ভাষাকে কাদার মতো ব্যবহার করে তা থেকে বিচিত্র নানা মূর্তি গড়ে তোলা, সেদিকে দুচারজন ক্রিটিক ছাড়া কারো নজরই যায়নি প্রায়। হিন্দি সাহিত্য ঐশ্বরিক বিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে কবে একাজে হাত দেবে জানি না । আজকে ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয়, এ-কাজ করার সময় এসে গেছে ।

ইংরাজপূর্ব বাংলার গ্রামাঞ্চল কিন্তু কবিকে অনেক সহজভাবে নিয়েছিল। কথক ও কবিয়াল ছিলেন, কবিগান ছিল। যাত্রার, পালার আসর ছিল, চণ্ডীতলা ছিল। অবশ্যই কবিকে স্পেশাল টেকনিকে দক্ষ লোক মনে করা হত; তবে সাউক বা অবতার, বা ভগবান নয় । কবির লড়াইতে তো কবিতা তৈরি হত সর্বসমক্ষে, মুখে-মুখে। আর হারজিতও ছিল। কাজেই রহস্যের সেখানে কোনো ভূমিকাই ছিল না । কবি স্পেশাল টেকনিকে দক্ষ বলে তাঁদের আদর-আপ্যায়নও হত, তবে তাঁকে একটি বেদিতে বসিয়ে তাঁর মুখের ওপর স্পটলাইট জ্বেলে রাখা ? নাঃ ! ইংরাজপূর্ব বাংলার গ্রামাঞ্চলে তা করা হত না।

ইংরাজরা আসার পর বাংলা সাহিত্যে কবিতার রহস্যের আমদানি হয় । নিজস্ব সংস্কৃতি বলতে ইংরাজদের কিছু ছিল না। যাকে তারা নিজের সংস্কৃতি বলত, তার খুঁটিগুলো সবই ছিল গ্রিস, রোম থেকে ধার করা। গ্রিসে ‘বার্ড’ বা ভ্রাম্যমান কবিদের নিয়ে রহস্য গড়ার অভ্যাস প্রচলিত ছিল। ভক্তি যুগের আদলেই প্রায় বলা যায়, তাঁদের ‘ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা’, ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী, ইত্যাদি মনে করা হত। হোমারের স্হান গ্রিক মানসে প্রায় ঋষির জায়গাতেই ছিল, দাড়ি-টাড়ি সমেত। শেকসপিয়রও আরও কয়েকশো বছর আগে জন্মালে ঐ জায়গাতেই পৌঁছে যেতেন। আমাদের সৌভাগ্য, তিনি পরে জন্মানোর দরুন বিশ্বসাহিত্য একটি নিদারুণ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গিয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং, সাহিত্যিক জীবনের পরবর্তীপর্বে, কবিতার বিশেষত্বের জায়গা থেকে অনেকটা সরে এসেছিলেন। যাকে সাহিত্যের বিশেষজ্ঞরা ‘গদ্য কবিতা’ বলেন, তা তাঁর এই বোধের সাক্ষ্য দেয়। তাঁর কিছু গদ্য কবিতা গল্পকেন্দ্রিক। সাহিত্যকর্ম ইশাবে অনেক উঁচু দরের কাজ সেগুলো। মোদ্দা ব্যাপার হল, আজ পাড়াব-পাড়ায় ‘কবি প্রণাম’ সত্ত্বেও সাহিত্যের বিভিন্ন ফ্যাকাল্টির মাঝখানের দেওয়াল ধ্বসিয়ে দেবার পক্ষপাতী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। তাঁকে বাঙালি এত বেশি ‘কবি’ বানিয়ে ফেলেছিল যে হাত খুলে এই কাজটি করা সম্ভব ছিল না তাঁর পক্ষে। তবে কাজের মধ্য দিয়ে ঠারে-ঠারে যতটা পেরেছেন, করেছেন। বিশেষ করে ছবি আঁকার মাধ্যমে।

কবিতাকে বা কবিকর্মকে ঘিরে একটা রহস্য সৃষ্টি করে রাখলে কবিতা কখনই সামাজিক পরিস্হিতির দলিল হয়ে উঠতে পারে না। কবিতার মিস্টিসিজমের প্রথম অসুবিধে এটা। কবিতা যদি সামাজিক পরিস্হিতির দলিল না হয়, তবে তাকে ড্রইংরুম সাজানোর ডলপুতুল বা অশ্রুমোছার রুমাল হয়ে থাকতে হয় কেবল।সেটা অবশ্য অনেকেরই মনঃপূত, বিশেষ করে যাঁরা ‘সমাজ-টমাজ’কে দশ হাত দূরে রাখতে চান। সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো সাহিত্যেও লড়াই আছে, পক্ষ-প্রতিপক্ষ আছে। একটি পক্ষের বিশেষ দর্শন এটাই। কবিতার গায়ে গরম হাওয়ার ঝাপটা যেন না লাগে।

কবিতার মিস্টিসিজমের দ্বিতীয় অসুবিধে ভাষার স্তরে। ভাষা তো একটি নদী বিশেষ। একূল-ওকূল দুকূলই সে ভাসায়। তাকে সিমিলি, মেটাফর, ছন্দবৃত্ত, মাত্রা, পয়ার ইত্যাদির গণ্ডীর মধ্যে সর্বদা বেঁধে রাখা যায় না। কবিতার নিয়মানুবর্তিতা থেকেই কবিতার মিস্টিসিজমের জন্ম। এই নিয়মানুবর্তিতার দরুনই, একটি বিশেষ শ্রেণীর প্রয়োজন অনুভূত হয়, যে কবিতা ‘লিখতে পারে’। যে ‘পারে না’, তাকে দূর করো, দাঁড় করিয়ে রাখো দরজার বাইরে। তার ভাষাটিও ব্রাত্য।

তাই, কবিতার স্বার্থেই, কবিতার রহস্যময়তাকে ভাঙা অত্যন্ত প্রয়োজন।

বাংলা সাহিত্যের সিরিয়াস পাঠক সম্প্রতি নড়ে-চড়ে বসেছেন। ষাটের দশকে, যে একটি তুমুল ওলোট-পালোট ঘটে গিয়েছিল বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে— সেদিকে নজর গেছে তাঁদের। দেরিতে হলেও, এটাই কাম্য ছিল।’হাংরি আন্দোলন’ নিয়ে ইতিপূর্বে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ গোছের কথাবার্তা হয়েছে। ‘হাংরি আন্দোলনকারীদের’ গভীর মননশীল পঠন-পাঠন ছিল, যাকে বলা যায় ওভারভিউ। হাংরির পরেও আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন এসেছে, তবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঝাঁকুনি হিসাবে হাংরিই ছিল “প্রথম”। বাংলা সাহিত্যের অবস্হা, হাংরি আন্দোলনের আগে ছিল অকালবৃদ্ধ আফিংখোরের মতো। রবীন্দ্র ঐতিহ্য পুঁটুলি বেঁধে কোলে নিয়ে বসে ঝিমোনো আর মাঝে-মাঝে চটকা ভেঙে, “অ্যাই, গোল কোরো না বলচি, পড়াশুনো করো, পড়াশুনো…”। অথচ দেশে-বিদেশে তখন ঘটছে যুগান্তকারী ঘটনা । ‘গ্রানমা’ জাহাজে চড়ে বিপ্লব করতে আসা কয়েকজন যুবক হঠাৎ জয়ী হয়েছেন। ওয়াশিংটন থেকে মাত্র নব্বই মাইল দূরে দেখা দিয়েছে বিদ্রোহের পতাকা। ওদিকে ঠাসবুনোট সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্রমে ঠোঙা বানাবার কাগজ বই আর কিছু নয়। স্হিতাবস্হাকামী বাণিজ্যিক সংবাদপত্র গোষ্ঠীর প্রচণ্ড একমাত্রিক দাপট বাংলা সাহিত্যে। তার দোরগোড়ায় মাথা না ঠুকলে কেউ মানুষই হবে না, সাহিত্যিক হওয়া তো দূরে রইল।

এইরকম সময়ে বাংলা সাহিত্যের ‘পীঠস্হান’ কলকাতা থেকে দূরে, পাটনা শহরে, যেখানে ঐশ্লামিক ধর্মশাস্ত্র পড়তে গিয়েছিলেন রামমোহন রায়, আর বেশ কয়েক বছর চাকরি করে গেছেন দীনবন্ধু মিত্র, সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে একটি অপরিচিত গরিব পরিবারের যুবক মলয় রায়চৌধুরী আই আন্দোলনটির ছক কষেন। দাদা সমীর রায়চৌধুরী কলকাতায় সিটি কলেজে পড়েন, সেই সুবাদে যুবা বাঙালি লেখক-কবিদের সাথে আলাপ-পরিচয় । দেশ-দুনিয়ে জুড়ে উথালপাথাল সত্ত্বেও কলকাতা, ব্রিটিশের প্রিয় ‘কালকুত্তা’ তখনও শীতল। বামপন্হী দলগুলোর বিরুদ্ধে গান্ধীবাবার কংগ্রেস প্রতিপালিত গোপাল পাঁঠা, ইনু মিত্তিরদের দাপাদাপি; কলকাতা শীতল। কবিতা ভবন (!) থেকে ‘কবিতা’ বেরোয় । বুদ্ধদেব বসুর পরিশীলিত আঙুল কবি বাছাই করে, ফতোয়া দেয়। দোর্দণ্ডপ্রতাপ সেই উপস্হিতি। এককালে…’না না অমন বলবেন না । সুকান্তও কবি। ছন্দ বোঝে। এই দেখুন আমি দেখাচ্ছি — পতা/কায় পতা/কায় ফেরমিল/আনবে ফেব্রু/য়ারি। দেখলেন ?

অট্টহাসি উদ্রেক করা সেই সময়। সমীর রায়চৌধুরীর ‘পাটনাই’ হওয়ার দরুন কলকাতার যুবক কবিদের পাটনায় আনাগোনা। এঁদের মধ্যে অন্যতম শক্তি চট্টোপাধ্যায়। যাঁর বিষয়ে বাসব দাশগুপ্তকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মলয় বলেছেন, “শক্তির কবিতা সম্পূর্ণ নিজস্ব ও অসাধারণ। কেননা তিনি পাঁড় অশিক্ষিত, কোনো লেখাপড়া করেন না, এবং দর্শন, ইতিহাস, সমাজবোধ এসব ছিটেফোঁটা তাঁর মধ্যে নেই। নিজের খাঁটি বোধ থেকে তিনি লেখেন, তখন তাঁকে জীবনানন্দের পরের প্রভূত ক্ষমতাসম্পন্ন মনে হয়।” মনে রাখা প্রয়োজন, এই সাক্ষাৎকারটি যখন দিচ্ছেন মলয়, তখনও হাংরি আন্দোলনের স্মৃতি, তজ্জনিত তিক্ততা, সব কিছু মলয়ের মস্তিষ্ককোষে উপস্হিত। কিছুই ক্ষমা করেননি। অথচ কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে মলয়ের চোখা, টান-টান মূল্যায়ন। ব্যক্তিগত তিক্ততা সেখানে ছায়া ফেলেনি।

হাংরি আন্দোলনের পরিকল্পনাপর্বে এই শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে মলয় সঙ্গে পেয়েছিলেন, আর পেয়েছিলেন দেবী রায় ( হারাধন ধাড়া) কে। পাটনার সুবিমল বসাক এসে যোগ দেন কিছুকাল পরে।একটি সাহিত্য আন্দোলন, যা বাংলা সাহিত্যের হাল-হকিকত পালটে দিয়েছিল, কত সামান্যভাবে শুরু হয়েছিল, ভাবলে অবাক লাগে। প্রেস পাওয়া যাচ্ছিল না, তাই মিষ্টির দোকানের বাকসো যে জব প্রেস ছাপতো, সেখানেই ছাপতে হয় হাংরি বুলেটিন। রিজার্ভ ব্যাঙ্কে মলয় তখন লোয়ার গ্রেড কেরানির চাকরিতে, কত মাইনে পেতেন জানা নেই, তবে প্রায় সম্পূণফ মাইনেটাই মনে হয় হাংরি বুলেটিনের পেছনে ঢালতে হত। বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে বাংলা কবিতায়, পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রথম কাগজ বেরোনোর আরম্ভটা এইরকম। ‘শতভিষা’ পত্রিকার তুলনায় ‘কৃত্তিবাস’ ও নিজেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাগজই বলত, তবে হাংরি বুলেটিনের সাথে তার ছিল মৌলিক প্রভেদ। ‘কৃত্তিবাস’ ছিল সাহিত্যিক উচ্চাকাঙ্খীদের কাগজ। তাঁদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়ে সুরে সুর মিলিয়ে। প্রতিষ্ঠান কখন যশ, প্রতিপত্তি, বৈভব, টাকাকড়ি, সামাজিক সুবিধার কাজে লেগে যায়, বলা তো যায় না। হাংরি বুলেটিনের উদ্দেশ্যই ছিল যুদ্ধ। আপসের জন্যে সেখানে কোনও জায়গাজমি রাখা হয়নি।

অনেকের মতে হাংরি আন্দোলনকারীরা কয়েকটি গিমিকের আশ্রয় নিয়েছিলেন রাতারাতি খ্যাত হবার জন্য, যেমন শাদা দিস্তা কাকজ, জুতোর বাকসো ইত্যাদি রিভিউএর জন্য পাঠানো, টপলেস প্রদর্শনীর আয়োজন ( টপলেসের অর্থ যে মুন্ড বা মস্তিষ্কবিহীনও হয়, এই বোধটুকু কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের হয়নি), জীবজন্তু-জোকারের মুখোশ বিলি ইত্যাদি। ‘হাংরি কিংবদন্তি’তে মলয় উদ্ধৃত করেছেন আবু সয়ীদ আইয়ুবের যে মন্তব্য, তা এ-প্রসঙ্গে দেখা যেতে পারে।কিন্তু মলয় বা তাঁর সঙ্গীরা কি জানতেন না যে প্রতিষ্ঠান ও প্রসাশন কতদূর হিংস্র হতে পারে? এ জানা সত্ত্বেও একজন চাকুরিজীবী ( মলয় ) নিজেকে এই ঝুঁকির সামনে এগিয়ে দিয়েছিলেন কেন ? শুধুই প্রচারের জন্য? না কি কিছু মূল্যবোধের ব্যাপারও ছিল ? মলয় তাঁর ‘সাক্ষাৎকারমালা’র এক জায়গায় বলেছেন, ‘ষাট দশকের সুস্হতা স্বাভাবিক ছিল না।’ এই অস্বাভাবিক সুস্হতাকে ভালোমতো একটা ঝাঁকুনি দেওয়াই উদ্দেশ্য ছিল তাঁর। তার জন্য দুহাতে হাতকড়া, কোমরে দড়ি পরে চোর-ডাকাতের সঙ্গে সার বেঁধে পাটনা শহরের রাস্তায় অতিপরিচিতজনের মাঝে হাঁটা, চাকুরি থেকে সাসপেন্ড হওয়া, পঁয়ত্রিশ মাস প্রতি সপ্তাহে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো— সবই। প্রচার পাওয়ার জন্য যদি এত করতে হয়, তাহলে তো মুশকিল। এর চেয়ে সহজ রাস্তা তো কতই ছিল। বিশেষত, ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীতে তাঁর দাদার বন্ধুরাই যখন সর্বেসর্বা। সমসাময়িক অন্যান্যদের মতন একটু মিঠে ব্যবহার রাখলেই আর দেখতে হচ্ছিল না। আর, ‘কৃত্তিবাস’ও তেমন-তেন বৈশিষ্টহীন ও লুপ্ত হবার পথে এগিয়েছে। সাহিত্য আন্দোলন সম্পর্কে ‘কৃত্তিবাসীয়’দের সততার এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কী হতে পারে ?

( দ্রষ্টব্য: কবিতীর্থ, মাঘ ১৪১০)

বলা যেতে পারে যে ‘কৃত্তিবাস’ যদি সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে না টিকে থাকে তবে ‘হাংরি বুলেটিন’ও তো টেকেনি। হ্যাঁ, হাংরি বুলেটিন উঠে গিয়েছিল মামলা-মকদ্দমার দরুন, অন্তর্কলহের দরুন। কিন্তু হাংরিদের ঝগড়াঝাঁটি ছিল খোলাখুলি, তাতে মধ্যবিত্তের চাপ-চাপ ঢাক-ঢাক ছিল না। মামলা-মকদ্দমার ভয়ে কেউ রাজসাক্ষী হয়েছিলেন ( সুভাষ ঘোষ,শৈলেশ্বর ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু প্রমুখ ), কেউ ভেবড়ে গিয়ে কলকাতার বাইরে কেটে পড়েছিলেন ( প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য প্রমুখ )। সেগুলোকে দেখার কোনও অর্থ হয় না।’হাংরি বুলেটিন’ বন্ধ হবার পর অগনণ পেশিবহুল বাহু এগিয়ে এসেছে আন্দোলনের পতাকা তুলে নিতে।জেব্রা, উন্মার্গ, ফুঃ, স্বকাল, ক্ষুধার্ত খবর, জিরাফ, কনসেনট্রেশান ক্যাম্প, ওয়েস্ট পেপার, চিহ্ণ, প্রতিদ্বন্দী ইত্যাদি পত্রিকাও হাংরি বুলেটিনই। মলয় কোনোদিন বলেননি যে হাংরি আন্দোলনের কপিরাইট একমাত্র তাঁর। হ্যাঁ, আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও দার্শনিক প্রতিনিধি হিসাবে তাঁর কিছু বক্তব্য থাকতেই পারে, যা তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে পাঠকদের সামনে রেখেছেন।এই অধিকার থেকে তো আর তাঁকে বঞ্চিত করা যায় না। মলয়ের পরবর্তীকালীনরা হাংরি মতাদর্শকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন।এটিও একটি আন্দোলনের প্রাণশক্তির প্রমাণ। মলয়, হাংরি আন্দোলন ফুরিয়ে যাবার পর, পড়ালেখার নিজস্ব পৃথিবী গড়ে তুলেছেন, মন দিয়ে এবং চুটিয়ে বিভিন্ন শহরে চাকরি করেছেন, সংসার করেছেন, ভারতীয় জনজীবনকে দেখেছেন, জীবন থেকে শিখেছেন। আজ গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধের যে হতচকিত-করা ফসল তিনি আমাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন তা সম্ভব হতে পেরেছে এরই দরুন। বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠানের গদি-আঁটা চেয়ারে বসে আঙুলে চাবির রিং ঘোরাননি মলয়। এর জন্য তাঁর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। অন্তত একটি আকাশ এমন রয়েছে, যাকে ঢেকে ফেলতে পারেনি কালো মেঘ।

মলয়কে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটির দরুন মামলায় পড়তে হয়। কবিতাটি বর্তমানে বহুল প্রচারিত, তাই তাকে আর সম্পূর্ণ উদ্ধৃত করার প্রয়োজন নেই। তবে এই কবিতাটিকে কেন্দ্র করে অশ্লীলতা ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মামলা, যদি ধরেও নেওয়া যায় যে এর পেছনে কোনো অসূয়া কাজ করছিল না, একটি কৌতুকপ্রদ মাইন্ডসেট-এর দিকে ইঙ্গিত করে। এই মাইন্ডসেটটি তদানীন্তন বুদ্ধিজীবী বাঙালির, যিনি পুজোর ছুটিতে সস্ত্রীক খাজোরাহো দেখতে যান। তাহলে মলয়ের কবিতা কেন গ্রহণীয় নয় ? মজা কেবল এই জায়গাটুকুতে নয়, অন্যত্রও আছে। “আমরা যখন অসভ্য ছিলুম তখন ওইগুলো বানিয়েছি। এখন আমরা সভ্য, এখন তো আর এসব চলতে দেওয়া যায় না ।” এও মানলাম, কিন্তু মাই ডিয়ার, ব্যাপারটা যে আদপে তা নয় একেবারেই। ব্যাপার আগাগোড়া অন্যরকম। যৌন রূপকল্প, দ্যোতক ও বিম্ব কেবল ব্যবহার করেছেন মলয়, সেগুলির মাধ্যমে নিজের কথা বলেছেন। এও চলবে না ? তাহলে শিবলিঙ্গ তুলে দিন, গৌরীপট্ট নাকচ করুন, অম্বুবাচী ব্যান করুন। কামাখ্যা মন্দিরে মা-কামাখ্যার মাসিক যেন আর না হয়। কি বলেন ? যাঁরা “অশ্লীল অশ্লীল” চিল্লিয়েছিলেন, তাঁরা সম্ভবত ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার-এর এই লাইনগুলো নজর করে দেখেননি–

১.

জন্মমুহূর্তের তীব্রচ্ছটা সূর্যজখম মনে পড়ছে

আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই

মলয় রায়চৌধুরীর প্রয়োজন পৃথিবীর ছিল না

তোমার তীব্র রূপালি য়ুটেরাসে কিছুকাল ঘুমোতে দাও শুভা

শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও

২.

হুঁশাহুঁশহীন গাফিলতির বর্ত্মে স্ফীত হয়ে উঠছে নির্বোধ আত্মীয়তা

আ আ আ আ আ আ আ আ আঃ

মরে যাব কিনা বুঝতে পার্ছি না

তুলকালাম হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরকার সমগ্র অসহ্যতায়

সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাব

শিল্পর জন্যে সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দোবো

কবিতার জন্যে আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই…

৩.

এরকম অসহায় চেহারা ফুটিয়েও নারী বিশ্বাসঘাতিনী হয়

আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই

এখন আমার হিংস্র হৃৎপিণ্ড অসম্ভব মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে

মাটি ফুঁড়ে জলের ঘূর্ণি আমার গলা ওব্দি উঠে আসছে

আমি মরে যাব…

৪.

৩০০০০০ লক্ষ শিশি উড়ে যাচ্ছে শুভার স্তনমণ্ডলীর দিকে

ঝাঁকেঝাঁকে ছুঁচ ছুটে যাচ্ছে রক্ত থেকে কবিতায়

এখন আমার জেদি ঠ্যাঙের চোরাচালান সেঁদোতে চাইছে

হিপ্নটিক শব্দরাজ্য থেকে ফাঁসানো মৃত্যুভেদী যৌনপর্চুলায়

ঘরের প্রত্যেকটা দেয়ালে মার্মুখী আয়না লাগিয়ে আমি দেখছি

কয়েকটা ন্যাংটো মলয়কে ছেড়ে দিয়ে তার অপ্রতিষ্ঠিত খেয়োখেয়ি

এই পঙক্তিগুলো একটু মন দিয়ে পড়লে বাঙালি মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর পক্ষে বোঝা দুষ্কর ছিল না যে নিছক যৌনতা নয়, আরো গূঢ় কোনো বোধের দ্যোতনা এই পঙক্তিগুলোয় রয়েছে।’সাত বছর আগের একদিন’ কবিতায় জীবনানন্দ লিখেছিলেন, “অর্থ নয় কীর্তি নয় স্বচ্ছলতা নয় আরও এক বিপন্ন বিস্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে। আমাদের ক্লান্ত করে, ক্লান্ত ক্লান্ত করে। লাশকাটা ঘরে সেই ক্লান্তি নাই…”। এই পঙক্তিগুলোকে উদ্ধৃত করে জীবনানন্দকে শবসাধক সাব্যস্ত করা অবশ্যই উচিত হবে না, অথবা ঘোর অঘোরপন্হী। তেমনই হাস্যকর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’-এ যৌনতার বহিঃপ্রকাশ খোঁজা। আসলে মলয়ের বিরুদ্ধে যখন ষাটের দশকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অশ্লীলতার মকদ্দমা দায়ের করা হয়, তখন ষাটের দশকের ‘অস্বাভাবিক সুস্হতা’ রাজত্ব করছে পুরোদমে।’দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে প্রবোধকুমার সান্যালের ‘দেবতাত্মা হিমালয়’ আর মেট্রো সিনেমার ফুটে রিফিউজি যুবতীদের শরীর নিয়ে চলছে অবাধ বাণিজ্য! পায়ের চটি ঘষটাচ্ছে রিফিউজি যুবক, ‘মাই ওন সিসটার স্যার, ভেরি সুইট, ওনলি সিক্সটিন’। অথচ বাঙালি পাঠক ‘কত অজানারে’র বারবেল সাহেব আর ‘সখী সংবাদ’ এর মিষ্টিদিদি, নতুন দিদি, এদের নিয়েই মুগ্ধ। সমাজ কোথাও নেই; সমাজের জ্ধবলাপোড়া, আর্তি, চিৎকার এগুলোও কোথাও নেই। বামপন্হীরা ‘পরিচয়’ পত্রিকা চালাচ্ছেন, তাতেও এন্ট্রি পারমিট নিয়ে ঢুকতে হয়। এইরকম এক সময়ে ‘হাংরি বুলেটিন’ এর দরকার ছিল, প্রয়োজন ছিল ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’-এর। মূল্যবোধ ভেঙে খানখান হওয়ার যে হরর, শিল্পপ্রতীক জোলো হয়ে যাওয়ার যে শক, তাকে যথার্থ ফুটিয়ে তুতে গেলে এই কবিতাই তো লিখতে হবে। মলয় তাই করেছিলেন।

অবশ্য বিপদ চেনার ব্যাপারে প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানের সূক্ষ্মদৃষ্টির প্রশংসা করতেই হয়। কেই বা পড়ে তখন ‘হাংরি বুলেটিন’, কটা লোক ? পাটনার দুই যুবক, একজন হাওড়ার, একজন বিষ্ণুপুরের, একজন শান্তিনিকেতনের, এদের বুলেটিন বেরোয়। তার জন্যও আবার এই প্রেস, ওই প্রেসের হাতে-পায়ে ধরাধরি। তাহলে? এমন কী ক্ষমতাসম্পন্ন এরা, যে ক্ষেপে উঠল গোটা কলকাতার বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রশাসন ? মলয়ের বিরুদ্ধে কেবল মামলাই নয়, তাঁকে ও অন্যান্য হাংরি আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করে অপমান করা হল চরম, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন এই জাতীয় প্রবণতা মাথা তোলার হিম্মত না করে ।

বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন যে সমাজকে বুঝতেন না তা নয়, ভালোমতোই বুঝতেন। তাঁরাও জানতেন যে, যে-বদমায়েশি তাঁরা শিল্প, সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতির সর্বত্র বিছিয়ে রেখেছেন, তা মানুষের জন্য নয় । তবে শ্রেণী স্বার্থে এর প্রয়োজন তাঁদের ছিল। যেমন ইংরেজরা, আই.সি.এস.কে লৌহ কাঠামো হিসাবে গড়ে তুলতে ছেয়েছিল, তেমনই উত্তর-স্বাধীনতা যুগের ভারতীয় পুঁজিবাদ, আমলাতন্ত্র ও তার মিডিয়া-খানসামাদের লক্ষ ছিল একটি জড়, নির্বোধ, সংবেদনহীন মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে তোলা। তাদের রুচি, জীবনযাপন, মূল্যবোধ, সব কিছু হবে ছাঁচে ঢালা, সিনথেটিক। তারা হাসবে, কাঁদবে, গাইবে, সঙ্গম করবে একটি বিশিষ্ট কায়দায়। ‘হাংরি প্রজন্ম’এর হুড়মুড় করে এসে পড়ায় এই গোটা গেমপ্ল্যানটি ধ্বসে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। মলয় এবং অন্যান্যদের ওপর আক্রমণ সেই কারণেই।

প্রজাপতি-আঁকা বিয়ের কার্ডে হাংরি প্রজন্ম ধ্বনি তুলেছিল, “গাঙশালিক কাব্যস্কুলের জারজদের ধর্ষণ করো”। এই ধ্বনিটিতে অন্তর্নিহিত ছিল তদানীন্তন কাব্যধারার প্রতি বিবমিষা।

প্রকৃতি, নিসর্গ এই ব্যাপারগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছিলো বাংলা কবিতার কলোনোয়াল রোগবিশেষ। রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ ছিল একটা কমপালশান, যেমন লেখালিখি ছিল তাঁর কমপালশান। সেজন্য তাঁর লেখায় প্রকৃতি, নিসর্গ বিশেষভাবে উপস্হিত— কবিতায়, নাটকে, উপন্যাসে। আঁকার সময়ে তিনি এগুলো বর্জন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে, বাংলা কাব্যধারায় এই ব্যাপারগুলো প্রয়োজনীয় অনুপান হয়ে ওঠে। এবং অনুপানেরও অধিক, অভ্যাস।জীবনানন্দ লেখেন ‘রূপসী বাংলা’। তাতেও নিসর্গ ছিল; তবে সেই নিসর্গ, প্রকৃতির প্রতিটি কমপোনেন্ট আবহমানের বাঙালিজাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব করেছিল।মানুষের সাথে সম্পর্কবিহীন ছিল না সেই নিসর্গ, সেই প্রকৃতি।সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, “একদা আষাঢ়ে এসেছি এখানে, মিলের ধোঁয়ায় পড়ল মনে; কালবৈশাখী নামবে যে কবে আমাদের হাত-মেলানো গানে”। এখানে মানুষের সংগ্রামকে আঁকা হয়েছে প্রাকৃতিক ঘটনার রং-তুলিতে। কিন্তু বাংলা ভাষার সেইসব কবিরা (গাঙশালিক কাব্যস্কুল) সৃষ্টি করছিলেন মনুষ্যবিহীন নিসর্গ, মানুষকে মাইনাস-করা প্রকৃতি। এ ছিল একজাতীয় পলায়নবাদ। শংকরের ‘কত অজানারে’ যেমন বাঙালি যুবকের বেকারত্ব থেকে পলায়ন করতে চেয়ে বারবেল সাহেবের মহানতায় বুঁদ হয়ে থাকা, বিমল মিত্রের মিষ্টি দিদি, নতুন বৌদি, ছোট বৌঠান যেমন নারী-পুরুষের স্বাভাবিক যৌনসম্পর্ক ফেস করতে না চাওয়ার যুক্তি, তেমনই ‘গাঙশালিক কাব্যস্কুল’ ছিল মানুষের দুঃখ, শোক, রোগ, ঘা-পাঁচড়া এগুলোকে দেখতে না চেয়ে স্টুডিওর পর্দায় আঁকা চাঁদ, তারা, নদী, ফুলে বিভোর হয়ে থাকা। ঠিক তখনই মানুষের জীবনধারণ কতদূর দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছিল, তা দেখতে পাওয়া যায় ঋত্বিক ঘটকের ফিলমগুলোতে। সেই দৈন্য, দুর্দশা, দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইয়ের প্রতিফলন এই কবিতাগুলোতে কোথাও ছিল না। কেন ? কেননা, তা করার অসুবিধে ছিল। তা করতে গেলে দীর্ঘ একটা লাফ দিতে হত, বিশেষ করে ভাষার ক্ষেত্রে।ঋত্বিক যেমন ‘মেঘে ঢাকা তারা’ বা ‘কোমল গান্ধার’ -এ গোটা ইডিয়মটিকেই ভেঙেচুরে ফেলেছিলেন, তেমনই ষাটের দশকের বঙ্গসমাজ ও মানুষেকে তুলে আনতে গেলে বাংলা কবিতার গোটা ইডিয়মটিকেই ভাঙতে হত। খানিকটা শ্রেণী পরিপ্রেক্ষিত আর কিছুটা গাড্ডায় পড়ে যাওয়ার ভয়, উভয়ে মিলে এ-কাজ করতে দেয়নি বাংলা ভাষার কবিদের। অতএব চাঁদ, তারা, নদী, ফুল, মৌমাছি…

আরেকটি প্রশ্নও ছিল। কবি কি কেবল কবিতাই লিখবেন, না সামাজিক ভাষ্যকারও হবেন ? রবীন্দ্রনাথ কেবল কবি নন, সামাজিক ভাষ্যকারও ছিলেন। জীবনানন্দও তাই ( জীবনানন্দকে নিবীঢ়ভাবে পড়লে এই ব্যাপারটি ধরা পড়ে) । কিন্তু উত্তরোত্তর সামাজিক ভাষ্যের ব্যাপারটি বাংলা কবিতা থেকে উঠে যেতে থাকে। “কবিতা কবিতাই। সামাজিক ভাষ্যটাষ্য আবার কী?” এ-জাতীয় একটী প্রবণতা বাংলা কবিতাকে পেয়ে বসতে থাকে। একে ক্রমাগত হাওয়া দিতে থাকে স্বার্থান্ধ বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠান।

খুব স্বাভাবিকভাবেই নভেম্বর ১৯৬১-এর প্রথম বুলেটিন থেকেই হাংরি প্রজন্ম এই প্রবণতার বিরুদ্ধে ছিল। সেই দিন থেকে আজ অব্দি মলয়, সামাজিক ভাষ্যকারের ভূমিকাটি কোনোদিনই হাতছাড়া করেননি। ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’এ যেমন সামাজিক বিশৃঙ্খলা নিয়ে তাঁর তীব্র বিবমিষা, তামনই আজও। তাঁর হালের একটি কবিতা নেওয়া যেতে পারে, ‘যা লাগবে বলবেন’ সংকলন থেকে । কবিতাটির নাম ‘ক্ষুধার্ত মেয়ে’:

আমার আসক্তি নেই কোনো

চলে যা যেখানে যাবি

যার সঙ্গে শুতে চাস যা

আমি একা থাকতে চাই

ক্ষুধার্ত বা পেটুক মহিলা

যে ঘোরে সবার হাতে

খড়কুটোময় সংসারে

তার কোনো প্রয়োজন নেই।’

কবিতাটিতে জড়িয়ে আছে একটা ঈষৎ বোহেমিয়ান বাচনভঙ্গী। পড়লে মনে হবে কেউ একজন লিখছেন তাঁর শয্যাসঙ্গিনীর উদ্দেশ্যে। এটি কিন্তু কবিতার প্রথম স্তর। দ্বিতীয় স্তরে কবিতা ও সমাজ সম্পর্কে মলয়ের দার্শনিক বোধ সন্নিহিত। শয্যাসঙ্গিনী মহিলাটি আসলে কবিতাই। অথচ সবার হাতে ঘোরার প্রবণতা তার, সে হাত স্মাগলারের হোক বা বিপ্লবীর।কবিতার লয়ালটি সন্দিগ্ধ। ওদিকে সংসার অনিত্য, অতএব তার প্রয়োজন কিসের ?

‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতায় যে-কথা বলার জন্য মলয়কে অনেক বেশি জায়গা ব্যবহার করতে হয়েছে, ‘যা লাগবে বলবেন’ গ্রন্হে সেই কথাই তিনি বলেছেন অনেক সংক্ষিপ্ত পরিসরে। ‘হাংরি আন্দোলন’ থেকে সরে এসে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ইন্সপেক্টিং অফিসার হিসেবে ভারতের গ্রামে-গঞ্জে শহরে শহরে ঘোরা, তারপর এ.আর.ডি.সি. ও নাবার্ডের গ্রামোন্নয়ন বিশেষজ্ঞের উচ্চপদে। যদিও মলয় তাঁর এই পরিবর্তিত জীবনশৈলী নিয়ে ‘হাংরি কিংবদন্তি’ গ্রন্হের শেষে মশকরাও করেছেন, “ছাই-এর জায়গায় আসে টুথপেস্ট, কয়লার উনুনের বদলে গ্যাস, সর্ষের তেলের বদলে সূর্যমুখী, শার্ট-প্যান্টের বদলে সাফারি, মাদুরের স্হানে বিছানা, ঢাবার বদলে রেস্তরাঁ, দিশির জায়গায় স্কচ, কলেজস্ট্রিট ও বইপাড়ার বদলে বাংলার গ্রামশহর।” কিন্তু তবু জীবনের এই অধ্যায়টিও যে কবি হিসেবে মলয়কে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছে, তাতে সন্দেহ নেই।

‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’-এ বাঁধন-ছেঁড়া রাগ ছিল মলয়ের কবিতার পরিচিত চিহ্ণ। কিন্তু এই পর্যায়ে এসে জীবনের বহু কিছু দেখে-শুনে মলয়ের কন্ঠস্বর তেতো, অম্লকষায়, আর তার সাথে এসে জুটেছে আয়রনির অধুনান্তিক পরিহাসও। তবু তা মলয়ের কবিতাকে সর্বজনগ্রাহ্যও করে তোলে বটে।’যা লাগবে বলবেন’-এর আরও একটি কবিতাকে নেওয়া যেতে পারে, যেমন ‘দ্রোহ’:

এ-নৌকো ময়ূরপঙ্খী

তীর্থযাত্রী

ব্যাঁটরা থেকে যাবে হরিদ্বের

এই গাধা যেদিকে দুচোখ যায় যায়

যাযাবর

ঘাট বা আঘাটা যেখানে যেমন বোঝে

ঘুরতে চাই গর্দভের পিঠে

মাথায় কাগুজে টুপি মুখে চুনকালি

পেছনে ভিড়ের হল্লা ।

ব্যাস! কবিতা এইটুকুই। অথচ বাঙালি সমাজের যে একটি বিশেষ প্রবণতা, কবিকে বেদিতে বসিয়ে রাখার, তাকে কত সার্থক ভাবে ভাঙঅ হয়েছে এখানে। পাটনার অন্ত্যজ মহল্লাগুলোতে হোলির দুতিন দিন আগে থেকে চোখে-পড়া একটি সুপরিচিত দৃশ্যকে ব্যবহার করেছেন মলয়, প্রশ্নাতীত দক্ষতাসহ। তার সাথে মিশিয়েছেন তীর্থযাত্রার জন্য বাঙালি হিন্দুর চিরাচরিত আতুরতাটিকে, যাতে পোস্টমডার্ন পরিহাস আরও তীব্র হয় । আর… হাংরি মামলার সময়ে তাঁকে যে-সামাজিক অবমাননা সইতে হয়েছে, তাও উঠে এসেছে। মাত্র কয়েকটি পঙক্তির মধ্যে কত প্রসঙ্গ যে এসেছে, অথচ বলার ভঙ্গিটি এত সহজ যে ভাবাই যায় না ।

এই সংগ্রহের আরেকটি কবিতা ‘যে পার্টি চাইছেন সে পার্টিই পাবেন’।

বিশ্বাস এক দুর্ঘটনা

বুকপকেটে শ্রেণী

প্রতিরোধী থাকেন জেলে

কাজু-ফলের ফেনি

বরং ভালো

ভুল অঙ্কের ডানা।

…মোড়ল দলের পাড়ার কেউ বা

আওড়ায় বেঘোরে

ছাদ ঢালায়ের সমরবাদ্য

কর্তাবাবার জানা

মেলাবেন তিনি অন্তরীক্ষে

মোক্ষ একখানা ।

কবিতার শেষ দুটি পঙক্তিতে অমিয় চক্রবর্তীর ‘মেলাবেন তিনি মেলাবেন’, এই শান্ত, স্হিত, প্রায় ব্রাহ্ম, উত্তর-রাবীন্দ্রিক বিশ্বাসের আদলটি একেবারে বিপরীত অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে পার্টি আমলাতন্ত্রের যে প্রবল দাপত, যার দরুণ তেলে-জলে মিশ খেয়ে একেবারেই একাকার, পুতুল নাচের সুতোর শেষ প্রান্তটি ব্যক্তিবিশেষের হাতে, সেটিতে যেমন-যেমন টান পড়ছে, কাঠের পুতুলগুলো তেমন-তেমনই নাচছে; এই গোটা পরিবেশটি উঠে এসেছে কয়েকটি মাত্র পঙক্তির মাধ্যমে। মলয় বুঝিয়েছেন, যা বোঝাতে গেলে অন্তত কয়েকশো পাতার বই দরকার। আর? বিরোধীপক্ষ বলতে কিছু নেই আর। যারা বিরোধ করছে, তারাও বস্তুত নিজের-নিজের ছাদই ঢালাই করছে। সেই ছাদ ঢালাই-এর বাজনাকে মানুষ মনে করছে সমরবাদ্য।

এত সূক্ষ্ম যাঁর ভাষার পরিমিতিবোধ, তিনি কিন্তু ‘চিৎকারসমগ্র’ গ্রন্হে এসে আবার অন্যরকম হয়ে যান। দড়ি ঢিলে দেন একটু, যাতে তাঁর সংবাদবাহক ঘুরতে পারে জায়গা-বেজায়গায়। ‘ভাঙনের ছায়াগাছ’ কবিতাটির অংশ পড়া যেতে পারে এই প্রসঙ্গে:

হাজত থেকে ছাড়ান-পাওয়া সেই প্রৌঢ় নদী

নাচছে দুর্গাবোঙার ফরসা কোমর জড়িয়ে

শহর-পুরুতের গামছা কাঁধে

তাককা হুরে

আরে হুরে তাককা হুরে

বোঙা আদিবাসী দেবতা-অপদেবতার সর্বনাম। দুর্গা বাঙালির আবহমানের দুর্গতিনাশিনী। তারই কোমর জড়িয়ে নাচছে হাজত থেকে ছাড়ান-পাওয়া প্রৌঢ় নদী, কাঁধে শহর-পুরুষের গামছা। তাককা হুরে, আরে হুরে তাককা হুরে, শহুরে মাস্তানদের উল্লাসধ্বনি।

ভাঙনের ছায়াগাছ। এই ভাঙনকে সর্বদা দেখতে পাওয়া যায় না, অথচ সে তার কাজ করে চলেছে। ভাঙন বস্তুত একটি সার্বিক প্রক্রিয়া। এর দরুন সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে মজাদার মিলমিশ। বুর্জোয়ার বক্তব্য আশ্রয় করে লুমপেনের ভাষাকে।লুমপেন অ্যাডপ্ট করে বুর্জোয়ার চালচলন। এর সংস্কৃতি ঢুকে পড়ে ওর উঠোনে। ওর ‘রোনাধোনা’য় শোনা যায় এর অনুরণন।

চিৎকার করতে-করতে পড়ছে জলপ্রপাত চুলে

ঢাউসপেট পোয়াতি অফিস-বারান্দায় আইল হাতে

থ্যাতলানো ট্যাক্সিচালক হাওড়া স্টেশানে

যেখানে সাপের ফণা জমা রাখতে হয়

শহর বিষদাঁত খুলে নেয় প্রত্যেকের। ছোবলানো তো চলবেই না, ফোঁস করাও নয়। অফিস বারান্দায় ফাইল হাতে গর্ভিনী। কী প্রসব করতে চলেছে সে ? তারই মধ্যে ঝরে যেতে থাকা কেশপাশের চিৎকার। আলুলায়িত কেশপাশ বাঙালির আবহমানের সৌন্দর্য-মিথের অংশ।

মেঝেময় ছড়িয়ে-থাকা গোঙানির টুকরো তুলে

তারা বদলায়নি তবু আদল পালটেছে

হে নাইলন দড়ি বাড়িতে এখন কেউ নেই

কিন্তু বাইরে হাজার দুর্গন্ধে ভাগ-করা শহর

কবিতাটি পড়তে-পড়তে বহু পুরোনো টার্কিশ ফিলম ‘কংকারার্স অফ দি গোলডেন সিটি’র কথা মনে পড়ে। নিষ্পাপ একটি গ্রাম্য পরিবার শহরে এসে সব কিছু ধিরে-ধিরে হারাল। তার মেয়েরা হয়ে গেল বেশ্যা, পুরুষেরা অপরাধি। হাজার দুর্গন্ধে ভাগ-করা শহর— গোল্ডেন সিটি। সোনার শহর। নারকেল দড়ির বদলে নাইলন দড়ি, সভ্যতার অগ্রগতি। বাড়িতে কেউ নেই , শূন্যতা অপরিসীম।

কবিতাটির শেষ স্তবকে এসে মলয় দুর্বার ছুট লাগান— এমন ছুট যে কবিতা ব্যাপারটাই দুমড়ে-মুচড়ে যায়।

কচি বালক-পাছার নধরমাংস দেবদূত

মাখনমাখা ব্রয়লার যার শেষ খদ্দের

চলে গেছে তিন বছর তার ব্লাউজে সেফটিপিনগাঁথা হৃদয়

স্লুইস দরজা খুলে আলোর নারীশরীর

যে জীবন বুকের সামনে উঁচিয়ে অচেনা পিস্তল

তখনই সিঁড়িতে সাদা ছড়ির আওয়াজ তুলে

গামছায় মুখ ঢেকঢ গাঁও বালিকার কান্না

কেঁপে উঠেছে শিশুর গায়ে হাত ঠেকলে

ভাঙন যখন সব কিছুকেই ভাঙছে, তখন কবিতাকেও সে ভাঙবে। ভাঙতে-ভাঙতে কবিতাও মুক্ত হয়ে যাবে। তখনই বোধহয় বিদ্যুৎ ঝলকের মত এক অন্য কবিতার সৃষ্টিমুহূর্ত।’ভাঙনের ছায়াগাছ’ কবিতায় আমরা সেই প্রক্রিয়াটি দেখতে পাচ্ছি, চাক্ষুষ।মলয় রায়চৌধুরী থেকে বোধ হয় এক নতুন কবিকুলের সৃষ্টি হল, যাঁরা কেবল কবি নন, আপোষহীন সামাজিক ভাষ্যকারও বটে। “ঘুম-ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা এই মাধবী রাত” এর ব্যকরণ ভেঙে চুরমার, পর্বত শিখরে সূর্যোদয়ের মতো শোনা যাচ্ছে সেই নতুন কবিতার বজ্রনির্ঘোষ।

‘হাংরি সাক্ষাৎকারমালা’য় মলয় বলছেন বিবেকানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে, “যতদিন বেঁচে থাকা ততদিন কবিতা ও গদ্যের চাকুতে একনাগাড় পালিশ দেওয়া দরকার।” হাংরি আন্দোলন ফুরোবার পর মলয় কেবল প্রথাগত জীবন যাপনই করেননি, একনাগাড়ে অনুশীলনও করেছেন। এই অনুশীলন ও পঠন-পাঠন ছিল একলব্য সদৃশ, অথচ সামনে ছিল না দ্রোণের মূর্তি।মলয়ের সাধনা এরকমই। তার ফলে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ ও তাঁর আজকের কবিতার মধ্যে গড়ে উঠেছে লক্ষণীয় দূরত্ব। ‘লক্ষণীয়’ বললাম, কারণ মলয়ের ‘হাততালি’ কবিতাটিতে এমনই কিছু পরীক্ষা ও নিরীক্ষা জ্বলজ্বল করছে। রেলওয়ে ট্র্যাকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে যেমন ট্রেনের আলো-আঁধারি কামরাগুলো ঝটিতি চোখের সামনে দিয়ে বহুমাত্রিক অর্থময়তায় সরে-সরে যেতে থাকে, তেমনই এই কবিতার অজস্র ছবি, চিত্রকল্প, ইশারা এরা দ্রুত ছুটে চলেছে:

তারপর পলিতকেশ কাশফুলে

পইপই বারনের পুশতুভাষী দুর্যোধন বেরিয়ে পড়েছে

দগদগে রোদে

চন্দন রক্তের পাথর-পোশাক রক্ষীদের সরিয়ে

অন্ধকারকে খুঁচিয়ে বের করে এনেছেন সকালের বিকল্প

কাঁচা নরকের উদাত্ত অনুভব

হাহ

রোগা পৃথিবীর শিয়রে রাতজাগা নেশুড়ে

হরতালের দরুণ ক্রুশকাঠ থেকে নামতে পারেনি হাততালি

চোখে জলসুদ্দু হেসেছে শিশুরা

‘হাততালি’ প্রাথমিক স্তরে উল্লাসের বহিপ্রকাশ। প্রশ্ন উঠছে, সমাজ যখন পচছে-গলছে, তখন কবি এত উল্লসিত কেন ? কিসের এ-উল্লাস ? কেন উল্লাস ? বিশৃঙ্খলার মহোল্লাস ?

যা অচল, যা জড়, তাকে একদিন না একদিন ভেঙে জেতেই হবে। যতদিন তা না হচ্ছে, ততদিন নতুন কিছু গড়ে উঠবে না, উঠতে পারে না। মানুষের ভাবনাচিন্তা কার্যকলাপের ইতিহাসে এই উল্লাস অন্যত্রও দেখা গেছে। তন্ত্রসাধনার যে দিকগুলো, বামাচারের যে চালচলনগুলোকে ‘বিকৃতি’ বলে মনে করা হয়েছে, বস্তুত তা ছিল বর্ণাশ্রমপন্থী ছুঁৎমার্গপ্রবণ সনাতন হিন্দুধর্মের গড়া বিভিন্ন আগড় ভেঙে ফেলার উল্লাস। ভিন্ন ‘অন্ত্যজ’ বা অস্পৃশ্য জাতির নারীদের সাধনসঙ্গিনী করা, এই উল্লসিত বিদ্রোহের একটি দিক। নালান্দা জেলার কিংবদন্তি অনুযায়ী বৌদ্ধতন্ত্রের ভিক্ষু ‘পদ্মসম্ভব’ একজন অন্ত্যজ নারীকে নিয়ে ইলোপ করেছিলেন, ও দীর্ঘকাল নালান্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের দায়িত্ব থেকে উধাও ছিলেন।দাহসংস্কারকে নানা কর্মকাণ্ডে মুড়ে সনাতন হিন্দুরা চেয়েছিলেন, মানুষ যেন অতীতকে খুঁটিয়ে না দেখে। শবসাধনা ও অঘোরপন্থা ছিল পরোক্ষে এর বিরুদ্ধচারণ। অতীতকে বিশ্লেষণ করা ও তার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা, এই ছিল নানা তান্ত্রিক আচারের পেছনের অস্ফুট উত্তেজনা ও মহোল্লাস । মলয়ের ‘হাততালি’ কবিতার শিরোনাম ও ও প্রথম স্তবক এই আশ্চর্য নানার্থময় উল্লাসে মুখর। পুশতুভাষী দুর্যোধনের পৌরাণিক প্রাসঙ্গিকতাও আছে। একেবারে আলটপকা নয় এই অভিব্যক্তি। গান্ধার, কান্দাহার, পুরুষপুর, পেশাওয়ার, ভারত-পুরাণের এই অতিদীর্ঘ ছায়াবৃত যাত্রাপথের দূরত্ব নির্দেশকারী সংকেতগুলো মলয় ব্যবহার করেছেন স্হপতির নিপুণতায়, ইউক্লিডের নির্দেশ অমান্য করে। চন্দনরক্তের পাথর-পোশাক রক্ষীদের সরিয়ে। হিন্দুর পূজাসামগ্রী রক্তচন্দন। তাকে উল্টে চন্দনরক্ত। রক্ষীদের পোশাক পাথরের। অজর অনড় সনাতনী অতীত ভারত দেশের। অতীতকে না হয় মুছে ফেলা গেল, কিন্তু তারপর ?

“অন্ধকারকে খুঁচিয়ে বের করে এনেছেন সকালের বিকল্প/কাঁচা নরকের উদাত্ত অনুভব/হাহ”। যে নতুন পৃথিবী তৈরি হয়েছে তা নারকীয়। অতীতের বিকল্প গড়ে তোলার নামে কেবল নরকই তৈরি হয়েছে, অন্য কিছু নয়।

আধুনিকতার লাফঝাঁপ আজ হাস্যকর।

আধুনিকতার হাতে গড়া সামাজিক প্রতিবাদের নানা যোগাড়যন্ত্র প্রতিবাদকে ব্যহতই করেছে, আর কিছু করেনি।”হরতালের দরুণ ক্রুশকাঠ থেকে নামতে পারেনি হাততালি”, তথাপি “চোখে জলসুদ্দু হেসেছে শিশুরা।” কেউ যদি প্রশ্ন করেন যে মনুষ্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা কোনটি, তবে আমি কিন্তু বলব না, ‘পরমাণু বোমা আবিষ্কার’। বলব না ‘ঔপনিবেশিকতা’। বলব না কলম্বাস অথবা ভাস্কো ডা গামার জন্ম। আমার উত্তর “মনুষ্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা মার্কসবাদ ও জুডিও ক্রিশ্চিয়ানিটির সমার্থক হয়ে যাওয়া।” মার্কস একেবারে চাক্ষুষ দেখে ছিলেন বিশ্ব পুঁজিবাদের উদয়। সেই দেখা ছিল নিখুঁত। তাঁর অভুতপূর্ব মেধা খুঁজে পেয়েছিল সেই উদয়ের কারণগুলোকে। কিন্তু এক জীবনে তাঁকে করতে হয়েছিল বিপুল পরিমাণ কাজ।করাল দারিদ্রের সাথে প্রতিনিয়ত যুঝে, একমাত্র বন্ধো ও সহযোদ্ধা এঙ্গেলসের সাহায্যে, তাঁকে সমাজবাদী দর্শন, অর্থনীতি ও সমাজত্ত্বের ভিত্তিপ্রস্তর স্হাপন করতে হয়েছিল। তাই ইউরোপীয় সমাজের বাইরে বড় একটা ছড়িয়ে পড়তে পারেনি তাঁর দৃষ্টি। তবু ভারতবর্ষকে বোঝবার চেষ্টা তিনি করেছিলেন, উল্লেখ করেছিলেন ‘এশিয়াটিক মোড অফ প্রডাকশানে’ এর কথা। যদি এই মোডকে বোঝাবার সময় তাঁর হাতে থাকত, তবে হয়ত, হয়ত কেন, অবশ্যই, পরবর্তীকালীন যান্ত্রিকতা থেকে মার্কসবাদের মুক্ত থাকার সম্ভাবনা হত অনেক বেশি প্রবল।তা না হবার দরুন, পরে জুডিওক্রিশ্চান নিয়তির সাথে মার্কসবাদও জড়িয়ে পড়ে। যেমন খ্রিস্টধর্ম দরিদ্র ইহুদি ক্রীতদাসের ধর্ম হিসাবে যাত্রা শুরু করে, পরে রোমক সম্রাটদের ধর্ম হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনিই, মার্কসবাদ, কাউটস্কি প্রমুখ সুবিধাবাদীর হাতে পড়ে অচিরেই ইউরোপীয় পুঁজিতন্ত্রের সেবাদাসের কাজে লেগে যায়।

মার্কসবাদের সামাজিক বিকাশের নিয়মটিকে তার দ্বান্দ্বিক অন্তর্বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন করে এমনই একটি যান্ত্রিক সিদ্ধান্তে পরিণত করা হয়েছিল যে, বলা হল, “ধাপে-ধাপে এগিয়ে পুঁজিবাদই সমাজবাদ (!) হয়ে উঠবে”— এই হয়ে ওঠে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের দলগোলুর ধারণা।লেনিন, রোজা লুক্সেমবুর্গ প্রমুখেরা দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ভেঙে তৃতীয় আন্তর্জাতিক গড়ে সৃষ্টিশীল মার্কসবাদের গোড়াপত্তন না করলে, পরে মার্কসবাদকে পুঁজিবাদের দর্শন থেকে আলাদা করে আর চেনাই যেত না। তখনকার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, লেনিন ছিলেন অধুনান্তিক রাজনীতিবিদ, যিনি আধুনিকতার প্রবক্তা কাউটস্কির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। কাউটস্কি প্রমুখরা মার্কসবাদকে অক্ষরসর্বস্ব করে তুলেছিলেন।কিন্তু যান্ত্রিকতা বোধহয় মানুষের একটি স্বাভিক ঝোঁক। পরে লেনিন-শিষ্যরাই আবার যান্ত্রিক হয়ে ওঠেন; রুশ মডেলটিকে ব্যবহার করতে থাকেন যত্রতত্র সর্বত্র। ভারতের মার্কসবাদীরাই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে বেশি যান্ত্রিক।

‘ইতিহাস’ ভদ্রলোকটি নানাবিধ পরিহাসে যে ভালোরকম সিদ্ধহস্ত, তাতে আর সন্দেহ নেই। মলয়ের ‘হাততালি’ কবিতার ( এটি একটি দীর্ঘকবিতা ) দ্বিতীয় স্তবকের দ্বিতীয় পঙক্তিতে আছে, “যাত্রীডুবির খবরে ডুকরে উঠেছেন লালশালু নৌকার হাততালি।” পরিস্হিতি বারবার ওলোটপালোট করে দিচ্ছে মার্কসবাদীদের কষা ছক। এর ঠিক আগের পঙক্তিতে আছে, “একথোকা অন্ধকারে জোর করে দেখানো স্বপ্নে…।” মার্কসবাদীরা ভবিষ্যতের একটি মনমোহক স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন আপামর জনসাধারণকে। সেই ছবি বাস্তবসম্মত ছিল না। তাই ছক নষ্ট হয়ে যাওয়ায় হতপ্রভ মার্কসবাদী ভাবুক শিবির। “না খেতে পাওয়া হলুদ শীতে/গরম আলকাতরায় ফোটা ফরসা রজনীগন্ধা।” ওদিকে শোষণও অব্যাহত। তারই হাড়ে-মাংসে তৈরি হচ্ছে নবতম ‘নন্দনতত্ত্ব’। “কাঁধে চাঁদ নিয়ে ভররাত শাসিয়েছে শ্যাওলাধরা করোটি।” অতীতের দুঃসহ চাপ আর বারবার সেই চাপের কাছে নতিস্বীকার… “জ্বরগরম কপাল ছুঁইয়েছে তাঁর পশুপশম নাভিতে।” এরপর গুটিয়ে-রাখা একটি প্রাচীন, কীটদষ্ট মানচিত্র খোলার মতো একখানা গোটা উপমহাদেশ মলয় খুলে ধরেন আমাদের চোখের সামনে। সেই উপমহাদেশকে নষ্ট করেছে সাম্রাজ্যবাদ আর সামন্তবাদ। তাদের রূপক দ্যোতক প্রতীকগুলো বর্শাফলকের মতো বিদ্ধ হয়ে আছে উপমহাদেশটির হৃদয়ে।

“ব্যাবিলনের শাদা নরকহুরি/উত্রমুখো নকশিমেঘের ওষুধবড়ি গিলিয়েছে/রেড়িপ্রদীপে ঝুঁকে ঘুরঘুরে শুঁটিপোকা/

এলোচুলে ঢাকা রাজকন্যার মুকুট থেকে গানের টুকরো/

পায়ে রক্তমাখা রাজহাঁস/যখন-তখন চেয়েছে বাড়িফেরত সৈন্যের বসন্তকাল/সাজিয়েছে খেলাচ্ছলে মারা চরমযুবার মা-বাপের সবুজকাঁথা ধানক্ষেত/তুঁতেরঙা কুয়াশা এগিয়েছে সিংহচামড়া শিকারীর গোপন ঘাসপথে/বিবাহযোগ্য ঘুড়সওয়ার হাততালি/হেই হো”। এই নষ্ট প্রক্রিয়াটির বিরুদ্ধে দানা বাঁধেনি, বাঁধতে পারেনি যথার্থ বিদ্রোহ, যদিচ দেখতে বিদ্রোহের মতন, এমন অনেক কিছুই ঘটেছে।”আগুন যখন ধোঁয়া থেকে আলাদা হচ্ছে/যেটুকু সময়ে/আলজিভ/দুই হৃৎস্পন্দনের মাঝে তেতো হয়ে ওঠে/জলপথে এসে আক্রমণ করেছে জ্বরবিদ্রোহী/গাছে-গাছে ঝড়কালীন পলাশের লাল সক্যতা/ঠিক যেন চিড়িয়াখানার ভবিষ্যৎহীন/শেষ হাওয়ায়/পটকা ফাটিয়েছে রাংতাপাড় মেঘ/যেন এক্ষুনি এসে পড়ল বলে হাততালি।” একটি নষ্ট প্রক্রিয়া, তার বিরুদ্ধে ‘গড়ে ওঠা’ বিপ্লবী আন্দোলনের দেউলেপনা, সবকিছু মিলে বিচিত্র এক পরিস্হিতি। বিপ্লবী আন্দোলনের সেই সততা নেই যে নিজের দেউলেপনা স্বীকার করে নেবে।”কবরে পাওয়া গেছে ভাত খাবার কাঁসি/অত্যাচারিতের কাতরানিতে পড়েছে হাড়ের খিলান/কেউ সুখি নয়/কেমন আছো জানতে চাইলে বলেছে /ভালো/পাকের পর পাক কাঁটাতার কোমর থেকে খুলে দিয়েছে”।

ভারতবর্ষে বিহারসদৃশ যে কয়টি আভ্যন্তরীণ উপনিবেশ আছে, সেখানে অবস্হা আরও ভয়াবহ।এই আভ্যন্তরীন উপনিবেশগুলোকে নিয়ে বিপ্লবীদের ভড়ংএরও শেষ নেই।”ওদিকে হাততালিবাদক/ভগ্নস্বাস্হ্য আকাশে/পাখিদের গান শুধরে দিতে চেয়েছে/তারা দপদপে অন্ধকারে/

বালিশ-জড়ানো বর্ষায়/পালামৌ জেহানাবাদ রোহুতাসে কাদাপেছল মাগুরের আঁশটে হাঁপানি/শামুক থুতনি বুড়ির চোখের পাতায় ধূসর সোরাগন্ধক।”

সবকিছুর শেষে, সমস্তকিছুর পরিণামে খিদে। খেতে চাইছে মানুষ আর নিরন্তর খাদ্য হয়ে যেতে হচ্ছে তাকেই। আর তার এই খাদ্য হয়ে যাওয়াকে নানা অং বং চং দিয়ে মহিমা মন্ডিত করা হচ্ছে। মলয় এই বিচিত্র প্রক্রিয়াকে প্রস্ফূট করতে গিয়ে ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন রূপকল্প, যাতে এই পরিস্হিতির দ্বৈততা যথার্থ ব্যাখ্যাত হয়। যে ক্ষুধার্ত, সে-ই খাদ্য। “এদিকপানে মুখ করে দাঁড়িয়েছে ছোকরা সূর্যমুখী/ গরম তেলে লাল দুহাত উড়িয়ে স্বাস্হ্যবতী কাঁকড়া/ভাতের হাঁড়িতে নেচেছে সফেদ-মসলিন নরম অপ্সরা/তখন অন্ধকারে কেঁদে নিয়ে আলোয় হেসেছে হাততালি/হাসপাতালের বিছানায় লোহার শেকলে বাঁধা শুনেছে/ টেবিল ঘড়িতে সারারাত গ্রেপ্তারের ঠক ঠক ঠক ঠক।”

আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে যাঁরা ঔৎসুক্য রাখেন, তাঁদের অবশ্য পঠনীয় একটি বই “দি নিউ ক্লাস”, লেখক মিলোভান জিলাস। জিলাসের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়া আবশ্যক।মিলোভান জিলাস, তদানীন্তন যুগোস্লাভ কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষস্হানীয় নেতাদের একজন, স্ট্যালিন ও টিটোর অন্তরঙ্গ, আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের ‘কমিনফর্ম’ পর্যায়ের একজন সম্মানিত ব্যক্তি। পরে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যতা ত্যাগ করেন ও এই বইটি ও আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই লেখেন, যেমন “কনভারসেশানস উইথ স্ট্যালিন” লেখেন। “দি নিউ ক্লাস” লেখার অপরাধে টিটো জিলাসকে সশ্রম কারাদন্ডে দম্ডিত করেন। দি নিউ ক্লাস বইটিতে জিলাস সমাজবাদী রাজনীতির ক্ষেত্রে একেবারে নতুন একটি অবদান রাখেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, মিনস অফ প্রোডাকশানের মালিকানা স্বত্ব কাগজে-কলমে না থাকলেও সমাজতন্ত্রী দেশগুলোতে একটি নিউ ক্লাস বা নতুন শ্রেণির উদয় হয়েছে, যারা উদ্বৃত্ত বা সারপ্লাস সংগ্রহ করতে সক্ষম। এই শ্রেণীটি ক্রমশ নিজেদের হাতে প্রভূত অর্থ ও ক্ষমতা কেন্দ্রিত করেছে, এবং পার্টি, শাসনতন্ত্র, সমস্তকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। জিলাসকে সেই যুগে সাম্রাজ্যবাদীর দালাল উত্যাদি আখ্যায় বদনাম করা হয়েছিল। তিনি কারাবাস করেন, এবং ধিরে-ধিরে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান। পরে যখন সোভিয়েট দেশ ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরে ধ্বস নামে, এক কালীন পার্টি আমলারাই সি.পি.এস.ইউ.কে ভোগে দিয়ে দেন, এবং রাতারাতি বিশাল-বিশাল কল-কারখানার মালিকের চেয়ারে জাঁকিয়ে বসেন, তখন আবার জিলাসকে খোঁজা আরম্ভ করেন যথার্থ মার্কসবাদীরা। পশ্চিমবঙ্গে বহুকাল বহুবছর বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থাকার ফলে আমলাতন্ত্রের যে অভ্যুদয় ঘটেছে, তাকে যথাযথ বুঝতে যাঁরা চান, তাঁরা এই বইটির সাহাজ্য নিতে পারেন।

‘কৌণপের লুচিমাংস’ কাব্যগ্রন্হের ভূমিকায় মলয় বলেছেন, “বর্তমান কালখন্ডের বঙ্গসমাজটি অধিবাস্তব। আমি চেষ্টা করেছি তাকে উপস্হাপনের। সেকারণে কোথাও-কোথাও পঙক্তি এবং ছবিকে মনে হতে পারে জটপাকানো। আমার প্রতিভা দ্বারা কবিতাগুলোর সৃজন হয়েছে মনে করা ভুল।আমিই বরং সৃজিত হয়েছি কবিতাগুলোর দ্বারা। ভাষাসমাজের দ্বারা।”মলয়ের এই বক্তব্যটি কবিত্বের ধারণাটিকেই পালটে দেয় মূল থেকে। গলায় গাঁদাফুলের মালা, স্কুল-শিশুদের উদ্দেশ্যা নরম গলা, ‘নারীত্বের’ প্রতি সম্ভ্রমশীল, চোখ ঢুলুঢুলু, ভুলো মন, জীবন সম্বন্ধে উদাসীন— স্বল্পকথায় একটি প্রবল নন্দনতাত্ত্বিক তালগোলের যে চিত্রটি চোখে ভেসে ওঠে ‘কবি’ শব্দটি উচ্চারণ করতেই, তা থেকে মলয় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়েছেন কিছুটা জোর করেই হয়ত। মলয় বলছেন, ‘কোথাও-কোথাও পঙক্তি এবং ছবিকে মনে হতে পারে জটপাকানো’। এও বলছেন, একটি অধিবাস্তব সমাজকে উথ্থাপন করতে গিয়েই হয়ত এই জটিলতার সৃষ্টি। কৌনপ একজন পৌরাণিক রাক্ষস, যে কুনপ অর্থাৎ শব খেয়ে বেঁচে থাকে। ‘কৌনপের লুচিমাংস’ রাজনৈতিক কবিতার সংগ্রহ। সর্বসাকুল্যে বত্রিশটি কবিতা আছে সংকলনে। কবিতাগুলির প্রত্যেকটিই একটি করে হাহাকার। আজকের পশ্চিমবঙ্গ, তার সমাজ, তার সংস্কৃতি, তার পচন, সবকিছু নিয়ে হাহাকার; যদিও ওই একই ভূমিকায় মলয় বলেছেন, ‘এই গ্রন্হের পাঠবস্তু আসলে বাঙালির পচনের হোলিখেলা’। কিন্তু মলয়ের কষ্ট ও বেদনা প্রতিটি কবিতায় প্রস্ফূট। তার আঙ্গিকটি যদিও উল্লাসের, হোলিখেলার। ব্যাপারটা কিছুটা চার্লি চ্যাপলিনের ফিলমের মত বলা যায়।অধুনান্তিক। ‘রাঁঢ়বাজারে শততম প্রেমিকের আবির্ভাব হল/ অথচ ফুলের টবে মাটি নেই শেকড়ে-শেকড়ে ছয়লাপ সংসার’। রাঁঢ়বাজার শব্দটি প্রণিধানযোগ্য। মলয় বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পরিস্হিতিকে ‘রাজনীতিবিদ বনাম জনতা’ এভাবে নিচ্ছেন না কিন্তু। আগেও বলেছি, সামাজিক ভাষ্যকারের ভূমিকাটি মলয় কখনই হাতছাড়া করেননি। সেই ভূমিকাটিই তাঁকে উৎসাহিত করেছে পশ্চিমবঙ্গের কলোনিয়াল অতীতকে খুঁটিয়ে দেখতে। তাঁর লেখা বহু গল্পে ও প্রবন্ধে এই দেখা খুব স্পষ্ট। মলয়ের অধুনান্তিক ধ্যান-ধারণার উৎপত্তিও বস্তুত এখান থেকেই। উপনিবেশবাদ পশ্চিমবঙ্গের মনোজগৎকে ভালো রকম ধামসে দিয়েছে বহু আগেই। তার ফলে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি ফলাও রাঁঢ়বাজার, যেখানে কেবল প্রেমিক যায় আর আসে। বর্তমান কালখণ্ডের ক্যাডাররা সেই রাঁঢ়বাজারের শতশত প্রেমিক। ফুলের টবে মাটি নেই, অথচ শেকড় সেঁদিয়ে গেছে ভেতরে, প্রায় অতল পর্যন্ত।অনন্ত পর্যন্ত নানা কায়েমিস্বার্থ চারিয়ে দিয়েছে শেকড়।

সামাজিক ভাষ্যকারের ভূমিকাটি অত্যন্ত সিরিয়াসলি নেয়ার দরুনই মলয় খুঁটিয়ে দেখেন গলদ কোথায় ছিল আর আছে। কমিউনিস্ট-বিরোধীরা যেমন গোটা ব্যাপারটিকেই “আরে ও শালারা অমনধারাই” বলে সেরে নেন, মলয় কিন্তু তা করেননি। তিনি খু#টিয়ে দেখেন, জানতে এবং জানাতে চান।তার ফলে তাঁর চোখে ধরা পড়ে বহু বিচ্যুতি, যেগুলো হয়ত অনেকেই দেখেও দেখেননি। ‘কাউন্টার ডিসকোর্স’ কবিতায় মলয় বলছেন, “খাটের দুপাশ দিয়ে আলাদা বয়ে যাচ্ছিল মজুরের নদী কৃষকের নদী। যে কড়াকড়িতে সারাদিনে সূর্য শুধু একবারই ওঠে আর মিলিয়ে যায়।”

অক্টোবর বিপ্লবের সময় সহসা আবিষ্কৃত হয় যে বলশেভিক পার্টির হাতে কৃষক শ্রেণির জন্য কোনো আলাদা প্রোগ্রাম বা কর্মসূচী নেই। অথচ বিপ্লবের কর্মকান্ডে কৃষক শ্রেণির সহযোগীতা অপরিহার্য। লেনিন দ্বিধাহীনভাবে এস.আর. (শ্পেশাল রিভলিউশানারি)-দের প্রোগ্রামটিকেই সরকারের তরফ থেকে অ্যাডপ্ট করে নেন। কয়েকটি পার্টির যে যুক্তফ্রণ্ট অক্টোবর বিপ্লব ঘটাতে চলেছিল, তাদের মধ্যে এস.আর. দলটিও ছিল, তাই এই কাজটি কারো অবিপ্লবী মনে হয়নি। নিজের পার্টির ত্রুটি মেনে নেওয়া, স্বীকার করা, পরিমার্জনা করার ব্যাপারে লেনিন তো, প্রায় বলা চলে তুলনাহীনই ছিলেন। আজকের ভারতবর্ষের, আরও বিশদভাবে বলতে গেলে, আজকের নানা রঙের বামনেতাদের মাইন্ডসেট কি একটুও এরকম? পুঁজিবাদী সামন্ততান্ত্রিক সমাজে ওলোটপালোট ঘটাতে গেলে যে-দুটি শ্রেণীর হাত মেলানো প্রয়োজন, তারা দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ আলাদা-আলাদা অবস্হানে।শ্রমিক ও কৃষকের উঠোন একেবারেই ভিন্ন। আবার মজুরদের বমধ্যেও পি.এস.ইউ.এর মজুর আর আনঅর্গানাইজড সেক্টরের মজুরের আলাদা হাঁড়ি। কৃষকদের মধ্যেও এই জাতীয় নানা ভাগাভাগি। অথচ এ নিয়ে ‘মার্কাসবাদী’ তাত্ত্বিকদের মাথাব্যথা আছে , ঔপচারিক বুকচাপড়ানো ছাড়া , এমন তো মনে হয় না। তাহলে রদবদলটা ঘটবে কীভাবে ?

রদবদলের আশা করাটাও কী উচিত ? যখন বিপ্লবী ক্রিয়াকলাপ এক হিমশীতল রুটিন মাত্র , তার রন্ধ্রে-রন্ধে বাসা বেঁধেছে নানা সাইজের ঘুঘু , পৃথিবীর সবচেয়ে অগ্রগামী দর্শনটি এক অকিচিঞ্চিৎকর উপচারে পর্যবসিত, তখন সত্যিই কি কোনো আশা কোথাও রয়েছে যে একদিন সব কিছু বদলাবে ? “শেষ ট্রেনের নাম তত্ত্ববিশ্ব” কবিতায় বলছেন মলয়, “আর ভাটার দুলুনি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ুক ক্লান্ত স্টিমলঞ্চ/হাড়ে-হাড়ে টের পাওয়া হাড়গুলো দাঁতনদেঁতো প্যাংলার দুর্ভাবনায়/ডেরা ডেলে চুলখোলা বারান্দায় চোখ বুজে দেখবে এক তিন ঠেঙে বেড়াল/শ্যাল-চাদর মুড়ি দেয়ে/প্রতিধ্বনি নকল করতে ওস্তাদ তলপেট-ফোলা বোল্ডার/পিঁপড়ের খনি-টানেলে জড়ো করেছে টুসকি নির্দেশে/নামিয়ে-আনা তত্ত্ববিশ্ব।” তবু মানুষের আশা…। ধন্য আশা কুহকিনী। এখনও সে আশা রাখে রেলিতে যায়, ব্রিগেড জমায়েতে যায়। এখনও পার্টিদাদার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে যে তার আশা-হতাশার কথা দাদা শুনবেন। এখনও…। “খোঁড়া বরের টোপর” কবিতায় মলয় বলছেন, “দূরে শোনা যাচ্ছে/ নারকেল-পাতায় উড়ন্ত ঘোড়ার খুরধ্বনি/ বর আসছে বর আসছে বর আসছে একঠেঙে/ কাছিম-টেকো মাথায় ফর্দাফাঁই লালটোপর।”

“কৌনপের লুচিমাংস” সংগ্রহে এসে মলয়ের কবিতায় আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল ঘটেছে বলে আমার ধারণা। এই কথাটি মলয় নিজেও স্বীকার করেছেন সংগ্রহের ভূমিকায়, “বাঁকবদলের জন্যেই তো নতুন কাব্যগ্রন্হ, নইলে একঘেয়ে একের পর একের কোনো মানেই হয় না।” মলয়ের ভাষা আশ্চর্য দ্যুতিমান হয়ে উঠেছে এই সংগ্রহে এসে। “ভূমিপুত্রের জন্মস্হান বদলের দরখাস্ত” কবিতাটিতে মলয় বলছেন, “দাদু, কেন্দ্র কই, সেই গর্মাগরম ষাঁড়িত জান্তব সিংহাসন ?/এ তো দেখছি গ্যাংগ্রিনের শাশ্বত নালি ঘা!” দুটি মাত্র পঙক্তি। তার মধ্যেই বিধৃত একটি সমাজের গোটা ইতিহাস, তার অতীত, তার বর্তমান, আর বোধকরি তার ভবিষ্যতও। কি আশ্চর্য দক্ষতায় মলয় দেখিয়ে দেন সবকিছু; মাত্র দুটি পঙক্তিতে কত কথাই যে বলেন। পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের আজকের হাল-হকিকত বোঝাতে….”এই একপশলা সন্ধ্যায় ট্রানজিসটারে লকাপ লোচ্চার লিট্যানি শুনতে/গুটিপোকার সবুজ দেহতরঙ্গের তুলতুলে গানে গাছের কোটরে/সঙ্গীত খুঁজছে কাঠঠোকরা তার নিলাম-ডাকা মেশিন ঠোঁটে/পিটিয়ে-মারা শেষ শেয়াল পঞ্চায়েতকে উন্নীত করেছে জেলাসদরে/ড্যাশবোর্ডে থ্যাঁতামাথা কুষ্ঠ-সাম্রাজ্যের সোনাজল ভোটার/ঠায় বসে আছেন কাদা-কুঁজোর কায়দায় ঘুরন্ত চাকে।”( ফ্রান্তস ফ্যানঁ ) । অথবা…”আমি যে কিনা কুহকঠুঁটো মেয়েদের মাঝে ছিলুম ট্রিগারলিঙ্গ যুবা/খড়খেতের সোঁদা-সোনালি চামচমকানো মকাইগুঁফো চাষার ছেলে/একটা চুল টানতেই বেরিয়ে পড়েছে রক্তপচা আঁতের ঝুরি/জ্ঞাতিদের মুখে পাঁঠার গলায় নেমে আসা খাঁড়ায় আঁকা চোখের কান্না/ দেখছি আর ভাবছি কি মজা শবশকটে আগে চড়িনি কক্ষুনো” (রূপসী বাংলার ভাতার )

অথবা…”আমি কিন্তু কুঁড়ে টাইপের বিকেলবেলায় যখন বেহেড/পাকস্হলি নিয়ে ফিরছি/ভুল সময়ে আগত শীতে বদন-বেচুনিদের চৌরঙ্গি স্যামপেলের ডেরায়/ম্যাপ খুলে দেখাবে, হ্যাঁ, ওই যে ওই তো ইউজারফ্রেন্ডলি বসন্তঋতু/ চিলের পেছন-পেছন উড়ে ব্লো-আপ হিরোর গায়ে/হাত ছুঁইয়ে ভিককে চাইছে/আমি কিন্তু অতীতকে নতুন করে গড়ে ফেলেছি জলফোঁটায় বেঁধে-বেঁধে/প্রকৃতি কি আর ভাবছেন জানত না লাশ গোঁজড়াতে একসেট অমাবস্যা চাই/তাই তো জলের ক্যাঁদরায় খুকি-পোনাদের ভাসিয়ে নিয়ে/চলল জোয়ার-বুড়ো” (ক্যাটাক্রিসিস)।

প্রথম-যৌবনে কবিতা লেখার জন্য লাঞ্ছিত ও নিন্দিত, পরে বহু বছর নৈঃশব্দের অতলে, আর আজ বাংলা কবিতার মধ্যগগনে সূর্যের মত ভাস্বর মলয় রায়চৌধুরী এখন পরিণত বয়স্ক। আয়ুর ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই মানুষের; শোনা যায় মলয়ের শরীরও খুব একটা সুস্হ নয়।বাংলা ভাষার যে অপরিমেয় সম্ভাবনা আছে, তার ঠাহর মলয়ের মত আর কারো হয়ত নেই। বাংলা ভাষার শব্দগুলোকে তিনি দিয়েছেন সম্পূর্ণ নতুন এক আয়তন, তাকে আজকের পৃথিবীর যোগ্য করে তুলেছেন।মলয়ের কবিতা নিয়ে কথাবার্তার এক নতুন পর্ব আরম্ভ হবে বলে প্রতীক্ষা করছি আমরা। সেই কবে কৃত্তিবাস ওঝা দ্বিধাজড়িত হাতে লেখা আরম্ভ করেছিলেন, “গোলকে বৈকুন্ঠপুরী সবার উপর।/ লক্ষ্মীসহ তথায় আছেন গদাধর।/তথায় অদ্ভু বৃক্ষ দেখিতে সুচারু।/যাহা চাই তাহা পাই নাম কল্পতরু।। দিবানিশি তথা চন্দ্র-সূর্যের প্রকাশ।/তার তলে আছে দিব্য বিচিত্র আবাস।।/নেতপাট সিঙহাসন উপরেতে তুলি।/বীরাসনে বসিয়ে আছেন বনমালী।।/মনে মনে প্রভুর হইল অভিলাষ।/এক অংশ চারি অংশ হইতে প্রকাশ।।” তেলের প্রদীপের আলোয় সামনের দিকে নুইয়ে পড়ে তিনি লিখেছিলেন। বাইরে চরাচরব্যাপী অন্ধকার। সেই অন্ধকারে হয়ত বা জ্বলছিল-নিভছিল গুটিকয় জোনাকি। অশ্বথ্থের নিষের অমান্য করে হঠাৎ-হঠাৎ হাওয়া বইছিল। অসংখ্য কান প্রতীক্ষা করছিল বাংলা কবিতার জন্মের প্রথম কান্নাটি শুনবে বলে। খাগের কলমের খসখস শব্দ উঠছিল তুলোট কাগজে। তারপর দীর্ঘপথ। কত রাজত্ব, সাম্রাজ্যবাদের উথ্থানপতন। ধুলোয় গড়াগড়ি কত মুকুট, রাজদণ্ড। রক্তাপ্লুত, কাঁটা-বেঁধা পায়ে কেবল হেঁটেছে বাংলা কবিতা। হেঁটেছে, হেঁটেছে আর হেঁটেছে। এখনও চোখ খুললে সেই মানুষদের দেখতে পাওয়া যায় সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে, যাঁরা সেই শিশুটিকে বয়স্ক করে তুলতে অসহ্য দুঃখ স্বীকার করেছেন। সকল পার্থিব সুখ-সুবিধা তুচ্ছে করেছেন তাঁরা, নিজের জীবন, যৌবন, মান-সম্মান, সব কিছু ব্যয় করেছেন বাংলা কবিতার জন্য। যেদিন মলয় কবিতা লেখার জন্য কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন, সেদিনই, সবার অলক্ষ্যে, এই মানুষদের একজন হয়েগিয়েছিলেন তিনি। ভুল করেছিল বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন। বাংলা কবিতার জন্য সর্বস্বপণ যোদ্ধাকে অট সহজে পরাভূত করা যায় না। জয় মলয়েরই হয়েছিল। সেই জয় আজ প্রতিধ্বনিত মলয়ের প্রতিটি কবিতায়।

( প্রবন্ধটি ২০০৩ সালে কবিতীর্থ পত্রিকায় প্রকাশিত হবার পর বিভিন্ন পত্রিকায় পুনঃপ্রকাশিত হয়ে চলেছে । সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে আবার আসিব ফিরে পত্রিকায় ২০১০ সালে ।)

———————————————————————————-

বিশ্বজিত সেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। পার্টি বহু অংশে বিভাজিত হবার পর ও তাদের সদস্যদের নৈতিক পতনে আশাহত শ্রীসেন পার্টি ত্যাগ করেন।কিন্তু তিনি আজও নিজেকে একজন মার্কসবাদী ভাবুক বলে মনে করেন।তাঁর একাধিক কাব্যগ্রন্হ, গল্পগ্রন্হ ও প্রবন্ধের বই আছে।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

পদ্যঠাকরুণ

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা “লম্পটের জন্ম”

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

পোস্টমডার্ন কবিয়ালি

পোস্টমডার্ন কবিয়ালি       

মলয় রায়চৌধুরী        

সত্যি বলতে কী টুংটাং বাতাসের 

ছায়া দিয়ে তৈরি গরম-গরম ফুলকো প্রাসাদে

ছলকে-ওঠা রোদ্দুরে তাকিয়ে থাকি, তবু

কেন যে দেখতে পাই না তা বিশদ লেখা ছিল

অর্শ সারাবার হ্যাণ্ডবিলের তুলতুলে ডানায়

যেগুলো হাতবদল-করা যাত্রার পোস্টকার্ডের কায়দায়

গাড়িগুলোকে পাশ কাটিয়ে-যাওয়া রাস্তায়

এমনভাবে পড়েছিল যেন এক বেহেড বরযাত্রী 

যার কথা বরের বাবা বেমালুম ভুলে গেছেন

অথচ এমন তো আর নয় যে নীল জলের 

সাঁতারু-মেয়েদের অতল থেকে জাপ্টে ধরার

বহুদিনের স্বপ্ন বরের মেসোর ছিল না

যাঁর তরুণ বয়সের সিটি-বাদক সুগলা

আজ পালটে গেছে উকিলের গলা-খাঁকারিতে

.

‘আঁকড়া সাজায়েচে ভালো মাকড়া রাম বাউল

দিয়ে এড়ুয়া বেঁকি নুপূর পায় ভেড়ুয়া যেন নেচে যায়

মেড়ুয়াবাদীর মতো ওটার মাথাভরা কোঁকড়া-চুল’

.

সত্যি বলতে কী কলকাতা শহরে

যে-মেয়েটি শেষ ঘুমোতে যায় তার

প্রেমে ক্ষয়ে-ক্ষয়ে বেহাল উডডামরা শরীরে

হেথা-হোথা আচারে ভেজানো টকমিষ্টি

চোখগুলো কিসের মতন ঠিক মনে পড়ছে না

আরে হ্যাঁ বরের মা একজনকে চিনতেন

যে চিনদেশের লাল টুকটুকে বই পড়ে

সেই যে হাটুরে কেরানিদের ঠ্যাঙদুলুনি দুপুরে

কোমরে গোধূলি জড়িয়ে উধাও হলো

ফিরেছিল অতিথি-মার্কা টেরিকাটা ঝড়ে

ভ্যান-রিকশায় চিৎ মাছি-ঢাকা মুচকি-ঠোঁটে

কী আর বলি মৃত্যুর মতন ইয়ার্কি আর নেই

মনে হয়েছিল একটু আগেই যখন বেচারা 

বেচারত্বে জন্মাচ্ছিল তখন গাইছিল–

.

‘ময়মনসিংহের মুগ ভালো খুলনার ভালো কই।

ঢাকার ভালো পাতাক্ষীর বাঁকড়োর ভালো দই।।

কৃষ্ণনগরের ময়রা ভালো মালদার ভালো আম।

উলোর ভালো বাঁদরপুরুষ মুর্শিদাবাদের জাম।।

রংপুরের শশুর ভালো রাজশাহির জামাই।

নোয়াখালির নৌকা ভালো চট্টগ্রামের ধাই।।

দিনাজপুরের কায়েত ভালো হাওড়ার ভালো শুঁড়ি।

পাবনা জেলার বৈষ্ণব ভালো ফরিদপুরের ছুঁড়ি।।

বর্ধমানের চাষি ভালো চব্বিশ পরগণার গোপ।

গুপ্তিপাড়ার মেয়ে ভালো শ্রীঘ্র বংশলোপ ।।

হুগলির ভালো কোটাল-লেঠেল বীরভূমের ভালো বোল।

ঢাকির বাদ্যি থামলে ভালো হরি হরি বোল ।।

.

সত্যি বলতে কী ফাটা ডিমে বাবুই দম্পতির

কয়ের ডেকোরেটেড বেডরুম প্যাচপেচে

হয়ে থাকায় বরের মুটকি রাঙা-বউদি

ইষ্টনাম জপতে বসার জায়গা পেলেন না

এদিকে ওনার তর সইছিল না কেন না

বাঁ-হাতের মুঠোয় জমে গেছে দু-ডজন কন্ঠস্বর

যার এক-আধটায় মাকঢ়সার ওৎপাতা 

একাকীত্ব থেকে ঠায় ভেসে আসছিল

ভাটিয়ে পুরুষের হাঙর-গান যেটা

বাসরঘরে গাইবেন বলে বরের মেজোকাকা

অবৈধ-ভ্রূণ হাতে আইবুড়ো রয়ে গেলেন

এইজন্য যে এক নৃত্যপটিয়সী বাদুড়

একখানা এমন জীবানুবাহী কথা বলেছিল

যা মানে করলে অনেকটা এরকম দাঁড়ায়–

.

‘কেমন করে বললি জগা জোড়া গোলক বৃন্দাবন

এখানে তো বামুন রাজা চাষা প্রজা চৌদিকে তার বাঁশের বন

জগা কোথা যে তোর শ্যামকুণ্ড কোথা রে তোর রাধাকুণ্ড

ওই সামনে আছে মানিককুণ্ড করগে মূলা দরশন’

.

সত্যি বলতে কী বর-শালা যতোই

ছিন্নমূল হোক না কেন তার শেকড় এমন

গজাবে যে সে নিজেই নট নড়ন-চড়ন ফুলশয্যায়

বাবরের আনা ডোরাকাটা তরমুজ খেয়ে 

পোষমানা নদীর ল্যাজ আছড়ানির ধাক্কায় 

ভাঁজখোলা ঘোড়াফড়িঙের সবুজ লাফ দেবে

মুখের মধ্যে সম্পাদিত কথাবার্তার কুচি

ট্রেনচাকার ফিনকিতোলা  চিৎকার সেজে উড়বে

সে-রব যতই আঞ্চলিক ভাষায় হাত নাড়াক

ও তো জানে যে-গ্রহে নুন নেই সে-গ্রহে মানুষ নেই

তা যদি থাকতো তাহলে ওয়ালরাস-দেঁতো

বরের মামা কি নোংরাভাষিনীর টেলিফোনে

গায়ের তাপ বাড়াতে পয়সা ঢালতো

বরং যে-কোকিল দুপুর-রোদকে সুরে বাঁধে 

বা যে ভবঘুরে কেন্নোর ঠ্যাংগুলো বাচাল

তাদের কাছ থেকে জেনে নিত কেন

মৌমাছি বসলেই ফুলেরা গন্ধ লুকোয়

আর মধু-ভাষায় কাঁদে—-

.

‘শ্যাম আপনারো যেমন তৃভঙ্গ কালিয় ভূজঙ্গ কুটিলে।

কুবুজারো অঙ্গ রসেরো তরঙ্গ তাহাতে স্ত্রী অঙ্গ ডুবালে।।

শ্যাম এই ভূমণ্ডলে আধো গঙ্গাজলে রাধাকৃষ্ণ বলে নিদানে।

এখন কুঁজিকৃষ্ণ বোলে ডাকিবে সকলে ভূবনো তরাবে দুজনে ।।

শ্যাম তেজিলে শ্রীমতী তাহাতে কী ক্ষতি যুবতী সকলি সহিলো।

ভূজঙ্গ মাণিকো হরে নিলো ভেকো মরমে এ-দুখো রহিলো ।।

শ্যাম প্রদীপেরি আলো প্রকাশ পাইলো চন্দ্রমা লুকালো গগনে ।

ওহে গোখুরের জলে জগতো ব্যাপিলো সাগরো শুকালো তপনো।।

.

সত্যি বলতে কী মোষের ধন

দুইতে-দুইতে কর-রেখায় যেমন গ্রীষ্ম জমে

বাসের ছাদে বসে যাত্রীরা তেমন রাজনীতি

আলোচনা করছিল যে কেউটে খোলোস ছাড়লে

তার সঙ্গে গায়ের নকশাও তো ফেলে আসে

তাহলে কেন মিথ্যুকের পদচিহ্ণে থরহরি

মহাকরণের ভি আই পি লিফট চেপে

বর বললে কাস্তেটা শান দিও বন্ধু

জিগ্যেস করলে কমরেড তুমি নবযুগ আনবে না

পদ্যের কড়া হাতুড়িতে আজ হত্যে

হঠকারিতায় ভেঙে দাও ভীরু দ্বার

টোপর মাথায় বললে আগুন আমার ভাই

ব্যাস শোনা গেল টায়ার পাংচার কন্ঠস্বর–

.

‘আমারে ফ্রড করে কালিয়া ড্যাম তুই কোথা গেলি

আই অ্যাম ফর ইউ ভেরি সরি গোলডেন-বডি হলো কালী

হো মাই ডিয়ার ডিয়ারেস্ট মধুপুরে তুই গেলি খৃষ্ট

ও মাই ডিয়ার হাউ টু রেস্ট হিয়ার ডিয়ার বনমালী

                        শুনো রে শ্যাম তোরে বলি

পুওর কিরিচর মিল্ক গেরেল তাদের ব্রেস্টে মারলি শেল

ননসেন্স তোর নেইকো আক্কেল ব্রিচ অব কনট্র্যাক্ট করলি

                       ফিমেলগণে ফেল করালি

লম্পট শঠের ফরচুন খুলল মথুরাতে কিঙ হলো

আংকেলের প্রাণ নাশিল কুবুজার কুঁজ পেলে ডালি

                        নিলে দাসীরে মহিষী বলি

শ্রীনন্দর বয় ইয়ং ল্যাড কুরুকেড মাইন্ড হার্ড

কহে আর সি বার্ড এ পেলাকারড কৃষ্ণকেলি

                       হাফ ইংলিশ হাফ বাঙ্গালি’

.

সত্যি বলতে কী যে মেয়েটি

পাপড়ি ঝরার বয়সে এই সবে পৌঁছেচে

আঙুলের বদলে কথা দিয়ে ওর দরোজায়

টোকা দিতে বরের কুষ্ঠিঠিকুজি জুড়ে

ময়ূরের ঝর্ণাপেখম রিমঝিম হিমসিম

কেননা ফেশিয়াল-করা হাসিতে বললে

শীতঘুমের দিনগুলো ভালো ছিল গো

তা শুনে বরপার্টির সে কী আখড়াই-ধুম

ছিরিকেষ্ট ল্যাঙাশিবু ট্যারাহরি বেঁটেনারাণ

ঢ্যাঙাকাত্তিক কেলোগণশা তোতলাসতে–

কনে বেচারি পাশবালিশ জড়িয়ে যা শুনলে

তা বুড়ি থুথ্থুড়ি হলেও মনে রেখেছে–

.

‘১.চিতান ।। বালিকা ছিলাম ছিলাম ভালো ছিলাম সই—

             ছিল না সুখ অভিলাষ ।

১.পরচিতান ।। পতি চিনতাম না, ও-রস জানতাম না

             হৃৎপদ্ম ছিল অপ্রকাশ ।

১.ফুকা ।। এখন সেই শতদল মুদিত কমল কাল পেয়ে ফুটিল।

             পদ্মের মধু পদ্মে রেখে ভৃঙ্গ উড়ে গেল ।

১.মেলতা ।। একে মদনের পঞ্চশর প্রাণনাথের বিচ্ছেদ শর

             দুই শরে সারা হলো যুবতী….

মহড়া ।। আমার কুলের নাশক হলো রতিপতি

             আমার প্রাণনাশক হলো প্রাণপতি

             আমি অবলা বইতো নই

             কী করি বলো সই

             হয়েছি বিচ্ছেদে নতুন ব্রতী—

খাদ ।। উভসংকটে পড়ে সই হলো এ কী দুর্গতি ।

২.ফুকা ।। ও তার নামটি মদন…

         গঠন কেমন দেখতে পাই না চোখে…

         ইন্দ্রজিতের যুদ্ধ যেমন বান মারে কোথা থেকে ।

২.মেলতা ।। একে অর্ধরথী নারী তার সঙ্গে কি পারি

          তাতে নাই আমার যৌবনরথের সারথি ল

অন্তরা ।। পোড়া মদন তো তাও সই বুঝে না ।

         দেখে অবলা নারী তাতে যুবতী ।

         আপন পতি হয়ে যদি বুঝলে না বেদনা…

২.চিতান।। জ্বালালে পতি হয়ে যদি নারীর প্রাণ

        দোষ কি দিব মদনে ?

২.পরচিতান।। ঘুচে সব জ্বালা জুড়ায় অবলা

        ত্যাজিলে এ পাপ জীবনে ।

৩.ফুকা ।। পোড়া যৌবন গেল

        জীবন গেলে প্রাণ জুড়ায় গো সখি ।

        নইলে জ্বালা জুড়াবার আর উপায় না দেখি।

৩.মেলতা।। আমার কুল রক্ষে মান রক্ষে সমভাবে দুপক্ষে

        পাছে বিপক্ষে বলে আবার অসতী।।

.

সত্যি বলতে কী….

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

কাঁদুন

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর ‘ডেথ মেটাল’ কবিতা নিয়ে মেটালহেডদের জ্যাম শেশন

বাংলা সাহিত্য নিয়ে যারা একটু ঘাটাঘাটি করে,তাদের নতুন করে হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। তবুও আরেকবার মনে করিয়ে দিই ৬০ এর দশকে অল্টারনেটিভ ধর্মীয় কবিতার একটি আন্দোলন তৈরি হয়েছিল,যার প্রাণপুরুষ ছিলেন শ্রী মলয় রায়চৌধুরী। না আজকে হাংরি আন্দোলন নিয়ে কোন কথা বলবো না,আজ কথা বলব অন্য একটি বিষয় নিয়ে তাহলে মিউজিক।মেটাল মিউজিক। ক্লাস নাইনে থাকাকালীন হাংরি আন্দোলনের গল্প শুনেছিলাম স্কুলের বাংলা শিক্ষকের কাছে।তখন থেকেই খোঁজ করতাম এইসব কবিতার এবং কবিদের।শেষমেষ ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার মাধ্যমে আলাপ হয় হাংরি প্রাণপুরুষ মলয়বাবুর কবিতাগুলির সাথে।কি অদ্ভুত ব্যাপার এই ৮২ বছরের তরুণ কবির কবিতা পড়তে গিয়ে জানতে পারি মানুষটা একজন মেটালহেড।হ্যাঁ প্রথমে আমিও একটু অবাক হয়েছিলাম।মেটালহেড কবি? কিন্তু পরে বুঝতে পারি তিনি অবশ্যই একজন মেটালহেড,তা শুধু মিউজিক শুনে হয়েছেন সেটা নয়।তার মধ্যে এই বিষয়টি না থাকলে হয়তো নিয়ম ভাঙার আন্দোলনের সূত্রপাত হতো না।যদিও এটা সম্পূর্ণ আমার মতামত। যাই হোক এবার আসি মূল কথায়।তার একটি কবিতা ‘ডেথ মেটাল, অবন্তিকার জন্য প্রেমের কবিতা’ নিয়ে আমি এবং আমার বন্ধু ও দাদা D Wylde একটি মেটাল গান তৈরি করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। অবশ্যই মলয় স্যারের ইচ্ছানুসারেই। আমার মিউজিক জীবনের একটি মাইলস্টোন হিসেবেই রয়ে যাবে এই কাজটি। কতটা লোকের মাঝে সাড়া পেলাম না পেলাম তা নিয়ে ভাবার সময় আমার নেই।সেই মানুষটির কবিতা নিয়ে গান করতে পেরেছি,যে মানুষটাকে না চিনেই তার আন্দোলন নিয়ে ভেবে শিহরিত হতাম।এটা অবশ্যই আমার জীবনের সেরা কাজ হয়েই থেকে যাবে বলে আমি মনে করি। তার গুণমান যার যেমনই লাগুক না কেন এবং আমার মনে হয়,কলকাতার মেটাল মিউজিসিয়ান এবং মেটালহেড প্রত্যেকের অবশ্যই এই মানুষটিকে চেনা উচিত

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Immortality of Malay Roychoudhury

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

ভস্মাসুরের বংশধর

ভস্মাসুরের বংশধর

মলয় রায়চৌধুরী

তিরিশ বছর পর দেখতে এসছি ইমলিতলার বাড়ি

সবাই যাবার পর কেবল জেঠিমা একা থাকতেন

স্টোভে হরিহে হরিহে হরিহে বলে পাম্প করতে বসে

সক্কোলের কথা ওঁর মনে পড়ছিল

যারা বাড়িটাকে গমগমে চাঙ্গা করে রেখেছিল বহুকাল

স্টোভের বিদীর্ণ আগুনে লেলিহান জেঠিমা একা

ইমলিতলার বাড়ি অন্ধকারের রঙিন দখলে চলে গেল

অন্ধকারের কতো রঙ হয় ; আলোর তেমন রঙ নেই

তিরিশ বছর পর দেখতে এসেছি ইমলিতলার ফাঁকা বাড়ি

অন্ধকারের রঙে রাঙা 

পাড়ার থুথ্থুড়ে বুড়ি  চিনতে পারলো দেখে

কৈশোরে দোলের দিন চটকা-মটকি খেলেছিল আমাকে জাপটিয়ে

বলল, ওহ তুই ! তোরা তো ভস্মাসুরের বংশ !

যেদিকে তাকাস জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিস ।

সত্যিই ভস্মাসুরের আমি বংশধর ; পুড়ি ও পোড়াই !

যারই দিকে চোখ মেলি দগ্ধ হয়ে ছটফট করে

তাদের স্মৃতিতে বসে অস্তিত্ব পুড়িয়ে দিই

মনে রাখবে না মানে !

পুড়বে আর মনে রাখবে ! জ্বলবে আর মনে রাখবে !

আমি তো ভস্মাসুরের বংশধর ; পুড়ি ও পোড়াই—

পুড়ুক পুড়ুক ওরা ঈর্ষায়  মরুক জ্বলেপুড়ে ।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর কবিতাসমগ্র ( প্রথম খণ্ড )

( যে কেউ এই কবিতাসমগ্র প্রকাশ করতে পারেন । এখান থেকে বেছেও প্রকাশ করতে পারেন )

একা

একাই লড়েছিলুম

কেউ বলেনি ‘হোক কলরব’

একাই নেমেছিলুম

ব্যাংকশাল কোর্টের সিঁড়ি বেয়ে

সেদিন একাই

কলকাতার পথে ঘুরেছিলুম

সকাল পর্যন্ত

বাংলার ত্রস্ত নীলিমা

সোনালী ডানার চিল নাই আর, কাঁদেও না, এখন কেবল

সারাদিন ডিজেল-আকাশ জুড়ে শকুনেরা পাক খায়

আপনার দেখা সেইসব বধূরাও নেই ; তারা সব ধর্ষিত হয়ে

ধানসিঁড়ি নদীতীরে লাশ হয়ে আছে । উবে গেছে ব্রা্‌হ্মধর্ম–

গাঁয়ে ও শহরে যখন-তখন দাঙ্গা লেগে যায়, লাশ পড়ে থাকে।

.

আমিও আপনার মতো মিশতে পারি না হায় সবায়ের সাথে

মনে হয় বিশ্বাস করার মতো কিছি নেই, কেউ নেই

বাংলার ত্রস্ত নীলিমা ছেড়ে, আত্মনির্বাসন আজ ভালো মনে হয় ।

প্রেমিকা

মাথার দিক থেকে গেলা আরম্ভ করো তুমি

চেবাও না, চেবাবার দাঁত নেই, শুধু একটু-একটু করে

পুরোটা অস্তিত্ব গিলে নাও, জীবন্ত গিলে নিতে থাকো

একেই প্রেম বলে মনে করো তুমি

প্রেমিককে আগাপাশতলা চুবিয়ে জারকরসে

দুটি দাঁতে বিষ জড়ো করো

লারগা ভিদা আল কমান্দান্তে

আমি রাইফেল চালাতে শিখেছিলুম

আমি স্টেনগান চালাতে শিখেছিলুম

আমি রিভলভার চালাতে শিখেছিলুম     

শিখেছিলুম আপনার স্মৃতিকে নিজের ভেতরে পুষে রাখব বলে

মার্গারেটের ডাকে বলিভিয়ায় গিয়েছিলুম

নয়েস্ত্রা সেনিওরা দ্য লা পাজ-এ

উচ্চতায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেছিলুম

লারগা ভিদা আল কমান্দান্তে

চিলে আর পেরুর বাতাসে ঝড় তুলেছিল আমার চিৎকার

বাতাস বইলে মনে হয় সবুজ রঙের ঘোড়ার দল ছুটছে

আমিও একটা সবুজ ঘোড়ার ওপরে বসে দেখলুম গাছের ওপরে আপনার বাসা

ম্যাকাও পাখির মেটিঙ কল যেন বুলেট ছুটছে

কমান্দান্তে চে

কমান্দান্তে, আপনি পৃথিবীর স্বপ্ন

আপনি দুটো হাত দিয়ে স্বপ্ন দেখতেন আর দেখাতেন

তাই শত্রুরা হাত দুটো কেটে নিয়ে লোপাট করে দিয়েছিল

নয়টা বুলেটে বিদ্ধ করেছিল আপনাকে

বুলেটের আওয়াজ চিরকাল ধরে রাখবে ম্যাকাও পাখিরা

আমার কবিতায় আপনার মোটর সাইকেল ছুটবে

সারা লাতিন আমেরিকা জুড়ে

আমি নিকারাগুয়ায় গিয়েছিলুম আরনেস্তো কার্দেনালের সঙ্গে দেখা করতে

মার্গারেট র‌্যানডালের সঙ্গে কথা বলতে

মার্গারেট আমার বিপ্লবের কবিতা প্রকাশ করতো

আমাকে চুমু খেতে দিয়েছিল মার্গারেট

যাতে ঠোঁটে বিপ্লবের উষ্ণতা নিয়ে দেশে ফিরি

টুপাক আমারুর দলের গেরিলাদের আগে আমি গেরিলাদের সঙ্গে মিশিনি

আমি ওদের দেখাদেখি টুপাক আমারুর নামে জয়ধ্বনি দিলুম

কিউবায় যাইনি কমান্দান্তে

আপনি কিউবা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন

আপনি বুঝে গিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আপোস করা যায় না

কিউবা থেকে আপনার হাত দুটোও লোপাট হয়ে গিয়েছিল

কিউবার নোটে আপনার সই থাকতো

লারগা ভিদা আল কমান্দান্তে

ঝিউড়ি মেয়ের স্বপ্নে

মোদোমাতাল ঝিউড়ি মেয়ের স্বপ্ন থেকে বেরিয়ে এলুম অনেক কষ্টে

সারা গায়ে চাবুক-পেটা রান্নাবঁটির কোপের রক্ত

পা ধরে টানছিল আরও ভেতর অন্ধকারে

যতোদিন না চুল পাকবে এই কড়ারে রাখবে বেঁধে

একটু নেশা কেটে গেলেই লাথাবে লোহার জুতো

ঝিউড়ি মেয়ের স্বপ্ন থেকে বেরিয়ে এলুম কুচোমাংসের টুকরো মানুষ

টুকরো দিয়ে গড়া ওই ঝিউড়ি মেয়ের মাতাল স্বপ্ন

সেই থেকেই টুকরোগুলো খুঁজে বেড়াই লেডি গাগায়

“হে প্রেম হে নুনু”

লড়ছিল দুই পুংহরিণ, শিঙের সঙ্গে শিঙ জড়িয়ে

হরিণীদের সবকটাকে পাবার জন্য

গোটা দশেক ভার্জিন আর বাদবাকিরা ঋতুগন্ধা

ঘাপটি মেরে দেখছিল চার-পাঁচটা সিংহী

দুটোকেই ধরল ঘিরে আর খেতে-খেতে ছিঁড়তে লাগলো

পৌঁছে গেল খোকাসিংহ খুকিসিংহি রক্তভোজে

এগিয়ে এলেন পুরুষসিংহ দুলকিচালে

পুংহরিণের নুনু দুটো সিংহমশায় খাবেন

অশোকের শিলালিপি

চারিদিকে হিজিবিজি স্পষ্টবাক বোবাদের গেঁড়িচোখ ভিড়ে

কে যে পরশ্রমজীবি নয়, সত্যি বলতে, টের পাওয়া যেত যদি

ঝড়েদের লেজ ধরে বৃষ্টিতে ঝুলে তারা পিঁড়ি-ছেড়ে ওঠা

বরেদের পাঁয়তাড়া ফ্রাই-করা প্রজন্মের বৈদ্যুতিক পুং

নেমন্তন্ন পাওয়া মাত্র পত্রপাঠ ছিঁড়ে ফেলার আনন্দে ভোগে–

তা ভুগুক, ক্ষেতি নেই । ডানার খাপে-খাপে যে-মস্তি লুকিয়ে রয়েছে

নিজেরই গলার স্বরে প্রতিধ্বনি সেজে তা তো বেমালুম হাওয়া

তাদের আঙুল নোংরা বরফের কোমল মোবিলে

তাহলে কাদের থাকে নখদর্পণের মতো মাথামোটা চিজ

বলো দিকি ! হ্যাঁ ঠিক, টিভি না থাকলে শ্যালে টেনে নিয়ে যেতো

জোব চার্নকের দিশি অ্যাণ্ডাবাচ্চা

বেচারি ব্যথিতচিত্ত কুকুরির ফেকলুছাপ প্রতিস্বপ্নে যাঁরা

স্যাঁতসেঁতে বাগ্মীতাগড়া বাস্তবে হিসেবি আদর্শবাদ পুযে

অণ্ডকোষ ভরে ভরে আওয়াজের গুণিতকে তোলাবাজ আনলেন

রাংতায় বানানো সেসব সাকিন-পরিচয়হীন মনোপজীবীই তো 

তারিয়ে তারিয়ে ভোগ করেন শান্তিমিছিলের ঢিল-ছোঁড়া দূরত্ব

আমি হ্যান আমি ত্যান আমি অমুক আমি তমুক আমি কেউ আমি কেটা

ভেবে ভেবে মশা-মাছিরাই কিনা মানব সভ্যতা পালটে দিলে

কেননা হাতফেরতা প্রেমিকদের প্রেমপত্রের ইনটারভ্যালে যে-প্যাঁচ থাকে

তা বুঝতে তুলোটনরম আবৃত্তিকারিনীদের কালো রঙের দুধ

বাকসাঁতারুদের ভাসিয়ে দেয়া বুদবুদের ঢঙে ফানুস হয়ে যায়

শেষে সেও-ভি-আচ্ছা ধাঁচের দার্শনিকতার ফুলেল আত্মকেন্দ্রে

মাচানে-মাচানে বুকনিবাজ থেটার-বিপ্লবীদের এমন পেঁকো জমঘট

যে বাঙালি আর কাঙালির তফাত এই ঘোচে কি সেই ঘোচে

মুক্ত চিন্তা মানে মনে-মনে ভাবুন দাদা পথিমধ্যে স্পিকটি নট

জোব চার্ণকের আদুরে গাড়ূগোপালদের ঔরস যে বহুরূপী ।

সপ্তফণ

যে-মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ে না

এমনই একজন সেদিন গোরস্হানে বল্লে

ঘৃণা করতে পারি এমন কিছু দিন দিকিনি

যাতে বেতো-শকুনদের অবসরপ্রাপ্ত বাসা থেকে

ফেলে-দেয়া জব্বর প্রশংসাগুলো কুড়োতে না হয়

ভদ্রপাল

চিঁটির হুঁচোট খেয়ে যে-পাথর চলেছেন গড়িয়ে-গড়িয়ে

মনোমজাদার ওঁর আধাফিল্মি ছম্মকছল্লো সুর–

যেন গড়াচ্ছে গড়াক শালা অসমমাত্রিক ধাক্কা পোয়াবার শেষে

থামবে চৌচপাট ক্যারদানি-চিত্তির কোনো হাফবাচনিক মহাফেজে

মাকড়সাথুতুর ছড়া লিভ-ইন গাঁটে-গাঁটে বেঁধে

ঘুষি-খাওয়া ত্যাবড়ানো ভুরু তুলে দেখবেন 

খুড়ো তো মিচকে-মারা দিবাচর ভদ্রপাল শিলা

পাল্প ফিকশন

যে-ভাষায় বাণিজ্য হয় না শুধু পদ্য লেখা যায়

সে-ভাষায় কথা বলে-বলে ক্লান্ত জিভ নাড়িয়ে 

কুয়াশায় সাঁতরে আসা রিকশাটাকে যখন ডাকলুম

দেখলুম তার হলুদ গায়ে কালো অক্ষরে লেখা :

‘যে লেখে বিস্তর মিছা সে লেখে বিস্তর’ ।

আইলা রে

আরে হ্যাঁ, বলতে ভুলে গিসলুম

খড়ের-মড়া পোড়াবার প্রতিবাদী গ্যাঞ্জামের ধোঁয়ায়

সমসাময়িক হবার ধান্দায় যেনারা জড়ো হয়েছেন

তেনাদের বুকনির মুসাফিরখানায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে 

দেখলুম পকেট মারছেন গোল্ডফিশ চেহারার এক মাগ-মহিলা

আকাশ জুড়ে তখন ফুৎকারে-গড়া পেল্লাই রামধনু

যা টুকে রাখছিলেন হোঁৎকাপোঁদা খবরের কাগজের হাফখোচর

এক বেড়ালগুঁফো সাংবাদিক যেনার আঙুলের কন্ঠস্বর 

থেকে-থেকে ডটপেনের ডগায় লুকিয়ে কাশলে কী হবে

ভোরবেলা উঠেই জানি দেখতে পাবো আলকাৎরায় 

চোবানো করোটির ফোকলা-অক্ষর হাসি

দেহপট

নোংরা ঘোলাটে পদ্মা আর গঙ্গা যেভাবে বঙ্গোপসাগরকে নীল করে তুলেছে

ঠিক সে-ভাবেই আগুনের দু’চার কলি নিঃশ্বাসে গড়া গান গেয়ে আমি

রুদ্রাক্ষহীন আঙুলে হাওয়ার শুটি ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে জব্বর এক গপ্পো বানাই

অনেকটা যুবতী শোকাতুরাকে জড়িয়ে মৃতকে ভুলে দেহতাপের মাতনে

আমারই দুটো ছায়ার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যেন কানে-কানে বলছি

হ্যাঁ গা মেয়ে, ব্যকরণ যদি জানো, বলো দিকিন এই দেহ ব্যাপারটা কী ?

অংশুমালী, তোর ওই হরপ্পার লিপি উদ্ধার

কী গণিত কী গণিত মাথা ঝাঁঝা করে তোকে দেখে

ঝুঁকে আছিস টেবিলের ওপরে আলফা গামা পাই ফাই

কস থিটা জেড মাইনাস এক্স ইনটু আর কিছু নাই

অনন্তে রয়েছে বটে ধূমকেতুর জলে তোর আলোময় মুখ

প্রতিবিম্ব ঠিকরে এসে ঝরে যাচ্ছে রকেটের ফুলঝুরি জ্বেলে

কী জ্যামিতি কী জ্যামিতি ওরে ওরে ইউক্লিডিনি কবি

নিঃশ্বাসের ভাপ দিয়ে লিখছিস মঙ্গল থেকে অমঙ্গল

মোটেই আলাদা নয় কী রে বাবা ত্রিকোণমিতির জটিলতা

মারো গুলি প্রেম-ফেম, নাঃ, ফেমকে গুলি নয়, ওটার জন্যই

ঘামের ফসফরাস ওড়াচ্ছিস ব্রহ্মাণ্ড নিখিলে গুণ ভাগ যোগ

আর নিশ্ছিদ্র বিয়োগে প্রবলেম বলে কিছু নেই সবই সমাধান

জাস্ট তুমি পিক-আপ করে নাও কোন প্রবলেমটাকে

সবচেয়ে কঠিন আর সমস্যাতীত  বলে মনে হয়, ব্যাস

ঝুঁকে পড়ো খোলা চুল লিপ্সটিকহীন হাসি কপালেতে ভাঁজ

গ্যাজেটের গর্ভ চিরে তুলে নিবি হরপ্পা-সিলের সেই বার্তাখানা

হাজার বছর আগে তোর সে-পুরুষ প্রেমপত্র লিখে রেখে গেছে

হরপ্পার লিপি দিয়ে ; এখন উদ্ধার তোকে করতে হবেই

অবন্তিকা অংশুমালী, পড় পড়, পড়ে বল ঠিক কী লিখেছিলুম তোকে–

অমরত্ব অমরত্ব ! অবন্তিকা অংশুমালী, বাদবাকি সবকিছু ভুলে গিয়ে

আমার চিঠির বার্তা তাড়াতাড়ি উদ্ধার করে তুই আমাকে জানাস

মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো

মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো

মুখ দেখে ভালোবেসে বলেছিলে, “চলুন পালাই”

ভিতু বলে সাহস যোগাতে পারিনি সেই দিন, তাই

নিজের মাথা কেটে পাঠালুম, আজকে ভ্যালেনটাইনের দিন

ভালো করে গিফ্টপ্যাক করা আছে, “ভালোবাসি” লেখা কার্ডসহ

সব পাবে যা-যা চেয়েছিলে, ঘাম-লালা-অশ্রুজল, ফাটাফুটো ঠোঁট

তুমি ঝড় তুলেছিলে, বিদ্যুৎ খেলিয়েছিলে, জাহাঝ ডুবিয়েছিলে

তার সব চিহ্ণ পাবে কাটা মাথাটায়, চুলে শ্যাম্পু করে পাঠিয়েছি

উলঙ্গ দেখার আতঙ্কে ভুগতে হবে না

গৌড়ীয় লবণাক্ত লিঙ্গ দেখবার কোনো স্কোপ আর নেই

চোখ খোলা আছে, তোমাকে দেখার জন্য সবসময়, আইড্রপ দিও

গিফ্টপ্যাক আলতো করে খুলো, মুখ হাঁ-করাই আছে

আমার পছন্দের ননভেজ, সন্ধ্যায় সিঙ্গল মল্ট, খাওয়াতে ভুলো না

মাথাকে কোলেতে রেখে কথা বোলো, গিটার বাজিয়ে গান গেও

ছ’মাস অন্তর ফেশিয়াল করিয়ে দিও, চন্দনের পাউডার মাখিও

ভোর বেলা উঠে আর ঘুমোতে যাবার আগে চুমু খেও ঠোঁটে

রাত হলে দু’চোখের পাতা বন্ধ করে দিও, জানো তো আলোতে ঘুমোতে পারি না

কানে কানে বোলো আজও উন্মাদের মতো ভালোবাসো

মাথা কেটে পাঠালুম, প্রাপ্তি জানিও, মোবাইল নং কার্ডে লেখা আছে

কবিতা সাহেব

তাকিয়ে পাথর করে দেবার সৌন্দর্যবোধ যে আমার ছিল না

তা কাজরি মাছের জাতীয় সঙ্গীতের ছোটো-ছোটো ঢেউ দিয়ে বানানো

অচেনা টগবগে মেয়েদের দেখে ভাল্লাগে এমন উড়ুউড়ু দুপুরে 

আকাশের গনধধ শুঁকতে-শুঁকতে লতিয়ে ওঠা গাছের ডগায় টের পেলুম

যে আমায় শহুরে চাকরানির দোআঁসলা ইশারায় আবডালে বলেছিল

ডাকটিকিট ছাড়া জীবনে আর কিছু চাটা হয়নি নাকি গো দাদাবাবু 

পাঁকে হাঁটতে পায়ের আবার কষ্ট কিসের ? হ্যাপা তো সব মাথার ।

.

.

সে যাকগে ! দিনে দুবার অস্ত-যাওয়া সূর্যের একটা চিত্রকল্প যদি পেতুম

নিদেনপক্ষে খোসপাঁচড়ার অলংকরণে একজন স্যানিটারি বাঙালির উপমা

তাহলে অজ্ঞান করার ওষুধের সুগন্ধি ফিসফিসানি শুনতে শুনতে

নিশাচর শুক্রকীটরা যেভাবে নুডল-নরম ঠোঁট আর সুপ-গরম শ্বাসের

তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে ঝড়ের কায়দায় ফুরিয়ে যাবার তাড়ায় ভোগে

জিভের ওপরে হামাগুড়ি দেবার ইচ্ছে গোপন রাখতো না এদান্তি কেউ

পথচিহ্ণ দেখে মালুম হতো কে-কে কোনখানে দাঁড়িয়ে আর কোথায় যাচ্ছে

.

.

আয়নাও তো দেখি পারা ঝরিয়ে নতুন-বউয়ের স্মৃতি ভুলে যায়

তাই বলে যাদের রাশিফল সব কাগজেই নিত্যিদিন হাসিখুশি থাকে

তারা কি পোয়াতি-কাঁঠালের গাছপাকা গন্ধে হিংসুটে বোলতাদের ডাকবে

নাকি স্ফূলিঙ্গের জুতো পরা দূরপাল্লার রেলগাড়ির বাংকে শুয়ে ভাববে

পরতের পর পরত বয়সের মুখোশ জমে মুখটাই সাহেব হয়ে গেল গো

মাংস

লোকগুলো সাধারণ, ভিড়ের ভেতরে ঢুকে কেন

এমন খুংখার হিংস্র হয়ে পেটাতে লাগলো বুড়োটাকে

বেদম প্রহার, মুখ থেকে আতঙ্ক গোঙানি রক্তের ভলক

খালি গায়ে লাঠি দিয়ে লালচে নীলাভ দাগ দেগে

যতোক্ষণ না বুড়োটা পথের ওপরে পড়ে নিথর নীরব

আটপৌরে পথ-চলতি লোকেরাও ভিড়ে মিশে গিয়ে 

ভয়ংকর কেন ? আত্মচেতনা বিসর্জন দিয়ে

অন্যেরা যা করছে তাতে জুটে গেল ? কীভাবে 

দ্বৈতসত্তায় একটা বিষাক্ত আত্মা ঘাপটি মেরে থাকে !

এইভাবে মগজে নোংরা বিষ গড়ে ওঠবার কী কারণ

হতে পারে ? লোকগুলো সবাই তো সংসারি, ছেলে-মেয়ে

বউ বাবা রয়েছে বাড়িতে, চাকরি-বাকরি আছে

কিংবা চাষ-বাস জমি-জিরে, মাঠে কাটা ধান পড়ে আছে

একটু আগেই তো স্বাভাবিক পথচারী ছিল, এখন

হিংসা সম্পর্কে বোধহীন । মাংসের প্রতিশোধ নিতে

মোষের মাংসকেও গরুর মাংস নাম দিয়ে বুড়োটার

জীবন্ত মাংস খুবলে বিষাক্ত অপর সত্তাকে

আনন্দে আত্মহারা করে ছেড়ে দিলে হোমো স্যাপিয়েন

গপ-শপ

একদিন না, কাকেদের সড়গড় ভাষায় দেখলুম

সরকারি প্যানেলভূক্ত মড়াগুলো আমায় চিবিয়ে খাচ্ছে

দাঁতগুলো খণ্ডে-খণ্ডে প্রকাশিত বত্রিশ ভল্যুম মেঘ

চেহারা দেখে মনে হল সব বাসি বিয়ের টাটকা বর

ব্যাঙের ডিমে তা দিতে মগ্ন বগিথালা-ছাপ পদ্মপাতায়

যারা হাই তুলে-তুলে অফিসঘরের হাওয়া পালটায়

কথাটা এতো সহজ যে বলে বোঝাতে পারব না অবশ্যি

এখানে একটা মেটাফর ঢুকিয়ে ব্যাপারটা খোলসা করা যায়

টেকোদের ব্রোঞ্জমূর্তি মরে যেতে চায় অথচ উপায় নেই

রাতের সঙ্গে ঘুষোঘুষির পর রক্তশূন্য সকাল বেলায়

পালাবদল না-হওয়া অব্দি ভুগতে থাকা অমরত্বের কলঙ্কে

প্রদূষিত পরিবেশ দিয়ে সুনির্মিত অহংকারের ছাইপাঁশে

হাউ-হাউ বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় মা-মরা রাস্তায়

যেন ঘড়ি থেকে মুহূর্ত সরিয়ে ফেলতে গিয়ে ধরা পড়েছে

আহ্লাদে সাতখানা

যে-মেয়েটির

চোখের পাতা  দুর্গাটুনটুনির ফিনফিনে ডানায় গড়া

তার সঙ্গে মানে বাদ-দেয়া শব্দে তৈরি আলটপকা বাক্যালাপে

নাতি-নাতনিদের ঝুলতে শেখাচ্ছিলেন লোলগতর বাদুড়ঠাকুরমা

.

যে-গ্রামে

মোষের কেঁদোপিঠে বসে শালিকপাখিরা হিচহাইক করে

সেখানের প্রেশারকুকারগুলো কিন্তু মেয়েটিকে দেখে আজও সিটি মারেনি

অথচ ওর সারা গায়ে জল চুয়ে-পড়া সোঁদা সুড়ঙ্গের ঘনসবুজ গন্ধ ছিল

.

যে-দেশে

চোখের জল ফেললে সত্যিই টপ করে মিউজিকাল শব্দ হয়

ওখানেই তো প্রতিটি শবের চোখের পাতা বোজাবার চাকরি পেয়েছে মেয়েটি

ইচ্ছে করলে ও চাঁদের কায়দায় যে-কোনো সমুদ্রের গোমর ঘোচাতে পারে

.

যে-জাজিম

মেয়েটির নাচের তাল নিজের মির্জপুরি নকশায় পুষে রাখে

তা আসলে ঝাঁকবাঁধা কাজরি মাছের কাতুকুতুতে খিলখিল ঢেউ

শহুরে টবের গোলাপের ঢঙে আলসে থেকে ঝুঁকে মেয়েটিকে ডাক পাড়ে

.

যে-লোকটা

লুঙ্গি না ধুতি পরবে ঠিক করতে না পেরে কাকতাড়ুয়া রয়ে গেল

তার সঙ্গে বিয়ে হতে ঝিলমিলে অন্ধকারে শুয়ে মেয়েটি জানতে পেরেছে

ওর বুকের খড়ে কুয়াশা জমে শ্লেষ্মা হয় বলে মাথায় পোড়ামাটির হেলমেট

.

যে-দরজার

কপাটে খোলা আর বন্ধ করার আওয়াজ চুপচাপ লুকিয়ে থাকে

তা ঘুরিয়ে বলা যায় যে সে-আওয়াজ এমনভাবে গুজব ফিরি করে যেন

বাদামের পাঠবস্তু চোখের সামনে মেলে ধরে মুখস্হ করছে কাঠবিড়ালি

.

যে-জেলখানায়

এক চিলতে আকাশে দ্বিতীয়ার চাঁদ তিন লাফে উঠে পড়ে

সেখানে পেঁয়াজ ছাড়িয়ে-ছাড়িয়ে যাদের কান্নার স্টক শেষ হয়ে গেছে

পান্তুয়ার মাংস দিয়ে তৈরি সেসব মহিলাদের ভিড়ে মেয়েটি আজ নায়িকা

নায়কত্ব

আটাকলের চনমনে গমদানার কায়দায় নাচতে-নাচতে

জুতোপায়ে বাজারে গিয়ে যখন খালি পায়ে নিজের মধ্যে ফিরি

বাসন-ধোয়া আওয়াজে চমকে ওঠে কাঁসাপেতলের রান্নাবাড়ি

বুঝতে পারি না অতো গান কেন ওইটুকু গলায় ধরে রাখে পাপিয়া

মাটিতে কান পেতে শুনতে পাই আরশোলাদের শোকপ্রস্তাবের ফিসফিস

.

বয়স হবার পূর্বাভাস আয়না তো অনেক আগেই দিয়েছিল

আমিই বরং ভেবেছি কাঁধে পাণ্ডবদের কালাশনিকভ নিয়ে বেরিয়ে পড়ব

কিন্তু মাঝরাতে হাতের মুঠো যে উন্মাদ হয়ে যাবে তা কে জানতো

.

প্রথম চুমুর স্মৃতি রোমন্হন করতে যে বৃদ্ধ এখন ইনটেনসিভ কেয়ারে

নিজের ভুলগুলোকে সন্মান জানানো হয়ে ওঠেনি বলে

মদ খেয়ে নর্দমায় পড়ে থাকার উচ্চাকাঙ্খা পূরণ হল না

সমুদ্র তো অবিরাম ঝাঁপাই ঝুড়ে স্বাধীন হতে চায় তবু পারে না

.

ঝড়ের সঙ্গে লড়ছে বাড়িটা অথচ ভেতরে বসে লোকটা ভাবছে ওইই লড়ছে

উত্তরটা কী ? উত্তরটাই তো প্রশ্ন ! প্রশ্নটা কী ? প্রশ্নটাই তো উত্তর !

.

অতো বেশি পালক রঙ রূপ নাচ নিয়ে ময়ূর ওড়ে না

ওকে কেবল দেখুন আর প্রশংসা করুন ; ও-ই তো নায়ক

স্বচ্ছ দেওয়াল

সে দেওয়াল কেমন দেখতে জানে না

দেওয়ালটা যার সেও কখনও জানেনি

সে কেবল জানে রয়েছে দেওয়ালখানা

বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে সেই যুবকের জন্য

যাকে সে ভাঙতে দেবে

যুবকেরা তবু গলদঘর্ম হয় স্বচ্ছ একটা পাতলা

দেওয়াল ভাঙতে

হাজার হাজার বছর যাবত চলছে দেওয়াল ভাঙা

রক্তের সাথে রসের তৈরি সেই দেওয়াল

যার ভাঙে তার গর্ব ধরে না

যে ভাঙছে তারও অহমিকা নাচে ঘামে

রসের নাগর খেতাব মিলেছে প্রেমিকের

প্রেমিকা দেখাবে চাদরে রক্ত লেগে

অধ্যবসায়ে সময়ের সাথে লড়ে

দেওয়াল ভাঙার সে কি আনন্দ দুজনেরই

যে ভাঙল আর যার ভাঙা হল

সেলোফেন ফিনফিনে

দেওয়াল না ভেঙে মানুষ জন্মাবে না

তাই সব দেওয়ালই স্বচ্ছ মাংসে গড়া

সেলোফেনে হোক কিংবা 

লোহার ইঁটের অদৃশ্য সীমারেখার

প্রেমের ঘামেতে ভিজিয়ে ভেঙে ফেলা দরকার

টাপোরি

আমি যে-কিনা পালটি-মারা তিতিরের ছররা-খাওয়া আকাশ

জলে ডোবা ফানুসপেট মোষের শিঙ থেকে জন্মেছিলুম

অলসচোখ দুপুরে পুঁতি-ঝলমলে নিমগাছটার তলায়

থাবা-তুলতুলে আদর খাচ্ছিলুম ভুরু-ফুরফুরে শ্যামাঙ্গী গৌরীর

হাত-খোঁপায় গোঁজা বৃষ্টির কাছে নতশির স্বর্ণচাঁপার কোলে

.

আমি যে-কিনা গ্রিলবসানো সকালমেঠো দিগন্তে দাঁড়িয়ে 

মাড়ানো ঘাসের পদচিহ্ণ আঁকা শোকাচ্ছন্ন রোদের সোঁদাভূমিতে

শেষ গড়াগড়ির বিছানায় কাঠকীটের রাতঘ্যাঙোর শুনেছি

ভাবছিলুম উদ্দেশ্য প্রণোদিত হলেই খারাপ হতে যাবে কেন রে

পদ অলঙ্কৃত-করা গতরের ঘামে কি খাটুনির লবণকলা নেই

.

আমি যে-কিনা ডাহুককে জিগ্যেস করেছি প্রজাপতির ডানায় কী স্বাদ পাস

কানপটিতে খুরধ্বনি সেঁটে চিপকো খেলার তেজবরে কনের আদলে

জাহাজ-এড়ানো লাইটহাউসের আলোয় এক করাতদেঁতো হাঙর

যামিনী রায়ের আঁকা স্তনের কেরানির সঙ্গে মহাকরণের খাঁচালিফটে

হেঁকেছিলুম আরোহী-ফেলা পুংঘোড়ার লাগামছেঁড়া হ্রেষা

.

আমি যে-কিনা উচ্চিংড়ের স্বরলিপিতে গাওয়া ফুসফাসুরে গান

বেড়াজালের হাজার যোনি মেলে ধরে রেখেছি ইলশে-ঝাঁকের বর্ণালী

স্বদেশী আন্দোলনের লাশঝোলা স্মৃতির গাবগাছের পাশের ঝোপে

শুকপোকায় কুরে-খাওয়া লেবুপাতার পারফিউমড কিনার বরাবর

পাথরকুচি কারখানা-মালিকের ঘাড়কামানো পাহাড় থেকে উড়ছি

ভূমিকাবদল

হাই তুলতে-থাকা থুতনির তিলে বিষে নেতিয়ে আছে যে-বিকেল

কিস্তিতে কেনা আদরের বেড়াজাল কচুপাতার টলটলে সবুজ নাভিতে

অল্পস্বল্প ঢিলেঢালা প্রতিধ্বনি মিশিয়ে মাখিয়ে দিন ঝিনচাক দেদোল দেহে

হারানো জিনিসের বিকল্প পাবেন চাউনির অভিযোগ থেকে পোঁ-পাঁ বেরিয়ে

ডুমোডুমো করে কাটা কথাবাত্রায় চুবিয়ে নিন প্রজাপতি গর্ভের ডিজেল

খুজলি-খচিত কানের মাকড়সাকে বলুন রংচটা আঁখিউলির কী রেট যাচ্ছে

ও-ই আনবে নিরুদ্দেশ নুড়ির জলস্মৃতি আর রয়াল বেঙ্গল খচ্চর ডাক

কাঁচি-কাটা পুকুরের পানাচাদর গায়ে আখের রস পালটান খেজুর পাটালিতে

না-ব্যালাড

জ্বলন্ত রাজহাঁসের কয়েল-খোলা ডানা থেকে

গুটিপোকার সবুজ রক্তসমুদ্র বিয়োবার পর

মেঘের তলপেটে ওই খোসাছাড়ানো চাঁদ

ঢেউকে হুকুম করেছে কাঁকড়াদের বুকে জ্যোতিষ মুছতে

কানায়-কানায় ভরা চিরহরিৎ আলজিভের পদ্মে

পরাগ-হাতড়ানো মৌমাছি তার আঁচল উড়িয়ে

গরিমারাঙা গণপ্যাঁদানির বেহেড গ্রামে খুঁজেছে 

পাশে শুয়ে মনকেমন দূরত্বের ধুমধামাকা গান

নেভো মোম নেভো

আপনি আমার প্রিয় নারী, যদিও শুধুই শুনেছি ঘুমন্ত কন্ঠের কালো

ফিল্মে দেখেছি, আগুন নগ্নিকা, বুক দুটো অতো ছোটো কেন

দুঃখ হয় নাকি ? আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল বুক ছোটো বলে

হত্যা করতে গিয়ে কিছুটা ঝুঁকলেন, নয়তো বুক উঁচু করে বলতেন

যা করি তা কারি, প্রেত তোর তাতে কী, তুই কি ঘুমের ইন্দ্রজালে

শুধু বুক খুঁজে বেড়াস নাকি ! সত্যিই তাই, আপনার ঘুমে ঢুকে

তাছাড়া কি খুঁজবো বলুন ? ফেরার ট্যাক্সিভাড়া ? গ্যাসের রসিদ ?

যা ইচ্ছে করুন আপনি, জেনে নেবো, চলন্ত গাছেরা বলে দেবে,

না জানলেও আকাশ তো ভেঙে পড়ছে না ; আপনি আমার প্রিয় নারী,

মন খারাপ করে দিলেন আজকে বৃষ্টির দিনে, ছাতাও আনিনি,

আপনার পাশ দিয়ে যেতে-যেতে ছাতার আড়াল থেকে আপনার

ছোট্টো দুটো বুক জরিপ করে নিতে পারি, ব্র্যাঙ্কোর প্রেত আমি,

ছোরা দুটো নিলেন দুহাতে তুলে, মনে হয়েছিল বুকের গরবিনি, হত্যা

নেহাতই অজুহাত, কেউ তো আর মনে রাখবে না, উনিও জানেন

তোমাকে দেখেই চুমু খেতে ইচ্ছে করেছিল, না না, হাঁ-মুখের ঠোঁটে নয়

পাছার দু-ঠোঁটে, আহা কি মসৃণ হতো রাজরানি হওয়া, যেন ইস্কাপন

নষ্ট করে নেচে উঠছে বিদ্যুতের খ্যাতি, যার অস্তিত্বে আমি বিশ্বাস করি না

খুলে বলি আপনাকে, আমি কীরকমভাবে নারীকে খুঁজি তা বলছি শুনুন,

যেমন ঘোড়দৌড়ের জুয়াড়িরা ঘোড়ার রেসবই খুঁটে খুঁটে পড়ে

আমার ভেতর সেরকমই পোষা আছে কয়েকটা অসুখ

বুঝলেন, যখন প্রথম পড়ি, প্রেমে পড়ে গিসলুম নগ্ন আপনার !

লেডি ম্যাকবেথ ! আহা কি শঙ্খিনী নারী, কি ডাগর রক্তময়ী চোখ

ঘুমন্ত হেঁটে যাচ্ছো মৃত্যুর মসলিনে সম্পূর্ণ পোশাকহীন, কোনো খেয়াল নেই,

চেয়েছি জড়িয়ে ধরতে, বলতে চেয়েছি, লেডি, লেডি, নগ্ন পশ্চিমে

একটা চুমু শেষবার দাও, পুরস্কার নিয়ে ডাইনিরা দাঁড়িয়ে রয়েছে

রক্তাক্ত ছোরার সঙ্গে কথা বলো, বুকের নির্দয় ওঠা-নামা, লেডি

ম্যাকবেথ, ওই যিনি ছোটো বুকে মনটা খারাপ করে ফিরছেন বাড়ি

ওনাকে উৎসাহিত করো, বড়ো, আরবের সমস্ত আতর ধুতে পারবে না

হত্যার মিষ্টি গন্ধ, যেমনই লোক হোক সে তো তার নিজস্ব দৈত্যের সৃষ্টি,

তেমন নারীও, আত্মজীবনীতে লিখবেন কিন্তু প্রথম হস্তমৈথুনের স্বাহা

ক্লিটোরিসে অঙ্গুলিবাজনার মৃদু উগরে-তোলা ঝর্ণাঝংকার

আপনার নগ্নতার ব্যক্তিগত ছন্দ লেডি ম্যাকবেথের মতো হাঁটছেন

কলকাতার রাস্তা দিয়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ, আমাকে চিনতে পেরেছেন ?

আমি ব্যাঙ্কোর প্রেত, প্রতিটি হত্যাদৃশ্যে উপস্হিত থেকে

বুকের বর্তুলতা মাপি, যবে থেকে স্কুলপাঠ্য বইয়ে দুরূহ লেগেছিল

লেডি ম্যাকবেথের লোভ সিংহাসনে রাজমহিষীর মতো উঁচু বুকে

বসে আছো, স্কুল-ফেরত সম্পূর্ণ উলঙ্গ তুমি হাঁটছো পাশাপাশি

ঘুমন্তকে নয়, ঘুমকে খুন করেছিলে তুমি, চিৎকার করছিলে

‘কে জানতো বুড়ো লোকটার গায়ে এতো রক্ত এতো রক্ত ছিল !’

এসবই আপনার নারীত্বের রক্ত, ছোট্টো দুটো বুকের দুঃখের

ভাববেন না বেশি, যৌবন ফুরোবার সঙ্গে এই দুঃখ চলে যাবে

তখন দেখবেন ক্লিটোরিস সাড়া দিচ্ছে না, রসশাস্ত্রহীন দেহ

আদিরস প্রথমে লোপাট, ঘুমন্ত হাঁটবার আহ্লাদ নামছে দুঃস্বপ্নে

আপনার ছোট্টো বুক ছোট্টোই থেকে যাবে যতোই উদার ওন

ভিখিরি দেখলেই বটুয়াতে কয়েনের ওজন কমান, লেডি ম্যাকবেথ

ছাড়বে না, উচ্চাশার কি দুর্দশা, হাতে রক্ত, নেভো মোম নেভো

কপিরাইট

অবন্তিকা, অতি-নারী, অধুনান্তিকা

পঞ্চান্ন বছর আগে চৈত্রের কোনারকে

লোডশেডিঙের রাতে হোটেলের ছাদে

ঠোঁটের ওপরে ঠোঁট রেখে বলেছিলি

চুমু প্রিন্ট করে দিচ্ছি সারা নোনা গায়ে

ম্যাজেন্টা-গোলাপি ভিজে লিপ্সটিকে

গুনেগুনে একশোটা, লিমিটেড এডিশান

কপিরাইট উল্লঙ্ঘন করলে চলবে না ।

অবন্তিকা, সাংবাদিকা, অধুনান্তিকা

এ-চুক্তি উভয়েরই ক্ষেত্রে লাগু ছিল

কিন্তু দুজনেই এর-তার কাছে থেকে

শুনেছি কখন কবে কার সাথে শুয়ে

ভেঙেছি ভঙ্গুর চুক্তি কেননা মজাটা

ঠোঁটের ফাইনপ্রিন্টে লিখেছিলি তুই ।

প্রজাপতি প্রজন্মের নারী তুই অবন্তিকা

রবীন্দ্রনাথ, এটা কিন্তু ভালো হচ্ছে না।

অবন্তিকা বলছিল আপনি প্রতিদিন

ওকে রুকে নিচ্ছেন, আপনাকে সাবান

মাখাবার জন্য, বুড়ো হয়েছেন বলে

আপনি নাকি একা বাথরুমে যেতে

ভয় পান, আর হাতও পৌঁছোয় না

দেহের সর্বত্র, চুলে শ্যাম্পু-ট্যাম্পু করা–

পোশাক খুললে, আসঙ্গ-উন্মুখ নীল

প্রজাপতি ওড়ে ওরই শরীর থেকে

আর তারা আপনার লেখা গান গায় !

এটা আপনি কী করছেন ? আপনার

প্রেমিকারা বুড়ি থুতথুড়ি বলে কেন

আমার প্রেমিকাটিকে ফাঁসাতে চাইছেন !

নাচ মুখপুড়ি

নাচ তুই নাচতে থাক অবন্তিকা উইখেকো গোরিলার ঢঙে

নাচতে থাক নাচতে থাক নাচ কী হয় কী যে হয় তালে-তালে

আমি আছি তোর ঘামে নুন হয়ে হাওয়ার সঙ্গে ট্যাঙ্গো

আলোর সঙ্গে ফক্সট্রট কিংবা দোলানো পাছায় মাম্বো রুম্বা বুগি

পাসো দোবলে লিকুইড লকিং বোলেরো জাইভ সুইং সকা

মুনওয়াক ফ্ল্যামেঙ্গো নাচে কথা বলা বন্ধ রেখে

নিজেকে নাচাতে থাক ডি.জে. আমি আছি তোর নাভি ফুটো করে

হালকা হলুদ পোখরাজে অন্তর্বাসে আছি আলতো সন্মোহিনী কটুগন্ধে

মোদো-ভাপ নিঃশ্বাসে নখের পুরোনো ময়লায়

চুমুপ্রিয় গালের ফুসকুড়ি হয়ে তেষ্টা-পাওয়া খসখসে ঠোঁটে

শ্লেষাত্মক হাসি হয়ে আছি বুঝতে পারবি না মুখপুড়ি

কেননা তুই ঢঙি চিরকাল কেবলই নেই নেই নেই নেই

নেই নেই নেই নেই করে নেচে গেলি নেচে গেলি নেচে

ভাষার মাস্টার বোদা করিয়োগ্রাফারের ইশারায়

দলে দলে 

সব দেশেই বিপ্লবীর জলপাই পোশাকে অস্ত্রধারী দল আছে    

চোরাচালান হয়ে আসে বোমা বারুদ কালাশনিকভ

একদল আরেকদলের লোকেদের খুন করে জয়ধ্বনি দেয়

তুলে নিয়ে যায় আরেকদলের নারীদের ধর্ষণ করে

বিক্রি করে হাতবদল হয় শেকলে বেঁধে নিয়ে যায়

ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দলবেঁধে উল্লাস করে সবায়েরই

আছে বিপ্লবের তত্ব, এক দলের তত্বের আরেক কাঠি ওপরে

আল-কায়দা, আল-শবাব, আনসারাল শারিয়া, ইমাম শামিল

খোরসান গোষ্ঠী, আইসিস, আবু সায়াফ, বোকো হারাম,

জুনুদ উল খালিফা-এ-হিন্দ, মুজাহাদিন শুরা, আনসার খালিফা

জামাত আল জিহাদ আল ইসলামি, জামিয়া ইসলামিয়া, 

কুর্দিস্তান ওয়কর্স পার্টি, লর্ড রেজিস্ট্যান্স আর্মি, তালিবান,

হেজ্বে ইসলামি গুলবুদিন, ফিদাই মাহাজ, সালাফি জিহাদি,

মাগরিব কায়দা, হাককানি বিপ্লবী, কাবিন্দা ফ্লেক, মাপুচে,

অ্যান্টি বালাকা, কোওরদিনাদোরা আরাউকো-মালেকো,

জিনজিয়াং স্বাধীনতা সংগ্রাম, তুর্কিস্তান ইসলামি বিপ্লব,

ব্ল্যাক ইগলস অব কোলোমবিয়া, গাইতানিসতাস, ইএলএন,

ইপিএল, ফার্ক, ইতুরি বিপ্লব, কাটাঙ্গা বিপ্লব, কিভু বিপ্লব, 

কামউইনা নাসাপু বিপ্লব, এম সাতাশ, মাই-মাই, রুদ-উরুনানা,

নিয়াতুরা, এফডিএলআর, মাই মাই শেকা, মাই মাই ইয়াকুটিমবা,

রাইয়া মুটোমবোকি, এফএনআই, এফআরপিআই, এফপিজেসি,

মাই মাই ইয়াকুটিম্বা, মাই মাই গেদেঅন, কোরাক, সিপিকে, নালু,

কামউইনা নাসাপু মিলিশিয়া, বুন্দু দিয়া কঙ্গো, আল ফুকরান ব্রিগেড,

আনসার আল শারিয়া, ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদ, হাসম বিপ্লব,

এরিট্রিয়া ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট, এরিট্রিয়ান কুনামা লিবারেশন,

ইথিয়োপিয়ান পিপলস ফ্রন্ট, ওরোমিয়া লিবারেশন ফ্রন্ট, ওগাডেন 

ন্যাশানাল ফ্রন্ট, ওরোমো লিবারেশন ফ্রন্ট, সিদামা লিবারেশান ফ্রন্ট,

ব্ল্যাক স্টার অব গ্রিস, কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসিস্ট, হরকত অল

মুজাহাদিন, হিজবুল মুজাহাদিন, জয়েশে মোহম্মদ, খালিস্তান কমান্ডো

ফোর্স, লশকরে তৈয়াবা, সিমি, জেমা ইসলামিয়া, মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট

মাওইস্ট পার্টি অফ ইরান, কুর্দিস্তান পার্টি অব ইরান, জুন্দুল্লাহ, কুর্দিস্তান 

ফ্রিডাম পার্টি, ইসলামিক মার্কসিস্ট পার্টি অফ ইরান, হেজবোল্লাহ,

আল নুসরা, মাওইস্ট আর্মি অফ মেহিকো, নিওজাপাটিসমো, রেনামো

অফ মোজামবিক, নাইজার ডেল্টা অ্যাভেঞ্জার্স, বায়াফ্রা অ্যাভেঞ্জার্স

বালোচ রিপাবলিকান আর্মি, সিপাহে সাহাবা দেওবন্দি, শাইনিঙ পাথ

অব পেরু, বিপ্লব চলতেই থাকে চলতেই থাকবে খুনোখুনি ধর্ষণ

রঙিন ঝাণ্ডা, গরু-ছাগলের সঙ্গে নারীদের তুলে নিয়ে যাবার বিপ্লব

পপির ফুল

বোঁটায় তোর গোলাপ রঙ অবন্তিকা

শরীরে তোর সবুজ ঢাকা অবন্তিকা

আঁচড় দিই আঠা বেরোয় অবন্তিকা

চাটতে দিস নেশায় পায় অবন্তিকা

টাটিয়ে যাস পেট খসাস অবন্তিকা

অন্তরটনিক

বিড়ি ফুঁকিস অবন্তিকা চুমুতে শ্রমের স্বাদ পাই

বাংলা টানিস অবন্তিকা নিঃশ্বাসে ঘুমের গন্ধ পাই

গুটকা খাস অবন্তিকা জিভেতে রক্তের ছোঁয়া পাই

মিছিলে যাস অবন্তিকা ঘামে তোর দিবাস্বপ্ন পাই

তোর বহির্মুখ, মুখপুড়ি

তোর বহির্মুখী দেহ, আদরক্লান্ত ঘামে, মুখপুড়ি মেছোমেয়ে

আলুথালু মরশুমে বেড়ে ও ফিকিরহীন, অপপ্রচারে, বুঝলি

জাহাজ ভাসাতে চাইছে পিম্পদের ঘোড়েল জোয়ারে ।

হাউ সিলি ! নো ? কী বলিস, ডারলিং, সুইটি পাই ?

তোর নাব্য নগ্নতা গ্লসি কাগজের চারু মলাটে হেলান দিয়ে

পুজো সংখ্যার মোটা বেহেডদের পাশে শুয়ে করছেটা কী ?

বল তুই ? তোর কোনো সে নেই ? বোবা না বধির তুই !

অলংকার-টলংকার বেচে খেয়েছিস জানি । বাড়ির কাঠামো

দেখছি ঝুলে গেছে দশ বছর বাদে-বাদে কিস্তি দিতে-দিতে;

হাউ স্যাড । চ্যাংড়া যারা জোটে তারা টেকে না কেন রে ?

বছর না যেতেই কাট মারে ! অথচ বডি তো সরেস আজও

অক্ষরের ধাঁচে জমে একেবারে টানটান আগাপাছতলা

কন্ঠের টিউনিঙও শ্বাসকে ফুরিয়ে ফ্যালে রাত বাসি হলে ।

বেশ্যার আলতামাখা গোড়ালি দেখবো ভাবিনি— তাও

ব্যালেরিনা জুতোর আবডালে, ডারলিং, ঘামে-ভেজা

প্রণামের খাতিরে তুই কতরকমের ফাঁদ পেতে রেখেছিস !

পরমাপ্রকৃতি

মেঘের রঙ দিয়ে ছুঁয়ে দিস অবন্তিকা

চামড়া বাঘের ডোরা ধরে

হাওয়ার রেশম দিয়ে চুল আঁচড়ে দিস অবন্তিকা

মাথা বেয়ে ওঠে বুনো মহিষের শিং

ঝড়ের মস্তি দিয়ে পাউডার মাখিয়ে দিস অবন্তিকা

গায়ে ফোটে গোখরোর আঁশ

হরিণের নাচ দিয়ে কাতুকুতু দিস অবন্তিকা

ঈগল পাখির ডানা পাই

রোদের আঁশ দিয়ে নখ কেটে দিস অবন্তিকা

গজায় নেকড়ের থাবা হাতে-পায়ে

নদীর ঢেউ দিয়ে ঠোঁটে চুমু খাস অবন্তিকা

কাঁধে পাই রাবণের জ্ঞানীগুণী মাথা

বৃষ্টির ঝাপটা দিয়ে জড়িয়ে ধরিস তুই অবন্তিকা

হুইস্কির বরফ হয়ে যাই

গানের সুর দিয়ে চান করিয়ে দিস অবন্তিকা

ডুবে যেতে থাকি চোরা ঘূর্ণির টানে

নয়নিমা

ব্যায়াম করিস তুই অবন্তিকা, নরম গোলাপি ম্যাটে শুয়ে, মিহিমিহি

বাজনায় বডি তোর মৃদঙ্গ তালের ঢঙে ফুল-অন উরুকে ফোলায়

পা দুটো ওপরে ওঠে, উলঙ্গ সাঁতারু, আয়নার পারা গুঁড়োগুঁড়ো

ভাসাস সঙ্গীতে ধোয়া উড়ন্ত বকের ডানা, কাকে দিবি বলে

কাঁচা মাটি মাখছিস আঁটো সাঁটো লোভনীয় পাছাকে দুলিয়ে ?

মর মুখপুড়ি

এই বেশ ভাল হল অ্যামি, বিন্দাস জীবন ফেঁদে তাকে

গানে-নাচে মাদকের জুয়ার পূণ্যে অ্যামি, কী বলব বল,

অ্যামি ওয়াইন হাউস, অ্যামি, আমি তো ছিলুম তোর

জানালার কাঁচ ভেঙে ‘ল্যাম্ব অফ গড’এর দামামায়

বাজপড়া গিটারের ছেনাল আলোয় চকাচৌঁধ ভাম,

অ্যামি, আমি তো ছিলুম, তুই দেখলি না, হের্শেল টমাসের

শিয়রে বিষের শিশি মাধুকরী লেপের নিঃশ্বাসে, অ্যামি

স্তনের গোলাপি উলকি প্রজাপতি হয়ে কাঁপছি, দেখছিস

লাল রঙে, অ্যামি, অ্যামি ওয়াইন হাউস, মুখপুড়ি

হ্যাশের ঝাপসা নদী কোকেনে দোলানো কোমর, চোখ

থ্যাবড়া কাজলে ঘোলা ঠিক যেন বাবার রিটাচ করা

খুকিদের নকল গোলাপি ঠোঁট বয়ামে ভাসাচ্ছে হাসি

সাদা কালো, হ্যাঁ, সাদা কালো, ব্যাক টু ব্ল্যাক গাইছিস

বিবিসির ভিড়েল মাচানে কিংবা রকবাজ ঘেমো হুললোড়ে

আরো সব কে কী যেন ভুলে যাচ্ছি ভুলে যাচ্ছি ভুলে…

ওহ হ্যাঁ, মনে পড়ল, ক্রিস্টেন পাফ…জনি ম্যাককুলোস…

রাজকমল চৌধুরী…ফালগুনী রায়…অ্যন্ড্রু উড…

সেক্স পিস্টলের সিড ভিশাস…দার্বি গ্রেস…অ্যান্টন মেইডেন…

সমীর বসু…শামশের আনোয়ার…কে সি কালভার…

হেরোইন ওভারডোজ, ছ্যাঃ, ওভারডোজ কাকে বলে অ্যামি

ওয়াইন হাউস, বল তুই, কী ভাবে জানবে কেউ

নিজেকে পাবার জন্যে, নিজের সঙ্গে নিজে প্রেমে পড়বার জন্যে…

য়ুকিকো ওকাকার গাইতে গাইতে ছাদ থেকে শীতেল হাওয়ায়

ৱদু হাত মেলে ঝাঁপ দেয়া, কিংবা বেহালা হাতে সিলিঙের হুক থেকে

ঝুলে পড়া আয়ান কার্টিস, কত নাম কত স্মৃতি কিন্তু কারোর

মুখ মনে করা বেশ মুশকিল, তোর মুখও ভুলে যাব

দিনকতক পর, ভুলে গেছি প্রথম প্রেমিকার কচি নাভির সুগন্ধ,

শেষ নারীটির চিঠি, আত্মহত্যার হুমকি-ঠাসা, হ্যাঁ, রিয়্যালি,

নরম-গরম লাশ, হাঃ, স্বর্গ নরক নয়, ঘাসেতে মিনিট পনেরো

যিশুর হোলি গ্রেইল তুলে ধরে থ্রি চিয়ার্স বন্ধুরা-শত্রুরা,

ডারলিং, দেখা হবে অন্ধকার ক্ষণে, উদাসীন খোলা মাই,

দু ঠ্যাং ছড়িয়ে, একোন অজানা মাংস ! অজানারা ছাড়া

আর কিছু জানবার জানাবার বাকি নেই, অ্যামি, সি ইউ…

সি ইউ…সি ইউ…সি ইউ…মিস ইউ অল…

সবুজ দেবকন্যা

ওঃ তুই-ই তাহলে সেই সুন্দরী দেবকন্যা

তুলুজ লত্রেক র‌্যাঁবো ভেরলেন বদল্যার

ভ্যান গঘ মদিগলিয়ানি আরো কে কে

পড়েছি কৈশোরে, কোমর আঁকড়ে তোর

চলে যেত আলো নেশা আলো আরো মিঠে

ঝলমলে বিভ্রমের মাংস মেজাজি রঙে

বড় বেশি সাজুগুজু-করা মেয়েদের নাচে

স্পন্দনের ছাঁদ ভেঙে আলতো তুলে নিত

মোচড়ানো সংবেদন কাগজে ক্যানভাসে

অ্যামস্টারডম শহরের ভিড়ে-ঠাসা খালপাড়ে

হাঁ করে দেখছি সারা বিশ্ব থেকে এনে তোলা

বিশাল শোকেসে বসে বিলোচ্ছেন হাসি-মুখ

প্রায় ল্যাংটো ফরসা বাদামি কালো যুবতীরা

অন্ধকার ঘরে জ্বলছে ফিকে লাল হ্যালো

এক কিস্তি কুড়ি মিনিট মিশনারি ফুর্তির ঢঙে

পকেটে রেস্ত গুনে পুরোনো বিতর্কে ফিরি

কনটেন্ট নাকি ফর্ম কোনটা বেশি সুখদায়ী

তাছাড়া কী ভাবে আলাদা এই আবসাঁথ ?

যুবতী উত্তর দ্যান, শুয়েই দ্যাখো না নিজে

এই একমাত্র মদ যা বীর্যকে সবুজ করে তোলে।

ম্যালেরিয়া

দেখলি তো অবন্তিকা মশা বধুরাও তোর

প্রেমিকগুলোর রক্ত চেনে! মেঝেয় ছড়ানো তোর

গুঁড়ো গুঁড়ো মুখচ্ছবি উড়িয়ে পড়েছে সটকে

তোর যত পার্টটাইম সুবেশ ডিউড দল ।

জ্বরদেহ চাইছে রে জড়িয়ে ধরুক তোর

গা-ময় ছড়ানো শীত নিভিয়ে ফেলুক কেউ

তাপের স্হানিক নিম শুকনো ঠোঁটের শ্লেষে

যা তুই চিরটাকাল আমারই জন্য শুধু

রাখলি ঘুমের ভানে–এরম ব্যবস্হা ভালো

অন্তত তাহলে শুধু আমার কাছেই পাবি

জ্বরের বিকল্প রোগ।

শরীর সার্বভৌম

জরায়ুটা বাদ দিয়ে অমন আনন্দ কেন অবন্তিকা

তাও এই গোরস্হানে দাঁড়িয়ে গাইছিস তুই

মৃত যত প্রেমিকের গালমন্দে ঠাসা ডাকনাম

যারা কৈশোরে তোর বিছানার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে

ভুতুড়ে কায়দায় ঝুঁকে প্রেম নিবেদন করেছিল ?

তারপর তারা সব একেএকে লাৎ খেয়ে বিদেয় হয়েছে

অন্য যুবতী ফাঁসতে যাদের জরায়ুপথ বীজ শুঁকলেই

কয়েক হপ্তায় ফুলে ওঠে। সেসব মহিলা কিন্তু আনন্দই পেতো

এই মনে করে যে দেহটা তো সার্বভৌম ; মন বা মনন নয়,

মন না চাইলেও দেহে খেলে যায় ওগরানো তরল বিদ্যুত

যা কি না ভালো খারাপের ঊর্ধ্বে। ঠিকই বলেছিস তুইও

শরীরই সার্বভৌম…

উৎসব

তুই কি শ্মশানে গিয়েছিস কখনও অবন্তিকা ? কী বলব তোকে !

ওহ সে কী উৎসব কী আনন্দ, না দেখলে বুঝতে পারবি না–

পাঁজিতে পাবি না খুঁজে এমনই উৎসব এটা । কফিতে চুমুক দিই।

আগুনকে ঘিরে জিন্স-ধুতি-প্যান্ট-গেঞ্জি মেতে আছে ননস্টপ

মিচকে আগুন তেড়ে নাচছে আনন্দ খেয়ে, ধোঁয়ার বাজনা

শুনে কাঁদো-চোখে যারা সব অংশ নিতে এসেছে তারাও মজা

শেষে শেয়ার বাজারে কী উঠল কী নামল আবার ট্যাকসি

ধরে ছোটো নিরামিষ কেনাকাটা পুরুতের দেয়া লিস্টি মেনে–

চলিস শ্মশানে কাঁধে চিপেস্ট পালঙ্কে শুয়ে লিপ্সটিক মেখে…

নিয়ে যাব একদিন সবাই প্রেমিক মিলে কাঁধের ওপরে ডারলিং…

তোর সুগন্ধ, মুখপুড়ি

ঠিকই বলেছিলি, মুখপুড়ি, থাকুন না সঙ্গে সবসময়, কোঁকড়া দুর্গন্ধ হয়ে

দেহের নৌকো জুড়ে, আগাপাশতলা, নোনা বাঁকে মাছেদের অপলকা ঝাঁকে

কোথাও অ্যাড্রেনালিনে নীল তাঁতে বোনা গোড়ালি-গন্ধকে মাখা ভিজে-নাচ

চামড়ায় মরে-যাওয়া জং-ধরা হাঙরের মিষ্টি হাঁ-মুখ ভরা খিলখিল আলো

খুঁজুন না যা চাইছেন, ভিনিগারি ঘামের রোদ্দুর, গ্রন্হিল জ্বরের নিঃশ্বাস

ছানাকাটা দুধেল উত্তাল, তাও হরমোনের তরল বারুদে তিতকুটে

বলেছিলি তুই, প্রেম ? ছ্যাঃ, সুগন্ধ তো বানানো নকল তার সাথে, ডারলিং

মাংসের মেদের মজ্জার আত্মীয়তা নেই। পেতে হলে শুধুই দুর্গন্ধ নিতে হবে

যা তোর একান্ত আপন, বলেছিলি। চারিপাশে বাতাসের নিভাঁজ জারকে

তোর ওই ঘোষণা উড়ছে: সি ইউ… সি ইউ… সি ইউ… সি ইউ…

ফেলে গিয়েছিস তোর লনজারি টপ জিন্স বক্ষবন্ধনী হাইহিল। কই তোর

দুর্গন্ধ কোথাও তো নেই মুখপুড়ি ; ফেলে-যাওয়া কিছুতেই নেই। সবই

ভিনিভিনি খুশবু মাখানো। যতক্ষণ ছিলি, তোর গা থেকেও ওই একই

পারফিউম উড়েছে, বানানো নকল, তোরই মতন মুখপুড়ি, কথার

ফেনানো জালে টোপ বেঁধে যা তুই ফেলেই চলেছিস প্রতিরাত প্রতিদিন।

তাহলে ফালতু তোর সি ইউ…সি ইউ.. ডাক হাতছানি উদোম ইশারা।

শুদ্ধ চেতনার রহস্য

ঠিক আছে, লাফাও

অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম কাচের জানালা খুলে কুড়ি তলা থেকে

বাতাসে ঝাঁপাও তুমি টাঙাইল আঁচল উড়িয়ে

শূন্যে ভাসবে কালো ঢাল এলোকেশ

দু পায়ে আচেনা নাচে পৃথিবীর রঙিন মাটিতে

নেমে এসো তুমি

তখন খামচে দেখো হাওয়ার শরীর কীরকম

খেলবে তোমাকে নিয়ে ওলোট-পালোট

আমার পায়ের কাছে পড়ে তুমি ছত্রখান হও

খণ্ড-বিখণ্ড হাড় থ্যাঁতা মাংস নাড়িভুঁড়ি সব একাকার

ঠোঁট যোনি উরু নাভি পাছা স্তন আলাদা অস্তিত্ব নিয়ে

সৌন্দর্য বিমূর্ত ক্বাথে মাছির খোরাক হবে তুমি

সব জড়ো করে তবু তুমি নও

তুমি সে-সময়ে রৌদ্রে ভাসমান

বুঝেছিলে মিথ্যে এই প্ররম্ভিক অধঃপতন ।

শিল্পোন্নয়ন

এ কী তুমি এইখানে পাগলাগারদে

পায়েতে শেকলবাঁধা নেয়ারের খাটে

উদোম উলঙ্গ শুয়ে আছো চুলে জট

নোংরা নক বেড়ে গেছে দুচোখে ঢুলুনি

সারাঘর বমি মুত পায়খানা ভরা

ভাতমাখা এনামেল থালা এককোণে

শরীর ধোওনি জলে নেমে কতদিন

চেনাই যায় না এককালে পাঁচতারা

হোটেলে নেচেছ নাভি নিতম্ব কাঁপিয়ে

আরেকবার সুস্হ হও শুভ্রা রায়

নাচব সকলে তুর্কি গাঁজা-ভাঙ টেনে

হাড়িয়া মহুল খেয়ে ফিরিঙি আদলে

উঠে এসো সুর্মা চোখে লুপুঙগুটুতে

বেবাক দুনিয়া যায় জাহান্নমে যাক ।

বিজ্ঞানসন্মত কীর্তি

ফ্যান টাঙাবার ওই খালি হুক থেকে

কন্ঠে নাইলন দড়ি বেঁধে ঝুলে পড়ো

কপাট ভেজিয়ে দরোজার চুপিসাড়ে

উঁচুতানে রেডিও চালিয়ে তাড়াতাড়ি

শাড়ি শায়া জামে খুলে টুলের ওপরে

দাঁড়িয়ে গলায় ফাঁস-রশি পরে নিও

সারারাত অন্ধকারে একা ঝুলে থেকো

চোখ ঠিকরিয়ে জিভ বাইরে বেরোনো

দুপাশে বেহঁশ দুই হাত আর স্তন

জমাট ষোড়শি শূন্য পায়ের তলায়

পৃথিবীর ধরাছোঁয়া ছাড়িয়ে যেখানে

বহু পুরুষের ঠোঁটে আদর খেয়েছ

সে-শরীর ছুঁতে ভয় পাবে তারা আজ

দোলো লাশ নামাবার জন্য আছি আমি ।

সুফিয়ানা

এ কেমন ক্রিমতোলা বাংলায় কথা কোস তুই

যে ভেলকিবাজ রোদের ভয়ে ঝরে পড়া শিউলিফুলগুলো

পাখিদের রোমান্টিক গানকে নার্ভাস করে তোলে

যেন হাঁ-মুখে নার্সের থার্মোমিটার

দোলের দিন ডেকে-ডেকে হাঁপানি ধরে গেল কোকিলটার

আসলে তোর কেন মতামতহীন হবার আধিকার নেই

একটা হ্যাঁ-এর সঙ্গে একটা না মিশিয়ে তখনই জানা যায়

যখন প্রেমের ক্লাইম্যাক্সে মাটির সঙ্গে আমি যোগাযোগ হারাই

শাঁতার কাটবার মতন তোর গভীর টলটলে সংলাপে

যে-দিন জিরে-জিরে করে কুচোনো বিদ্যুতের সবুজ জোনাকি

ঘোড়াহিন রেসের মাঠে তোকে ঘিরে বেশরম হ্রেষা হয়ে উড়বে

ইরানি হরফে তোকে প্রেমপত্র লিখে রাখবে বটগাছের শেকড় ।

দালাল

এ কী কুলনারী তুমি জাহাজঘাটায় দেহ বেচতে এসেছো

লুঙি-পরা পানখোর দালাল রাখোনি

সাদাপোষাকের কবি শরীর ঝাঁঝরা করে দেবে

শাঁখা-নোয়া খুলে তারা দুহাত হিঁচড়ে টেনে তুলবে লরিতে

লকাপে ল্যাংটো মাঝরাত…..সে-সময়ে গেয়ো তুমি রবীন্দ্রসংগীত

ছিহ কুলখুকি তুমি সবায়ের আদর কুড়োও

যারতার সাথে গিয়ে যেখানে-সেখানে শুয়ে পড়ো

চারিদিকে কটাচোখ ধ্রুপদী জোচ্চোর সব নজর রাখছে মনে রেখো

আমি তো স্ট্রেচারবাহী কিছুই করতে পারব না

হয়তো টিফিনবাক্সে এনে দেব রুটি আর আলুজিরে ভাজা

গান শোনাবার মাঝে ঝুঁকে-ঝুঁকে পয়সা কুড়োবো

ভোর হলে গঙ্গার পাড়ে তুমি দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বমি কোরো

হাসপাতালেতে পাবে বেডপ্যান গ্লুকোজ বোতলে জল

তালচিটে বিছানায় পাশে শোয়া ঘুমন্ত কুকুর ।

বজ্রমূর্খের তর্ক

আজকে শুক্কুরবার । মইনে পেয়েচি । বোধায় শরতকালের পুন্নিমে ।

পাতলা মেঘের মধ্যে জোসনা খেলচে । মাঝরাত । রাস্তাঘাট ফাঁকা ।

সামান্য টেনিচি তাড়ি । গাইচি গুনগুন করে অতুলপ্রসাদ ।

কোথাও কিচ্ছু নেই হঠাত নেড়ি-কুকুরের দল

ঘেউ ঘেউ করে ওঠে । তাড়া করে । বেঘোরে দৌড়ুতে থাকি ।

বুঝতে পারিনি আগে । রাজপথে এসে হুঁশ হয় ।

মাইনেটা পড়েচে কোথাও হাত থেকে । কী করে ফিরব বাড়ি ?

কেধ তো বিশ্বাস করবে না । ভাববে খেলেচে রেস,

গিয়েচে মাগির বাসা, বন্ধুদের সাথে নিয়ে বেলেল্লা করেচে ।

বন্ধুবান্ধব কেউ নেই । রেসও খেলি না কতকাল ।

অন্য স্ত্রীলোকের খোলা-বুকে হাত শেষ কবে দিয়েচি যে

ভুলে গেচি । জানি না বিশ্বাস করে না কেউ কেন ।

আমার তো মনে হতে থাকে, যা করিনি সেটাই করিচি বুঝি ।

যা কইনি, সেকথা বলিচি । তাহলে এ পুন্নিমের মানে ?

কেন এই মাইনে পাওয়া? কেন গান ? কেন তাড়ি ?

.

আবার ঢুকতে হবে রামনোংরা গলির ভেতরে । নির্ঘাত কুকুরগুলো

গন্ধ শঁকে টের পাবে । ছেঁকে ধরবে চারিদিক থেকে ।

যা হবার হয়ে যাক । আজ শালা এস্পার কিংবা ওস্পার ।

প্রিয়তমার নিলাম

বিশল্যকরণী বলে কিছু নই শেষ ওব্দি লক্ষ্মণের লাশ

রাবণের মর্গে পড়ে ভেটকে উঠেছিল

ভিড়ের দড়ির টানে

খর্ব অপুষ্ট জরাক্লিষ্ট মুখে কাঠের জগড়োনাথো ফিরেছে স্বস্হানে

ওরকম মুখ বুজে থাকব বলে আসিনি এখানে আমি

গন্ধমাদন কাউকে ল্যাজ তুলে আনতে হবে না

কেননা ভূমিষ্ঠ হয়েই মাটি কামড়ে ধরেছি কষদাঁতে

শীতকালে কেন ফিকে ন্যাপথালিনের গন্ধ মানুষীর নিশ্চুপ স্তনে

যে-মুখে রেখেছি হুল লেহনে বোটকা স্মৃতি বৃক্কে নেমে যাবে

ফেরারির অগ্নিচোখ অর্জন করেছি শ্রমে

বল্লম ধরার আগে আঙুলের খাঁজ হেজেছিল

বাতাসে বাবরি উড়বে চ্যাঁচাব দুখাঁধ তুলে

বুকের ওপরে দুই হাতা ঘুষি আছড়ে বলব বারবার

অগ্নি সংযোগ করো শান্তিভঙ্গ হোক ছারখার করো

ক্রন্দনরত কারা গুঁড়ি মেরে এলোচুলে ঘোর অন্ধকারে

শানাচ্ছে কুখরির ডগা উল্কাপাথরে ঘষে একটানা সুরে

টিকটিকিদের ল্যাজ আছড়াবার ক্ষীণ শব্দ

ঝড়ের ধুলোয় নাকে জ্বালা ধরে

মুখেতে রুমাল বেঁধে নিঃশব্দে ঘোড়া থেকে নামি

যে-রকম কথাছিল আবার এসেছি আমি নিলামের দাক দিতে

এইবার সবচে বেশি দাম ধরে দেব

মাত্র দু-পাঁচশো নয় কিংবা মাসখানেকের জন্যে ঘানির মজুরি

তুমি ধ্বংসধ্বনি খুকি

ভবিষ্যৎ থকথকে হারামরক্তে ডুবে আছে ।

বাকদানো

তোদের তো বলিছিলুম বাবা কিন্তু তোরা গা কল্লিনে

তবলা-বাজিয়ের কানে আওয়াজের আগেই য-ভাবে বোল ফোটে

অ্যাগবারে তেমনিই যে-দিকে মাথা করে শুই সে-দিকেই কেন সুয্যি ওঠে জানি না

.

আমাদের যুধিষ্ঠির, সেই যে, পাশাখেলার গ্র্যাণ্ডমাস্টার

বেতলা ফরেস্টে দ্রোণাচার্যের সেমিনারে অর্জুনকে ধাতানি দিয়েছিল

‘পা নাচিয়ে কক্ষুনো নাচবিনে, সব্বোদা বাতাস নাড়িয়ে নাচবি’

.

তোদের ওদিকটায় তো সভ্যতা মানেই শহর, কী, ঠিক বলিচি না?

জ্বরের ঘোরে-বলা প্রলাপ খানিক পরেই দেখবি আলোচনা হয়ে গেচে—

কাব্যি করে বলতে হয়, ‘ওগো এ যে গোঁজবঙ্গের পালতোলা শামুক ভাসিয়েচো’

.

যখুন দুঃখকষ্ট চেপে যেতে শেখার বয়েসে পৌঁছোলুম, অ্যাঁ

ঘুমন্ত অবস্হায় যে-পাখিটা বিপদে পড়েচে তার মাঝরাতের ডাকে

দেহের বিতর্কিত জায়গায় হাত দিয়ে ফেলার ভয়ে আমি তো থরহরি

.

বিড়ির শেস-ফুঁকের আয়েস টেনে মেয়েটি যখুন পোনয় নিবেদন কল্লে

একাধটা অঙ্গকে বিশ্বেস করা মুশকিল হয়ে পড়েছিল রে

তা, সবাই তো আর সবায়ের ব্যথার গন্ধ টের পায় না

.

এ-বাড়ির ঘড়িগুলোকে দ্যাখ, বড্ড কামচোর, সবুর করতে পারে না;

কী করি ? আমি তো পাহাড় থেকে ঝাঁপ-দেয়া ঝর্ণার ফূর্তি দুমুঠোয় পুরে

মৌমাছিদের রানিকে নিয়ে বরযাত্রীদের সঙ্গে ওইবঙ্গে কেটে পড়লুম…

পরবর্তী সর্বনাশ

পাহাড়ের বাঁকে ট্রেন দেখা গেছে যাও

এইবালা ঘুমে অচেতন গৃহস্হালি

ফেলে ছোটো মাথা পেতে দিতে রেলপথে

এরপর রাতে আর কোনো ট্রেন নেই

পিষে কেটে ছটুকরো হয়ে যাও তুমি

শাঁখা পলা গুঁড়ো হয়ে মিশুক মাটিতে

তলপেটে রাখা ভ্রুণ নিসর্গে ফিরুক

ত্রেনের পয়ার ছন্দে নিজেকে ভুলিয়ে

তোলপাড় করে দাও সুখের সংসার

ভয় দুঃখ শোক গ্লানি দিয়ে বন্ধ করো

অমল আনন্দ শেষ হোক ভাঙা ঘুমে

দুহাত বাড়িয়ে সারারাত রেলপথ

শিশির উপেক্ষা করে তোমার শরীর

পাবে বলে ঠায় জেগে আছে সন্ধে থেকে

স্হানিকতা

যে-মানুষীর হনুমানের ঢঙে চার হাতে জড়িয়ে ধরার তল্পিতল্পা ছিল

তার সঙ্গেই তো ধুপকাঠি-গেঁথা পাকা-কলার কুচকুচে পিঁপড়ে পাড়ায়

অন্ধকার দিয়ে নিজের বদ-দূরত্বটুকু বেঁধে রাখতে চাইছিলুম

.

ওকে পেয়েছিলুম ছোটবেলার চান-করার হল্লায় তৈরি বিয়েবাসরে

মেঘ থেকে বৃষ্টিফোঁটা খুঁটেখুঁটে ঘাম জমিয়ে তুলত মুখময়

.

গৌড়ের সেসব ভুলভাঙা রাজপথ তো এখন অচেনা খেতসবুজ গ্রাম

মিটকি মেরে পড়ে আছে আলোর ঝলকানিতে টোলখাওয়া বিদ্যুতে

কেননা ইতিহাসে ঢুকতে গিয়ে চৌকাঠে ঘা খেয়ে ওর মাথা ফেটে গেছে

.

হয়তো একদিন তিলোত্তমাদের ফেলে দেয়া তিলগুলো জড়ো করে ফেলবে

আর চিতার ওপর হাসতে-হাসতে উঠে বসবে আগুনের মুখোশপরা গৌড়

উৎপাদন পদ্ধতি

বিদ্যুতের তার ঝড়ে ছিঁড়ে ঝুলে আছে

এতো কী ভাবছো বাজে সারাদিন ধরে

যাও ছুঁয়ে দাও গিয়ে মাথা ঠিক রেখে

মুঠোর ভেতরে নাও তীব্র জ্যোতিরেখা

একটা ঝলকে স্নেহ রক্তে ঢুকে যাবে

দেখে নাও মাটিতে পা থাকা কত ভুল

মাটি ও তোমার মাঝে দরকার ছিল

হাকুচ আড়াল কোনো হিজড়ে তৈজস

কীরকম জ্বলে ওঠো দেখতে চেয়েছি

শাদা ত্বক এক লহমায় পুড়ে কালো

চোখ থেকে চাউনি উধাও জানুদেশ

থিরথির কেঁপে ছিটকে ঘাসের মধ্যে

পড়ে তুমি বারকয় নড়েচড়ে স্হির

শেষবার তারপর ঝুঁকে চুমু খাবো ।

ধনতন্ত্রের ক্রমবিকাশ

শেষরাতে পাশ থেকে কখন উঠেছ

চুপচাপ আলমারি ভেঙে কী অ্যাসিড

ঢকঢক করে গিলে মরছ এখন

আলজিভ খসে গেছে দুগালে কোটর

মাড়িদাঁত দেখা যায় কষেতে বইছে

গাঢ় ফেনা হাঁটুতে ধরেছে খিঁচ ব্যথা

চুল আলুথালু বেনারসি শাড়ি শায়া

রক্তে জবজবে মুঠোতে কাজললতা

শোলার মুকুট রক্ত-মাখা একপাশে

কী করে করেছ সহ্য জানতে পারিনি

শুনতে পাইনি কোনো চাপা চীৎকার

তবে কেন সায় দিয়েছিলে ঘাড় নেড়ে

আমি চাই যেকরেই হোক বেঁচে ওঠো

সমগ্র জীবন থাকো কথাহীন হয়ে

ডোমনি

ডোমনি, তুইই দয়াল, খয়েরি চাউমিন তাপের খোলসে

জিভ দিয়ে পড়ে থাকি, টাকরা মন্দাক্রান্তা ছন্দে কাঁপে

ডোমনি, তুইই দয়াল, চরণ বিভক্ত তোর মধ্যযতি দিয়ে

ঠোঁট চেপে পড়ে থাকি, বানভাসি ঢেউ খেলায় নদী ঢুকে আসে

ডোমনি, তুইই দয়াল, টানপ্রধান অনুষ্টুপ তোর তরল পয়ারে

মুখ দিয়ে পড়ে থাকি শ্বাসযতি শ্বাসাঘাতে ছন্দখেয়ে টলি

ডোমনি, তুইই দয়াল, বুকের স্তবকে রসের স্পর্ধা এনে দিস

নাক দিয়ে পড়ে থাকি হরিণেরা কস্তুরি নাচে চৌপদীলঘু

ডোমনি, তুইই দয়াল, স্বর্ণলতা কোঁকড়া চুলের আয়েসে

কান দিয়ে পড়ে থাকি, বাণের বাকসম্ভোগী ডাক শুনি

ডোমনি, তুইই দয়াল, আদি আলুথালু ক্রৌঞ্চী তোটক তৃণক

গাল রেখে পড়ে থাকি, ত্রিগুণবারি বাকসম্ভোগে ঝরে কামচণ্ডালী

ডোমনি, তুইই দয়াল, চাপল্যছাক্কস দ্রুতছন্দের আদিস্বরে

গোঁফ দিয়ে সুড়সুড়ি দিই তোর কালিকাগহ্বরে, ধামালি দিগক্ষরা ওরে

ডোমনি, তুইই দয়াল, আমি খালিপিলি আকখা বিরামচিহ্ণে থামি

মাথা গুঁজে পড়ে থাকি, অভেদ খুলে যায়, বেরোয় সিঙ্গলমল্ট মধু

ডোমনি, তুইই দয়াল, স্হিতিস্হাপক লঘুদ্রূতি স্বরধ্বনি ওঠে

হাত রেখে পড়ে থাকি, গোলাপরঙ ধরে, তোর মোহন আবসাঁথ উঁকি দেয়

ডোমনি, তুইই দয়াল, অঙ্গটায় সুখ নেই, অঙ্গের চৈতন্যে পুরো সুখ

বুক রেখে পড়ে থাকি, রঙমহলে ঢুকি, রিপুকে দমন করে নদীর রক্তমুখ

ডোমনি, তুইই দয়াল, মন বলতে যা বোঝায় তা ওই দেহযজ্ঞখেলা

উরু তুলে পড়ে থাকি, দেহমাতাল হই, মানবিক দেহযজ্ঞে ফারাক করিনে

ডোমনি, তুইই দয়াল, শরীরে রসের ভিয়েন, কামেই কাম নিবারণ

সারাদিন স্বভাবঘোরে ঠেকায় সুরবাঁধা, গাধার পরজন্ম হয়, আমার তো নেই

ডোমনি, তুইই দয়াল, দেহরস উর্ধগামী করাই সাধনা, অন্ত্যমিলে কোনো মিল নেই

স্হানের অর্চক আমি, ডুবতে চেষ্টা করি, মাংস ছেড়ে প্রেমের স্বদেশ নেই কোনো

ডোমনি, তুইই দয়াল, ফাটলের গান না বেরোলে বহু কষ্টে রাতদিন কাটে

যতো ঝড় সব খামোশ তোর ও-তল্লাটে, চাতক প্রায় অহর্নিশি, চরণদাস আমি

ডোমনি, তুইই দয়াল, লোকলজ্জার ভয় কাটিয়ে দিয়েছিলি সেই ষাটের দশকে

তেকোনা মানবঘর আজব কারখানা, বন্ধুরা শত্রু হল শাঁখ-গেঁড়ি-শামুকের চেলা

ডোমনি, তুইই দয়াল, মলয়দাস ভণে, শুনো গাণ্ডুগণ, কয়লাঅঙ্গ কালোলাল

চাপান-ওতোর চলে, বিরল তিমিরজালে, মশকগৃহিণী বসে শত্রুদের নিতম্বপরে

ডোমনি, তুইই দয়াল, কৌশলে সাড়া দিস, বীজরস শুষে নিস, যেন চোরাবালি

অনল-হিল্লোল-ধারা, মাথাথুয়ে বর্ত্মফাঁকে, বিচিত্র আলোকোদয়ে চাটি রসমধু

ডোমনি, তুইই দয়াল, অলক্ষ্মী অলকায় যাক, অলক্ষ্মী অমরায় যায় যাক

মাংসের ছটায় মজে, কালো পদ্মফুলে সেজে, চটচটে মাত্রাবৃত্তে অন্ধকার হবি

ডোমনি, তুইই দয়াল, ঢুলু-ঢুলু দুই চোখে, ছটফটাস বেওকুফ মাস্তানের ঢঙে

হাঁফাস আর বলে উঠিস, করুক্ষেত্র কোথাকার, ভেতরে ফেলিস না কেন

ডোমনি, তুইই দয়াল, আমি তো বাউলক্ষ্যাপা, ওরে এটাই আসল শিক্ষে

মলয়হাংরি বলেছেন জোয়ার ভাটায় চলে ফেরে সাগর কিন্তু শুকায় না রে

ডোমনি, তুইই দয়াল, কী করিতে কিবা করি, বীর্যে বোঝাই তরি

ছিলুম কোথা এলুম হেথা যাবো কোথায় কার সনে প্রেমের উর্ধলোকে

ডোমনি, তুইই দয়াল, মনের মানুষ বলে কিছু নেই, সবই দেহের মানুষী

আদিশক্তি পরম যুবতী আমার দেহ চালাস তুই মানুষ আড়তরসিক

ডোমনি, তুইই দয়াল, সাধনসঙ্গিনী, বিরল তিমিরজালে ফাঁসালি আমাকে

বাবা বলে কেন ডাকিস, আমার আলজিভ নেই, গানের কন্ঠস্বর নেই

ডোমনি, তুইই দয়াল, তুই কালচেদেহ, ডাগর দু’চোখ, চেরিফল বুক

মা বলে ডাকতে পারি না তোকে, মনে হয় ইনসেসচুয়াস এই বাউলসম্পর্ক

ডোমনি, তুইই দয়াল, আলোজ্বলা এ-সম্পর্ক, ক্ষ্যাপাহাংরি সহ্য করে বেমালুম

মাবুদ মজুদ তুই এই শরীরে থাকিস, তোকেই ভজনা করি আমার কবিতায়

ডোমনি, তুইই দয়াল, মলয়দাস বলে মিছে গণ্ডোগোল ভবে এসে শুনতে পাই

এই যে বীজ বা বীর্য, এর কী আলাদা কিছু আছে ? চাঁদ সবায়ের এক, চাঁদের আলোও

ডোমনি, তুইই দয়াল, মানুষের বীজে হয় না ঘোড়া, ঘোড়ার বীজে হয়না প্রজাপতি

হিন্দু শিয়া-সুন্নি মুসলমান খ্রিস্টান বৌদ্ধ জৈন শিখ আহমেদিয়া ইহুদি অনাস্তিক

ডোমনি, তুইই দয়াল, খাজাবাবা খাজাবাবা মারহাবা মারহাবা, মস্ত কলন্দর ওরে

ইশকের গাঁজা ফুঁকলে হয় রুহ তরতাজা যেন নৌকা চরস টেনে চলেছে মাতাল

ডোমনি, তুইই দয়াল, সুকুমার চৌধুরীকে বল দেখি আশেক হলে মাশুক মিলবে ওর

পড়ে থাকুক জিভ ঠোঁট মুখ গাল বুক ঠ্যাঙ হাত দিয়ে মন্দাক্রান্তা আমিষাশি বীর্যকবিতায়…

মরে গেলি , অরুণেশ ?

মরে গেলি ? সত্যিই মরে গেলি নাকি অরুণেশ ? 

রূপসী বাংলার খোঁজে আসঙ্গ উন্মুখ শীতে বেপাড়া-ওপাড়া ঘেঁটে

শেষমেশ জিলের সবুজ ঝাঁঝরিতে ডুব দিলি ! যবাক্ষারযানে কালো

বিষগানে আধভেজা উলুপীর সাপ-রক্ত মিঠেল শীৎকারে

হৃদযন্ত্রে দামামা বাজতেই বুক খামচে জলে নেমে গেলি

বাড়িতো পিছনে ছিল, সেদিকে গেলি না কেন ? ডাঙার গেঁজেল হায়নারা

যৌবনে ভালবাসা পেয়েছিল তোর, যখন অতৃপ্ত ছিলি ? কী খাচ্ছিল

কে খাচ্ছিল নৌকোর পালে আঁকা তোর রাগি নমস্কার ? দেখেছিলি

মোমে-জোড়া ডানা গলে ইকারাস সমুদ্রের আঁশটে ঘূর্ণীতে নেমে গেছে

নিরিবিলি ওফেলিয়া পিরানহা মাছেদের বন্দনা মেশানো ঝাঁকে

ড্রাগন উৎসবের ডিঙি থেকে ঝাঁপ দিলেন সৌম্য কুউয়ান

ফেনার ওপরে লেখা কীটসের নশ্বর অক্ষরমাংস ঠোকরায় চিল

হয়তো কাঁকড়ারা বুজকুড়ি কেটে-কেটে লি পোর কবিতা পোড়ে

শোনাচ্ছে নাটালি উডের লাশে ভাসমান কাক গৃহিনীকে

হার্ট ক্রেনও আছে নাকি তোর পাশে শুয়ে কিংবা ঠোঁটে

চুমু কি দিচ্ছেন ওর নগ্ন আলিঙ্গনে টেনে ভার্জিনিয়া উলফ ?

বউ ফেলে ষোড়শী মেরিকে নিয়ে কাটলেন পিসি বিসি শেলি

দেখলি ডন হুয়ান নয় ; তিন দশকে ফ্র্যাংকেনস্টাইন খুড়ো

জলে-পচা রাসপুতিন ছিঁড়ে খেলো তোর প্রিয় রূপসী বাংলাকে

স্বপ্নের নীল নদে, টাইবার নদীতে, রাইনে, লিমমাতে, তিস্তায়

অ্যামস্টারডামের খাল যার দুই ধারে রোজ বেশ্যা প্রেমিকারা

রক্তাক্ত আলোয় বসে উলঙ্গ গোলাপি খুলে সন্ধ্যা ফেঁদেছেন

পরমহংসের শোক শিখেছিলি রেঁবোর আবসাঁথ পান করে

অথচ ঠান্ডা রক্তে জড়িয়ে ধরল জল ভালবেসে তোকে

উকুন ও ছারপোকার কামড়ের মাঝে তৃপ্ত ঘুম ছেড়ে হ্যাঁ রে

নেমে গেলি অমৃতমন্হনের ডাকে– কোন দিকে যাবি তুই

বুঝতে না পেরে অসুর ও দেবতার মাঝে পিষে গেলি, আজীবন

পিষে গেলি…পিষে গেলি…পিষে গেলি…পিষে গেলি…পিষে…

বিষবাউলের গান

মলয় মলয় মলয় মলয় মলয় মলয়

শুনতে শুনতে দেখতে দেখতে শুনতে শুনতে

এই নাম আর দেয়া যাবে না ছেলেকে নাতিকে

নামের ভেতর কোনো নরম নদীর নারী নেই

জোনাকি মালায় ওর হরিণীরা সঁপেনাকো গলা

শীতের হাওয়ায় নেই আমলোকি-পাতাদের নাচ

কী রেখেছে তাহলে ছাইপাঁশ ?

বানভাসি-ফেলে-যাওয়া ধানখেতে হাঁটু-ডোবা বালি…

আঁস্তাকুড়ে ফেলে-যাওয়া ভ্রুণ…

শুয়োরের পচা মাংস তেবাষ্টে হাঙরের নোনামাছ…

ফ্ল্যাট বিক্রি করে চলে যাচ্ছে এ-শহর ছেড়ে

৩৮৯৭ টি কবিতার বই বিলিয়ে দিতে চেয়েছিল

নেবার জন্য পাওয়া গেল না কাউকে

কবিতার বই রাখবে না কোনো গ্রন্হাগার

পাঠক নেই দেখভালে খরচ কে দেবে

জাতীয় গ্রন্হাগার কপিরাইট আইনে বই পায়

রাজ্য গ্রন্হাগার রাখে পার্টির লোকেদের বই

কারোর বাসায় অত জায়গা নেই তরুণ কবিদের

অতি ভালবাসা-মাখা কবিতার বই রাখবার তাক

মলাট বাদ দিয়ে কিলো দরে কিনতে রাজি

পোরোনো কাগজঅলা…প্রেম হাসি ক্রোধ সংবেদন

শতশত উপহার নেবার জন্য কোনো লোক নেই

পত্র-পত্রিকা জুড়ে হাজার হাজার সমালোচনার ঝাঁক

সবই ফালতু বুঝি ? মগজ ধোঁয়াটে হয়ে ওঠে

এত বই এত এত পত্রিকা কোথায় যাচ্ছে চলে ?

তিরিশের পর থেকে ? দুই বাংলা জুড়ে !

বাংলার টিচার ঠিক বাতলেছিলেন ক্লাসে:

টেকার জন্যে চাই কুখ্যাতি-দুর্নাম-বিষবাউলের গান

এ-সময় সে-সময় নয় : সে-সব বাউল আজ মৃত।

কাহার কুর্মি ডোম দুসাধের ছোটোলোক পাড়া

শৈশব কি গ্রন্হহীন ছিল ? কবির রহিম দাদু

তুকারাম থিরুভাল্লুভার রামচরিতের ছেঁড়া পাতা ?

এতটা আসার পর পিছন ফিরলে দ্যাখে

সেদিকে কিচ্ছু নেই, দিগন্তবিহীন পচা-ছেঁড়া-ছাতাপড়া

দশ-বিশ-হাজার টাকা নোটের দুর্গন্ধে টেকা দায়

কী হবে তাহলে ? সযত্নে আদরে রাখা কাব্যগ্রন্হগুলো ?

বাড়ি তো বিক্রি হবে চারদিন পর নতুন মালিক

বলেছেন: না না ওসব বই ফই গতি করুন

কারা পড়ে মশায় রবিঠাকুরই তো শুধু সাজেগোজে

তো আপনাদের এই বেআফিমি কারেস্তানি নেশা…

ওই তো মিউনিসিপালিটির জঞ্জালের ভ্যাট

কাগজকুড়ানিরা আসে দলবেঁধে সকালবেলায়

ক্যানিঙের ট্রেনে ভাড়া লাগে না কারোর

বাবা বারণ করতে পারতেন মা বারণ করতে পারতেন

শিক্ষক বলেছিলেন ওহে ঠাঁই নেই ছোটতরীর মানে

নরম নদীর নারী সোনাগাছি নিয়নে থাকুন

নদী থাক গলাটেপা বাঁধের বেড়ায় বাঁধা

হরিণ ঝুলতে থাক শিকারীর রঙিন দেয়ালে শিং তুলে

জোনাকিরা চলে যাক ফিনফিনে এনডোসালফিনে

আমলোকি গলে যাক রামদেব-আশ্রমের চিমচিমি-মোড়কে

শহরে আর আঁস্তাকুড়েরও জায়গা নেই

বলেনিকো কেউ ? কবির রহিম দাদু কৃত্তিবাস

কাশিরামদাস ময়মনসিংহী গান লেখকেরা ?

এত কবিতার বই এত কবিদের লেখা শ্বাস-প্রশ্বাস

ওরই নামের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে থাকবে আঁস্তাকুড়

কলেজ স্ট্রিটের পথে ডাস্টবিনে ফেলে-দেয়া ভ্রুণ

থাকবে ধাপার মাঠ শহরের জঞ্জালের বিরাট পাহাড়

নামের ভেতর মৃদু হাওয়া নয় নশ্বর অবিশ্রাম ঝড়…

৬৫টি হাইকু

অঙ্কের দোষ

সাধক কবিও লেখে

মাত্রা গুনে গুনে

ফেসবুক আছে

অরকুট টুইটার আছে

তবু থাকে একাকীত্ব

ভূমাধ্যাকর্ষণ

আলো ও ক্যালকুলাস—

নারীদেহ ছোঁননি নিউটন

 ৪

বসন্তে মৌমাছি

আফিমের ফুল থেকে

মাদক পেল না

শীতকাল–

কোথায় পোশাক রাখল

স্বপ্নের নগ্ন যুবতী

 ৬

সকলেই জানে টাকমাথা

কবিটি মিথ্যাচারী এবং অসৎ

তাই বলে ওনার গবেষকও

ব্যায়াম ব্রেকফাস্ট ভিড়

অফিস ভিড় বাড়ি টিভি সঙ্গম

মাসে লাখ টাকা

শুধু শোনো

বন্ধ রাখো মুখ

কমরেডগণ

ক্যাটরিনা কাইফ

জানেন সুন্দরী নিজে

চোখের নকল পাতা কেন

 ৯

কটা বেজেছে

জানতে চায় লোকটা

এক মুহূর্ত থেমে যায় পৃথিবী

১০

খরার খেতের মাঠ–

হাজার হাঁ-মুখ খুলে রূপসী বাংলা

নিঃশব্দে হাসছেন অট্টহাসি

১১

মলে ও মার্কেটে

দল বেঁধে ঘোরে যুবতীরা

স্বপ্নে শুধুই একজন

১২

মরা গাছ

নিজেকে নিয়েই সুখী

বৃষ্টি বাদলায়

১৩

সেলফোন–

রঙিন নানান গেমখেলা

বিদেশী নারীর কন্ঠ

১৪

এক দশক বন্দুকে

আঁকাআঁকি কবিতায় আরেকটি

ব্যবসার পাট কবে হবে

১৫

চরসের ধোঁয়া—

স্মৃতি থেকে অতীত ও বর্তমান

মুছে ফেলল কাশ্মিরী বালক

১৬

যে কবিরা

রাজনেতাদের সাথে ঘোরে

সংসারেও রাজনীতি করে

১৭

নগ্ন নারীদেহ

কতবার দেখেছে ফেরারি

ধারাবাহিক হত্যা করে তবু

১৮

শোপ্যাঁ…শোপ্যাঁ…

ডানা বাজাচ্ছে ঝিঁঝিঁ

শ্রাবণ সন্ধ্যায়

১৯

একা থাকে

কথা কইতে চায় না

খারাপ হবে কেন

২০

আওয়াজ…

বাজির আলো

জড়িয়ে ধরার সুযোগ

২১

পাকা বটফল টুপটাপ

মাটি থেকে তুলে নিলেন গৌতমবুদ্ধ

অসুস্থ কাঠবিড়ালি

২২

ওপারে তাজমহল

শাজাহান দেখছেন দূষণে নোংরা মার্বেলপাথর

কালো তাজমহল এলো

২৩

পাক খেয়ে উঠছে শাড়ি

নারী অঙ্গের বাঁকে নেচে উঠছে

মরা পলুপোকা

২৪

চিনিমুখে পিঁপড়েরা

আখগাছের গোড়ায় সুখের বাসা পিঁপড়ের

চাষির কাস্তে

২৫

ঘুণপোকার উন্নতি

ভালো বা খারাপ সময়টা যারই হোক যাই হোক

মহামহিম মহামহিম

২৬

লোডশেডিঙের গ্রীষ্ম

এমনকী দেশি পোষা কুকুররাও ডাকছে

ঝরঝরে তুষার

২৭

পুরুষ শাঁখ: কে বেশি সুন্দরী?

মাদি শাঁখ নাকি শাঁখা-রুলি পরা বউটি!

কলম হারিয়েছে

২৮

বালিতে জুতোর দাগ

বর্ষা এলে বাঁকবদল চায়নি নদী

শরতের খরা

২৯

পথে পায়রার ঝাঁক

থলে থেকে গম উপুড় করে গেছেন ব্যবসায়ী

ভিখারির কাশি

৩০

আমাদের শান্তি….নিকেতন

ফুল ও শাড়ির রঙে বসন্তের নাচ

ওপচানো ট্রেন

৩১

পাতালপুরীতে ফাল্গুন

দরজায় কড়া নাড়ছে মৌরলাঝাঁক

মেয়েটির ভাসমান লাশ

৩৩

যতটুকু ঝুঁকে দেখা

বাতাসে ছড়ানো আকাশ

ল্যাজের রক্তাভ আলো

৩৪

কোমরে হাত মেয়েটি

সম্রাট অশোক কাঁদছেন

কালো ঠান্ডা পাথর

৩৫

মেঠোপথে লাশ

লেবু পাতায় সবুজ টুপটাপ

স্যাঁতসেঁতে ঘাসফড়িং

৩৬

সুন্দরী পাতার রস

রক্তাক্ত হাত ছেলেটির

মৌয়ালিরা ফিরছে মধু নিয়ে

৩৭

শ্মশানে ধোঁয়ার কুন্ডলী

জলে চিংড়ি মাছের ঝাঁক

গৌতমবুদ্ধ হেঁটে গেলেন

৩৮

হাসছে বুড়ো লোকটির ভুঁড়ি

আমের গাছে লাল-হলুদ

কেউ একজন চুমু খেল

৩৯

শিমুলগাছে কোকিলের গান

আঁস্তাকুড়ে ভিড় বাড়ছে

কবিরদাস দোহা গাইতে-গাইতে গেলেন

৪০

বর্ষার প্রথম সকাল

বারান্দায় বাবার চটিজোড়া

ডাকপিওনের হাঁক

৪১

মুম্বাইয়ের তিরিশতলায়

নাকতলার গলি

কুকুরের পেছনে ছোঁড়ারা

৪২

ছাদে কাপড় মেলছে বউটি

দড়িতে ঘুড়ি আটক

দুপুরের গান

৪৩

দ্রুতিমেদুর শ্বেতাঙ্গিনীরা

অকেজো কমপিউটার

মেকানিকের মুঠোয় তিনগুণিতক

৪৪

আকাশে ২৩৮ প্রার্থনায়

পিছলে গেলেন ইষ্টদেবরা

পেট্রলগন্ধী দাউ-দাউ

৪৫

দিশি বন্দুকের ফটকা

আলকুশির রোঁয়া

উড়ছে। গোলা পায়রার ঝাঁক

৪৬

শিশির ভেজা ঘাসে

আজ সবুজ পায়ের দাগ

বৈরাগির দোতারায় সন্ধ্যা

৪৭

খুপরির অন্ধকার দিকটিতে

পিছন ফিরে পূর্ণিমা

ভিখারিণীর নোয়া

৪৮

জ্বলন্ত শহরের ছাইয়ে

গ্রিক সেনাপতি মিনান্ডার। পাটুলিপুত্রে

নাগার্জুন ধুলো মাখছেন

৪৯

কুয়াপুজোয় নাচছে হিজড়েরা

রাধেশ্যাম রাধেশ্যাম

কেঁদে উঠলো নতুন মানুষ

৫০

আঙিনায় থই-থই

ঝলমলে খিচুড়ির অমলতাস

প্রগাঢ় চোখমুখ

৫১

গোধুলি লগ্নের পানের বরজে

অশ্রুসজল রুমাল

বিসমিল্লা খান

৫২

জুজুধান ঝড়ে বনজ

মণিপদ্মে গোণ্ড-মুর্মু-ওঁরাও; উনি

অশথ্থ গাছের তলায় চোখ বুজলেন

৫৩

একটি মৃতদেহ

সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে আছে

পুরুষ মাকড়সা

৫৪

দুরুদুরু শ্মশান

সাজানো কাঠের ওপর চোখ বুজে

ছানাসহ কুকুর

৫৫

শ্রাবণের দ্বৈরথে ফ্ল্যাটবাড়ি

দেড়শো বছর লড়ে পড়ে গেল

পায়রারা পথে

৫৬

চোরেদের স্মৃতি

রবীন্দ্রনাথের চটি রয়েছে শোকেসে

মাপে বড্ডো বড়

৫৭

রক্তাক্ত কৃষক

ঝুঁকে আছে ধানের শীষ

অস্থির মাঠে

৫৮

মহাষ্টমী

গরদ-নোলক গৃহিনী

হাতে ব্ল্যাকবেরি

৫৯

রূপোলি টাকা

সিঁদুর মাখা

বৃষ্টির অপেক্ষায়

৬০

তৃতীয় বউকে নিয়ে

প্রথম ট্রামে

মৌলভি যুবক

৬১

চৈত্রের বাতাস

নিখুঁত চাঞ্চল্য

যুবতীর আঁচলে

৬২

পাকা আম

পাড়তে বারণ করছে

গ্রীষ্মের লুবাতাস

৬৩

সোজা গিয়ে বাঁদিকে

কানা গলির শেষে

প্রেমিকার শ্বশুরবাড়ি

৬৪

মাইকে বলিউডি গান

পোস্টারে মার্কস

বিশ্বকর্মা পুজো

৬৫

ওনার বিড়াল

আমার বাড়ির মাছ

তাঁর আনন্দ

 দুটি বিশ্ব

আমরা তো জানি রে আমরা সেরে ওঠার অযোগ্য

তাই বলে বৃষ্টির প্রতিধ্বনিতে ভেজা তোদের কুচুটে ফুসফুসে

গোলাপি বর্ষাতি গায়ে কুঁজো ভেটকির ঝাঁক সাঁতরাবে কেন

তোদের নাকি ধমনীতে ছিল ছাইমাখা পায়রাদের একভাষী উড়াল

শুনেছি অন্ধের দিব্যদৃষ্টি মেলে গাবদাগতর মেঘ পুষতিস

বগলে গুঁজে রাখতিস গাধার চিল্লানিতে ঠাসা রোজনামচা

আর এখন বলছিস ভোটদান তো দানবীর কর্ণও করেননি

কে না জানে শববাহকরাই চিরকাল অমর হয়েছে

ঔরসের অন্ধকারে কথা বলার লোক পেলি না বলে

ঘড়িঘরহীন শহরে ওয়ান-শট প্রেমিকা খুঁজলি

কী রে তোদের কি ঠিক-ঠিকানা নেই না রক্তের দোষ

যে বলিপড়া আয়নায় চোপরদিন লোলচর্ম প্রতিবিম্ব পড়ে

ছি ছি ছি নিঃশ্বাস ফেলে সেটাই আবার প্রশ্বাস হিসেবে ফেরত চাস

আমি তো ভেবেছিলুম তোরা সন্দেহ করার অধিকার প্রয়োগ করবি

তা নয় সারা গায়ে প্রাগৈতিহাসিক চুল নিয়ে ঢুং ঢুং তুলো ধুনছিস

শুভেচ্ছা রইল তোরা যেন দুঃশাসনের হাত দুটো পাস

যা দিয়ে ধোঁয়ার দুর্গে বসে ফুলঝুরির ফিনকি গুনবি

সম্প্রসারণ

আমার ডাক-নাম তো ফনকু, তাই নাজিমের আব্বু

আমায় ফনকার সাহেব বলে ডাকেন। স্কুলে যেতে দেখলেই

বলেন, ‘আসসলাম ওয়ালেকুম ফনকার সাহেব।’

আমি বলি, ‘ওয়েলকাম আসসলাম।’

উনি বলেন, ‘অর্জ হ্যায়…।’

আমি বলি, ‘ইরশাদ হো।’

উনি বলেন, ‘মুলহাজা ফরমায়া যায় ।’

আমি বলি, ‘ইরশাদ ইরশাদ ।’

উনি বলেন, ‘মেরি তামির মেঁ মুজমার হ্যায় ইক সুরত

খরাব কি, হায়ুলা বর্ক ই খিরমান কা হ্যায় খুন ই গর্ম

দেহকান কা ।’

আমি বলি, ‘বহুত খুব বহুত খুব, মরহাবা ।’

তারপর জিগ্যেস করি, ‘এর মানে কী ?’

নাজিমের আব্বু বলেন, ‘আরে মিয়াঁ, এ হল গালিব,

অত্যন্ত অপলকা, এর মানে করতে যেও না,

নষ্ট করে ফেলবে ।’

আমি বললুম, ‘তাহলে আরেকটা শোনান।’

প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার

ওঃ মরে যাব মরে যাব মরে যাব

আমার চামড়ার লহমা জ্বলে যাচ্ছে অকাট্য তুরুপে

আমি কী কোর্বো কোথায় যাব ওঃ কিছুই ভাল্লাগছে না

সাহিত্য-ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাব শুভা

শুভা আমাকে তোমার তর্মুজ আঙরাখার ভেতর চলে যেতে দাও

চুর্মার অন্ধকারে জাফ্রান মশারির আলুলায়িত ছায়ায়

সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে

আর আমি পার্ছি না, অজস্র কাঁচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে

আমি জানি শুভা, যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও

প্রতিটি শিরা অশ্রুস্রোত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে হৃদয়াভিগর্ভে

শাশ্বত অসুস্হতায় পচে যাচ্ছে মগজের সংক্রামক স্ফুলিঙ্গ

মা, তুমি আমায় কঙ্কালরূপে ভূমিষ্ঠ করলে না কেন ?

তাহলে আমি দুকোটি আলোকবষহ ঈশ্বরের পোঁদে চুমো খেতুম

কিন্তু কিছুই ভলো লাগছে না আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না

একাধিক চুমো খেলে আমার গা গুলোয়

ধর্ষণকালে নারীকে ভুলে গিয়ে শিল্পে ফিরে এসেছি কতদিন

কবিতার আদিত্যবর্ণা মূত্রাশয়ে

এসব কী হচ্ছে জানি না তবু বুকের মধ্যে ঘটে যাচ্ছে অহরহ

সব ভেঙে চুরমার করে দেব শালা

ছিন্নভিন্ন করে দেব তোমাদের পাঁজরাবদ্ধ উৎসব

শুভাকে হিঁচড়ে উঠিয়ে নিয়ে যাব আমার ক্ষুধায়

দিতেই হবে শুভাকে

ওঃ মলয়

কোল্কাতাকে আর্দ্র ও পিচ্ছিল বরাঙ্গের মিছিল মনে হচ্ছে আজ

কিন্তু আমাকে নিয়ে আমি কী কোর্বো বুঝতে পার্ছি না

আমার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে

আমাকে মৃত্যুর দিকে যেতে দাও একা

আমাকে ধর্ষণ ও মরে যাওয়া শিখে নিতে হয়নি

প্রস্রাবের পর শেষ ফোঁটা ঝাড়ার দায়িত্ব আমায় শিখতে হয়নি

অন্ধকারে শুভার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়া শিখতে হয়নি

শিখতে হয়নি নন্দিতার বুকের ওপর শুয়ে ফরাসি চামড়ার ব্যবহার

অথচ আমি চেয়েছিলুম আলেয়ার নতুন জবার মতো যোনির সুস্হতা

যোনোকেশরে কাঁচের টুকরোর মতন ঘামের সুস্হতা

আজ আমি মগজের শরণাপন্ন বিপর্যয়ের দিকে চলে এলুম

আমি বুঝতে পার্ছি না কী জন্যে আমি বেঁচে থাকতে চাইছি

আমার পূর্বপুরুষ লম্পট সাবর্ণচৌধুরীদের কথা আমি ভাবছি

আমাকে নতুন ও ভিন্নতর কিছু কোর্তে হবে

শুভার স্তনের ত্বকের মতো বিছানায় শেষবার ঘুমোতে দাও আমায়

জন্মমুহূর্তের তীব্রচ্ছটা সূর্যজখম মনে পড়ছে

আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই

মলয় রায়চৌধুরীর প্রয়োজন পৃথিবীর ছিল না

তোমার তীব্র রূপালি য়ূটেরাসে ঘুমোতে দাও কিছুকাল শুভা

শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও

তোমার ঋতুস্রাবে ধুয়ে যেতে দাও আমার পাপতাড়িত কঙ্কাল

আমাকে তোমার গর্ভে আমারই শুক্র থেকে জন্ম নিতে দাও

আমার বাবা-মা আন্য হলেও কি আমি এরকম হতুম ?

সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শুক্র থেকে মলয় ওর্ফে আমি হতে পার্তুম ?

আমার বাবার অন্য নারীর গর্ভে ঢুকেও কি মলয় হতুম ?

শুভা না থাকলে আমিও কি পেশাদার ভদ্রলোক হতুম মৃত ভায়ের মতন ?

ওঃ বলুক কেউ এসবের জবাবদিহি করুক

শুভা, ওঃ শুভা

তোমার সেলোফেন সতীচ্ছদের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীটা দেখতে দাও আমায়

পুনরায় সবুজ তোশকের ওপর চলে এসো শুভা

যেমন ক্যাথোড রশ্মিকে তীক্ষ্ণধী চুম্বকের আঁচ মেরে তুলতে হয়

১৯৫৬ সালের সেই হেস্তনেস্তকারী চিঠি মনে পড়ছে

তখন ভাল্লুকের ছাল দিয়ে সাজানো হচ্ছিল তোমার ক্লিটোরিসের আশপাশ

পাঁজর নিকুচি করা ঝুরি তখন তোমার স্তনে নামছে

হুঁশাহুঁশহীন গাফিলতির বর্ত্মে স্ফীত হয়ে উঠছে নির্বোধ আত্মীয়তা

আ আ আ আ আ আ আ আ আ আঃ

মরে যাব কিনা বুঝতে পার্ছি না

তুল্কালাম হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরকার সমগ্র অসহায়তায়

সব কিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাব

শিল্পের জন্যে সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দোব

কবিতার জন্যে আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই

শুভা

 আমাকে তোমার লাবিয়া ম্যাজোরার স্মরণাতীত অসংযমে প্রবেশ কোর্তে দাও

দুঃখহীন আয়াসের অসম্ভাব্যতায় যেতে দাও

বেসামাল হৃদয়বত্তার স্বর্ণসবুজে

কেন আমি হারিয়ে যাইনি আমার মায়ের যোনিবর্ত্মে ?

কেন আমি পিতার আত্মমৈথুনের পর তাঁর পেচ্ছাপে বয়ে যাইনি ?

কেন আমি রজোস্রাবে মিশে যাইনি শ্লেষ্মায় ?

অথচ আমার নীচে চিত আধবোজা অবস্হায়

আরামগ্রহণকারিণী শুভাকে দেখে ভীষণ কষ্ট হয়েছে আমার

এরকম অসহায় চেহারা ফুটিয়েও নারী বিশ্বাসঘাতিনী হয়

আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই

এখন আমার হি২স্র হৃৎপিণ্ড অসম্ভব মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে

মাটি ফুঁড়ে জলের ঘূর্ণি আমার গলা ওব্দি উঠে আসছে

আমি মরে যাব

ওঃ এসমস্ত কী ঘটছে আমার মধ্যে

আমি আমার হাত হাতের চেটো খুঁজে পাচ্ছি না

পায়জামায় শুকিয়ে-যাওয়া বীর্য থেকে ডানা মেলছে

৩০০০০০ শিশু উড়ে যাচ্ছে শুভার স্তনমণ্ডলীর দিকে

ঝাঁকে-ঝাঁকে ছুঁচ ছুটে যাচ্ছে রক্ত থেকে কবিতায়

এখন আমার জেদি ঠ্যাঙের চোরাচালান সেঁদোতে চাইছে

হিপ্নোটিক শব্দরাজ্য থেকে ফাঁসানো মৃত্যুভেদী যৌনপর্চুলায়

ঘরের প্রত্যেকটা দেয়ালে মার্মুখি আয়না লাগিয়ে আমি দেখছি

কয়েকটা ন্যাংটো মলয়কে ছেড়ে দিয়ে তার আপ্রতিষ্ঠিত খেয়োখেয়ি                                                   

যা লাগবে বলবেন

কে চেল্লায় শালা

কে চেল্লায় এত ভোরবেলা ?

গু-পরিষ্কার করেনি কাকেরা

মাছের বাজার থেকে ফেরেনি সবুজ মাছরাঙা

বকজোড়া আপিস যায়নি এখুনও !

কে চেল্লায়

কে চেল্লায়, অ্যাঁ, কিসেরি-বা রেলা ?

আমি, আমি, হাহ

আমিই আওয়াজ দিচ্ছি

চ্যাঁচাচ্ছি আমি

কোনোই বক্তব্য নেই

কোনোই কারণ নেই স্রেফ

চিৎকারের জন্যে চিৎকার

চিৎকারের ভেতরে চিৎকার

দ্রোহ

এ-নৌকো ময়ূরপঙ্খী

তীর্থযাত্রী

ব্যাঁটরা থেকে যাবে হরিদ্বার

.

এই গাধা যে-দিকে দুচোখ যায় যায়

যাযাবর

ঘাট বা আঘাটা যেখানে যেমন বোঝে

ঘুরতে চাই গর্দভের পিঠে

মাথায় কাগুজে টুপি মুখে চুনকালি

পেছনে ভিড়ের হল্লা।

কী বিষয় কী বিষয়

      আররে রবীন্দ্রনাথ

তোমার সঙ্গেই তো নেচেছিলুম সেদিন

আঙুলের ইতিহাসে একতারার হাফবাউল ড়িং ড়াং তুলে

ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের জমঘট থেকে সদর স্ট্রিটের লবঙ্গবাজারে

যেতে-যেতে তুমি বললে আমাগো শিলাইদহ থিকা আসতাসি

আলুমুদ্দিন দপতর যামু

          আগুন আর জলের তৈরি তোমার ঠোঁটে

তখনও একচিলতে ব্রহ্মসঙ্গীত লেগেছিল কী গরম কী গরম

গ্যাবার্ডিনের আলখাল্লা ফেলে দিলে ছুঁড়ে

দেখলুম তোমার ফর্সা গায়ে জোঁক ধরেছে

বড়ো জোঁক বর্ষার জোড়াসাঁকোয়

        সেলিমের দোকানে শিককাবাবের গন্ধে

নেড়েগুলা কী রান্ধতাসে ? জানতে চাইলে

ও বললে, না বুঝলুঁ ? সাঁড়কে ছালন ছে !

আহাঁ দেখুঁ না চখকে

        চায়ের ঠেকে টাকমাথা চুটকি দাড়ি 

ভ্লাদিমির ইলিচ আর সোনালিচুল ভেরা ইভানোভা জাসুলিচ

আর তোমার মতন রুপোলি দাড়িতে অ্যাক্সেলরদ আর মারতভ 

যার গাল আপনা-আপনি কাঁপছিল দেখে 

তুমি বললে, উয়াদের ধড়গুলা কুথায় ?

        আমি আমার নাচ থামাতে পারছিলুম না বলে 

তুমি নিজের একতারাটা দিতে চাইলে 

কেননা তোমার পা থেকে নাচ যে পেরেছে খুলে নিয়ে গেছে

আর এখন তো দিনের বেলাও হ্যালোজেন জ্বলে

কী আনন্দ কী আনন্দ

        সদর স্ট্রিটের বারান্দায় 

তোমার তিনঠেঙে চেয়ারখানা পড়ে আছে

হুড়োহুড়ি প্রেম করতে গিয়ে পায়া ভেঙে ফেলেছিলে

তারিখ-সন লেখা আছে জীবনস্মৃতিতে

কী ভালোবাসা কী ভালোবাসা

        তোমার ফিটনগাড়ির ঘোড়া তো

কোকিলের মতন ডাকছে দাদু রবীন্দ্রনাথ

আর তোমার বীর্যের রেলিক্স থেকে 

কতজন যে পয়দা হয়েছিল মাটি থেকে 

ছোলাভাজা তুলে খাচ্ছে

        ওগুলা কী ? আমি বললুম কাক;

ওগুলারে কী কয় ? আমি বললুম সেলিমকেই জিগেস করো

ও এই অঞ্চলে তোলা আদায় করে ।

কী ঐশ্বর্য কী ঐশ্বর্য

আমি ভঙ্গুর হে

    আমি যে-নাকি গাইডের কাছে ইতিহাস-শেখা ফোস্কাপড়া পর্যটক

ছায়ায় হেলান-দেয়া বাতিস্তম্ভের আদলে গিসলুম পিতৃত্ব ফলাবার ইসকুলে

জানতুম যতই যাই হোক ল্যাজটাই কুকুরকে নাড়ায় রে

.

    আমি যে-নাকি প্ল্যাটফর্মে ভবিষ্যভীতু কনের টাকলামাথা দোজবর

বস্তাপ্রতিম বানিয়ার বংশে এনেছিলুম হাইতোলা চিকেন চাউনি

কাদাকাঙাল ঠ্যাঙ থেকে ঝরাচ্ছিলুম ঘেসো ঝিঁঝির সাম্ভানাচ

.

    আমি যে-নাকি ফানুসনাভি ব্যাঙ থপথপে শুশুকমাথা আমলা

মাটিমাখা নতুন আলুর চোখে-দেখা দু’টাকা ডজন রামপ্রসাদী জবা

চাষির ঢঙে বলদ অনুসরণ করে পৌঁছেছিলুম বিধানসভার কুয়োতলায়

.

    আমি যে-নাকি পোলকাফোঁটা পুঁইফুলে দু’ভাঁজ করা হেঁইয়োরত বাতাস

ঢেউ-চাবকানো ঝড়ে যখন বঁড়শি-খেলা পুঁটির পাশে ভাসছি

তখন বুঝলি লম্বালম্বি করে কাটা কথাবাত্রার লাটিমছেঁড়া ঘুড়ি

.

আমি যে-নাকি ভূতলবাহী আওয়াজ-মিস্ত্রি হলদে-ল্যাঙোট বাবুই

চোখে-চোখে শেকল আঁকা ভিড়ের মধ্যে এঁদো বিভাগের কেঁদো

চি২ড়ি-দাড়া আঙুল দিয়ে খুলছি বসে জটপাকানো মুচকি ঠোঁটের হাসি 

হার্টঅ্যাটাক

     বঁড়শিঝোলানো রোদকিলবিলে নদীর টুকরো থেকে

এক হ্যাঁচকায় তরল অভিকর্ষ বাতাসে খেলিয়ে ফ্যাকাশে আগুনের পুরুষ

এই মালগাড়ি-ঘ্যানঘ্যানে গ্রামের গল্ফ-সবুজ দুপুরে বসে রইল কচুপাতায়

ভ্রাম্যমাণ জলফোসকার দিকে তাকিয়ে

     তখন ওর কন্ঠার ঘামফোঁটা বুকের লোমে

ব্রেইল লিখনে আঙুল বুলিয়ে হাওয়া মাড়াবার নিঃশব্দ আওয়াজ তুলে নামছে

আর ঝাঁকড়ামাথা কুয়াশায় নাচতে লাগল রোদ্দুরের গন্ধে কাহিল ঝুলশিল্পী

মাকড়সার ইঁদুর-কালচে দলবল বন্ধ করতে ভুলে-যাওয়া দরোজার

তাড়া-খাওয়া সুড়ঙ্গে হাওয়ার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল মোমশিখার উদোম হাতছানি

ক্রমশ আঁটি শক্ত করতে শাঁস আলগা করে দিচ্ছিল গোলাপখাস

দোটানা

ফেরার সময় ওরা ঘিরে ধরে। ছ’সাতজন। প্রত্যেকরই

রয়েছে কিছু-নাকিছু হাতে। আসার সময় জানতুম আজ

গোলমাল হবে তাই তৈরি হয়েই এসেছি। তবু প্রথমেই

নিজের তরফ থেকে হাত ওঠাবব না, সেটা ঠিক করা আছে।

জামার কলার ধরে একজন খিস্তি করে, ‘পরেম করতধে এয়েচো

এপাড়ায়! কেন? নিজের বাড়িতে মাগ নেই নাকি।’

দাঁতে দাঁত দিয়ে মাথা ঠাণ্ডা রাখি। তখনই চোয়ালে ঘুষি

রক্ত টেনে বের করে যেটা হাত দিয়ে টের পাই।

এক ঝটকায় ছাড়িয়েই বসে পড়ি। মোজার ভেতর থেকে

চকিতে বেরিয়ে আসে নতুন প্রজন্মের ক্ষিপ্র চিৎপুরি—

হ্যালোজেন-মাখা অন্ধকারে ঝলসে ওঠে স্টেনলেস চাকু

ফলায় ‘ছিদাম’ লেখা একপিঠে ‘মাকালী’ ওপিঠে।

জটলা ছিৎরে যায়। চাকু-দেবতার নামে কতগুণ আছে

সকলে জানে না। মানব কেন অমন কুচুটে?

প্রেমিকের জন্য কোনো ভালোবাসা নেই? এই যে ছ’সাতজন

মনের স্বামিত্ব হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বলে ঘিরে ধরেছিল

কেমন গুটিয়ে গেল চাউনির একটু ঝলকে !

ছি কলকাতা

থাকো তুমি তোমার ওই হিজড়েদের নিয়ে

তুমি তো তাদের আয়া স্বপ্নে যারা বর্ষাকালে বিছানায় মোতে

ইজের বদল করো ঠ্যাঙ তুলে

ফড়েরা পেচ্ছাপ করবে বলে তুমি দেয়ালে মহৎকথা লেখো

তোমার ব্যাপারে আর থাকতে চাই না আমি

তোমাকে চুম্বন করলে মৃত্যুর পরেও জানি টকে থাকবে মুখ

যেও গিয়ে কেরানি বিপ্লব করো বি-বা-দী পাড়ায়

তোমার খুলির ফাঁকে কেবলই পয়সা ফেলতা ডাকো তুমি

আমি তো মনুষ্যতর দানো

অঙ্গপ্রত্যঙ্গে স্হিতিস্হাপকতা নিয়ে জাপটে পিষে দিতে পারি

পায়েতে পাথর বেঁধে ফেলে দিতে পারি এঁদো পুকুরে-ডোবায়

তোমার ঘরেতে ঢুকলে দালালের টোকা পড়বে দরোজায়

“জলদি সারো আরও দু’জন বায়না দিয়েছে।”

“মানুষের ভাষা”

যোনি থেকে অর্ধেক বেরিয়ে রক্তমাখা দেহে

চিৎকার করছে নিজস্বভাষায় । বেরোতে চায় না

ফিরে যেতে চায় ; জন্মাবার সময়কে মানবে না

বাচ্চাটার মা ওকে দুহাতে ধরে বের করতে চাইলেও

পারছে না ; দাঁড়িয়ে জন্ম দিচ্ছে ; পা বেয়ে রক্ত টুপটাপ

ভিড় জমে গেছে ; সকলেই বাচ্চাটার ভাষা বুঝতে চায়

প্রত্যাখ্যানের ভাষা, জরায়ুতে ফেরত যাবার ভাষা

সবাই ওই ভাষা শিখে নিয়ে পুনরায় ফিরে যেতে চায়

 বাজারিনী

বিশ বছরের পর এলে তুমি। তোমার আদুরে ভাষা পালটে গিয়েছে

বারবার। জানি তুমি শুভ্রা রায় নও। ওরকমভাবে একঠায়ে

সারাদিন মাথা নিচু করে বসে থাকো। আমার চুলেতে পাক

ধরে গেছে। শেখাও তোমার ভাষা এইবার। দেখি কীরকম

ঠোঁট নড়ে নাভি খিলখিল কেঁপে হেসে কুটি হয়।যুবকেরা

ঘিরে থাকে বহুক্ষণ তোমায় আড়াল করে। কিসের কথা যে এধ হয়

কিছুই বুঝি না। অন্তত কুড়ি বছরের ছোট হবে তুমি।

জানি না কাদের জন্যে অন্ন আনাজ সংগ্রহে আজ এলোচুলে

নেমেছ বাজারে। লুবাতাসে রোদেপুড়ে কালো হয়ে যাবে শেষে।

তুমুল বৃষ্টির মাঝে কীভাবে বাসায় ফেরো? ওই যুবকেরা

ছাতা ধরে মাথার ওপরে? বাড়ি ফিরে ভিজে চুল বোধায় শোকাও একা।

সকালে কি রান্না করে আসো? সেগুলোই রাতে খাও?

শরীর খারাপ হলে কারা দ্যাখে ? কে কাপড় কাচে?

আমার সন্ত্রাসবাজি রাহাজানি লুটমারথেকে জানি তোমার দুনিয়া

আলাদা একদম। তোমাকে নিজের নাম বলতে পারি না আমি।

যদি ঘেন্না করো, জেনে যাও কী-কী করি, ভয় পাও।

কতদিন ইচ্ছে হয় সামান্য ইশারা করে আমার দলের লোকেদের

তোমাকে রাস্তা থেকে জোর করে তুলে নিতে বলি।

দাঁড়াবে আমার সামনে এসে তুমি। বলবে, ‘আমাকে যেতে দিন’।

২৮ আষাঢ় ১৩৯২ 

হাততালি  ( Centre compose )

তারপর পলিতকেশ কাশফুলে

পইপই বারণের পুশতুভাষী দুর্যোধন বেরিয়ে পড়েছে

দগদগে রোদে

চন্দন-রক্তের পাথর-পোশাক রক্ষীদের সরিয়ে

অন্ধকারকে খুঁচিয়ে বের করে এনেছেন সকালের বিকল্প

কাঁচা নরকের উদাত্ত অনুভব

হাহ

রোগা পৃথিবীর শিয়রে রাতজাগা নেশুড়ে

হরতালের দরুণ ক্রুশকাঠ থেকে নামতে পারেননি হাততালি

চোখে জলসুদ্দু হেসেছে শিশুরা

একথোকা অন্ধকারে জোর করে দেখানো স্বপ্নে

যাত্রীডুবির খবরে ডুকরে উঠেছিল লালশালু নৌকোর হাততালি

না খেতে পাওয়া হলুদ শীতে

গরম আলকাৎরায় ফোটা ফরসা রজনীগন্ধা

যখন নরুন-খোদাই বাতাসে

নিকেল চকচকে বিচিবীজ

কাঁধে চাঁদ নিয়ে ভররাত শাসিয়েছে শ্যাওলাধরা করোটি

ঘাসফুলে না-ফোঁপানো ফড়িং-পুরুষ

বারবাডোজ-পেশির ব্রোঞ্জপুরুষরা

জরগরম কপাল ছুঁইয়েছে তাঁর পশুপশম নাভিতে

চিরুনিধার বৃষ্টিতে

ভুরু কোঁচকানো ঢেউয়ে শুয়ে

জলকে থাপড়েছে ডিজেল-চাদর ছায়া

সমস্ত ডানা সরিয়ে ফেলা হয়েছে আকাশ থেকে

হরিবোল দিতে-দিতে সাংবাদিকের সদ্যছাপা সকাল

চাবির ঘোলাটে ফুটোয় যাবজ্জীবন কয়েদির চোখ

বাইরে

হেমন্তের ঢেঁকিতে গোলাপ-গোড়ালি

লালুং রমণী

ঘামসুগন্ধে বিহ্বল প্রতিধ্বনি ফেরত চেঁচাতে ভুলে যায়

তারপর

অপারেশন বুলশিট

মুখে ঘা

শহিদ চবুতরায় অর্ধনমিত লিঙ্গে যুবাবিপ্লবীর শীৎকার পেঁয়াজবাটায় ভেজা আমিষ হৃদয়

চোখে কালি হাসনুহানা

জলে ভিজে পদ্মফুলের নিউমোনিয়া

হুঁকোটানা বুড়ো রেলগাড়িতে মেঘের চেষ্টাকৃত গর্জন

আর সোনার মাকড়সার জালে ঢাকা বিদ্যুৎ

হোঁতকা মরদকে সবুজ পিঠ থেকে নামিয়ে দিয়েছে ব্যাঙযুবতী

ব্যাবিলনের শাদা নরকহুরি

উত্তরমুখো নকশিমেঘের ওষুধ বড়ি গিলিয়েছে

রেড়িপ্রদীপে ঝুঁকে ঘুরঘুরে শুঁটি পোকা

এলোচুলে ঢাকা উল্কামুখ রাজকন্যের মুকুট থেকে গানের টুকরো

পায়ে রক্তমাখা রাজহাঁস

যখন-তখন চেয়েছে বাড়িফেরত সৈন্যের বসন্তকাল

সাজিয়েছে খেলাচ্ছলে মারা চরমযুবার মা-বাপের সবুজকাঁথা ধানখেত

তুঁতেরঙা কুয়াশা এগিয়েছে সিংহ চামড়া শিকারির গোপন ঘাসপথবিয়াহযোগ্য ঘুড়সওয়ার হাততালি

হেই হো

কিছুটা অপরিচিত থাকার কষ্টে 

যে-বাগান সুপুরিগাছকে কড়ে আঙুলে দাঁড় করিয়ে আজীবন

দূরপাল্লার ঝড়ে

ল্যাম্পপোস্টের নীচে

বৃষ্টি মুড়িদিয়ে

সেই ভাঙচুর চেহারাই তাঁর আঙ্গিক

যে-আদল খুঁজেছে শরীর এলিয়ে দেয়া ঢেউ

কথকনাচে বাঁধা ব্রহ্মাণ্ড

মন্দিরের চোরাকুঠুরিতে মুখবাঁধা

হাততালি

আগুন যখন ধোঁয়া থেকে আলাদা হচ্ছে

যেটুকু সময়ে

আলজিভ

দুই হৃৎস্পন্দনের মাঝে তেতো হয়ে ওঠে

জলপথে এসে আক্রমণ করেছে জ্বরবিদ্রোহী

গাছে-গাছে ঝড়কালীন পলাশের সখ্যতা

ঠিক যেন চিড়িয়াখানার ভবিষ্যৎহীন

শেষ হাওয়ায়

পটকা ফাটিয়েছে রাংতাপাড় মেঘ

যেন এক্ষুনি এসে পড়ল বলে হাততালি

রাতভর ছড়ানো হাততালি সকালে এককোণে ঝেঁটিয়েছে ঝাড়ুদার

আঘাতহীন ভালোবাসায়

থলেতে পুরেছে অসুস্হ গঙ্গানদীকে

এক বা তিনরঙা পতপতে রামধনু

কবরে পাওয়া গেছে ভাতখাবার কাঁসি

অত্যাচারিতের কাতরানিতে পড়েছে হাড়ের খিলান

কেউ সুখী নয়

কেমন আছো জানতে চাইলে বলেছে

ভালো

পাকের পর পাক কোমর থেকে কাঁটাতার খুলে দিয়েছে

নষ্টের শপথ আওড়ানো শেষে

শহরগ্রামে রোঁদে বেরিয়েছে মড়াসংগ্রহকারী

কষ্ট হলে কাঁদতে পারার আশীর্বাদ চেয়েছে নগরবাসী

ওদিকে হাততালিবাদক

ভগ্নস্বাস্হ্য আকাশপাখিদের গান শুধরে দিতে চেয়েছে

তারা দপদপে অন্ধকারে

বালিশ-জড়ানো বর্ষায়

পালামৌ জেহানাবাদ রোহতাসে কাদাপেছল মাগুরের আঁশটে হাঁপানি

শামুক-থুতনি বুড়ির চোখের পাতায় ধূসর সোরাগন্ধক

আধপচা হুগলি নদীর ডাগরচোখ পারশের গান শুনতে

কেউটে যুবতীর শরীর থেকে খসে পড়েছিল শীতের মিহিন আদল

আচমকা সজারু

বিয়ের লাল বেনারসিতে শিমুল

এদিকপানে মুখ করে দাঁড়িয়েছে ছোকরা সূর্যমুখী

গরম তেলে লাল দুহাত উড়িয়ে স্বাস্হ্যবতী কাঁকড়া

ভাতের হাঁড়িতে নেচেছে সফেদ-মসলিন নরম অপ্সরা

তখন অন্ধকারে কেঁদে নিয়ে আলোয় হেসেছে হাততালি

হাসপাতালের বিছানায় লোহার শেকলে বাঁধা শুনেছে

টেবিল ঘড়িতে সারারাত গ্রেপ্তারের ঠকঠক ঠকঠক ঠকঠক

আলফা ফিমেল বিড়ালিনী

ক্যাটওয়াকে শোস্টপার, শব্দহীন আলতো স্টিলেটো ফেলে দেহের আলোয়

মেলে ধরছিস তুই বাঁকের বদলগুলো হাসির হদিস তুলে, ঠিক যেন

ইমলিতলার তিন তলা থেকে বারবার ভাসাচ্ছিস দু’থাবার

তুলোট ম্যাজিক, অবন্তিকা, আলফা ফিমেল বিড়ালিনী, কোলে নিয়ে

আদর করিস যাকে তারই চরিত্র তোকে চেপে ধরে কালো শাদা বাদামি ধূসর

নক্ষত্র ক্লোনিং চোখে অর্গলছেঁড়া তোর লিভ-ইন কোনো পৌরাণিক

ঋষির রেশমি ঠোঁটে দরোজাবর্জিত কিছু অ্যাগ্রেসিভ আঁচড়-কামড়

তুই কি নীলাভ দূরত্বে থাকা অরুন্ধতী ? নাকি তুই

হবির্ভূ সন্নতি কলা অনসূয়া ক্ষমা শ্রদ্ধার কোঁকড়া ঘনান্ধকারে

দু’পাশে দর্শক নিয়ে ক্যাটওয়াকে হাঁটছিস দেশ-কালহীন ?

তাই তোকে বর্ণসংকর করা কতই সহজ দ্যাখ, আদুরে অ-নাস্তিক

নিজেই নিজেকে চেটে অহরহ স্পিক অ্যান্ড স্প্যান থাকবার

যৌনতার নরম মডেল তোর আদি-মা বা পূর্বপুরুষ ছিল কিনা

কেউই জানে না দেখতে কীরকম গায়ের আদল কন্ঠস্বর

শ্বাসে তোর পাখির উড়াল-গান ইঁদুরের মৃত্যুমুখী খেলা মাছেদের ঘাই

অবন্তিকা, অধুনান্তিকা, তোকে সীমা দিয়ে বেঁধে ফেলা অসম্ভব !

কোন পুরুষ ? কোন পুরুষ ? কোন পুরুষ ? কোন পুরুষ ?

তৈমুর আত্তিলা-হুন ক্যালিগুলা পল-পট রোবেসপিয়ার ? নাহ–

তোর প্রেম অনির্ণেয় তবু তুই ক্যাটওয়াকে গ্রীবা তুলে আমাকে খুঁজিস…

চলো গুলফিঘাট

কেউ মরলেই তার শব ঘিরে মৃত্যু উৎসব ছিল ইমলিতলায়

বয়ঃসন্ধির পর দেহের ভেতরে অহরহ উৎসব চলে তাই

তারা মারা গেলে কান্নাকাটি চাপড়ানি নয় বিলাপ কেবল

শিশুদের জন্য করো বাচ্চা-বুতরুর জন্য কাঁদো যত পারো

শবখাটে চারকোণে মাটির ধুনুচি বেঁধে গুলফি ঘাটের শমসানে

ঢোলচি ঢোলকসহ সানাই বাজিয়ে নেচে আর গেয়ে পাড়ার ছোঁড়ারা

কুড়োতুম ছুঁড়ে-ফেলা তামার পয়সা প্যাঁড়া আম লিচু আকন্দের মালা

ফিরে এসে বিকালে রোয়াকে বসে বুড়ো বুড়ি কিশোর যুবক

তাড়ি বা ঠররা আর তার সাথে শুয়োরের পোড়া পিঠ-পেট

খেতে-খেতে ঠহাকা-মাখানো হাসি মাথায় গামছা বেঁধে গান

আমি মরবার পর ছেরাদ্দ বা শোকসভা নয় ; ইমলিতলার ঢঙে

উৎসব করবার কথা ছেলেকে মেয়েকে বলা আছে : মদ-মাংস খাও

স্বজন বান্ধব জ্ঞাতি সবাইকে বলো অংশ নিতে শমসানের পথে

বেহেড হুল্লোড় করে নাচতে গাইতে যেও ফিরো নেচে গেয়ে

মেটালিকা পাঙ্ক-রক হিপ-হপ সুমন শাকিরা ক্যাকটাস

বিটলস এলভিস কিশোর কুমার ও ইয়ুডলিঙে আর ডি বর্মণ…

নুন ও নিমকহারামি

তুই তো আমার ঘাম জিভ দিয়ে ছুঁয়ে

বলেছিলি অবন্তিকা, ‘আহ কি নোনতা

অন্তরতমের প্রাণ পুরুষালি ঘ্রাণ–‘

সেইদিন, লক-আপ থেকে আদালতে

হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ির

ফাঁসে বাঁধা, হেঁটেছি ডাকাত খুনিদের

সাথে, রাজপথে সার্কাসপ্রেমীর ভিড়…

বিশ্বাসঘাতক যারা, আমার  বিরুদ্ধে

আদালতে রাজসাক্ষী হয়েছিল,  তারা

কাঠগড়া থেকে নেমে বলেছিল, নুন

তো পায়নি, মিষ্টি ছিল আমার ঘামেতে;

তাই বিশ্বাসভঙ্গের প্রশ্ন নেই  কোনো

নিমকহারামি বলা চলবে না তাকে !                            

কপিরাইট

অবন্তিকা, অতি-নারী, অধুনান্তিকা

পঞ্চান্ন বছর আগে চৈত্রের কোনারকে

লোডশেডিঙের রাতে হোটেলের ছাদে

ঠোঁটের ওপরে ঠোঁট রেখে বলেছিলি

চুমু প্রিন্ট করে দিচ্ছি সারা নোনা গায়ে

ম্যাজেন্টা গোলাপি ভিজে লিপ্সটিকে

গুনে গুনে একশোটা, লিমিটেড এডিশান

কপিরাইট উল্লঙ্ঘন করলে চলবে না ।

.

অবন্তিকা, সাংবাদিকা, অধুনান্তিকা

এ-চুক্তি উভয়েরই ক্ষেত্রে লাগু ছিল

কিন্তু দু’জনেই এর-তার কাছ থেকে

শুনেছি কখন কবে কার সাথে শুয়ে

ভেঙেছি ভঙ্গুর চুক্তি কেননা মজাটা

ঠোঁটের ফাইনপ্রিন্টে লিখেছিলি তুই । 

আলফা পুরুষের কবিতা

কী দিয়ে তৈরি তুই ? নারীকে কবিতায়

আনা যাবেনাকো বলে তোর হুমকি,

অবন্তিকা ! কোন ঋতু দিয়ে গড়া ? স্কচ

না সিংগল মল্ট ? নাকি তুই হোমিওপ্যাথির

শিশি থেকে উবে যাওয়া ৩৫ হাজার ফিট

ওপরে আকাশে, প্লেনের হোল্ডে রাখা শীতে

নদীর মোচড়ানো বাঁকে ইলিশের ঝাঁক ?

আলোকে দেশলাই বলে ভাবলি কীভাবে ?

কেন ? কেন ? কেন ? কেন ?  অ্যাঁ, অবু , 

অবন্তিকা ? ভুলে গেলি তোরই ছোঁয়া পেয়ে

আড়মোড়া ভেঙেছিল চকমকি পুরুষ-পাথর !

বল তুই, বলে ফ্যাল, মিটিয়ে নে মিঠে ঝাল

জমা করে রেখেছিস স্কচ-খাওয়া জিভে ;

তোরই বাড়িকে ঘিরে তুষারের তীব্র আলো

সূর্য ওঠেনি আজ পনেরো দিনের বেশি

তবু তোর মুখশ্রী শীতে আলোকিত কেন ?

আসলে অন্যের ওপরে রাগ, উপলক্ষ আমি

হ্যাঁ, হ্যাঁ, খুলে বল, দাঁতে দাঁত দিয়ে বল

যে ভাবে ইচ্ছে তোর উগরে দে স্টক তোর…

.

তোকে নিয়ে লিখতে পারব না এ-নিষেধ

অমান্য করেই তবে পাতছি চোরা শব্দফাঁদ

অবন্তিকা মুখপুড়ি খুকিবাদী হে প্রেমিকা

এই নে মাটির পোড়ানো আংটি হাঁটু গেড়ে

দিচ্ছি তোর ক্রুদ্ধ আঙুলে, নিবি বা ফেলে দিবি

তা তোর অ্যাড্রেনালিন বুঝবে অবন্তিকা

আমি তো নাচার যতক্ষণ না যাচ্ছিস

মগজের ছাইগাদা-বিস্মৃতির উড়ো আবডালে…

স্প্যাম প্রেমিকা

বাঃ বেশ, আচমকা ঢুকে এলি ডেস্কটপে সঙ্গে তোর ফোটো

বহুরূপী আদুলগা, কুচকুচে হাসিমুখে ডাকছিস কালো সঙ্গমে

দেখছি গোগ্রাসে তোকে বদলভারের জানজতব ভেনাস

ভুলভাল ইংরেজি তলপেটে ‘আই লাভ ইউ’ লিখে

কৃষ্ণকলি হুকার ললনা তোর ফাঁদপাতা প্রেম নিবেদন

নরম উপাস্য উরু জাদুটোনা-করা নখে রঙ না রক্ত রে

কোন দেশ থেকে এলি মুখপুড়ি ? কেনিয়া উগান্ডা জাম্বিয়া

বুরকিনা ফাসো কংগো ক্যামেরুন সুদান নিঝের ?

মুম্বাই এসে ঘাঁটি গেড়েছিস নাইজারওয়াডিতে দলবেঁধে !

কী করে জানলি হ্যাঁ রে আফ্রিকার নারীসঙ্গ পাইনি কখনও ?

বেশ তোর হাইপার রিয়্যাল যৌন আবেদন ল্যাপটপ আলো

বিশদ জানিস তা । আসতে চাস আলিঙ্গনে তাই। কত টাকা

নাকি ডলারের বিনিময়ে পাওয়া যাবে ওই অভিজ্ঞতা

লিখিসনি তো ? কেবল দেখা করতে বলেছিস মীরা রোডে

জংশনের মোড়ে, ডিজিটাল রূপ ছেড়ে নামবি শহরে ।

পাঁকের মৃন্ময়ী

তুই কি সত্যিই কুচ্ছিত ? সবাই তো তাই বলে। পাঁকের মৃণ্ময়ী!

কোলে কালি চোখ তোর এত ছোটো কী করে দেখিস চেয়ে? ঠোঁটও

ভিষণ পুরু; বুক-পেট-কোমর তো একাকার ; থলথলে মাংসঢলা বডি

পেছন থেকেও তোর দুই বুক দেখতে পেয়ে হাসাহাসি করে লোকে

তাছাড়া শরীর জুড়ে নিমপাতা-মাখা গন্ধে মাছিরা বাসর পাতে

চামড়ায়, এমনই পচন তোর ঘামে; চুলও উকুনে রুক্ষ : অহরহ

তোকেই আঁকছি রোজ যতটা আসল করে তুলে ধরা যায় তোর

পুতিগন্ধময় জিভ মেগের আড়ালে ঢাকা থুতু-বৃষ্টি কথা অনর্গল।

.

কিন্তু যখনই তোর নাভিতে হাঁ-মুখ চাপি তরল বিদ্যুত বয়ে চলে

পুরোটা শরীর জুড়ে আমাদের দুজনারই। কুচ্ছিত-সুন্দরী তুই

যাবতীয় ‘ইজম’এর ঊর্ধে উঠে প্রমাণ করিস সব ফালতু বাঁটোয়ারা।

পাপ ও পূণ্যের যুগ্মবৈপরীত্য

অদ্ভুত নারী তুই অবন্তিকা; বুঝতেই পারি না তোকে

বলিস যে, বোঝার দরকার নেই, কেউ তো বুঝতে চায়নি আজও

হবেই বা কি বুঝে-টুজে ! জাগতিক মজা ছাড়া আর-কিছু

কীই বা হবে জেনে, বলেছিলি ! কী করবি এত টাকা ? কয়েকটা ফ্ল্যাট ?

ব্যাংকের গোপন লকার ? টয়-বয় পালটাস যখন যেমন ইচ্ছা। 

লুকিয়ে আসিস তুই মাঝরাতে মার্সিডিসে চেপে; দরোজা খুলে ধরে ড্রাইভার।

ওঃ কী রোয়াব। ব্র্যান্ডেড সবকিছু: লুই ভিতঁ, জিমি চু, ক্রিস্টিয়ান

ডিয়র, বারবেরি — লেবেল দেখে-দেখে টের পাই নাক আর বুক উঁচু

ক্ষমতা-বৈভব এই ভারতবর্ষের আর তোরও। আমি তোর বহুভাষী

প্রেমিকের অন্যতম। জানি না প্রেমিক বলা ঠিক হল কি না । বলেছিলি

প্রেমিক নামে কোনো জীব নেই, ছিল না কখনও এ-জগতে

দেয়া-নেয়া বৃত্তের মাঝে আমরা পাক খাই, তাই, যত দিন

পারা যায় লুটে নাও জীবনের অফুরন্ত গ্লানি। উজবুকের ঢঙে দেখি

আর ভাবি কি করেই বা ঘুষ নিস অমন সুন্দরী হয়ে ! বরকে লাথিয়ে

বের করে দিয়েছিলি চৌকাঠের ওপারে যৌবনে। এখনও চোখ তোর

রিয়্যালি যাকে বলে প্রতিমার ঢঙে বিস্ফারিত; ৩০-২৪-৩২ তোর

ওই বডিখানা । প্রশ্ন করেছি তোকে, অবন্তিকা, পাপবোধ হয়নাকো তোর ? 

বলেছিলি, পাপবোধ নেই বলেই অফুরন্ত ঘুষ নিস; লেখাপড়া

শিখেছিলি এ-জন্যেই, হাড়-মাস এক করে, আই এ এস হওয়াটাও সে জন্যেই

নখ কাটা ও প্রেম

রবীন্দ্রনাথ, দেড়শ বছর পর একটা প্রশ্ন আপনাকে:

কে আপনার নখ কেটে দিত যখন বিদেশ-বিভুঁয়ে থাকতেন,

সেই বিদেশিনী ? নাকি চৌখশ সুন্দরী ভক্তিমতীরা ?

যুবতীরা আপনার হাতখানা কোলের ওপরে নিয়ে নখ

কেটে দিচ্ছেন, এরকম ফোটো কেউ তোলেনি যে

ওকামপোর হাঁটুর ওপরে রাখা আপনার দর্শনীয় পা ? 

.

মহাত্মা গান্ধির দুই ডানা রাখবার সাথিনেরা

বোধহয় কেটে দিত নখ; কেননা বার্ধক্যে পৌঁছে

নিজের পায়ের কাছে নেইল-কাটার নিয়ে যাওয়া, ওফ, কি

কষ্টের, আমার মতন বুড়ো যুবতীসঙ্গীহীন পদ্য-লিখিয়েরা

জানে, প্রেম যে কখন বয়সের দাবি নিয়ে আসে ।

.

ফিসফিসে লোকে বলে সুনীলদার প্রতিটি নখের জন্যে 

উঠতি-কবিনী থাকে এক-একজন। জয় গোস্বামীরও 

ছিল, তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে সাগরের পাঁকে, জাহাজকে ছেড়ে। 

চাইবাসার ছোটোঘরে শক্তিদার নখ কেটে দিচ্ছেন প্রেমিকাটি

দেখেছি যৌবনে। বিজয়াদিদির নখ কেটে দ্যান কি শরৎ ?

.

যশোধরা তোর নখ কেটে কি দিয়েছে তৃণাঞ্জন কখনও ?

সুবোধ আপনি নখ কেটে দিয়েছেন মল্লিকার পা-দুখানি

কোলের ওপরে তুলে ? কবি কত একা টের পেতে, তার পা-এ

তাকালেই বোঝা যায়। যেমন জীবনানন্দ, হাজার বছর

খুঁজে চলেছেন কবে কোন বনলতা নখ কেটে দিয়ে যাবে তাঁর ।

রাবণের চোখ

শৈশবের কথা। সদ্যপ্রসূত কালো ছাগলির গা থেকে

রক্ত-ক্বাথ পুঁছে দিতে-দিতে বলেছিল কুলসুম আপা

‘এভাবেই প্রাণ আসে পৃথিবীতে ; আমরাও এসেছি

একইভাবে’। হাঁস-মুর্গির ঘরে নিয়ে গিয়ে আপা

আমার বাঁ-হাতখানা নিজের তপ্ত তুরুপে চেপে

বলেছিল, ‘মানুষ জন্মায় এই সিন্দুকের ডালা খুলে’।

.

রাবণের দশ জোড়া চোখে আমি ও-সিন্দুক

আতঙ্কিত রুদ্ধশ্বাসে দ্রুত খুলে বন্ধ করে দিই।

অমরত্ব

সালিশি-সভার শেষে তাড়া করে পিটিয়ে মেরেছে যারা, তারা

তোকেও রেয়াত করল না অবন্তিকা । আমরা দুজনে পচে

চলেছি হুগলি ঘোলা জলে ভেসে ; কী দোষ বলতো আমাদের ?

বউ তুই বৈভবশালীর : আমি গোপন প্রেমিক ছোটোলোক ।

সাম্যবাদ নিয়ে কত কথা চালাচালি হল তিরিশ বছরে ;

প্রেমিকের জন্যে নয় । কে জানে কাদের জ্ঞানে লেগেছে কেতাব…

প্রেমে পচে গলে হারিয়া যাওয়া ছাড়া যা থাকে তা অর্থহীন

সংসারের ঘানি টেনে কলুর বলদে মেটামরফোজড প্রাণী,

পার্টির ফেকলু কর্মী । ভালো এই লাশ হয়ে সমুদ্র ফেনার

বিশাল ঢেউয়ে ছেপে আঁশটে-আলোর পথে মৃত জড়াজড়ি…

কৃত্রিমতা

গাড়ির কাচটা নামা; গগলস খুলে ওই দ্যাখ

সেই সাব-এডিটর তোর অভিনয়ে কৃত্রিমতা

আছে লিখে তুলোধনা করেছিল তোকে অবন্তিকা

তাকিয়ে রয়েছে তোর পোস্টারের খাঁজে অপলক–

নাহ, অপলক বলা যুৎসই নয়, গিলছে রে

তোর সিলিকন-ঠাসা বুক দুটো। ভুলে গেছে ব্যাটা

ওদুটো কৃত্রিম, কিন্তু যৌনতার শিল্পবোধে ফেঁসে

লটকে পড়েছে তোর বুকের নিজস্ব অভিনয়ে।

তোর বহির্মুখ, অবন্তিকা

তোর বহির্মুখী দেহ, আদর-ক্লান্ত ঘামে, মুখপুড়ি মেছোমেয়ে

আলুথালু মরশুমে বেড়ে ও ফিকিরহীন, অপপ্রচারে, বুঝলি

জাহাজ ভাসাতে চাইছে পিম্পদের ঘোড়েল জোয়ারে ।

হাউ সিলি ! নো ? কী বলিস, ডারলিং, সুইটি পাই ?

তোর নাব্য নগ্নতা গ্লসি কাগজের চারু মলাটে হেলান দিয়ে

পুজো সংখ্যার মোটা বেহেডদের পাশে শুয়ে করছেটা কি ?

বল তুই ? তোর কোনো সে নেই ? বোবা না বধির তুই !

অলংকার-টলংকার বেচে খেয়েছিস জানি। বডির কাঠামো

দেখছি ঝুলে গেছে দশ বছর বাদে-বাদে কিস্তি দিতে-দিতে ;

হাউ স্যাড ! চ্যাংড়া যারা জোটে তারা টেকে না কেন রে ?

বছর না যেতেই কাট মারে ! অথচ বডিতো সরেস আজও

অক্ষরের ধাঁচে জমে একেবারে টানটান আগাপাছতলা

কন্ঠের টিউনিঙও শ্বাসকে ফুরিয়ে ফ্যালে রাত বাসি হলে ।

বেশ্যার আলতামাখা গোড়ালি দেখব বলে ভাবিনি কখনো– তাও

ব্যালেরিনা জোতোর আবডালে, ডারলিং, ঘামে ভেজা অবন্তিকা

প্রণামীর খাতিরে তুই কতরকমের ফাঁদ পেতে রেখেছিস

ডেথ মেটাল

মুখপুড়ি অবন্তিকা, চুমু খেয়ে টিশু দিয়ে ঠোঁট পুঁছে নিলি !

শ্বাসে ভ্যাপসা চোখের তলায় যুদ্ধচিহ্ণ এঁকে ডেথ মেটাল মাথা দোলাচ্ছিস

চামড়া-জ্যাকেট উপচে লাল নীল থঙ গলায় পেতল-বোতাম চোকার

ঝাপটাচ্ছিস সেকুইন গ্ল্যাম রকার খোলা বাদামি চুল কোমরে বুলেট বেল্ট

বেশ বুঝতে পারছি তোকে গানে ভর করেছে যেন লুঠের খেলা

স্ক্রিমিং আর চেঁচানি-গান তোর কার জন্য কিলিউ কিলিউ কিল

ইউ, লাভিউ লাভিউ লাভ ইউ কাঁসার ব্যাজ-পিন কব্জিবেল্ট

কুঁচকিতে হাত চাপড়ে আগুনের মধু’র কথা বলছিস বারবার 

আমি তো বোলতি বন্ধ থ, তুই কি কালচে ত্বকের সেই বাঙালি মেয়েটা ?

কোথায় লুকোলি হ্যাঁরে কৈশোরের ভিজেচুল রবীন্দ্রনাথের স্বরলিপি

কবে থেকে নব্বুই নাকি শূন্য দশকে ঘটল তোর এই পালটিরূপ

পাইরেট বুট-পা দুদিকে রেখে ঝাবড়া চুলে হেড ব্যাং হেড ব্যাং হেড ব্যাং

ঝাঁকাচ্ছিস রঙিন পাথরমালা বুকের খাঁজেতে কাঁকড়া এঁকে

পাগলের অদৃশ্য মুকুট পরে দানব-ব্লেড বেজ গিটারে গাইছিস

বোলাও যেখানে চাই নেশা দাও প্রেমজন্তুকে মারো অ্যানথ্র্যাক্স বিষে

মেরে ফ্যালো মেরে ফ্যালো মেরে ফ্যালো কিল হিম কিল হিম কিল

কিন্তু কাকে বলছিস তুই বাহুতে করোটি উলকি : আমাকে ?

নাকি আমাদের সবাইকে যারা তোকে লাই দিয়ে ঝড়েতে তুলেছে ?

যে আলো দুঃস্বপ্নের আনন্দ ভেঙে জলের ফোঁটাকে চেরে

জাপটে ধরছিস তার ধাতব বুকের তাপ মাইকে নিংড়ে তুলে

ড্রামবিটে লুকোনো আগুনে শীতে পুড়ছিস পোড়াচ্ছিস

দেয়াল-পাঁজিতে লিখে গিয়েছিলি ‘ফেরারি জারজ লোক’

ভাঙাচোরা ফাটা বাক্যে লালা-শ্বাস ভাষার ভেতরে দীপ্ত

নিজেরই লেখা গানে মার্টিনা অ্যসটর নাকি ‘চরম শত্রু দল’-এ

অ্যানজেলা গস কিংবা নাইটউইশ-এর টারজা টুরম্যান

লিটা ফোর্ড, মরগ্যান ল্যানডার, অ্যামি লি’র বাঙালি বিচ্ছু তুই

লাল নীল বেগুনি লেজার-আলো ঘুরে ঘুরে বলেই চলেছে

তোরই প্রেমিককে কিল হিম লাভ হিম কিল হিম লাভ হিম লাভ

হিম আর ঝাঁকাচ্ছিস ঝাঁকড়া বাদামি চুল দোলাচ্ছিস উন্মত্ত দুহাত…

ব্লাড লিরিক

অবন্তিকা, তোর খোঁজে মাঝরাতে বাড়ি সার্চ হল

এর মতো ওর মতো তার মতো কারো মতো নয়

যেন এমন যেন অমন যেন তেমন নয়

.

কী করেছি কবিতার জন্য আগ্নেয়গিরিতে নেমে !

এ কি, এ কি, কী বেরোচ্ছে বাড়ি সার্চ করে

কবিতায় ? বাবার কাচের আলমারি ভেঙে ব্রোমাইড সেপিয়া খুকিরা

কবিতায় । হাতুড়ির বাড়ি মেরে মায়ের তোরঙ্গে ছিঁড়ে বিয়ের সুগন্ধী                                                                                                  বেনারসী

কবিতায় । সিজার লিস্টে শ্বাস নথি করা আছে

কবিতায় । কী বেরোলো ? কী বেরোলো ? দেখান দেখান

কবিতায় । ছি ছি ছি ছি, যুবতীর আধচাটা যুবা ! মরো তুমি মরো

কবিতায় । সমুদ্রের নীলগোছা ঢেউ চিরে হাড়মাস চেবাচ্ছে হাঙর কবিতায় । 

পাকানো ক্ষুদ্রান্ত্র খুলে এবি নেগেটিভ সূর্য

কবিতায় । অস্হিরতা ধরে-রাখা পদচিহ্ণে দমবন্ধ গতি

কবিতায় । লকআপে পেচ্ছাপে ভাসছে কচি বেশ্যা-দেখা আলো

কবিতায় । বোলতার কাঁটাপায়ে সরিষা ফুলের বীর্যরেণু

কবিতায় । নুনে সাদা ফাটা মাঠে মেটেল ল্যাঙোটে ভুখা চাষি

কবিতায় । লাশভূক শকুনের পচারক্ত কিংখাব গলার পালকে

কবিতায় । কুঁদুলে গুমোট  ভিড়ে চটা-ওঠা ভ্যাপসা শতক

কবিতায় । হাড়িকাঠে ধী-সত্তার কালো-কালো মড়া চিৎকার

কবিতায় । মরো তুমি মরো তুমি মরো তুমি মরলে না কেন

কবিতায় । মুখে আগুন মুখে আগুন মুখে আগুন হোক

কবিতায় । মরো তুমি মরো তুমি মরো তুমি মরো তুমি মরো

কবিতায় । এর মতো ওর মতো তার মতো কারো মতো নয়

কবিতায় । যেন এমন যেন অমন যেন তেমন নয়

কবিতায়, অবন্তিকা, তোর খোঁজে সার্চ হল, তোকে নিয়ে কই গেল না                                                                                                       তো !

৩৬০

দেবারতিদি বিয়ে করলেন মণীন্দ্রদাকে

উত্তররৈবিক বাঙালির কবিতায়

সেই প্রথম ভাইবোনের বিয়ে

.

টেকো বিদ্বানরা বললেন, এসব হবে

জানতুম জানতুম জানতুম

.

খোঁপা বিদুষীরা বললেন

এম মা এবার কী হবে

.

হা-হা, কেউই জানত না, একটা সরলরেখা

এক থেকে আরেক বিন্দুতে নয়

৩৬০ রকমের জায়গায় যায়

.

কাটা আঙুলের মালা গলায় আমি

আঙুলপ্রমাণ বলে যে সুবিধায় রাক্ষসরা ভোগে

কনের আর বরের কবিতার হলুদ মেখে

চোখ মেরে ঘুচিয়ে দিলুম দিন-রাতের ফারাক

.

ওহ হো, বলা হয়নি, সে-আপ্যায়ণ দ্যাখে কে !

মধ্যবিত্ত কবি

আধুনিকতাবাদী কবিটি

বিষাদে ভুগতে হবে বলে ধুঁকছেন

মহানগরের ঘেয়ো কুকুরের মাছি

পুঁজ চেটে উড়ছেন

বিস্বাদ বিস্বাদ

অতিশয়োক্তি নোংরা বোবাও পারে

খণ্ডবাদীর ক্লিন্ন স্মারক জীবটি

ভনভন ভনভন

নেই কিন্তু ছিল

সেই লাল ল্যাঙোট দুদিক থেকে ফিতে দিয়ে কোমরে বাঁধা

আর সামনে দিকে লম্বা পাড় লাল নীল হলুদ সবুজ যে রঙ চাই

লিঙ্গকে বেকাবু হওয়া থেকে বাঁচাবার জন্য

লম্বাআআআআ খোলের ভেতর ভাঁজ-ভাঁজ টাকা

টাকাগুলো ঠেশে কুঁচকির মাঝে

যাতে অন্য লোকেরা মনে করে

উরিব্বাপ কোন পাড়ার চাঁদু

কী সাইজ রে

আসলে নেই — লিঙ্গই নেই লোকটার কিন্তু সিনেমার লাইনে

মারামারি করতে হবে আলিয়া ভাটকে পর্দায় পেতে

গায়ে সর্ষের তেলে মেখে ভিড়ে সেঁদিয়ে যাবার পেছল–

দাদা এটা আলিয়া ভাটের ফিল্ম নয় — কারিনা কাপুরের —

তো কী হয়েছে, যাঁহা আলিয়া তাঁহা কারিনা, তারা তো পর্দায়–

আসলে তো ল্যাঙোটে রয়েছে ডোডোপাখি

ভয় পেতে হলে ডায়নোসর, লম্বাআআআআ গলা

ঠেকাবেন কি করে ? কী আর করা যাবে বলুন !

ফসিল তো আছে । লাল ল্যাঙোটের জীবাশ্ম !

আমার স্বদেশ

আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে আদিবাড়ি উত্তরপাড়া আমার দেশ নয়

জানি গঙ্গায় অপরিচিতদের চোখ খুবলানো লাশ ভেসে আসে

আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে পিসিমার আহিরিটোলা আমার দেশ নয়

জানি পাশেই সোনাগাছি পাড়ায় প্রতিদিন তুলে আনা কিশোরিদের বেঁধে রাখা হয়

আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে মামার বাড়ি পাণিহাটি আমার দেশ নয়

জানি কোন পাড়ায় দিনদুপুরে কাদের খুন করা হয়েছে

আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে শৈশবের কোন্নগর আমার দেশ নয়

জানি কারা কাদের দিয়ে কাকে গলা কেটে মারতে পাঠায়

আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে যৌবনের কলকাতা আমার দেশ নয়

জানি কারা কাদের বোমা মারে বাসে-ট্রামে আগুন লাগায়

আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে পশ্চিমবঙ্গ আমার দেশ নয়

এদেশের লকআপে পিটুনি খেয়ে থেঁতলে মরার অধিকার আমার আছে

এদেশের চা-বাগানে না খেতে পেয়ে দড়িদঙ্কা হবার অধিকার আমার আছে

এদেশের চটকলে গলায় দড়ি দিয়ে ঝোলার অধিকার আমার আছে

এদেশের দলগুণ্ডাদের পোঁতা মাটির তলায় হাড় হবার অধিকার আমার আছে

এদেশের ধনীদের ফাঁদে ফেঁসে সর্বস্বান্ত হবার অধিকার আমার আছে

এদেশের শাসকদের বাঁধা লিউকোপ্লাস্ট মুখে বোবা থাকার অধিকার আমার আছে

এদেশের নেতাদের ফোঁপরা বক্তৃতা আর গালমন্দ শোনার অধিকার আমার আছে

এদেশের অবরোধকারীদের আটকানো পথে হার্টফেল করার অধিকার আমার আছে

আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে বাংলাভাষা আমার স্বদেশ নয়              

সাবর্ণভিলার আত্মহত্যা

আমাদের সাবর্ণভিলার, নোনাঝুরো খণ্ডহর

আত্মহত্যা করে নিল আজ

কাছারিবাড়ির তিনশ বছরের নীল অন্ধকারে

ঝুলছে নিঃসঙ্গ একা নতুনকাকার মেয়ে পুটি

বেঁধে গিঁট জামদানি শাড়ি

ফাক ইউ

আছড়ে কেলিয়ে পড়ে গেল আজ আশি বছরের মহীরুহ

প্রতিষ্ঠানের রেডউড ; অপগণ্ড শোকক্যালা পরগাছা নিয়ে

খোকাখুকু উইপোকাদের কাঁধে চলল ক্যাওড়ায়

.

শুরু হল সবুজ শতক জুড়ে শিশিরের রোদেলা হুল্লোড়

ঘাসফুলে বুনোবীজে দুর্দম হাত-পা ছড়ানো উদ্দাম

অবশ্যি এরাও জানে শিগ্গিরি আলো-হাওয়া চাপা দিয়ে যম

উঠে যাবে আরেকটা রক্তচোষা গদাইলস্কর ভুঁড়ো ডেডউড ভাম

চুষে খাবে ওদেরই মাটির গন্ধ কচিতাজা সুখের স্বাধীন

.

যদ্দিন তা না হচ্ছে তদ্দিন কাশফুলে মুথাঘাসে দুর্বাদলের শীষে

মৌমাছি প্রজাপতি ফড়িঙেরা গেয়ে নিক  ফাকিউ ফাকিউ সুরে

ফাকিউ ফাকিউ ফাক ইউ ফাকিউ ফাকিউ ফাক ইউ..

সোনাগাছিতে বৃষ্টি

পাকানো সিঁড়ির শেষে, তিন তলার বাঁকে, বলল পিসতুতো দাদা

“এই হল সোনাগাছি, শহরের রানি, ফি-রাত্তিরে পাঁচ লিটার

খোকাখুকু জমা হয় এ-পাড়ায়, ভেবে দ্যাখ, মৌজমস্তিতে নষ্ট

কত-শত মহান পুরুষ-নারী, জন্মাবার আগেই খাল্লাস ;

ওই যে গুটকাঠোঁট মাসি, ওকে বললেই, যাকে চাই নিস–

এখন তো চুলখোলা মেয়েদের নধর দুপুর, সকলেই ফাঁকা,

হাফরেটে সুন্দরীতমাকে পেয়ে যাবি ; কাজ আছে, আমি চললুম ।”

.

‘ঘরে নয়, বিছানায় নয়, চলো না কালবৈশাখিতে ভিজে

প্রেমিকার অভাব মেটাই’, বলি কালো মেয়েটিকে ।

.

চুড়িদার শ্যামলিমা আর আমি কোমর জড়িয়ে

আহিরিটোলার ঘাটে ঝোড়োজল গঙ্গায় নামি–

ও হয় ফোলানো পালের নৌকো, চিৎসাঁতার দোল খায়

আমি হই লগিঠেলা ভাটিয়াল মাঝি ।

.

“আবার এসো কিন্তু, অ্যাঁ, প্রেমিকা ভেবেই চলে এসো

যেদিন পড়বে বৃষ্টি, ভেতরে তো ভিজছি না

বাইরের ভেজবার রোগটুকু দিয়ে চলে যেও ।”

সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি 

 ‘সি এম জিন্দাবাদ’ নিশিডাক ; পিছনে ফিরতেই, চিৎকারকারী

সাবর্ণভিলার ছায়াছ্যাঁদা সিংদরোজার চৌকাঠে

ছোরাটা ঢুকিয়ে দিল খুড়তুতো ভাইয়ের পেটে !

“সি এম ? সি এম ?” গলিটা দৌড়োয় দুদ্দাড়

‘না, না, মুখ্যমন্ত্রীর জয় চায়নি গো, পালাও পালাও’

ছলকানো আতঙ্কের ঘড়া ফেলে ন্যাতাদঙ্কা খাওয়া-পরা মাসি

লেংচে ছুটতে গিয়ে খালি পেটে বমি করে তলপেট চেপে

যাবতীয় তত্ত্বের কস্তাপেড়ে থুতু : অস্ত্র কি মিসানথ্রপিস্ট

গামছামুখো ছুরি ছোরা ন্যাপালা ভোজালি বোমা বন্দুক ?

আজকে পেলুম টের ঊর্ধ্বশ্বাস বুক থেকে নয় । চিতাবাঘ গতি

ঘিলুতে জীবাশ্ম সেজে আলোর গণিত নিয়ে টুঁটি টিপে নামে :

‘সি এম তো চারু মজুমদার’

ঋতুর মানুষসংহার

শরৎকাল এসে গেছে নাকি ! কই, বলেনি তো কেউ !

বাড়িতে বাংলা ক্যালেণ্ডার নেই, পাঁজি নেই, জানি না কখন কোন ঋতু

আসে আর চলে যায়, যৎসামান্য শরতের উঁকি মারা টের পাই

যখন সংবাদে শুনি চাষিরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়ে

শরৎকে নিমন্ত্রণ করে আনছে । বর্ষায় বৃষ্টি তো হয়নি ;

যেখানে হয়েছে সেখানেও এতো বেশি ডুবে গেছে খেত–

খরা আর বানভাসি মিলে শরতের টুঁটি টিপে চাষিকেই শুধু নয়,

দালাল ও আড়তদারকেও বিপদে ফেলেছে ।

শরতের আকাশের কথা বাল্যে যা পড়েছিলুম তার কোনো কিছু

দেখি না আকাশে হাওয়ায় । শধু তো ডিজেলের গুঁড়ো

কুয়াশার পরিবর্তে নীলাভ ধোঁয়ায় ঢাকা কসমোপলিস । 

রাতে হয়তো চাঁদ কোনো চল্লিশতলার ছাদে নেমেও নামে না

রেভ পার্টি চলছে সেখানে অর্ধেক উদোম নেশারিনীদের

অ্যাসিড রকের সাথে মেটালিক বাজনায় চলছে নাচানাচি ।

বোনাসের টাকা নিয়ে মধ্যবিত্তের দল নেমেছে বাজারে

শরৎকে কিনে বাড়ি নিয়ে যাবে বলে

কিন্তু শরৎ তো উধাও, কেবল বাজার পড়ে আছে তার

ধুন্ধুমার উৎসবের ফাঁকা ঢোল নিয়ে ।

কলকাতা

খেলছে নরমুণ্ড নিয়ে দুটো দল, ফুটবল

মারছে ফ্রিকিক করনার কিক বাইসিকেল কিক

নৃমুণ্ড হাসছে চেঁচিয়ে নেচে ওপরে হাওয়ায় ভেসে

কামড়ে ধরছে টুঁটি, ছিঁড়ে ফেলছে কন্ঠনালী

মাঝমাঠে দুই দল ল্যাংটো খেলোয়াড়দের —

.

যতক্ষণ খেলা চলল এক-এক করে

সবকটা খেলোয়াড় ঘাসেতে লুটিয়ে পড়ল আর

মাঝমাঠে গিয়ে বাউন্স খেয়ে-খেয়ে

অট্টহাসি হাসতে লাগল মানুষের কাটা মুণ্ডুখানা

চে গ্বেভারা

বলুন তো চে গ্বেভারা

চাষির সুপক্ক ধান

তাও এক প্রান্তিক চাষির

মাঝরাতে কেটে নিলে কারা 

কপালে ব্যাণ্ডেনা-বাঁধা কোন বিপ্লবীরা

টি-শার্টে আপনার সেই বিখ্যাত ছবি !

স্যানিটারি ন্যাপকিন

ভালোবাসা ওই মেয়েটির মতো যার

স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল ; মাসে 

সাড়ে তিন দিন কাপড়ে শুকনো ঘাস

বেঁধে, পরে থাকতে হবে ; বর্ষায়

ঘাস তো সবুজ, তখন কাপড়ে ছাই

মুড়ে, রক্ত শুষে রাখবার তরকিবে

চুপচাপ বইহীন একা বসে থাকা ।

পিঠচুলকানি

মহিলা আলোচক বলেছেন, ‘পিঠচুলকানি’ —

পড়ে, কী বলব, ওনার পিঠটা দেখতে পেলুম,

ওনাকে তো দেখিনি কখনও । উনি কি আমার মায়ের মতন ফর্সা ?

মেজজ্যাঠাইমার মতো যাকে বলে উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ? হলেই বা কালো !

ওনার পিঠে ডান দিকে লাল রঙের আঁচিল আছে ? মায়ের ছিল ।

বড্ডো দেখতে ইচ্ছে করছে আলোচকদিদির পিঠ ; শিরদাঁড়ার দুদিকে

মাংসের ঢেউ নেমে চলে গেছে সামনের দিকে যেদিকটায়

হাত এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে চুরি করতেই অবন্তিকা বলেছিল

‘ওখানটায় তো চুলকোতে বলিনি, মাঝখানে, যেখানে হাত পৌঁছোচ্ছে না

সেখানে’ । কিন্তু চুলকোনো ছাড়াও তো হাতের কাজ আছে !

পিঠের ওপরই যদি একটা প্রেমের কবিতা লিখতে শুরু করি

তা কি এগিয়ে যাবে না অন্তমিলের দিকে ? তুই তো আমার মা নোস–

কবিতার আলোচকও নোস যে তাঁর খোলা পিঠে হাত দিয়ে বলব

‘ওগো, দাও না, একটু চুলকে দিই তোমার পিঠটা,

মায়ের জন্যে আজকাল বড্ডো মনকেমন করে।’

আমার ঠাকুমাকে যেন বলবেন না

উনি আমাকে পছন্দ করতে বারন করেছিলেন

আপনি কেন পছন্দ করছেন, নীরা ?

আমি আজো শুঁয়োপোকা-ঠাশা ঈশান মেঘে চিৎসাঁতার দিই

উনি পঞ্চাশ বছর আগে আমার কবিতা চাননি

আপনি কেন চাইছেন, নীরা ?

আমি আজো জলের দশপা গভীরে বরফের লাঠি চালাই

উনি আমার সাবজুডিস মামলায় সম্পাদকীয় লিখেছিলেন

আপনি সম্পাদক হয়ে কেন লেখা চাইছেন, নীরা ?

আমি আজো স্মোকড পেংগুইনের চর্বির পরোটা খেতে ভালোবাসি

উনি আমার কবিতার বইয়ের প্রকাশক হয়েও স্বীকার করেননি

আপনি কেন স্বীকৃতি দিচ্ছেন, নীরা ?

আমি আজো দুপুর-গেরস্হের হাঁমুখে সেঁদিয়ে ফ্যামিলিপ্যাক হাই তুলি

উনি আমার নাম উচ্চারণ করতে চাইতেন না

আপনি কেন তরুণদের কাছে করছেন, নীরা ?

আমি আজো রক্তঘোলা জলে টাইগার শার্কদের সঙ্গে বলিউডি নাচে গান গাই

উনি বলেছিলেন ওর মধ্যে সত্যিকারের লেখকের কোনো ব্যাপার নেই

আপনি কেন মনে করছেন আছে, নীরা ?

আমি ইমলিতলায় জানতুম কাঠকয়লা ছাড়া ইঁদুরপোড়ার স্বাদ হয় না

উনি বলেছিলেন ওর কোনো ক্রিয়েটিভ দিক নেই

আপনি কেন মনে করছেন আছে, নীরা ?

আমি অন্তত পাঁচ হাজার কোটি টাকার ব্যাঙ্কনোট পুড়িয়ে মড়ার গন্ধ পেতুম

উনি বলেছিলেন ওর দ্বারা কোনোদিন কবিতা লেখা হবে না

আপনি কেন মনে করছেন হয়েছে, নীরা ?

আমি অ্যামস্টারডামের খালপাড়ে হাঁ-করা বুড়োদের লিরিক শুনেছি

উনি সেসময়ে দুঃখ থেকে রাগ আর রাগ থেকে বিতৃষ্ণায় উঠেছেন

আপনি এতো উদার কেন, নীরা ?

আমার ঠাকুমাকে যেন প্লিজ বলবেন না । 

কমেডি হল ট্র্যাজেডির পরগাছা

কী নাম ছিল যেন সেই সম্পাদকের ? ‘জনতা’ পত্রিকার ? ১৯৬১ সালে 

লিখেছিলেন, ‘টিকবে না, টিকবে না,’ প্রথম পাতায় !

উনি ? হ্যাঁ, বোধহয় মোগাম্বো ওনার নাম ।

তারপরে ১৯৬২, ১৯৬৩, ১৯৬৪, ১৯৬৫, ১৯৬৬

কে যেন সেই বেঁটেখাটো লোকটা লিখেছিল দৈনিকে

‘ওঃ, ও আর কতোদিন, টিকবে না, টিকবে না,’ সাহিত্য বিভাগে

কী যেন কী ছিল নাম, আরে সেই যে, সপ্ল্যানেডে, বুকস্টলে,

মনে পড়ছে না ? কোথায় গেলেন উনি, সেই যে !

গাবদাগতর এক লিটল ম্যাগাজিনে লিখলেন–

উনি ? হ্যাঁ, বোধহয় ডক্টর ডাঙ ওনার নাম ।

তারপরে ১৯৬৭, ১৯৬৮, ১৯৬৯, ১৯৭০, ১৯৭১, ১৯৭২

মনে আসছে না ? চোখে চশমা ? হন হন পাশ কাটিয়ে–

উনি ? হ্যাঁ, বোধহয় গব্বর সিং ওনার নাম ।

কেন যা পারোনি রাখতে মনে করে ওনাদের পিতৃদত্ত নাম ।

পঞ্চাশ বছরেই ভুলে গেলে ? গেলেন কোথায় ওঁরা !

আরে সেই যে সেই ঢোলা প্যান্ট চাককাটা বুশশার্ট ?

লিখলেন অতো করে, ‘টিকবে না, টিকবে না।’

তারপরে ১৯৭৩, ১৯৭৪, ১৯৭৫, ১৯৭৬, ১৯৭৭, ১৯৭৮, ১৯৭৯

১৯৮০, ১৯৮১, ১৯৮২, ১৯৮৩, ১৯৮৪, ১৯৮৫

১৯৮৬, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৮৯, ১৯৯০, ১৯৯১, ১৯৯২

১৯৯৩, ১৯৯৪, ১৯৯৫, ১৯৯৬, ১৯৯৭, ১৯৯৮, ১৯৯৯

২০০০, ২০০১, ২০০২, ২০০৩, ২০০৪, ২০০৫, ২০০৬, ২০০৭

২০০৮, ২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫

কী ? মনে পড়ল না এখনও ! অদ্ভুত লোক তো তুমি !

অতগুলো লেখক সম্পাদক কবি পই পই করে

লিখে গেল, ‘টিকবে না, টিকবে না, বেশিদিন টিকবে না

শিগগিরই ভুলে যাবে লোকে ।’ অথচ তাদেরই নাম

মনে আনতে এত হিমশিম ? তবে তাই হোক ।

মোগাম্বো ডক্টর ডাঙ ও গব্বর সিংহ নামে

বাঙালির ইতিহাসে ওনাদের তুলে রেখে দিই ।

বজ্জাতির জন্য প্রেমের কবিতা

রক্ত তৈরি হচ্ছে তোর দেহে ।শুনতে পাই মিহিন আওয়াজ ।

সাহিত্যিক ক্রিমিনাল আমি ।ইচ্ছামতো শব্দদের ভাঙি ।

প্রথম চুমুর স্মৃতি আছে ।প্রজাপতি উড়েছিল পেটে ।

কার শবে সুগন্ধ ছিল বল ।র‌্যাঁবো না রবিঠাকুরের ।

যতো শিগ্গিরি পারি মানেদের ।মুছে ফেলে অন্য মানে দিই ।

ব্যকরণ এমন শয়তান ।অথচ মূর্ছা যায় আমি ছুঁলে।

ব্যাখ্যাদের তুলে নিয়ে গিয়ে।ধাপার জঞ্জালে ফেলে দিই।

মর্ত্য যে যক্ষ্মায় ভুগছে। পালাবার পথ বাকি নেই।

শ্রেষ্ঠ দুঃস্বপ্ন সুসৃজন। কবিতা খোঁচাতে জানে ডোম।

ক্যালেণ্ডারে কবে ঢুকবে ভেবে।মধ্যবিত্ত হিমশিম খাক ।

পয়লা জানুয়ারি থেকে বৈশাখ ।জন্মমৃত্যুর মাঝে ডুবে ।

মজার ব্যাপার হলো এই ।আমরা মানুষ এখনও ।

হায় নরহত্যার অভিলাষ ।সকলে মেটাতে পারে কই।

এরা বলে আমি ফেরাউন । ওরা ডাকে আমি মালাউন।

আমার নির্দিষ্ট বাড়ি নেই।শহর থেকে শহরে বেড়াই।

রক্ত তোর তৈরি হচ্ছে দেহে ।তাতে শ্রম পুরোটা আমার।

ন্যাংটো তন্বীর জন্য প্রেমের কবিতা

কুচকুচে চকচকে পুংঘোড়ায় বসে আছো ন্যাংটো তন্বী

তোমার কুলকুচি-সুধা খেয়ে পৃথিবীর নেশা ধরে গেছে

তার ফল এদান্তি ফলছে রসেবশে ধোঁয়ায় কান্নায়

চুলেতে রঙিন-ফুল গুঁজেছিলে বিপ্লবী শতকে

তাই থেকে শুরু হলো দেংজিয়াও পিঙ্গের বিড়ালের রঙ

মারামারি ঠোকাঠুকি শেষে সেই টাকমাথা পুরুষ ময়না

মাওবাদী বনপ্রান্তে কুঞ্জমাঝে খসখসে হেঁকে গায়

চুলে গিঁট পড়ে গেলে কোনো চিন্তা নেই

স্বর্গ-নরক-মর্ত্য সর্বত্র চিরুনি আছে

চিরুনি-তল্লাশ আছে, এক পা সামনে আর দুই পা পেছনে

সেই গ্রেট লাফ দিয়ে সামনে আঁৎকে দেখলে চারিদিকে রক্ত কেবল

শুধু তোরা দুচোখের পাতা রাংঝালে জুড়ে চলে যাস

সাংস্কৃতিক বিপ্লবে আনন্দিত লোকগুলো আজ বুড়ো-বুড়ি

অবশ্য অনেকে দুর্ভিক্ষে মরে গেছে, মাটির তলায় হাড়

শেষে কিনা বিপ্লবের জায়গায় প্রতিবিপ্লব !

কুচকুচে চকচকে পুংঘোড়া হাঁকিয়ে ন্যাংটো তন্বী তুমি

দুর্বিপাক ডেকে আনলে ঝুলে-পড়া গোলার্ধ দুটোয়

জুজুবুড়ি জুজুবুড়ো খোকোন খুকুরানি তটস্হ সক্কলে…

কঙ্কালের দেশের জন্য প্রেমের কবিতা

ভেঙে-ভেঙে পড়ছে শহরের রাস্তায় পথে গলিতে ঝুরোঝুরো কঙ্কাল

অপেক্ষা করছি তারা ঘুরে দাঁড়িয়ে এবার আমার সঙ্গে নাচবে

আমি তাদের মাংস-মজ্জা-রক্ত-চামড়া খেয়ে কঙ্কালের নান্দনিকতা দিয়েছি

সাপের ফণা দিয়ে দেশের ইতিহাস লেখার পর এই কঙ্কালগুলোকে

তাদের চেহারা ফিরিয়ে দেবো কিন্তু কোনোটাই মানুষের কঙ্কাল হয়ে উঠবে না

বহুকাল আগে মানুষরা থাকতো এই দেশে তারাই এখন জানোয়ারের কঙ্কাল

সবাই চাইছে তাদের শুকতারায় নিয়ে গিয়ে দাহ করা হোক

শিস দিই ছুটে আসে রক্তমাখা বাদামি নেকড়ের দল

সাপেদের মুখ থেকে গলগল করে কুচকুচে রক্ত বেরোয়

সাপেদের দাঁত থেকে ফিনকি দিয়ে নীল বিষ ছিটকে ভেজায় কঙ্কালদের

আমি বিষ খাই বিষ খাই বিষ খাই দীর্ঘ হয়ে উঠি

আকাশে মাথা ধাক্কা খেলে বুঝতে পারি উড়ছে অন্ধ পেঁচারা

আমার চোখ লক্ষ্য করে কঙ্কালরা হাড়ের স্লোগান আওড়ায়

চারিদিকে মানুষীদের জরায়ু পড়ে আছে বিষে নীল

নেকড়েরা তবুও জরায়ু টানাটানি করে চলেছে

আমি দীর্ঘ হতে থাকি দীর্ঘ হতে থাকি দীর্ঘ হতে থাকি

বিষ আমাকে এতো ক্ষমতা দেবে তা তোমরা জানতে না

তোমরা মানুষ ছিলে এককালে এখন জানোয়ারের কঙ্কাল হয়ে গেছো

কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর প্রেমের কবিতা

রক্ত খেতে শেখানো হয়েছিল তাই রক্তকে টনিক মনে করে খেয়ে চলেছি

মানুষের কালো রক্ত গোরুর সবুজ রক্ত বাঘের নীল রক্ত

যতো রক্ত আকাশ থেকে চুয়ে-চুয়ে পড়েছে আর বয়েছে নদীগুলোয়

সবই আমার খাওয়া

খেয়ে হেগে বের কে দিয়েছি ওদের

রক্তগুলো গুয়ের সোনালি রঙের ছিল না

ছিল কালো সবুজ নীল কমলা বেগুনি হলুদ

সেগুলো কেউটে হয়ে আমার পড়ার টেবিল ঘিরে সারা দিন নাচে

বলে, রক্ত খাও রক্ত খাও রক্ত খাও

নয়তো সব নদী-নর্দমা শুকিয়ে যাবে

লোকেরা লাশ ভাসাতে পারবে না

চাষ করে গাছে-গাছে মুণ্ডু-ফসল ফলাতে পারবে না

স্যানিটারি ন্যাপকিন কনডোম শিকনি ফেলতে পারবে না

রক্ত খেতে শেখাবার সময়ে ওরা বলেছিল, যাও

গন্ধমাদন তুষারে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো নামে আয়ুর্বেদিক পৌধা আছে

রক্ত খেতে-খেতে ল্যাজের কেতন উড়িয়ে আমি পৌঁছোলুম

গন্ধমাদন গ্লেসিয়ারে দেখলুম কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর নাম পালটে গেছে

ভেতরের লেখাগুলো পালটে তার নাম হয়ে গেছে মনুস্মৃতি

বইটা খুলতেই রুশ ভাষার অক্ষরগুলো ঝরে পড়তে লাগলো

বরফের আগ্নেয়গিরি থেকে বেরিয়ে চেঁচাতে লাগলো

ফিরে গিয়ে যাকে পাবি তার রক্ত চেটেপুটে খাবি

তাছাড়া নদী-নর্দমা শুকিয়ে যাচ্ছে, মানুষ বিষাক্ত পৌধা হয়ে যাচ্ছে

আমি রক্ত খেয়ে খেয়ে খেয়ে খেয়ে খেয়ে খেয়ে বাঁচতে শিখে গেছি

যেদিকে তাকাই পৌধার পর পৌধামানুষের মুণ্ডু হাসাহাসি করছে

শাশুড়ির জন্য প্রেমের কবিতা

বাঁশদ্রোণী বাজারে শাশুড়িদের ভিড়ের ভেতর হাঁটতে-হাঁটতে আমি

আমার শাশুড়িহীন জীবনের অভাব মেটাবার চেষ্টায়

ভারি-ভরকম এক শাশুড়িকে বলি, দিন থলেটা, পৌঁছে দিচ্ছি–

উনি বলেন, না, আমার ড্রাইভার আছে

একজন শাশুড়ির কাছে কি তাহলে ড্রাইভারের গুরুত্ব বেশি !

বোঝা উচিত ছিল, কেননা ওনার শাড়ি থেকে 

বিদেশি পারফিউমের সুগন্ধ পাচ্ছিলুম

আরেকজন শাশুড়ির কাছে গিয়ে জামাইষষ্ঠীর দিনের অভাব মেটাবার জন্য

কিছু বলার আগেই উনি বলে ওঠেন

ও বাবা একটু মাছটা টাটকা কিনা দেখে দাও তো

আমার জামাই চিতল মুইঠা খেতে ভালোবাসে

শাশুড়ি ছিল না বলে চিতল মুইঠা খাইনি কখনও

তবু বলি, চিতল এরকমই হয়, তেমন টাটকা তো পাবেন না

জামাইষষ্ঠীর বাজারে এসে আজ মনে হচ্ছে পুরো জগতটাই

শাশুড়িময়, শুধু আমার ভাগ্যেই শাশুড়ি জুটলো না

জানতে পারলুম না জামাইষষ্ঠীতে জামাইদের ভূমিকা কি

শাশুড়িরা সেদিন জামাইদের নিজের মেয়ের চেয়ে বেশি আদর করেন নাকি

কেমনভাবে কি-কি করেন ধুতি-পাঞ্জাবিতে হিরো জামাইকে নিয়ে

আমার শাশুড়ি থাকলে আমি তাঁকে প্রণাম করবার জন্য

ঠোঁটে একটা চুমু খেতুম

উনি আমায় জড়িয়ে ধরে সকলের সামনে আদর করতেন

আমি ওনাকে সালমান খানের ফিল্ম দেখাতে নিয়ে যেতুম

ম্যাকডোনাল্ড কে এফ সি ডোমিনোজ পিৎজায় নিয়ে যেতুম

ব্ল্যাক ফরেস্ট আইসক্রিম খাওয়াতুম

সারা বাঁশদ্রোণী বাজার আজ ছেয়ে গেছে শাশুড়িতে

এনাদের অনেকের ঠোঁটেই চুমু খাওয়া যায়

ভিড়ের ভেতরে আমি জামাইহীন শাশুড়ির খোঁজ করি

শেষে পেয়ে যাই একজনকে, উনি বলেন, ওনার ভাগ্য বড়ো খারাপ

মেয়েও হয়নি আর ছেলেও হয়নি, আর দ্যাখো, শাশুড়িগুলোর ঢঙ

আমি বলি, চলুন, তাহলে বাজার করে দিচ্ছি

আমারও শশুর নেই, শাশুড়িও নেই

কিন্তু আপনার ঠোঁটদুটো খুবই সুন্দর, এই বয়সেও মেইনটেন করেছেন

উনি বলেন, না করলে আর পথজামাইদের ধরব কেমন করে !

আমি কাননদেবীরে বুঝি নাই, সুচিত্রা সেনরে বুঝি নাই

 Alfred Newton : “Poetry is a kind of ingenious nonsense.”

বহুকিছু বুঝি নাই আমি, বহু লেখাজোখা, বহু আঁকজোক, নক্ষত্ররাজি

আমার গ্রন্হ যাঁহারা কোনোদিন হস্তে লন নাই, তাহাঁরাও

আমাকে পছন্দ কখনও করেন নাই এমনও দেখিয়াছি–

আমিও চাহি না তাহাঁদের পছন্দের তালিকায় আমার

কুনামখানি ঘাপটি মারিয়া থাকে, তাহাঁদের রোগগ্রস্ত করে–

জিজ্ঞাসা করিবার মতো কেহ নাই ; কেই বা বলিয়া দিবে

সাতাশ নক্ষত্র হতে কী কারণে একটি নক্ষত্রের নাম বাছিলেন

সেইটি চব্বিশতম, নক্ষত্রগণের ক্রীড়া কভূ বুঝি নাই

কাননদেবীরে বুঝি নাই, সুচিত্রা সেনরে বুঝি নাই

অহো, সে কি নক্ষত্রের আলো, তাহাঁদের বায়োস্কোপের

গবাক্ষগুলিতে তাহাঁদের জ্যোতি দেখিবার জন্য জনসমুদায়

কাড়াকাড়ি মারামারি করিতেছে, ক্রমে বৃদ্ধাবৃদ্ধ, তাহাঁদের পক্ককেশে

শেষ আলো কোথায় হারায়ে গেছে, তাহাঁরা কেহ কভূ

জানিতে পারেন নাই ; অহো, কেমনে একটি রকেট চাঁদে যায়

ফিরিয়া চলিয়া আসে পুনরায় ! কেহ কেহ রকেট বিজ্ঞানাশ্রিত কবিতায়

চুপিসাড়ে কোয়ান্টাম বাস্তবের ফাঁদখানি পাতিয়া অপেক্ষা করেন

যেমন বিষ্ণু দে, তাহাঁর পংক্তিগুলি রকেটগণিতে কেন যে আক্রান্ত

বুঝি নাই ; আমি যোগেন চৌধুরী বুঝিয়াছি, গাইতোণ্ডে বুঝি নাই–

কুড়ি কোটি টঙ্কায় তাহাঁর তৈলচিত্র বৈভবশালীগণ ক্রয়ের গৌরবে

নিজ-নিজ নাম টঙ্কাক্ষরে লিপিবদ্ধ করিবার ক্রীড়ায় মাতেন

অহো, অহো, আমি অলোকরঞ্জন বুঝিয়াছি, আলোক সরকার বুঝি নাই–

তিন দিনে এক পংক্তি লিখিবার পর, আরেক পংক্তি আঠাহীন

নিম্নের সিঁড়ির ধাপে স্হান লয় ; প্রথম পংক্তির ন্যায় সেটিও কবিতা–

বুঝি নাই প্রতিটি পংক্তি যদি কবিতার রূপ লয়

তাহারা কি বিচ্ছিন্ন সমাপতনের অষ্টমগর্ভের সন্তান–

মাধুরী দীক্ষিতের যেনবা কটিদেশ, আলিয়া ভাটের বেবি ঠোঁটের ফুলেল–

অমিয় চক্রবর্তীর কুহকবিহীন নিরাসক্ত হাহাকারহীন স্বপ্নহীন ঢঙে

অনুসরণের পথে দেখি আলোক সরকার; ছোটোলোকপাড়ার যুবা আমি

সদ্য দাড়ি গজাইবার আনন্দে হাত বুলাই, অচিন্ত্যনীয় চিন্তা করি–

“উতল নির্জন” হইলা কেমনে ! “নির্জন” তো জীবনানন্দীয়,

যাহাঁর কবিতার বিপুল ঝঞ্ঝা কৃষ্ণচশমায় করিয়াছিলেন রুদ্ধ ?

“আমার তো জানা নেই সহসা এ রঙ্গের প্রণয়” — বুঝি নাই আমি —

“আমাকে তা দেওয়া কেন যা আমার নয়” — বুঝি নাই আমি —

খ্রিস্টিয় ইংরাজগণ লইয়া আসিয়াছিল তাই, ফরাসি কবিতা বাংলায়

মধ্যবিত্ত বাঙালির আধুনিকতাবাদী ধুম্রজালে আলোক সরকার

পংক্তি ধরিবার জন্য নিবেশ করিয়াছেন চিত্রের অনৈক্যের খাতে

বয়সের সাথে-সাথে পংক্তিসমূহ পারস্পরিক জুয়া খেলিয়াছে

আধুনিকতাবাদী মহাআধুনিক কবিমহাশয়, গবাক্ষটি মালার্মের ছিল

অথবা সপ্তদশ শতকের ঝঁ লা ফনতা, উনিশ শতকে আলফসেঁ দ্য লামার্তিন

কেন কেহ আপনাকে ডাডাবাদী রাইজোম্যাটিক বলিবে না

পংক্তির পরের পংক্তির মাঝে আঠা নাই ! রজঃ বা বীর্যের আঠা ?

কখনো বা ঠাটা গদ্যে স্বগতসংলাপ কবির নামের ওজনে উঠে যায়

অতিসংহতির কূপে ইহাও কি “নিরাশাকরোজ্জ্বল চেতনার” ঢেউ নহে ?

আলোক-অলোক-দীপংকরের কন্ঠ শুনিয়াছি বালিগঞ্জের ধনীগৃহে–

শুনিয়াছি ঢেউগুলি স্ব স্ব দেহে সাবান মাখিবার পর ফেনাখেলা করে–

বাক্যগুলি অবজেকটিভ প্রতিস্ব লয়ে যাত্রা করে এবং সাবজেকটিভিটি

কাঁধের উপরে লয় “আলোকিত সমন্বয়” ; উহা কি প্রকৃতই সমন্বয় ছিল ? 

তাহাঁদের বঙ্গীয় চাহনিতে কলিকাতা নাই কেন ? বাস্তব কলিকাতা !

ঘরের বাহিরে চাহিয়া দ্যাখেন নাই আপনি ও আপনারা —

নিজ গৃহকোণকেই ঐতিহ্যপীড়িত “বিশুদ্ধ অরণ্য” রূপে মস্তিষ্কের কোষে

বোদল্যারি “শাণিত বিষাদ” নিপুণ বিন্যাসী বিলাসিতা পায়; অথচ শহর নাই

দেহের ভিতরে “দুই পাশে সবুজ ঘাসের স্বাভাবিক” । রিয়্যালি ? স্বাভাবিক ?

“কোনো পদচিহ্ণ নাই” ; আমরা যাহারা ছোটোলোক, দেখিতেছি

অজস্র মানুষ, হাজার লক্ষ পদচিহ্ণ প্রতিদিন প্রতিটি মুহূর্তে কোথায় হারায়ে যায়

এইসব মানুষের কোনোরূপ “আশ্রয়ের বহির্গৃহ” নাই ; আপনার আছে–

আপনাদিগের, আলোক-অলোক-দীপংকর মহাশয়দের…..

আলোচকদের জন্য প্রেমের কবিতা

যা ইচ্ছা লিখুন আপনারা, গালমন্দ, খিল্লি, খিস্তোনি

আমি চাই শুধু, ব্যাস, লেখা হোক, কিছু লেখা হোক

লিখে যান, আশ মেটান, কিছুটা কুখ্যাতির অংশ

বিলিয়ে তো যাই, নিন, নিন, হাত পাতুন, নতুবা মাথাটা

কলমে বা কমপিউটারে ঝেড়ে দিন সুযোগ পেলেই

আমি জানতে চাইব না, কে আপনার বাবা ছিল

কে ছিল পাথরে বীর্য থেকে জন্মানো দুর্বাসার কাগুজে বিদ্বান

পঞ্চাশ বছরের বেশি লিখে তো যাচ্ছেন

এখন আপনারা, তার আগে আপনার বাবারা মেসোরা

এভাবে চলুক যতো যুগ আপনারা চালিয়ে যাবেন

আরও পঞ্চাশ, আরও একশো, আরও কয়েকশো বছর

কবিতা যখন আপনার বংশে আর কেউ পড়বে না

তবুও আপনার বংশধরেরা আমাকে বাঁচিয়ে রাখবেন

খিস্তিয়ে, গালমন্দ করে, খিল্লি উড়িয়ে

ব্যাস, আমি চাই, চলতে থাকুক চলতে থাকুক চলতে থাকুক

জোকারপুঙ্গবদের রঙ্গতামাশা

নারীর বুকের জন্য প্রেমের কবিতা

ম্যাডেলিন বলেছিল প্রেমিকের শরীরের

সবকিছু মুখস্হ হয়ে গেলে অন্য প্রেমিকের প্রয়োজন হয়

তারপর বুড়ো হলে জীবনের সব মিথ্যা

সত্য হয়ে উঁকি মারে বলিরেখা জুড়ে

প্রতিটি যুগের নিজস্ব মিথ্যা হয় 

সমস্ত জীবনভর যতো ছায়া মাটিতে ফেলেছ

তাদের একত্র করে প্রেমিকার বুকে মাথা গুঁজো

শেষতম নারী দু’বুকের মাঝখানে ইনসমনিয়া সারাবার

ব্যবস্হা করবেই সেখানে ঘুমের জন্মান্ধ উত্তমপুরুষ

কবিতার অদৃশ্য খাতা খুলে কয়েক শতক বসে আছে

সেতারা মাহবুব-এর জন্য প্রেমের কবিতা

 উত্তর-সত্যের গূঢ় জগতসংসারে

শুভ-অশুভের বাইরে গোপন সুড়ঙ্গ এই প্রেমের কবিতা–

প্রেম? , প্রেম তো খুনোখুনি যুদ্ধ হানাহানি রক্তপাত ; 

প্রেমের কবিতা চুপিসাড়ে সরকারি নথিপত্র ছাড়া পার হয়

এ-সুড়ঙ্গে ধর্মের চাপাতি-ত্রিশুলধারীরা সব মরে পড়ে আছে

এ-সুড়ঙ্গে মতাদর্শের একনায়কেরা কখনও ঢুকতে পারে না

এ-সুড়ঙ্গে নিকৃষ্ট পোশাক পরে হাঁটে না ক্যাটওয়াকের পেত্নীরা 

এ-সুড়ঙ্গে আমাদের অনুপস্হিতি হাত ধরাধরি করে এপার-ওপার প্রতিরাতে

সীমার কাঁটাতার চেকপোস্ট এপারে-ওপার ঘুষ এ-সুড়ঙ্গে নেই; প্রেমের কবিতা

রান্নাঘরে গিয়ে ফিসফিসে কন্ঠে ডেকে বলবে তোমাকে, “সেতারা মাহবুব,

চলো, কেনই বা আমরা দুজনে এই তাচ্ছল্যঠাশা পৃথিবীর মনোরঞ্জনে

জীবন নষ্ট করি ?” প্রভাবিত হওয়া কি আতঙ্কজনক, ওয়েদিপাউসের 

ভুত এসে ঘাড়ে চেপে বলবে কি ইন্দ্রিয়ের বিলাসিতা থেকে 

বোধবুদ্ধি নির্বাসন দাও, বলো, বলো, সেতারা মাহবুব, কী রেঁধেছ ?

তোমাদের দেশে যাইনি কখনও, তাই, এখন সহজে,কবিতার সুড়ঙ্গ দিয়ে

পৌঁছে দেখছি, রেঁধেছ আমার জন্য, মূলা দিয়ে দেশি কইমাছ, 

পাঙাশ মাছের ঝোল, চিংড়ি করলা দিয়ে, পাবদা-বেগুন,

ইলিশ-খিচুড়ি, চাপিলা মাছের ফ্রাই, লটে মাছের ঝুরো, কাচকি-টোম্যাটো,

এতো পদ আমার জন্য তুমি রাঁধো, খেতে তো ডাকোনি কোনোদিন–

আমি তাকালেও, তুমি তো আমার দিকে চেয়েও দ্যাখোনি,

তোমার বাড়ির পথ ভুলে যাই, দেখি ফুটপাথ জুড়ে, কুয়াশা বিক্রি হয়–

গলিগুলো সরু থেকে আরও সরু , রাস্তায় থামের আলো

সন্ধ্যা হলে নিজের ছায়া নিয়ে পাক খায়, উত্তর-সত্যের পৃথিবীতে

চলে এসো চুপচাপ, সেতারা মাহবুব, প্রতিটি মহাকাব্যে এভাবেই

দু’জনের পালাবার গল্প লেখা আছে, ট্রয়ের জাহাজ ভেসে যাক, দেখা যাবে… 

কলকাতার স্ট্যাচু

ওরে, তোরা কি জানিস

মোড়ের মূর্তির বদলে ওর মাথায়-বসা গোলা-পায়রাটার খ্যাতি কেন বেশি ?

স্ট্যাচুটাতো ছিল মরার আগের দিন ব্যাপটাইজ করা কলকেতিয়া কাঙাল

উপমা দিতে হলে বলতে হয় উনি ছিলেন অতুলনীয় একজন ফক্কা

ওড়ার অভ্যাস ভুলে আলো-নাচুনি মাদি ঝিঁঝির ফুররি

.

ওরে, তোরা কি জানিস

বিলিতি সায়েবের নাম-মোছা কবরফলক ফিরে এসচে শিল-নোড়া হয়ে

দাদু-দিদা প্রজন্মের সেসব ভুতুড়ে ব্যথা-বেদনা যখন মশলা বাটায় মেশে

মৌজমস্তির দিলদার ছকেতে সেসব শিহরণ মাইরি বলবার নয়

যখন কিনা মৌমাছির পাখনার হাওয়া ছাড়া ফুলের বুকের জ্বালা কমে না

.

ওরে, তোরা কি জানিস

বিশৃঙ্খলায় ঘাপটি মেরে যেসব নিহিতার্থ হরবখত ভোল পালটায়

তাদের মৃত্যু তো একরকম কৌমার্য যা ছিল আমার ছেলেবেলায়

যখন জনগণের জিভে জমানো তিতিবিরক্ত ফিসফিসানিগুলো

পেঁকো পথের দু’ধারে অশথগাছে কচিমেরুন পাতার ঢঙে বেরিয়ে পড়েছিল

.

ওরে, তোরা কি জানিস

প্র্রভূ সেজে মানুষের হাঁটার কায়দা কেন নাগরিকের থেকে আলাদা হয় ?

আসলে মেঘের কানায়-কানায় কালচে-কালো ভাষা নিয়ে মারকাটারি আলো

ফোঁপরা ছায়ার টুপি পরিয়ে ওকে হিরোগিরিতে এমন বুঁদ করে

যিন নিষ্কলুষ নোংরামির জোয়ার বেচবার একচেটে মালিকানা পেয়েছে

ঘাস

ঘাস হয়ে জন্মেছি আমি, একজন কচি

যুবতীর দু’পায়ের মাঝে, ঘিরে আছি তার

গোপন গন্ধমাদনের ঝর্ণা, বিগত অস্তিত্বে

ঘাসই ছিলুম, আমার সবুজ রক্ত পান করে

জেব্রা মহিষ ভেড়া ছাগলেরা রক্তকে লাল

করে নিতে পেরেছিল, আমিষলোভী

এই যুবতীর রক্তে এখন মিশেছি, তাই

তার দু’পায়ের মাঝে কোঁকড়া কৃষ্ণ ঘাস

হয়ে ক্রমে জন্মালুম, আমি তোতলাবো

প্রজাপতি-ডানার গরম উড়ালে

তখন শীতল আগুনে দাউ-দাউ পুড়ে 

ঠাণ্ডা হবো, মহাগ্রন্হের মলাট দুই পাশে

যার জন্য ট্রয়ের লঙ্কার যুদ্ধ, কতো গল্প

রয়েছে ঘাসের পৃথিবীতে, অতল গহ্বরে

তৃষ্ণার্ত খেলার সঙ্গী হই আমি, দুপুরে

সন্ধ্যায় রাতে তাতাই একাকীত্ব দিয়ে

প্রতি মাসে একবার ডিমের পোচ খাই

কখনও বা আঙুলের বদলে অন্যকিছু

আমাকে লুকিয়ে করা অসম্ভব, জানে

তাই মাঝে-মাঝে সেফটি-রেজর কাঁচি

ঘাসনাশক দিয়ে আমাকে লোপাট করে

আমিও নাছোড় প্রেমিক, মাথাচাড়া দিই

ঘাসের সঙ্গে কারো পেরে ওঠা অসম্ভব

সারা বিশ্ব জুড়ে আমাদের ভূরাজত্ব

মরি না কখনও আমরা, কৃষ্ণ বা

সবুজ ঘাসেরা, আমরা মহীরুহ নই

মনে হয় শুকিয়ে গিয়েছি, আসলে জিরোই

খেলতে সাহায্য করি বাঁচতে খোরাকি

ঢেউ তুলব ঘর্মাক্ত শরীরে, একদা

সবুজ ঘাস আমি, নবজন্মে আজ

প্রহেলিকা ইশারার ফাঁদ পেতে আছি

জানি কোনো সৎ-কাপুরুষ আসবে

তার বাড়তি বীজ ফেলার জন্য রাতে

মলয়দাস বাউলের দেহতত্ব

ডোমনি, তুইই দয়াল, যখন বিদেশে যাস কেন রে আনিস কিনে সেক্সটয় ?

ভাইব্রেটর, ডিলডো, বেন-ওয়া-বল, গুহ্যের মুক্তমালা ?

ডোমনি, তুইই দয়াল,জানি কেন বিডিএসএম কবিতার বই এনেছিস,

জি-বিন্দু হিটাচির ম্যাজিকের ছড়ি ? নিপল টিপে কাঁপাবার ক্লিপ ?

ডোমনি, তুইই দয়াল, হাত=পায়ে দড়ি চোখে ঠুলি আমাকে চেয়ারে

উলঙ্গ বেঁধে রেখে দিয়েছিস, নিজের ফাঁস খুলে তলাতল রক্তের স্বাদটুকু দিলি

ডোমনি, তুইই দয়াল, শুদ্ধ প্রেমে মজল যারা কাম-রতিকে রাখলে কোথায়

চাবুক মারিস তুই, চুলের মুঠি ধরে ক্ষিরোদধারাকে চুষে বের করে নিস

ডোমনি, তুইই দয়াল, চাতক স্বভাব নাহলে অমৃতের দুধ তুই দিবিনাকো

আমার খিদে নেই, মুখের ভেতরে কৃষ্ণের বিশ্বরূপ খেয়ে মজে গেছি

ডোমনি, তুইই দয়াল, যতো ইচ্ছে আনন্দ কর, দেহ নিয়ে খেল

আমি একটুও নড়ব না, আহ উহ করব না, যতো চাই ধাতুবীজ নিস

মলয় সাঁইয়ের গান

ডোমনি, তুইই দয়াল, যাতে  জ্বালা জুড়োবার ইচ্ছে পুরো ঘুচে যায়

জ্ঞানহীন বন্ধুবর্জিত শত্রুঘেরা থাকি তার ব্যবস্হা করে দিস

ডোমনি, তুইই দয়াল, মোমাছির চাকে মোড়া তোর অঙ্গ, অনিত্যানন্দময়ী

নিয়ে চল মহাবিলাসের গর্তে, করে তোল যতোটা পারিস অদীক্ষিত

ডোমনি, তুইই দয়াল, অশুভের নাচগানে সাধক করে তোল রে আমাকে

কী-কী করলে মহাপাপ হবে তার রাস্তা বলে দে, গোত্রবর্জিত করে তোল

ডোমনি, তুইই মহান, অপ্রেমপন্হায় শ্রীগুহ্যসমাজতন্ত্র ভাঙচুর কর

মগজের আশিক মাশুকাদের স্মৃতিহীন করে মেরে ফ্যাল

ডোমনি, তুইই দয়াল, শরীরের ব্যকরণ মুছে দে রে মস্তিষ্ক থেকে

নিয়ে চল ভুল পথে দেখা যাক মর্ষমজা কীরকম দোষদুষ্ট খেলি

মলয়ক্ষ্যাপার নাচ

ডোমনি, তুইই দয়াল

আমার চেতনায় শিকড় পুঁতে দিয়েছিস

ধর্ম-বর্ণে কোনো শিকড় নেই

জাতীয়তায় কোনো শিকড় নেই

বাড়ি-পাড়া-রাজ্যে কোনো শিকড় নেই

শ্রেনিতে কোনো শিকড় নেই

আয় আজ দুজনে মিলে অমাবস্যার নাচ নাচি

মলয় আউলের নাচ

ডোমনি, তুইই দয়াল

আমাকে দেহসর্বস্ব আত্মহারা করে দিলি

শাক্ত বৈষ্ণব থেকে মুক্ত করে দিলি

পাপপূণ্য একাকার করে দিলি

স্বর্গনরক একাকার করে দিলি

ইহলোক ছাড়া আর কিছু নেই বলে দিলি

আয় আজ দুজনে মিলে অমাবস্যার নাচ নাচি

মলয় ফকিরের নাচ

ডোমনি, তুইই দয়াল

কুৎসাকে তুড়ি মেরে ওড়াতে শেখালি

শত্রুরা আমার আগে মরে যাবে বলে মন্ত্র দিলি

কলঙ্ক কিছুই করতে পারবে না বলে আমাকে ঘিরে রেখে দিলি

অশুভশক্তি কিছু করতে পারবে না বলে ছাতা মেলে দিলি

আয় আজ দুজনে মিলে অমাবস্যার নাচ নাচি

মলয় বাউলের নাচ

ডোমনি, তুইই দয়াল

তোর ঘামে স্নান সেরে নিই

তোর শ্বাসে শ্বাস ফেলে খেলি

আমি তোর খমকের ধুন

আমি তোর একতারার তার

আমি তোর মাটিছোঁয়া জটা

আয় আজ দুজনে মিলে অমাবস্যার নাচ নাচি

মলয় পচার নাচ

ডোমনি, তুইই দয়াল

তুই আমার শবের ছাই ঝড়েতে ওড়াবি

তুই আমার মুখে দিবি কারণবারি রক্ত

আমরা করব সহবাস ঋতুবীজহীন

আমি তোকে তুই আমাকে পরস্পর খাবো

গিঁট না খুলে তুই সবই দেখিয়ে দিস ওরে

আয় আজ দুজনে মিলে অমাবস্যার নাচ নাচি



মলয়সাঁইয়ের গান

ডোমনি, তুইই দয়াল, আমাকে জড়িয়ে ধর, বাকিটুকু কাঁদি

ডোমনি, তুইই দয়াল, ছাইয়ের গাদায় চল জড়াজড়ি করি, বাকিটুকু কাঁদি

ডোমনি, তুইই দয়াল, জাগিয়ে দে কুণ্ডলিনিচাকা, বাকিটুকু কাঁদি

ডোমনি, তুইই দয়াল, চুমু খা কাঁচা-মাংস খাওয়া ঠোঁটে, বাকিটুকু কাঁদি

ডোমনি, তুইই দয়াল, দেখা রে দাঁড়কাক দেহ, বাকিটুকু কাঁদি

ডোমনি, তুইই দয়াল, নোংরা নখে বুক চের, বাকিটুকি কাঁদি

ডোমনি, তুইই দয়াল, বুকে তোর দুধের বদলে রক্ত খেয়ে বাকিটুকু কাঁদি

ডোমনি, তুইই দয়াল, আয়, অমাবস্যায় নিজেদের মুড়ে বাকিটুকু কাঁদি

ডোমনি, তুইই দয়াল, চুলের জটা দিয়ে বাঁধ আমায়, বাকিটুকি কাঁদি

ডোমনি, তুইই দয়াল, আমাকে তোর দোতারা কর, বাকিটুকু কাঁদি

ডোমনি, তুইই দয়াল, দিব্যনিম করে দে আমায়, বাকিটুকু কাঁদি

ডোমনি, তুইই দয়াল,  আমাকে অনাদর কর, বাকিটুকু কাঁদি

ডোমনি, তুইই দয়াল, আমার শিকড় তুই উপড়ে দে, বাকিটুকু কাঁদি

ডোমনি, তুইই দয়াল, বরফে আগুন ধরা, বাকিটুকু কাঁদি

ডোমনি, তুইই দয়াল, জীবনভর জড়িয়ে থাকিস, সারাজীবন কাঁদি

মলয় ফকিরের গান

ডোমনি, তুইই দয়াল, রোজ ভোরবেলা দেখি

আঁস্তাকুড় থেকে বেছে নিচ্ছিস কতো পরিত্যাগ

ডোমনি, তুইই দয়াল, আদিমতমা নারীবাদী

বডিস পরতে দেখিনি কোনোদিন, তোর দু’বুকের ভাঁজে

ডোমনি, তুইই দয়াল, জ্যোতি আছে, কখনো বা আচমকা

বোঁটাও ঝিলিক দ্যায়, তাতে কিচ্ছু যায় বা আসেনাকো তোর

ডোমনি, তুইই দয়াল, বাতিল কনডোম তুলে নিয়ে বীর্য শুঁকিস

সুগন্ধে হাসিস মিটিমিটি, হাঁ করে গলায় ঢেলে নিস ফোঁটা-ফোঁটা

ডোমনি, তুইই দয়াল, বারোয়ারি বীজঠোঁটে কবে চুমু খাবো

তুই জিভ টেনে নিবি মুখে সুষুম্না লতিয়ে উঠে ঝরবে তলাতল

ডোমনি, তুইই দয়াল, রক্তমাখা স্যানিটারি ন্যাপকিন

তুলে নিয়ে চটের বস্তায় ভরে নিস, বস্তিতে গিয়ে রক্ত মাখবি গায়েতে

ডোমনি, তুইই দয়াল, ওই বাসি রক্ত চেটে নিঃস্বভাবি হতে চাই

ডোমনি, তুইই দয়াল, শিখিয়ে দিয়েছিস শ্বাসবায়ু বন্ধ করে রেখে

ইচ্ছাধীন উড়ন্ত দেহে কুম্ভক সৃষ্টির ইন্দ্রজাল

ডোমনি, তুইই দয়াল, নাভিতে কতোকাল ময়লা জমে আছে

নিয়ে চল তোর ডেরায় জিভ দিয়ে পরিষ্কার করি

ডোমনি, তুইই দয়াল, প্রতিমাসে জোয়ারে ভেসে যাস

তোর তিন নাড়িতে ত্রিবেণী সংহতি

ডোমনি, তুইই দয়াল, রস ও রতির মিশেলে জেগে ওঠ

গরলামৃত নিয়ে আমার মতন সাধকের সাথে নৃত্য কর

ডোমনি, তুইই দয়াল, ইড়াতে পূরক, পিঙ্গলায় রেচক শেখালি

নদীর একুল-ওকুলে অধর ধরে নির্মাণচক্রে ঘুমোস

ডোমনি, তুইই দয়াল, তোর লাবণামৃতে চান করে উন্মাদ হই

বিন্দু ধারণের যোগ্য কবে করে তুলবি আমাকে

ডোমনি, তুইই দয়াল, শ্মশানের কাঠকয়লায় রেঁধেছিস ভাত

করোটির থালায় ভরে খাবো দুইজনে পোড়া মাংস দিয়ে

ডোমনি, তুইই দয়াল, বলি দেয়া পাঁঠার রক্ত এনে ভরিস করোটিতে

একদিন আমারও করোটিতে চুমু দিয়ে রক্ত খেয়ে নাচবি ধামাল

ডোমনি, তুইই দয়াল, রজপ্রবৃত্তির তিন দিন তিন রাত

দেহের অমাবস্যায় তুই আমাকে পূর্ণিমা দিস

ডোমনি, তুইই দয়াল, আমার ব্যক্তিসত্তাবোধ লোপ করে কবে দিবি

আনন্দকে তিনটি দিনের লাল আলো জ্বেলে শীতোষ্ণ করবি কবে

ডোমনি, তুইই দয়াল, চেয়ে দ্যাখ আমি আস্তাঁকুড়

মানুষের ফেলে-দেয়া সবকিছু নিজের অস্তিত্বে ধরে আছি

ডোমনি, তুইই দয়াল, আমাকে আলেখ পুরুষ করে তোল

বলে দে কেমন করে স্খলন বন্ধ করে কবিত্বের শক্তি যোগাবো

ডোমনি, তুইই দয়াল, আমাকে সহজ পুরুষ করে তোল

বলে দে কেমন করে সারা দেহে প্রেমানন্দ আনবে বানভাসি

ডোমনি, তুইই দয়াল, আমাকে অশ্লীলতম নোংরা গান শেখা

ঝরাই অশ্রাব্য অমৃতধারা এই লাৎখোর বঙ্গসমাজে

ডোমনি, তুইই দয়াল, তুইই শবরী, চণ্ডালী, শৈবালযোনি

পদ্ম আর বজ্রের সংসর্গে ক্লেশশত্রুজয়ী পুরুষ করে তোল রে আমাকে

ডোমনি, তুই দয়াল, কবে তোর অতিনোংরা চরণ দুটি পাবো

বুকের  ওপরে রেখে খেলবি দজ্জালদোষে নৈরাত্মা-হরণ করা চরণ দুটি পাবো

ঔপনিবেশিক রক্তচোষার দল

শেয়ালদা স্টেশানের বেঞ্চে বসেছিলুম

ছারপোকার কামড়ে উঠে পড়তে হল

আমার ফাঁকা জায়গায় তক্ষুনি একজন বসল এসে

এই যে কলকাতার ছারপোকা, এই যে কলকাতার নানা জাতের মাছি

এরা কোথা থেকে এলো এই শহরে, কারা নিয়ে এসেছে, 

এখানে তো শহর ছিল না

অজ পাড়া গাঁ ছিল, সেই গ্রামে নিশ্চয়ই ছারপোকা ছিল না

ধাপার মাঠও ছিল না যে মাছির কলোনি বসবে

আসলে ছারপোকা আর মাছি এসেছে জাহাজে চেপে

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে

ঔপনিবেশিক সায়েবরা চলে গেছে ভেবে লাভ নেই

তারা ছেড়ে গেছে আরেকধরণের রক্তচোষার দল

এই রক্তচোষারা সাম্রাজ্যবাদী নয়, এরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে

সকলের রক্তই এরা একইভাবে খায়, কোনো বাদবিচার নেই

ম্যাজিশিয়ানের অবসরপ্রাপ্তি

বিদায় জানাবার সময়ে আপনি জড়িয়ে ধরে ‘হাগ’ করলেন

এখন আর হ্যাণ্ডশেক বা হাতজোড় করে নমস্কার করার রেওয়াজ নেই

আমার বাঁহাতে আপনার বডিসের হুক ঠেকলো

আপনার বিদেশি পারফাইউমের সুগন্ধ

কিন্তু আমি আপনাকে ভুলে গেলুম

তৎক্ষণাত ভুলে গেলুম

বুঝতে পারলুম ফিরে গেছি পাঁচ দশক অতীতে

বাঁহাতে বডিসের হুক ঠেকেছিল

হুবহু একই পারফিউম

আমরা যা করেছিলুম তাকে সেসময়ে লোকে বলতো

প্রেম করা, ইন্দ্রিয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা

আজ আপনাকে জড়িয়ে ধরার পর

মনে হল প্রেম করা বলে আদপে কিছুই

বোধহয় নেই

যা আছে তা কুণ্ডলিনী জাগিয়ে তোলার ম্যাজিক

আমি আর ম্যাজিক দেখাতে পারি না

আপনি হয়তো তা বুঝতে পেরেছেন

অলিভ ফলের মতন

তোর, মনে আছে এখনও, ছিল বড়ো-বড়ো চোখ

একটার থেকে আরেকটা কিছুটা দূরত্বে, জোড়া ভুরুর তলায়

কাঁচা অলিভের মতন গায়ের রঙ

আজকাল বাজারে অলিভ পাওয়া যায়, নয়তো

তোর গায়ের ত্বক কেমন তা বোঝাতে পারতুম না

তোর দেহকে ব্যাখ্যা করার জন্য

এইটুকুই যথেষ্ট , কিন্তু চোখে যে কেন দুঃখ

দেখলুম তা আজও ভুলিনি রে

খিদে

কোনো ভয়ই খিদের সামনে টিকতে পারে না

কোন ধৈর্য পারে না খিদের সামনে দাঁড়াতে

খিদে পেলে নিজের মান সন্মান কোনো ব্যাপরই নয়

কোনও কুসংস্কার খিদের সামনে একেবারে ফালতু

কোনও বিশ্বাস খিদের সামনে ভুয়ো

মরুভূমির বালির ঝড় বই আর কিছু নয়

কিন্তু সকলেই প্রশ্ন করে যে

‘আপনার খিদেটা কিসের ?’

শুনে, তাদের যাচ্ছেতাই গালাগাল দিই

সেলুনে গোঁফের ছবি

সেলুনে নাপিত জানতে চাইলো

‘কেমন গোঁফ চাই, স্যার ?’

দেখলুম, স্ট্যালিনের গোঁফ, হিটলারের গোঁফ

রাজকাপুরের গোঁফ–

বললুম, ‘ওরে নিতাই,

তুই আমার পুরো গোঁফটাই কামিয়ে দে

আজ থেকে আর গোঁফ রাখবো না ।”

আমার মহাপরিনির্বাণ – একটি পোস্টমডার্ন কবিতা

“রাস্তার সব আলো নিভিয়ে অন্ধকার করে দেয়া হয়েছিল

দরোজায় টোকা দিতে বাইরে বেরোলেই

পেছন থেকে চুলের মুঠি ধরে গলায় কাস্তে চালিয়ে দিলুম

জিভে রক্তের ছিটে এসে লাগল

সেই থেকে রক্তের প্রতি আমার ভালোবাসা

এখন করোটিতে ভরে রক্তপান করি

তখন তো আমি সতেরো বছরের যুবতী

এখন বয়স হয়েছে এখন আমি তন্ত্রসাধিকা

অমাবস্যার রাতে চিতা থেকে আধপোড়া

মাংস এনে দেয় ডোম, খাই ; আমি  ব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে একাত্ম

এখন আমি করোটিকে অমাবস্যায় জাগিয়ে তুলি

মেয়েরা যে কংশাল ছিল তা অনেকে জানে না

আমরা চারজন মেয়ে ছিলুম

দুজনের কাজ ছিল গলার নলি কেটে দেবার পর

লাশের মুখে আলকাতরা মাখানো

ঠেলাগাড়িতে তুলে গঙ্গায় নিয়ে গিয়ে ভাসানো–

আমার দোসর এই বাউল প্রাণেরপুতুল দাস

ও নকশাল ছিল, বিদ্যাসাগরের মূর্তির মাথা

ওইই কেটেছিল”

..

শুনে,  আমার চোখ নিজের  পাতা ফেলতে ভুলে গিয়েছিল

ওনার চোখ দুটো এখনও বড়ো আর কাজলটানা

শুনে,  আমার ঠোঁটদুটো হাঁ-মুখ বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিল

ওনার প্রৌঢ় গালে এখনও রক্তের পাউডার মাখানো

মাটিতে গোঁজা ত্রিশূলে টাঙানো তেলসিঁদুর মাখানো করোটি

দুটো করোটিতে তরল রক্ত রাখা

করোটিগুলো হয়তো কোনো কবির

করোটিগুলো হয়তো কোনো ভাস্করের

করোটিগুলো হয়তো কোনো ছবি-আঁকিয়ের

ছাগল বলি দিয়ে পূণ্যার্থী দিয়ে গেল তরল চটচটে রক্ত

হাড়িকাঠে ছাগলেরর মাথা ঢুকিয়ে শিঙ ধরে টেনে রেখেছিল পূণ্যার্থী

আমার গায়ে বরফমাখা ঘামের কাঁটা

.

বাউল প্রাণেরপুতুল দাস-এর দিকে তাকালুম

তার মুখে হাসি হাতে একতারা রঙিন তাপ্পি দেয়া পোশাক

বুক দেখা যাচ্ছে, চুল নেই

অমাবস্যার অন্ধকার কেটে-কেটে ওনার কথা

“হ্যাঁ, আমিই বিদ্যাসাগরের মূর্তির মাথা কেটেছিলুম

আমি অনেক শ্রেণীশত্রুকে গুলি করে মেরেছিলুম

অনেক জোতদারকে কুপিয়ে খুন করেছিলুম

রক্তের প্রতি আমার টান আমায় এই সাধিকার কাছে এনেছে

আমরা একই পথের যাত্রী, আমি প্রেমসুধা পান করি

ও রক্তপান করে

আমি প্রেমের গান গাই একতারা বাজাই নাচি

ও মন্ত্র পড়ে ধুনো দেয় নাচে

আমাদের গন্তব্য নেই তীর্থ নেই চাওয়া-পাওয়া নেই

আমরা দুজনে একই জায়গায় রয়েছি আর থাকবো

আমাদের মনে আর শরীরে যা ঘটার তা আমরা ঘটিয়ে ফেলেছি”

.

শুনতে শুনতে টের পাই

শুনতে শুনতে বুঝি

আমার মহাপরিনির্বাণ ঘটছে

কান্নাপাড়ার চৌমাথায়

সম্পাদক আর আমার মাঝে ছাপা-কথার

মিছিলের ভেতর দিয়ে হাঁটার সময়ে ফিলিপিনি যুবতীটি

আমায় কাঁদতে শিখিয়েছিল

ও যখন শান্তিনিকেতনে কাজের বউ ছিল

দেখেছিল রবীন্দ্রনাথের কান্না একটা বোতলে সিল করা আছে

যেমনটা খালাসিটোলার বোতলগুলো আলকাতরার

জ্যোতি দিয়ে বন্ধ করা থাকে

১৯৩০ সালে চোরেরা বোতল গেঁড়িয়ে খেয়েছিল

ভেবেছিল বেহেড হয়ে প্যারিসের রাস্তায় গড়াগড়ি দেবে

কিন্তু নেশা হয়নি বলে বোতলের ওপর বেজায় চটে গিয়েছিল

১৯৫০ সালে যে-কয়েক ফোঁটা বোতলে ছিল

জিভের ওপর ফেলে চারজন ছোকরা অবিনাশ কবিরাজ লেনে

আত্মহত্যার গান গেয়ে অঢেল টাকা রোজগার করেছিল

সেই টাকায় একাধজন শান্তিনিকেতনে বাড়িও হেঁকেছে

এদিকে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রঙিন হাফযুবতীরা

রক্তের পাউডার গালে মেখে

সম্পাদকদের শিখিয়ে দিয়েছিল কেমন করে

মিছিলের ভেতরে হাঁটার সময়ে কাঁদতে হয়

জোকারদের শহরে

যে রাস্তায় সুচিত্রা সেনের গন্ধ এখনও আমাকে খুঁজে বেড়ায়

আর তো কোনো দুর্গা টুনটুনিকে দেখি না

ফুলেদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করছে

অথচ চারিদিকে কোকিলের মতন সুকন্ঠ ধড়িবাজরা

অভিনন্দন ধরার জন্য জাল পেতে বসে আছে

ভ্রুর তলা থেকে তাকিয়ে দেখুন

প্রতিটি আওয়াজের ইশারা আছে এই শহরে

পুষে রেখেছে কালবৈশাখির মহাসুখের সন্ত্রাস

স্লেভ

মিশরের পিরামিডগুলো দেখতে বারবার আসি

মনে হয় হারানো কাউকে খুঁজি, কাকে,

দু-আড়াই হাজার বছর আগের কোনো স্লেভ

মমি হয়ে শুয়ে আছে, ধুলোর তবকে মোড়া

তাকে নয়, আসলে মৃত্যুকে খুঁজি, তার মতো আরো অনেকের

নয়তো জাদুঘরে কেন যেতে ইচ্ছে করে

সবই তো প্রাচীন মৃত ইতিহাসে আবছা ধুলোট

সেখানেও মমিটির দিকে চেয়ে দেখি বহুক্ষণ

মনে হয় চিনি তাকে, মৃত্যুকে কতোভাবে চিনি

কোমরে হাত রেখে মহেঞ্জোদারোর কিশোরীটি

যে যুবতীকে কান কেটে উপহার দ্যান ভ্যান গঘ

মদিগলিয়ানির নগ্ন যুবতীরা, বদল্যারের জাঁ দুভাল

উড়ন্ত সারসদল ফিরে যাচ্ছে আকাশ গোলাপি করে

কোথায় মারা যায় তারা, কোথায় মারা যায় তিমিমাছ

ডায়নোসরদের পাথুরে কঙ্কাল ছুঁয়ে দেখি

কোটি-কোটি বচ্ছর আগের মৃত্যু

কেন তারা হারিয়ে গিয়েছে জানতে পারেনি কেউ

অ্যাজটেকদের পিরামিডগুলো দেখতে আসি বারবার

দেবতাকে হৃৎপিণ্ড কেটে উপহার দিত

রক্ত খেতে ভালোবাসতো তাদের ঈশ্বরেরা

আনন্দ উৎসবে মেতে, বুক থেকে ছিঁড়ে তখনও

নাচছে হৃৎপিণ্ডখানা, মৃত্যুর আহ্লাদে বিভোর

আসলে মৃত্যুকে খুঁজে ফেরে সকলেই

শেষে পায় নিজের শরীরে, মৃত্যুর ক্রীতদাস

তার বোধ মৃত্যুই লুপ্ত করে দিয়ে চলে গেছে

সে তখন মৃত্যু সম্পর্কে বোধশক্তিহীন

মাছি উড়ছে তার শবদেহটির ঠোঁটে

ডানায় মৃত্যুর গান নিয়ে

শাকাহার

“বাঁচাও বাঁচাও”

শুনে মনে হলো কোনো কিশোরের আর্তচিৎকার

ওই বিশাল বাড়িটা থেকে শোনা যাচ্ছে

“বাঁচাও বাঁচাও”

রাতের অন্ধকারে ঢাকা প্রাসাদের মতো

প্রাচীন বাড়িটা

ভাবলুম, কী করব, কিডন্যাপারদের সামলাতে পারবো না

যা হবার হোক, ঢুকে যাই, দেখা যাবে

জীবনে তো সবকিছু পাওয়া হয়ে গেছে

এখন কিডন্যাপারের ছুরি বা গুলিতে মরলেও ক্ষতি নেই

ঢুকে গেলুম চুপচাপ হাট-করে খোলা বাড়িটাতে

“বাঁচাও বাঁচাও” যে-ঘর থেকে আসছিল

সরাসরি সেই ঘরে ঢুকে দেখি, বাচ্চা ছেলেকে

ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে খাওয়াচ্ছেন তার মা

আমায় দেখে উনি বললেন, কী, আপনিও নিশ্চই ভাবলেন

এটা ছেলেধরাদের বাড়ি ? কীই বা করব বলুন

আমার ছেলেটা মাছ-মাংস খেতে চায় না একদম

আজকে চিকেন হয়েছে, চিংড়ির মালাইকারি, মুখে দিচ্ছে না

খাওয়াতে গেলেই লোকজড়ো করবার জন্য ওই বিটকেল

চেঁচানি, “বাঁচাও বাঁচাও” ; ছেলেটি আমাকে বলল, দাদু

তুমিই বরং মাংস আর চিংড়ি খেয়ে যাও–

আমি পালংশাক ভাজা আর মোচার ঘণ্ট শুধু খাবো ভাত দিয়ে ।

ওরারা- আমরারা

শেকসপিয়ার স্যার, তুমিই তো শিখিয়ে গিয়েছো

ইহুদিরা ভালো লোক নয়, সুদখোর, উশুল করবেই

হয় টাকা দাও নয়তো মাংসখন্ড দিয়ে ঋণ পরিশোধ করো

তুমিই দেখিয়েছিলে, ইহুদির মেয়ে খ্রিস্টানের সঙ্গে পালিয়েছে

ইহুদির চাকর ব্যাটাও ইহুদিদের ঘেন্না করে, কিন্তু ওর তো উপায় নেই

ইহুদির হাত থেকে ঋণখেলাপি থেকে বাঁচালো পোরশিয়া, লোকটার বউ

বলল, ঠিক আছে ইহুদি শাইলক তুমি মাংস কেটে নাও

তাই বলে রক্ত ঝরাতে পারবে না

ইহুদিকে নিজেরই জালে ফাঁসিয়ে দিলেন মহানাট্যকার

চুক্তিতে এ কথাও ছিল ইহুদি যদি চুক্তি ভঙ্গ করে

সেক্ষেত্রে তাকে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হতে হবে

সমস্ত পৃথিবী জুড়ে ওরা কেটে নেবে আমরাদের মাংস

রক্তসুদ্দুই কেটে নেবে

আমরা কেটে নেবে ওরাদের মাংস

রক্তসুদ্দুই কেটে নেবে

কতোকাল থেকে চলছে এই, মাংস কেটে নাচবার খেলা

ফ্যারাওদের রাজত্বের দিন থেকে

শত্রু ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা অসম্ভব বলে মনে হয়

যেমন বলিউডি তিনজন খান-হিরো ষড়যন্ত্র করে

তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বী ফাওয়াদ খানকে তাড়িয়ে শান্তি পেয়েছিল

এখন অপেক্ষা অন্য কোনো গ্রহ থেকে শত্রুদল আসে যদি

পৃথিবীতে আমরা নিজেদের মধ্যে লড়ালড়ি বন্ধ করে দিয়ে

পাঙ্গা নেবো সেই সব মূর্খ বা অতিজ্ঞানী প্রাণীদের সঙ্গে

আংটিই কেন ?

সম্পর্ক তৈরির জন্য আংটিই কেন ?

নারী-পুরুষের মাঝে আংটি কীভাবে এলো

সম্পর্ক গড়ে দিতে বিভিন্ন দেশে

বিবাহের আগে আংটি পরানোর প্রথা

মোহিত করার কালে আংটি পরাবার

যেমন শকুন্তলাকে পরিয়ে দুষ্মন্ত

শরীরের সম্পর্ক গড়েছিল !

যুবক-যুবতীদের দেখি প্রথমেই চোখ যায়

পরস্পরের অনামিকায় আংটি আছে কিনা

গুহামানবের যুগে শুরু হয়েছিল হরিণের হাড় থেকে

আংটি তৈরির খেলা, যে পুরুষ যতোজন মহিলাকে

আংটি পরিয়ে দেবে সেই তার সঙ্গে সম্পর্ক পাতাবে

অর্থাৎ এখনও মানুষ গুহামানবের ভালোবাসাবোধে

আটক রয়ে গেছে, আংটির বৃত্তের ফাঁদ পেতে !

আমার বৃক্ষেরা

আমার বৃক্ষেরা ছিল এই বাংলো-বাড়ির বিশাল বাগানে

পুঁতেছিলুম আমি ট্যুরে গিয়ে বিভিন্ন গ্রাম থেকে চারা এনে

পেয়ারার সজিনার মর্তমান কদলীর নারকেলে কুলের

নিজের হাতে কোদাল চালিয়ে খেত করেছিলুম আমি

একশো ফুট পাইপ এনে রোজই অফিস থেকে ফিরে, দিয়েছি

জলের ঝারি, স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে খুরপি নিয়ে আগাছা তুলেছে

টোমাটোর ভুট্টার ঢেঁড়সের বেগুনের ধনেপাতা মৌরিফুলের

বিলোতুম প্রতিবেশিদের, কতো আনন্দে তারা বাঁটোয়ারা করে নিতো

পুজোর জন্য ফুল নিয়ে যেতো অরিন্দমের বড়ো-পিসি

গোলাপ বেলিফুল রজনীগন্ধার ঝাড় দোপাটি কৃষ্ণকলি

আমার আর  স্ত্রী-ছেলে-মেয়ের পরিশ্রমে পাওয়া ফল ও ফুলের

চাকরি থেকে বদলি হয়ে যেতে হলো সাত বছর পরে

ফেলে চলে যেতে হলো আমার নিজের হাতে তৈরি বাগান

আজ অবসর নিয়ে দেখতে এসেছিলুম কেমন রয়েছে সে-বাগান–

সেখানে কিছুই নেই ; সে-বিশাল বাংলো জুড়ে উঠে গেছে

তেরো-তলা আবাসন, বারান্দায় শুকোচ্ছে আবাসিকদের

ঝোলানো পোশাক ; আমার বৃক্ষেরা ফুলেরা ফলের গাছ

এমনকি বারমুডা ঘাস নিশ্চিহ্ণ হয়ে গেছে শহুরে প্রসারে

কলম কেন লিক করে

যুদ্ধ চলতেই থাকে, ছোটো হোক বা বড়ো

আমরা ভাবি কবিতা লিখে যুদ্ধ থামিয়ে দেবো

কবিদের কেউই পাত্তা দেয় না

পাত্তা দেয় বিজ্ঞানীদের, যাঁরা

নতুন নতুন অস্ত্র আবিষ্কার করে চলেছেন

তা প্রয়োগ হয়ে চলেছে ছোটো যুদ্ধগুলোয়

বাড়ি ঘর শহর মনে হয় পাঁপড়ের তৈরি

যুদ্ধ কখনও ফুরোবে না, আমরা ফুরোবো

দেশে-দেশে সৈন্যদল থাকবে, আমরা হাত কামড়াবো

একদল শাসককে টেনে নামাবে এক যুদ্ধ

তাদের টেনে নামাবে আরেক যুদ্ধ

আমরা সাধারণ মানুষ সিঁটিয়ে থাকবো

বড়ো যুদ্ধ ছোটো যুদ্ধ মাঝারি যুদ্ধের ভয়ে

যাই হোক, তবুও যদি কবিতা কোনো কাজে দ্যায়

কবিদের তো এছাড়া আর কোনও গতি নেই…

পাঁপড়

রথের মেলায় গিয়ে নাতিকে পাঁপড় খাওয়ালে নাকি ?

মোবিল ভেজাল দেয়া তেলেতে ভাজা পাঁপড় তো ?

কীই বা করবে বলো, কাঁচা মালের যা দাম

তোমাদের তো সেঁকা পাঁপড় চলে না, সন্দেহ হয় যে

কাঠকয়লা এসেছে শ্মশান থেকে, সস্তায় পাওয়া যায়

যারা পাঁপড় বেলে তাদের ৫০০০ পাঁপড় বেলে রোজগার হয়

১৭৫ টাকা । একদিনে তো ৫০০০ পাঁপড় বেলা যায় না

তাও নিজেদের উঠোনে শুকিয়ে মহাজনকে ফেরত দিতে হয়

মহাজনেরও যে বিশেষ লাভ হয় তা নয় ; ৫০০০ পাঁপড়ে

তার লাভ ১০০০ টাকা । তোমার অতো চিন্তার কী দরকার

তুমি বন্ধুদের সঙ্গে চুল্লু ঠেকে পাঁপড় টাকনা দিয়ে খাও

তুমি তো মধ্যবিত্তবাবু, খিচুড়ির সঙ্গেও খেতে পারো

যারা পাঁপড়ের মতন ফিনফিনে রোগা হয়ে চলেছে

তারা যতোদিন পারে চালিয়ে যাক, তারপর তো মেশিন আসছেই

তাদের কাজ আর রোজগার খেয়ে ফেলার জন্য

তোমার কিন্তু মুচমুচে পাঁপড়টি না হলে চলবে না, বেশ, বেশ

আলু

তোমার আলুর দম খেতে ভালো লাগে নাকি আলুভাতে

পেঁয়াজকুচি সর্ষের তেল দিয়ে মেখে ?

রুইকালিয়ায় দেয়া আলু নাকি ডিমের ঝোলে ?

আলুছেঁচকি তোমার মায়ের হাতের, মনে পড়ছে

অফিসে নিয়ে যেতে টিফিনকৌটোয়, চন্দ্রমুখী ?

তুমি কুড়ি টাকা কিলো ভালো জাতের আলু কিনেছ

যে সব্জিঅলার কাছ থেকে কিনলে সে কতো করে কিনেছে জানো ?

সে কিনেছে চোদ্দটাকা করে কিলো

তাকে যে বেচেছে সে কতো টাকা কিলো কিনেছে জানো ?

সে কিনেছে সাড়ে সাত টাকা দরে

তাকে যে বেচেছে সে কতো করে কিলো কিনেছে জানো ?

সে কিনেছে চার টাকা দরে

চাষি কতো করে বেচেছে জানো ?

এগারো পয়সা কিলো দরে ।

কী, বেশ ভাল্লেগছে তো আলুর দম দিয়ে পরোটা খেতে

কিংবা সেদ্ধ চালের ভাত অড়র ডাল দিয়ে মেখে

আলুভাতের সঙ্গে ? দারুন, তাই না ?

তুমি আর কিই বা করবে ? বেচারা মধ্যবিত্ত !

যতোই গদিবদল হোক দাদা

চাষি ওই এগারো পয়সা করেই বেচে চলেছে—

কানু সান্যাল তাকে এক টুকরো জমি পাইয়ে দিয়েছেন বটে

কিন্তু আলুর দাম বাড়িয়ে যেতে পারেননি

বিপ্লব মহাজনদের ছোঁয় না

প্রেম কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড

ইদুরেরা জানে না আলফনসো আম ৫০০ টাকা ডজন

আবুঝমাড়ের জঙ্গলের আদিবাসিরা জানে না কাকে আলফনসো আম বলে

তারা জানে খাকি রঙ মানেই আতঙ্ক

কে যে কখন মরবে

কাকে যে কখন ধরে জেলে নিয়ে যাবে

সে ফিরবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই

ফিরলেও থেঁতো হয়ে ফিরে আসবে

আমি ঘুমের মধ্যে ফোঁটা-ফোঁটা রক্ত পড়ার শব্দ শুনতে পাই

জানি না তা কার রক্ত

জানিনা তা কাদের রক্ত

আসলে আতঙ্ক ব্যপারটা হলো বোধশক্তির পরীক্ষা

মানুষই কেবল আতঙ্কিত হয় কেননা মানুষই কেবল প্রেমের কথা জানে

মৃত্যুর পাঠক

পাঁচদিন পাঁচরাত ঝুলেছিল অদ্রীশ বিশ্বাস, আমার বিদগ্ধ পাঠক,

বুঝতে কি পেরেছিল পচে যাচ্ছে ক্রমে, সময়ের সাথে,

বনিবনা করতে পারেনি মানুষের সাথে, পারেনিকো কেন ?

জীবনানন্দ তো যাহোক কিছুটা পথচর নিশাচর হয়ে

মানিয়ে ছিলেন তো নিয়ে, অক্ষরের সাথে, ইতিহাস বই থেকে খুঁটে

কে ছিল আত্তিলা, দারুচিনি গাছের জঙ্গল কোন মস্তিষ্কের কোণে–

অদ্রীশ পারলো না, বলেছিল, ওকে রায়গঞ্জের পথে সাইকেল থেকে

একদল মাস্তান টেনে বেদম মেরেছিল, ওকে চারতলা থেকে হিঁচড়ে

টেনে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিয়েছিল পাগলাগারদে ;

বলেছিল পশ্চিমবাংলায় দুইটি ঘটনা আর ঘটবে না কোনোদিন

নেতাজির ফিরে আসা এবং সিপিআইম-এর গদিতে ফিরে আসা–

এ সেই অদ্রীশ, সোনাগাছি গিয়ে বিনয় মজুমদারের স্ত্রী ও ছেলের

ফিল্ম তুলে এনেছিল, কতোকিছু সংগ্রহ করেছিল একাধিক বই লিখবে বলে–

গলায় ফাঁস দিয়ে ঝোলার সময়ে পৃথিবীকে ফালতু জায়গা ভেবে

গন্তব্য শেষ করে নিলো । পাঁচদিন পাঁচরাত ধরে ঝুলে পচতে থাকাকে

মৃত্যু বলা যায় ? তারপর মর্গে গিয়ে আরও সাতদিন সাতরাত

চুপচাপ শুয়ে অদ্রীশ যা চেয়েছিল তা কি পেয়েছিল, পচে গিয়ে ?

আসলে প্রথম থেকে অদ্রীশ চেয়েছিল মৃত্যুর পাঠক হতে

ওর আগে আর কেউ মৃত্যুকে বিনির্মাণ করার চেষ্টা করেনিকো–

অদ্রীশ বিশ্বাস করলো, কিন্তু জানিয়ে গেল না, বিনির্মাণের চিরকুট

লেখবার প্রয়োজন মনে করলো না, অনির্ণেয় রেখে গেল উত্তরখানা ।

প্রেম

ঝড় উঠেছে, হয়তো বৃষ্টি আসবে, বলা যায় না

গোরু মোষগুলো যেখানে দাঁড়িয়েছিল

সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে, উপভোগ করছে ঝড়কে

ঝড়ে ওদের বিশেষকিছু এসেযায় না

নারকেলগাছের পাতা চুল এলিয়ে দিয়েছে, উপভোগ করছে

গাছেরা উপভোগ করতে পারছে না, হাত-পা ভেঙে লুটিয়ে পড়ছে

ব্যাঙের ছাতা কিন্তু উপভোগ করছে, চুপচাপ দাঁড়িয়ে

গোখরো সাপটা শীতের রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে ঘুমিয়েছিল

ঝড়ে গর্তের মুখে উঁকি মেরে চোখ বুজে উপভোগ করছে

শব্দ শুনতে পাচ্ছে পুকুরের মাছগুলোর লাফালাফি

দিনকতক আগেই খোলস ছেড়েছিল, এখন একেবারে টাটকা

মাঠে যে কংকাল পড়ে আছে তার ফিরে আসছে মাংসের স্মৃতি

পুরুষের কংকাল, পার্টির গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে খুন হয়েছিল

ঝড় আসছে দেখে প্রেমিকার হাত ধরে প্রেমিক পালিয়েছে

ইশকুলবাড়ির বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছিল

তখনই ধ্বসে পড়ল ইশকুলবাড়িটা ওদের ওপরে

সিন্ডিকেটের ঠিকেদার গতমাসেই তৈরি করেছিল

তারা তো ক্ষতির বিধাতা, প্রেমের বিধাতা তো নয়

ঝড় শেষ হবার পর সরকারি অফিসাররা খোঁজখবর নেবেন

তখন ওদের পাওয়া যাবে, ঝড়ের ভয়ে মরে পড়ে আছে

পাটলিপুত্রের সম্রাট

কতো যে সাম্রাজ্য জয় করা হয়ে গেলো, আমার সুনাম-দুর্নাম

ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে, বাবার নিরানব্বুই ছেলেকে খুন করে

বসেছি সিংহাসনে, এরকম কাহিনিও ছড়িয়েছে আমার শত্রুরা

আমি নাকি চণ্ডাশোক, রেগে গেলে রেয়াত করি না কাউকে

যা বলছে বলুক ওরা যা লিখছে লিখুক, আমার জন্ম নাকি দুইবার

দুইটি আঁতুড়ে, এখন সেসব প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষে মানুষেরা

পিকনিক করে, কুরুক্ষেত্রের মতো, আঠারোদিনের যুদ্ধ, শীতকালে

বাঘের চামড়ার বালাপোষ পরে, আমি যুদ্ধ লড়েছি খালি গায়ে

পাটলিপুত্র শহরের ইমলিতলার রেইনকোট পরিনি বৃষ্টিতেও

পোশাকের মৃত্যুচেতনা থাকে, যেরকম রাবণের ছিল, এখন

পাটলিপুত্রে পথের দুধারে বসে বাচ্চারা হাগে, আমার শিলালেখ

পড়বার ভাষা এরা সব কেউই জানে না, জল জমে, বর্ষায়

জঞ্জাল উঠে আসে বাড়ির ভেতরে, অলিগলি হামাগুড়ি দিয়ে

বড়োরাস্তায় পৌঁছে দেখতে পায় ছটপুজো করতে চলেছে

ঘোমটানশীন যুবতীরা, এরা কারা, কোথা থেকে এলো,

কোথায় গেলেন সেলুকাসের দেয়া হাজার গ্রিক যুবতীরা

প্রৌঢ়দের মুখে চব্বিশ ঘণ্টা যেন লেগে আছে ঘাটের মড়ার দুঃখ

আমার রথের চিহ্ণ, অশ্বখুরের ছাপ রাস্তা থেকে মুছে গেছে

লোকে ভাবে পাথরে খোদাই করে দুর্বোধ্য মেসেজ লিখে গেছি

দেখছি চারিদিকে নিত্যযাত্রীদের নিত্য উজবুক যাত্রা

সমুদ্র ফুরিয়েছে বাচ্চাদের খেলার ঢেউয়ে, কলিঙ্গ কোথায়

লক্ষ লোক মরে গিয়েছিল, লক্ষাধিক ক্রীতদাস আনা হয়েছিল

তাদের সন্তান পকেটে পিস্তল নিয়ে পাটলিপুত্রের পথে রাজনীতি করে

অথচ একদিন হাত-পা-কোমর থেকে সব অলঙ্কার আমি ফেলে দিয়ে

সাধারণ মানুষের মতো হতে গিয়ে বুঝতে পেরেছি তা হয়ে ওঠা

খুবই কঠিন, সেই পাটলিপুত্র আর নেই, এখন আমিই এই

ভুলে যাওয়া শহরের একচ্ছত্র বৌদ্ধ-ভিখারি, বোধি-অধিকারী

আদি টেম্পটেশান

মগজের বাঁদিকে ছান্দস, যা কিছু যোনির মতো দুই ফাঁক

বহু অন্ধকার তাহাদের রকমফের লয়ে আসে, যা কিছু যোনির মতো

হাসপাতালের পাঁচিলের পারে, যা কোনো যোনিতে গোপনে ছিল বাঁধা

যে বাসি রক্তমাখা তুলো,ওই রক্তই আমি, আকর্ষণের দেহতাপ রয়েছে তথায়

দেহ তো পাঠবস্তু, যোনির মতন দুই ফাঁক, পড়িতে না জানিলে

শবকে আগুন চাটে, ওই যে আঁস্তাকুড়ে মেয়ে-ভ্রুণ

ও-ভ্রুণের নাড়ির জমাট রক্তই আমি, একটি যোনি নষ্ট হয়ে গেল

শ্মশানে শ্মশানে ছাইয়ে আমি আছি, বহুযুগ, ঘায়ের নিষিদ্ধ রঙে

মটর ছোলার অড়হরে মুগের মুসুরের দুফাঁক যোনির অঙ্কুরে, আমাকে পাবেন

প্রতিটি যোনি দিয়ে গর্ভে গিয়েছি আমি

সাইক্লোনের ঘুরন্ত ল্যাজের ঝাপটের মতো

বাজার স্তনকে নিয়ে গেছে, বাজার যোনিকে নিয়ে গেছে, বাজার প্রেমকে নিয়ে গেছে

মুচকি দুঃখ-কষ্টের কিশোরীকে তুলে নিয়ে গেছে

সব নেবে, ওরা সব তুলে নিয়ে যাবে, প্রেম ভালোবাসা স্নেহ আদরের ছোঁয়া

ব্যথা শালা বলেনাকো কোথায় কবে কোনখানে আচমকা আঘাত দেবে

মরার পরের যন্ত্রণায়, লোভে উজ্বলমুখগুলো

আসবাব বলতে হাসি, মানুষের সংজ্ঞায় কিন্তু চুল নেই

মোমবাতিদের গান আছে, শীতের অলস সূর্যাস্ত, না,

তা আমি নই, আদালতে পেশ করা ছোরার রক্তই আমি, যোনিতে বসানো ছোরা

ব্যবসায়ীদের পোষা প্রেত ও প্রেতিনীরা, দরোজার ওই দিকে থাকে

বোমা মেরে থামিয়েছে সুফি গায়কের উল্লাস, তার ছিন্নভিন্ন দেহে

গান হয়ে আছি এখনও, তপ্ত যোনির মতো

দেয়াল ঘড়িতে যে গির্জা ঘণ্টাধ্বনি  মাঝরাতে স্বপ্ন ভেঙে জাগে

স্লিপিং পিলেতে মোড়া ঘুম, চেতনার রঙিন ম্যাকাও পাখি দল বেঁধে

কোথাও না কোথাও ধ্বংস হচ্ছে কিছু-না-কিছু, তার হুঁশিয়ারি

শ্মশানের ডোমও জানতে চায়, ‘এনাকে কেউ কখনও ভালোবেসে ছিল’

মাংস থেকে পাথরে যাবার মাঝে অহল্যার হাফ-বয়েল দেহ

মাংসের দু’ফাক যোনি পাথর হয়নি তো, আকর্ষণের দেহতাপ

আমি তাই, সমুদ্রের তীরে মরে পড়ে থাকা শিশুর পৃথিবীহীনতা….

নৌকোয় নাচ

মাঝিকে জিগ্যেস করলুম, ‘তোমার নৌকোয় নাচি

আমরা দুজনে ?’ মাঝিটি বললেন, ‘নৌকো তো নাচবার জন্য নয়

এপার ওপার করবার, নৌকো দোল খাবে, সামলাতে পারব না,

তাছাড়া আকাশ দেখুন, ঝড় এলো বলে, নৌকো যদি ডুবে যায় ?’

আমার প্রেমিকা বললেন, ‘ডুবলে তো ক্ষতি নেই, যাত্রী বলতে আমরা দুজন,

তুমি তো মাঝি বটো, নৌকো সোজা করে তুলতে পারবেই

আমাদের জন্য ভয় নেই, আমরা দুজনে সাঁতার জানি না,

তাইতো এসেছি আজকে ঝড়ের নৌকোয়

নদীর মাঝামাঝি গিয়ে জড়াজড়ি করে

নাচবো মনের সুখে, নাচবো দেহের সুখে, দর্শক বাতাস ঝড় মেঘ

আর তুমি । মাঝিটি বললেন, ‘নাচুন তাহলে, আমিও জীবনে কোনো দিন

মানুষ ও মানুষীর নাচ দেখি নাই ।’

মৃত্যুচেতনা

বাংলা ভাষার মাঝে মরে পড়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করবার নেই

শীতল নিথর শব, শরীরে পোশাক নেই, বুকের ওপরে দুই হাত

শুয়ে আছি, কখন  আলোচকদের দল এসে, টানা-হ্যাঁচড়া করে

তুলে নিয়ে যাবে, তাদের বাছাই করা ভাগাড়ে ফেলবে নিয়ে গিয়ে

পচবো সেখানে, গায়ে পোকা দেখা দেবে, শকুন কাক নেড়িকুকুরেরা

ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে, আমার ভেতরে যতো বাংলা ভাষার বীজ আছে

খাবে তারা চেটেপুটে, কয়েকশো বছরে কঙ্কালের হাড়গুলো

ধাপার মাটিতে মিশে যাবে, জংলি ফুলেদের জন্যে উপাদেয় সার

বাংলা ভাষার মাঝে মরে পড়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করবার নেই

ধন্বন্তরীর জন্মদিন

আমি ধন্বন্তরী, আজকে আমার জন্মদিন

অ থেকে কখগঘ হয়ে শেষ ব্যঞ্জনবর্ণ দিয়ে জোড়া

অত্যন্ত কালো আর পিচ্ছিল যে কালসাপ

টানাটানি করে অসুর ও দেবতারা

পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন, এ তথ্য জানার জন্য

বোবা না বধিরেরা কারা অমরত্বের দাবিদার

আমি সেই গূঢ় উত্তরের হাঁড়িটি ছিনতাই করে

মানুষের জন্তুর পাখিদের কীট ও সমুদ্রজীবের

মিসম্যাচ আরম্ভের কালখণ্ড শুরু করলুম

আমি ধনতেরসের অধিপতি

সাইক্লোনের ল্যাজ থেকে ‘সমাপ্ত’ লেখা প্রতিটি ভাষায়

কতো রকমের নৈঃশব্দ্যের বিস্ফোরণধ্বনি হতে পারে

শুনতে লাগলুম, সোনার রুপোর পেতলের কাঁসার

বাসনকোসন ক্রমে বৈভবশালীর গৃহে কাচের আসবাবে

পালটে গেলো, সেগুলো চীনদেশ থেকে আনা

যে দেবতা হাত দিয়ে খেতো

তারা সব কাঁটাচামচ ছুরি দিয়ে ননভেজ অমৃতখাদ্য

খেতে ব্যস্ত, কেননা আজকে আমার জন্মদিন

অসুরিণিদের দল অ্যালোভেরা মুখে মেখে

করলার লাউয়ের আমলোকির পালংশাকের জুস খেয়ে

বিষের আইসিং দেয়া কেক কাটবেন

কী আনন্দ কী আনন্দ,

আমার মূর্তিও চীনদেশে গড়া বলে সস্তায় মেলে

মৃত্যুর অবচেতনা

বঁটিতে মরচে পড়ে গেছে

ধার কমে এসেছে

কিছুই কাটা যাচ্ছে না

কে কাকে সিডিউস করেছে

লোহা মরচেকে

নাকি মরচে লোহাকে ?

বঁটির কাজ হলো কাটা

আনাজের মাছের রক্ত বইয়ে দেয়া

মরচে লোহাকে ফুসলিয়ে

ধার কমিয়ে দিয়েছে

যাতে আনাজের মাছের রক্তপাত

ঘটাতে না পারে

বঁটিরও মৃত্যুচেতনা আছে

মানুষ যে প্রশ্বাস নেয়

সেই বাতাসই শেষপর্যন্ত

বঁটিকে মেরে ফ্যালে

যদি কখনও কোনো ডাকাতের

গলাও কেটে গর্ববোধ করে থাকে

তবুও বছরের পর বছর ধার দিয়ে দিয়ে

বঁটিকে মরচের সিডাকশান থেকে বাঁচাতে হয়

মরচেকে লোহার সিডাকশান থেকে বাঁচাতে হয়

সিডাকশানের ভেতরেই থাকে

জড় আর প্রাণীর অবধারিত মৃত্যু

যৌনতার সিডাকশান প্রেমকে খুন করে

ভালোবাসা যৌনতাকে ফালতু করে তোলে

প্রতিটি ইন্দ্রিয়তে লুকোনো আছে

মৃত্যুচেতনা বা মরে যাবার আহ্বান

জড়ের হোক বা প্রাণীর

তার এক্সপায়ারি ডেট সঙ্গে আনে

বঁটির এক্সপায়ারি ডেট লোহা সঙ্গে আনে

খোলা সম্পর্ক

যে আসবে তাকে মুগ্ধ করার জন্য তৈরি হয়ে নিচ্ছে ও

ব্রেসিয়ার পরেনি, লনজারি পরেছে, ফিনফিনে

কালোর ওপর শাদা সিল্কের কাজ, তলায় লেস-বসানো

শুধু লাল টকটকে টপ, ট্রাউজার পরেনি,

হট প্যান্ট জিপ-দেয়া । লিপ্সটিক লাগিয়েছে । মেরুন ।

হাতে পায়ে নেল-পালিশও মেরুন । সারা দেহে ময়েশ্চারাইজার ।

শ্যাম্পু করা কাঁধ পর্যন্ত চুল । চোখে স্মাজ ফ্রি কাজল ।

দরোজায় রিং । তার মানে ও এসে গেছে ।

গিয়ে দরোজা খোলে । একে আরেকজনকে আলিঙ্গন করে ।

বন্ধুনির সঙ্গে বন্ধুনির প্রেম আজ কয়েক বছর হলো ।

বন্ধুনি আজ পাকাপাকি বন্ধুনির বাড়ি চলে এসেছে ।

সঙ্গে স্যুটকেস । সাজ একই রকম । ম্যাচিং ।

দুজনে আজ থেকে একসঙ্গে থাকবে ।

ওদের পুরুষ বন্ধুও আছে । ইচ্ছে করলে তারা এসে

যার সঙ্গে ইচ্ছে রাত কাটাতে পারে । কিংবা এরা কেউ

যেতে পারে পছন্দের পুরুষ বন্ধুর আস্তানায় ।

কবিতার মতন, যার যা পছন্দ ।

আমি লক্ষ্মীকান্ত, মহারাজা প্রতাপাদিত্যের অমাত্য

চলে যাচ্ছি অতিপ্রিয় যশোহর ছেড়ে, আর ফিরবো না কোনোদিন

কৃষ্ণবর্ণ ঘোড়া ছুটিয়ে পালাচ্ছি, বংশধরদের দিয়ে যাবো  খুরের গর্বধ্বনি

জখমের রক্তে শুনতে পাচ্ছি বৃষ্টির অঝোর, ধুমঘাট ছেড়ে চলে যাচ্ছি

প্রতাপাদিত্যের অনুচরেরা আমাকে হত্যার জন্য পেছু নিয়েছে, পর্তুগিজরাও

আমি প্রতাপাদিত্যের পালক পিতাকে খুন করার ষড়যন্ত্রে শামিল হইনি

পালক পিতাই কেবল নয়, রক্তসম্পর্কে প্রতাপাদিত্যের বাবার ভাই

তাকে খুন করল প্রতাপাদিত্য, আমার তাতে সায় ছিল না

বিক্রমাদিত্যের অপযশ পেয়েছেন মহারাজা, ছি ছি ছি ছি, চৌর্যবৃত্তি !

ওর বাবা শ্রীহরি, দাউদ খানের সোনাদানা নিয়ে কেটে পড়েছিল

নিজেই নিজেকে মহারাজা উপাধি দিয়েছিল, আমার তিরিশতম

বংশধরদের সময়কার বেহায়া রাজনীতিকদের মতন

স্বর্গে বসে শুনি আমার বংশধরদের পরিবার কুড়ি হাজার ছাড়িয়েছে

আমি প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে ছিলুম বহু যুদ্ধে, কতো শত্রুসেনাকে

কোতল করেছি, তাদের সেনাপতির মুণ্ড চুল ধরে উপহার দিয়েছি

আফগান তুর্কি আরব দক্ষিণি মগ হার্মাদ সেনাপতির মুণ্ড

প্রতাপাদিত্যের পায়ের কাছে, যদিও আমি ব্রাহ্মণের ছিলে, আমাকে

অকুলীন ঘোষণা করা হয়েছে, কায়স্হ রাজার সঙ্গ দিয়েছি, তাই

আমার বাবা কালীঘাটের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, মা স্বপ্ন দেখেছিলেন

সরোবরে সতীর হাত পড়ে আছে, অন্ধকার রাতে আমার কালো

ঘোড়া ছুটছে বঙ্গোপসাগরের দিকে, আমি বসত গড়ব সেখানে

আমি জানতুম না যে পর্তুগিজদের হার্মাদদের মগদের মতন

জোচ্চোর সমাজ গড়ে তুলবে বাঙালিরা, তাদের ভাষা পালটে যাবে

নখ চুল বিক্রি করার বাজার গড়ে উঠবে, বাজার বাজার বাজার

বাজার মানে দোকানপাট নয় যেমন ছিল প্রতাপাদিত্যের রাজত্বে

আমার বংশধরদের সময়কার বাজার মানে নিজেকে বিক্রি

প্রতাপাদিত্য কিন্তু নিজেকে বিক্রি করেননি, লড়ে গেছেন

ষড়যন্ত্র করেছেন, দুর্গ গড়ে তুলেছেন, নৌবহর গড়ে তুলেছেন

কিন্তু প্রতাপাদিত্য প্রথম বাঙালি, তিনিই দিয়ে গেলেন বাঙালির

রক্তে আত্মধ্বংসের বীজ, তখন থেকে বাঙালিরা নিজেরা

লড়ে মরছে, শ্রীহরি যেমন নিজেকে মহারাজা ঘোষণা করেছিলেন

জেলায় জেলায় অপরাধীরা নিজেদের মহারাজা ঘোষণা করছে

গরিব চষির লক্ষ লক্ষ টাকা মেরে চিটফান্ড খুলে কেটে পড়ছে

এরা সকলে দাউদ খানের ধনসম্পত্তি নিয়ে ডুবিয়ে দিয়েছে

বাঙালিদের, যশ থেকে যে যশোহর হয়েছিল, সেই যশ আর নেই

প্রতাপাদিত্য ছিলেন হিন্দুদের মহারাজা কিন্তু এখন লোকেরা

নিজেদের হিন্দু বলতে কুন্ঠিত হয়, যদিও তাদের নুনু কাটা নয়

আমি লক্ষ্মীকান্ত, আমার নুনুও কাটা নয়, কিন্তু আমার সেনায়

অধিকাংশ নুনুকাটা আফগান তুর্কি আরব ঘোড়সওয়ার

আমার ঘোড়ার পূর্বপুরুযও এসেছিল আরব দেশ থেকে, বাবরের

সেনাবাহিনীর সঙ্গে, যদিও বাবর আরব ছিল না, বাবরের ছেলেরা

এখানের যুবতীদের বিয়ে করে থেকে গেল, ওদের দেশে এরকম

সুন্দরী কখনও দেখেনি তাতার বাহিনীর সৈন্যেরা, ওদের যুবতীদের

চোখ ছোটো নাক চেপ্টা ঠোঁট পাতলা নয়, যদিও ব্রাহ্মণ সন্তান আমি

তাতার আফগান তুর্কি ফিরিঙ্গি তরুণীদের সঙ্গে শোবার সুযোগ পেয়েছি

অ্যাণ্টনি ফিরিঙ্গির রক্তে আমার বংশের রক্ত বইছে, ওর বাবা

আমার বংশধরের রক্ষিতার ছেলে, শ্যাম রায়কে পুজো করতো লালদিঘিতে

আমি লক্ষ্মীকান্ত, মহারাজা প্রতাপাদিত্যের অমাত্য, সাবর্ণ গোত্রের যোদ্ধা

আজ পর্যন্ত কেউ তরোয়াল চালানোয় আমাকে হারাতে পারেনি

কতো মুণ্ড এক কোপে ধরাশায়ী করেছি তার গোনাগুন্তি নেই

আমার বংশধরেরা তাই করবে একদিন, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে

ঘোড়ার পিঠে বসে চালাবে তরোবারি, যারাই সামনে আসবে  মূর্খ মুণ্ড

গলা থেকে কেটে ফেলবে ধুলায়, সেসব মুণ্ড বেঁচে থাকবে, কথা বলবে

দরবারে গিয়ে যে-যার লেজটি নাড়িয়ে রাজা বা রানির সেবাদাস হয়ে

সারটা জীবনভর ঘেউ-ঘেউ করে ক্রমে-ক্রমে জীবাশ্মের রূপ নেবে

যশোহর ছেড়ে চলে আসলেও ভুলতে পারিনি কখনও

যশোহর ছেড়ে চলে আসলেও ভুলতে পারনি কখনও

আমার বংশধরেরা যশৌ্র রোড দিয়ে যাবার সময়ে মনে করবে

তাদের পিতৃপুরুষ এই পথে একদিন কালো ঘোড়া

ছুটিয়ে একদিন জঙ্গল সাফ করে কলকাতা সুতানুটি গোবিন্দপুরের

পত্তন করেছিল, ক্লাইভের পোঁদ চাটবার জন্য কৃষ্ণচন্দ্রের মতো

নিজেকে বিক্রি করিনি, আমার বংশধররাও নিজেদের শিরায় শিরায়

আমার রক্ত নিয়ে প্রতিরোধ করে যাবে অন্যায়ের, শোষণ ও অত্যাচারের

এরকমও তো হতে পারে

এরকমও তো হতে পারে

খারাপ কালখণ্ড এলো

সূর্য আর উঠবে না কোনো দিন

.

এরকমও তো হতে পারে

আমরা সবাই হাত-ধরাধরি করে

নাচবো গাইবো গিটার বাজাবো

.

দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা ব্যথায়

কাতরাবো মরে গেলুম প্রতিদিন

এরকমও তো হতে পারে

কৈতব

আমি চটের সুতলি জড়ানো বীজ

পেরেক ছররা কাচের টুকরো আছে আমার বুকে

.

আমার আলোর চারিধারে আদর করে জড়িয়ে দিয়েছে

আমি আগুনের ডানা মেলতে পারি

.

আমি নিরপেক্ষ

শিশু বুড়ো বউ সবাইকে সমান চোখে দেখি

.

আমি নিজে রাজনীতি করি না

যারা করে তারা আমাকে আড়ালে ভালোবাসে

.

আমার চরিত্রে কোনো দোষ নেই

আমি তো বীজ মাত্র

ভাঙা কাপড়ের তাপ্পিমারা কাঁথা

মায়ের এক্স এক্স শায়া আর বাবার এক্স ওয়াই পাঞ্জাবি

ছুঁচেতে প্রতিমা-ভাঙা শাবল দিয়ে লিখে গেছেন অঞ্জুমান রোজী

ঠাকুরগাঁওয়ের কালী প্রতিমার নীল ত্বক ছিঁড়ে তাপ্পি দিয়েছেন

তখন এক্কেবারে বোবা মূর্তি তো মাটির

নারীকে শ্রদ্ধা জানাবার বদলে

না না পাকিস্তানের তিনশো ফিলমের সুন্দরী নায়িকা নয়

তিনি কেনই বা কাঁথায় শোবেন মুবিনকে ডিভোর্স দিয়ে

কাঁথার ওপরে বসে শায়রানা মেহফিল ইস অঞ্জুমনমেঁ

বহুত খুব বহুত খুব

আরবি মেহফিলের সঙ্গে ইংরেজি গোলাপের মিলন

কাঁথা কি জানা ম্যায় কওন

দমাদম মস্ত কলন্দর

কাঁথাকে ঘেন্না করুন নুরিতা নুসর খোন্দোকার কাঁথার

সেলাই ফোঁড়াই দেখে বলেছেন কাঁথার রুচি বড্ডো বাজে

ঠাকুরগাঁওয়ের শিবের বাঘছাল কৌপিন ছিঁড়ে তাপ্পি দিয়েছেন

এর ওপর হা-হা গ্রীষ্মে শোয় লোকটা নাকি হি-হি শীতে চাপা দেয়

মনোরমা বিশ্বাস বললেন কাঁথা ব্যাটা নির্ঘাত ভায়াগ্রা খায়

কুলদা রায় আসলে পদবিটা অন্য ছিল লুকিয়ে রায় হতে হলো

বেরালে কাঁথা দেখলেই তাতে সাহিত্য হাগতে চায় সিংহের হাগুম হাগুম

বললে কাঁথাটা পারভারটেড, নাসিরনগরের দুর্গার গরদ ছিঁড়ে

তাপ্পি মারলে কাঁথায় খুলনার কীর্তনীয়াকে মেরে তার গেরুয়া

ইউসুফ তাপোশ বলেছে কাঁথাটা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভাঙা গণেশঠাকুরের

বোকার জন্নতে থাকে বললে নুরুজ্জমান দেলাওর ; কাঁথাটা ভাবছিল

জাহান্নমে নয় কেন, যেখানে ভার্জিলের সঙ্গে দান্তে গিয়েছিল

সেই কথা জেনে ফরিদ উজ জামান বলেছিল কাঁথাটা ইতর শ্রেণির

অমিতাভ দাশ মাচানে দাঁড়িয়ে কাঁথাটাকে অত্যন্ত দুর্গন্ধময়

এরকম কাঁথা বস্তিশ্রেণির রিকশওয়ালারা ব্যবহার করে ছিঃ ছিঃ

সাগরের লুম্পেন ঢেউ হাওয়ায় বিলি কেটে দিচ্ছিল

উনি অবাক কেন সূর্যকে সপ্তাহে একদিন ছুটি দিচ্ছে না

বাচাল বাচাল বলে গেছে সাইদুর রহমান ; কাঁথাটার ইচ্ছে

এইসব নারী ও পুরুষদের এক চিলতে অমরত্ব দেয়া যাক–

কাঁথায় মুড়ে নিয়ে নয়তো এদের কেই বা মনে রাখবে এমনকি

অবিনাশ কবিরাজও মনে রাখবে না বলবে কাঁথার কথা শোনেনি

পিকাসোর পায়রারাও তো বুড়ি হয়ে বাদুড়ের চেহারা নিয়েছে

ধরুন সমুদ্রে গিয়ে মাছের ঝাঁক রাস্তা হারিয়ে ফেলল কী হবে

মৌলবাদী চাপাতির ভয়ে গাছে-গাছে উল্টো ঝুলে থাকবে

বহুত খুব বহুত খুব

আমার কিছুই আসে-যায় না

বেঁচে থাকার কারণ ওই একটাই, কবিতা

সে কুচ্ছিত, সে কালো, সে যা-ই হোক

কেবল বেঁচে থাকাই বেঁচে থাকা নয়

ভালোবাসতে জানতে হয়

আমি কবিতাকে ভালোবাসি

যন্ত্রণা সইতে হয়, সহ্য করি,

নোংরা-নোংরা গালমন্দ খেতে হয়, খাই,

পাড়াপড়শি এড়িয়ে ওই ফুটে চলে যায়, এড়াক

নাকে রুমাল চেপে লোকে পাশ কাটায়, কাটাক

নিজের মতো করে ভুল করি, করি তো

ভদ্দরলোকেরা ঘেন্না করে, করুক

ক’জনই বা বুক ঠুকে ভুল করে

সবায়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে ভালোবাসে

যেদিকে কেউ যেতে চায় না সেদিকেই যাই, গেছি তো

কি-কি না করেছি কবিতার জন্য

আর কেউ করে দেখাতে পেরেছে আজ অব্দি, পারেনি

ভালোবাসতে জানতে হয়, সবাই ভালোবাসতে পারে না

তারা ভালোবাসতে গিয়ে খবরযন্ত্রে জড়িয়ে পড়ে

তারা ভালোবাসতে গিয়ে টাকা-বাড়ি-গাড়ির খপ্পরে পড়ে

ভালোবাসতে গিয়ে পুরস্কারের ফাঁদে তাদের পা কাটা যায়

ভালোবাসতে গিয়ে তারা রাজনৈতিক দলের কুকুর হয়

শেষ পর্যন্ত তারা জানতে পারে না ভালোবাসা কাকে বলে

তারা ভাবে বেঁচে থাকা মানেই বুঝি ভালোবাসা

আমি কবিতাকে ভালোবাসি, আমি কবিতাকেই ভালোবাসি

তাতে কার বাপের কি এলো-গেলো

তাতে আমার কিছুই আসে-যায় না

নারীর দিব্যতার প্রেমের কবিতা

নারীর জন্মদিন কবে ? যেদিন বালিকাটির সোনালি রোমের উদ্গম–

অথবা সেইদিনখানি যেদিন কিশোরীটি করিল অসুস্হবোধ

যোনি হতে অকস্মাৎ নামিল গাঢ় রক্তঝর্ণা এবং তাহাকে

একাকীত্বের গৌরবে লয়ে গেল, তলপেটে ক্র্যাম্প, পাইল মেইডেন

খেতাবখানি, অথচ ক্রিকেট ক্রীড়ায় কী করিয়া মেইডেন সেঞ্চুরি

নিরানব্বুই রানের পরও যুবক-যুবতীরা করে ! নিরানব্বুইবার

কিশোরিটি যৌনসঙ্গমের পর মেইডেন সেঞ্চুরি করিবে কি ?

তাহার পূর্বে সে ক্লিটোরিসে নিজেকে আদর দিয়া ক্লিটোরিনি নয় ?

তর্কটি রহিয়া গেল, যদ্যপি ঋত্বিক ঘটক বলিয়াছেন ভাবো ভাবো–

ভাবিয়া পাই না, প্রথম ঋতুর দিন নাকি রোম উদ্গমের রাতে নাকি

যেদিন তাহাকে জন্মদাত্রী প্রসব করিয়াছিলেন নাকি ক্লিটোরিনি

হইলা যে রাতে, অথবা স্তনবৃন্ত হতে দুধের ফোয়ারা নামিয়া আসিল !

মাতৃদেবীদের কেন ছেলে চাই ছেলে চাই ছেলে চাই ? ভেনাসরমণীর

হাতের আয়নাখানি ক্রমে রজঃডিম্বানুর রূপ লহিয়াছে, যদ্যপি

ভেনাসের যোনি রোমহীন, তেমতই বত্তিচেলি চিত্রাকারে

ঘোষণা করিয়া গেছেন ; পাশ্চাত্য চিত্রকরগণ ভুল শিক্ষা দিয়াছেন

আমাদিগের মতো নিষ্পাপ বালকদিগকে যাহারা স্বমেহন করিবার

জন্য সুন্দরী নারীদের ছবি অন্বেষণকরতঃ চক্ষু মুদিয়া কামখেলা করে

যেমন মদিগলিয়ানি নারীর যোনি ও পশ্চাদ্দেশ উভয়ই রোমহীন

করিয়া গিয়াছেন ; তিনি কি সে-নারীকে বলিয়াছিলেন, অহো, অহো,

যাও গিয়া রোমহীন হইয়া আইসো, তোমাকে ভেনাসের অনুরূপ

করিয়া তুলিব, অথবা ফ্রানসেস্কো গোয়ার লা মাজা দেসনুদ, টিটিয়ান

অঙ্কিত ভেনাস অফ উর্বিনো, এদোয়ার্দ মানের অলিমপিয়া —

তাঁহারা নারীকে কহিতেন উইফমান, কিছুদিন পর উওম্মান, যখন

ক্যানভাসে কবিতায় নারীরা উদয় হইলা ত্রিকোণের রোমসহ, তাহাদের

উওম্যানরূপে, গজগামিনী হইতে অফিসগামিনী তাহাঁরা করিলেন–

প্রকাশ কর্মকার কয়লাখনিতে গিয়া আঁকিলেন কুচকুচে কুচযুগ নারী

যৌগেন চৌধুরী দেখাইলেন অভিকর্ষ নারীদেহে কিরূপ খেঁচোন মারে–

শোনপুর মেলায় গিয়া নাচিয়াছি ছম্মকছল্লো ঘাঘরাউলির সাথে–

লোখণ্ডওয়ালার মোড়ে আহ্বান শুনিয়াছি রাত্রির স্বল্পবাস মডেলের–

আমস্টারডামের লাল জানালায় দেখিয়াছি প্রায় নগ্ন বিদেশিনিদের–

পুরুষের পৌরুষের ন্যায় নারীরা নৌরুষ পাইল, ফেমিনিস্ট হইয়া

তাহাঁরা বক্ষবন্ধনী ফেলিয়াদিলেন, সে কি আনন্দের দিন ছিল

আমাদিগের মতো ছোটোলোকদের, গোয়ার সমুদ্রতীরে উলঙ্গ যুবতী

রোমহীন, যেন সদ্য ভূমিষ্ঠ হইয়াছেন, রৌদ্রে তাহাঁদের এসট্রোজেনের

গন্ধ — এয়োস্ত্রী, বিধবা, কনসর্ট, এসকর্ট, রক্ষিতা, মিসট্রেস, বারাঙ্গনা–

রৌদ্রের চরিত্রস্খলন হয় না তাহাতে ; খাজুরাহো মন্দিরে দেখিয়াছি

নারীদের, আটশো শতক হতে অমনভাবেই তাহাঁরা কেমনে আটক

অঙ্গপ্রত্যঙ্গে কি ব্যথা নাই, কলেজগামিনীর ন্যায় ; বন্ধুদের সাথে যৌবনে

খাজুরাহক্রীড়া করিবার চেষ্টা করিয়াছি, সে-নারীরা ডবলদক্ষিণা সত্বেও

কিছুক্ষণেই হাঁফ ছাড়ে ; চাণ্ডিলা নারীদের ন্যায় নৌরুষ নারীর বড়োই

অভাব, পথেঘাটে অলিতে-গলিতে এতো লম্পট ও ধর্ষকেরা লুক্কায়িত

এবং পুলিশি ঘুষখুরি, যে কারণে প্রেমও পুরাতন ব্যকরণ হারায়েছে–

লাভস্টোরির নায়ক-নায়িকার ন্যায় এখন কেহই একটিমাত্র লিঙ্গ লয়ে

তৃপ্ত নহে, আধুনিক ঔষধের গুণে প্রেমিক ও প্রেমিকা বদলের যুগ

আসিয়াছে ; একজন বনলতা সুপর্ণা নীরা লয়ে হাহাকারকারী পুরুষের

যুগ আর নাই ; যতো প্রকারের যোনি ততো প্রকারের ভালোবাসা

যতো প্রকারের ঠোঁট ততো প্রকারের চুম্বন ; মহাগুরু ভারতচন্দ্র

চিহ্ণিত করিয়া গিয়াছেন, অহো, অহো, স্বীয়া, মুগ্ধা, নবোঢ়া, পরকীয়া,

মধ্যা, প্রগলভা, ধীরা, অধীরা, অনূঢ়া, উঢ়া, বাগবিদগ্ধা, বিদগ্ধা,

ক্রিয়াবিদগ্ধা, গুপ্তা, কুলটা, মুদিতা, বনিতা, বক্রোক্তিগর্বিতা, মানবতী,

রূপগর্বিতা, উৎকন্ঠিতা, অভিসারিকা, কামিনী, মৃদুগামিনী, খণ্ডিতা,

তনুদামিনী, বিপ্রলব্ধা, স্বাধীনভর্তৃকা, কলহান্তরিতা, প্রোষিতভর্তৃকা–

ভারতচন্দ্র মহাশয়, কোথায় আছেন আপনি, স্বর্গে না নরকে, আমিও

তথায় যাইতে চাহি, কেমন করিয়া বুঝিলেন শঙ্খিনী, পদ্মিনী, হস্তিনী

এবং চিত্রিনী কাহার যোনিতে বেশি রোম আর কার বত্তিচেলি, সঙ্গমে

কোন নারী টক্কর দিতে পারে আর কোন নারী বড়োই ফ্রিজিড !

হায় গো ভারতচন্দ্র, গর্ভনিরোধক বটিকার কথা জানিতেন না —

একটি বটিকা খাইলে পর নারী বাহাত্তর ঘণ্টা সঙ্গম করিতে পারে–

তা তাহাঁর স্বাধীনতা, বহুবার অরগ্যাজমের অধিকারিনী তাহাঁরা–

বটিকাই চাঁদনি রাতের রূপ লহিয়াছে, যেন সন্ধ্যাকালের রবীন্দ্রসঙ্গীত–

নিঃশব্দে চিৎকার করে অন্ধকার, “নে এবার শুরু কর, গুটিপোকা ঢঙে,

স্মার্টফোনে ট্রিপল এক্স দেখে নিয়ে উথালিপাথালি কর নিজেকেই নিয়ে”—

রাজা রবি বর্মার ক্যালেণ্ডার নারীদের দেখি, কেমনে তাহাঁরা হইলেন

দেবী ; হিন্দুর পুজার ঘরে ফিবছর ক্যালেন্ডার হইতে নামিয়া আসেন

এমনই রাম ও সীতার একখানি ফ্রেমে বাঁধা ছবি দেখিয়াছিলাম ফৈজাবাদে

বাবরি মসজিদখানি ভাঙিয়া ফেলার পূর্বে ; তবে নারী বলিতেই কেন যে

রেশম পোশাকে ট্রয়ের হেলেন ও মিশরের ক্লিওপেট্রার কথা স্বপ্নে

নামিয়া আসে ; দেখি তাহাঁদের সোনালি রোমের উদ্গম রজঃসিক্ত উরু–

বহুবিবাহের পরও আঁটস্তনী, নিম্ননাভি, লালাসিক্ত রসময় ঠোঁট–

সেই হতে নারীদের অবজেকটিফাই করিতেছি, করিব না ভাবি, তবু করি–

কোলবালিশের নাম দিই মনরো মেরিলিন ; বোরখার ভিতরে নারীদের চোখ

দুটি দেখি ও মনে লয় অহো গর্তও সাত্বিক পবিত্র হয়, যাহা, বাৎস্যায়ন

কহিয়া যান নাই ; তারুণ্যে, কোলবালিশেরে কালো ওয়াড় পরাইয়াছিলাম-

চটকাইয়াছিলাম, প্রাণাধিক বাসিয়াছিলাম ভালো বালিশি-আরব রমণীরে–

ক্রুসেডে যাত্রার পূর্বে লৌহবর্মে যোনিকে মুড়িয়া চাবিখানি লইয়া যাইতেন

পুরুষেরা; বহুকাল পর ফিফটি শেডস অফ গ্রের মাধ্যমে দেখাইলেন নারীগণ

যৌন ক্রীতদাসীরূপে অত্যাচারিত হইতে ভালোবাসে ; আমি তো বোলতিবন্ধ–

সেরূপ অবাক শিবের লিঙ্গ দেখিয়া হইয়াছিলাম, বৃদ্ধবৃদ্ধা পুজিতেছে যোনির

ভিতর এক প্রবিষ্ট পুং, পাথরের বরফের মাটির লোহার বালুকার অষ্টধাতুর–

সক্কালবেলায় শুনিতেছে নস্যনাসিকায় বীরেন্দ্র ভদ্রের ইয়া দেবী ইয়া দেবী

তুমি অমুক তুমি তমুক তুমি তুসুক তাই দাও দাও দাও দাও হাত পেতে রই–

নেয়ানডারথাল যুগ হতে, নারীরা দিবার জন্য আসিয়াছে, রাঁধিবে তাহারা–

পুরুষেরা হত্যা করিবে ইন্দিরা গান্ধি বেনজির ভুট্টো অ্যানা পলিটোভস্কায়ারে–

ঋত্বিক ঘটক বলিয়া গেছেন, ভাবো ভাবো, তাই নারীদের কথা ভাবিতেছি–

জেসিকা লাল, নীরজা ভানোট, প্রিয়দর্শিনী মাট্টু, লক্ষ্মী অগ্রবাল, নীলম কাটারা,

সুনীতা কৃষ্ণণ, অরুণিমা সিনহা, পল্লবী পুরকায়স্হ, রুচিকা গিহরোত্রা,

সুজেট জর্ডন, জ্যোতি সিংহ যাহাঁরা প্রতিষ্ঠানকে বদলাতে বাধ্য করিয়াছেন–

অথবা বেগম হজরত মহল, ঝাঁসির লক্ষ্মী বাঈ, ম্যাডাম ভিখাজি কামা,

অ্যানি বেসান্ত, সাবিত্রীবাঈ ফুলে, যাহাঁদের কথা ভাবিবার কথা ভাবিনাকো–

প্রতিদিন বিজ্ঞাপনে দেখি সুন্দরীর দল  টঙ্কার লোভে হাফুলঙ্গ একটি অবজেক্ট ;

আইটেম নৃত্যে দেখি বুকের খাঁজের মাঝে রঙিন আলোর ঝাঁক ; পুরুষের তরে

যুবতীরা স্বয়ং করিতেছে, অরগ্যাজম ঘটিতেছে ক্যামেরার ; দেশীয় সংস্কৃতি

শিখায়ে দিয়াছে বিবাহ করিতে হইলে একখানি বিউটিফুল মুখশ্রির ট্রফিবউ

যাহার ত্বকের রঙ জাপানি মেয়ের, পাতলা কোমর, ভরাট দুইটি বুক এবং

নিতম্বখানি তানপুরার ন্যায় ; তাহার দেহের উপরে তাহারই  অধিকার–

সম্পত্তির অধিকার কেন সে পাইবে না, শিক্ষায় সমান সুযোগ কেন পাহিবে না

চাকরি ও মজুরি কেন পাহিবে না পুরুষের সমান-সমান ; কেন সে যুদ্ধে

শত্রুর বিরুদ্ধে লড়িতে যাইবে না, ধর্ষকের লিঙ্গচ্ছেদ করিবে না, বলো, বলো–

ভোগবাদী বঙ্গীয় সমাজে, শাশ্বতী গার্গী মৈত্রেয়ী অপালা অদিতির ন্যায় নারীদের

জন্ম কি সম্ভব, যাহাঁরা ইন্দ্রের ব্রহ্মবাদিনী উপদেষ্টারূপ বহুখ্যাত ?

অথবা অনসূয়া, যাহাঁর প্রেমের রোষে সূর্যোদয় বহুদিন বন্ধ রহিয়াছিল !

নারীর রহস্য আমি বুঝি নাই, দীপিকা-প্রিয়াঙ্কা-আলিয়া  যেমত বুঝি নাই–

ঋত্বিক কথিত উপদেশে, ভাবিয়া পাই না, নারীর সত্যকার জন্মদিন কবে…

সান্টাক্রুজের মেছুনির সঙ্গে প্রেমের কবিতা

চল্লিশ বছর পর আজ সান্টাক্রুজে গিয়েছিলুম মাছের বাজারে

সেই মেছুনি যুবতীর খোঁজে যে প্রতি শনিবার

খোঁপায় চাঁপাফুলের মালা জড়িয়ে আসতো–

আমি ওকে বলেছিলুম একদিন ফিসফিস করে

বড্ডো বদ গন্ধ বেরোয় তোর কাছে আসলে

শাশুড়ির সামনেই আমার সঙ্গে ফ্লার্ট করতো, আমিও করতুম

বলেছিলুম, পচা মাছ চাপিয়ে দিসনি যেন

যুবতী মেছুনি আমাকে তাজা মাছ চিনতে শিখিয়েছিল

সমুদ্রের মাছ, তাদের নাম, কেমন করে রাঁধতে হয়

সান্টাক্রুজ বাজারে গিয়ে আজ মন খারাপ হয়ে গেল

এই মন খারাপই প্রেম, মেছুনির সঙ্গে লুকিয়ে রাখা প্রেম–

বরকে ছেড়ে আরেকজনের সঙ্গে কোলহাপুরে চলে গেছে সে

হাঁপানিরোগ, প্রিয়তমাসু

এতো মনে রাখো তুমি, কখন হঠাৎ মাঝরাতে এসে টোকা দাও

ঠোঁটের ওপরে ঠোঁট চেপে শ্বাস বন্ধ করে দাও, জেগে উঠি

সঙ্গে আনো হাওয়ায় উড়ন্ত রাতের রঙিন পরাগ

হাইওয়ে দিয়ে ছুটে যে সমস্ত ভারি-ভারি ট্রাক যাচ্ছে

কুরুক্ষেত্রে দুঃশাসনের রক্তপায়ী ভীমের অগ্নিচোখ জ্বেলে

তাদের উন্মাদ ডিজেলের গুঁড়ো ট্যালকম পাউডারের মতো

সারা গায়ে মেখে আসো, অগাধ ঘুম থেকে টেনে তোলো

তোমার নিঃশ্বাসের সাথে আমার প্রশ্বাস মিলিয়ে ছন্দহীন

বাজাও আয়ুসঙ্গীতের ফুলকি ক্ষণে ক্ষণে

তোমাকে ছেড়ে আমি কৃত্রিম প্রিয়াকে হাতে তুলে নিই

তার শ্বাস আমাকে শান্ত করে, তারপর নিশ্চিন্তে ঘুমোই–

জোর করে প্রেম করা যায়নাকো, কতোবার বলেছি তোমায়

সনির্বন্ধ অনুরোধ করেছি সকাল-বিকেল-মাঝরাতে

আমাকে ছেড়ে তুমি চলে যাও, ভালো আমি তোমাকে বাসি না

খোট্টা প্রেমিক

আমি হলুমগে নামধন্য লাৎখোর খোট্টা প্রেমিক

ভালোবাসা দিতে অক্ষম, শালা, নিতেও অক্ষম, প্রথম চেষ্টাতেই

দুলাথ্থি খেয়ে, শালা, ছিটকে পড়েছি অন্য তরুণীর বুকে–

এই সেই অক্ষমতা যার বিকারানন্দে গ্যাঁজা ফুঁকে নাচি

লিট্টি-চোখা-ঠররা সাঁটিয়ে যমজ মাংসের ভাঁজে, শালা

মগজে এঁটেল কষ্ট, জানলায় মহানগরের নকল সকাল

স্বর ও ব্যঞ্জণবর্ণের বাইরে বেরিয়ে, শালা, কবিতার মৌলভাষ্য

বুঝে গেছি লাৎখুরি প্রেমে ; কাকেরা এ-শহরের ডিস্কজকির দল

ইঁদুরের মাংস থেকে বিরহযন্ত্রণা খুঁটে-খুঁটে খায়, সে ইঁদুর, শালা,

খাড়া হোক কিংবা ন্যাতানো, এভাবেও বলা যায়, ধরুন যেমন

নদীর রক্তচাপ বাড়াচ্ছে ইলিশের ছেড়ে যাওয়া ডিমের ওপরে

পুং-ইলিশের বীর্য-ফেনা, শালা, ইলিশও লাৎখুরি করে প্রেমে

দূর থেকে যেটুকু ঝরিয়ে ফেলে কেটে পড়া যায়, তারপর বাজারে চিৎপাত

ক্রোধহীন কবিদের মতো, শালা, যাদের আদিনিবাসের রাস্তা মরে গেছে

স্বমেহন করে-করে, কাউকে শ্রদ্ধা করে না, শুধু বাকতাল্লা অভিনয়

শালা, খুঁজে মরছে ভিকিরি কাতারে বসে দরোজা-দরোজা্য

ককিয়ে কান্নার স্মৃতি, শালাদের বাপ-চোদ্দোপুরুষ কে বা কাহারা

নিজেরা জানে না, গুদোন্মাদ চ্যাংড়াদের কালোয়াতগিরি

ইনিয়ে বিনিয়ে ভেঁজে যাচ্ছে গুচ্ছের কাচরা-কিচাইনে

কচ্ছপ খোট্টার সেক্স

আরেকটা শরীর হলে ভালো হতো, দুজন কচ্ছপই জানতো তা

তবে জানতো না কোনটা মাস্টারপিস, ভ্যান গগের কুর্সিখানা

নাকি যে শ্বেতাঙ্গিনী বুকের ভাঁজের আলো মেলে দেখছে ভ্যান গগ

ভিড়ের ভেতরে আমিও বোদ্ধা সেজে এবং লিঙ্গ ঠেকিয়ে ভ্যান গগ

দেখার ভান করি ; ভ্যান গগের পেইনটিঙের চেয়ে ঠেকাবার আনন্দ বেশি

কচ্ছপিনী বোঝে, তাই ঠেকাতে বাধা দিচ্ছে না ; জানে, কচ্ছপ উল্টে গেলে

প্রেমিকাও তাকে ফের সোজা করে প্রেম পলিটিক্স করতে পারবে না–

কিন্তু যা ঋজু হবার তা তো ইশারা পেলেই দড় হতে কিপ্টেমি করে না

অগত্যা পকেটে হাত ঢোকাই, খোট্টা কচ্ছপ সামলাই,

কৃষ্ণের কালো মাংস রাধার ধবল,

শ্বেতাঙ্গিনী পিছন ফিরে হাসিটি খেলিয়ে ঠোঁটে ভ্যান গগের জন্য চুমু খায়

জানে এ-ব্যাটা লাৎখোর এশিয়ান পকেটে আলোর কণা নেই…

যাই হোক, সেই সে ভাঁজের আলো এখনও হাঁপানির টান হয়ে আছে

খোট্টা বুলির টান, বউড়াহা বতাহা কহিঁকা, মর্দ হো কি ছক্কা দোহার

বিজলিচুল্লিতে খোট্টা

সকলেই এই বিজলিচুল্লিতে আসে, ফটাফট কাজ হয়, মরার প্রমাণপত্র

শ্রমিক মৌমাছির সেক্স করা ঠিক যেমন শতযোনি মৌচাকের মোম

মুখের ভেতরে ক্লান্তির গন্ধ নিয়ে জিহ্বাচুম্বনে পাওয়া বর্ষার পাটকরা মেঘ

সাউথ সিটি মলের পিকচারেস্ক ব্যাঙখুকির কিসপ্রুফ রঙ্গীন ঠোঁট

মৌমাছি কামড়েছিল কখনও ফুলটু হয়ে আছে, যেন কার্নিশের

শোকাতুর পায়রারা সিলভার থালায় ঠাণ্ডা বিরিয়ানি খেয়ে

দড়িতে শোকানো শায়াদের পা-হীন নাচে টপ্পাগুল, নিশ্চিত জানে

অন্যের ভাবনাচিন্তা কতো মানুষের জীবন নষ্ট করে চলে গেছে

বিজলিচুল্লিতে এই জায়গাটা শহরের সবচেয়ে জীবন্ত, আসছে-যাচ্ছে

ক্রন্দনকর্তারা, ফিরছে ন্যাড়া হয়ে, নাপিতের ফিস বাঁধা, সরকারি রেট

পুরুতের জাত অনুযায়ী রেট, শান্ত অন্ধকারে আঙুলের বিড়ি একা

শীতেই বসন্তকাল ঢুকে পড়ে, আমচুর-মধু দিয়ে ঝুমা চাটুজ্জের আলুদ্দম

প্রথম ঈশ্বর নাকি ইহুদি ছিলেন, একাত্তরের রিফিউজি বাঙালিরা

নিজেদের দেশে ফিরে গেছে হিন্দুর দেবী-দেবতার মূর্তি ভাঙার জন্য

পলাতক নমঃশুদ্ররা এখন খালপাড়ে শুয়ে ফেলে আসা ভূখণ্ডের গল্প শোনায়

গঙ্গার নোংরা জলে ডুব দিয়ে খুন-হওয়া পূর্বপুরুষের তর্পণ করে

আমরা তো খোট্টা প্রেমিক, আমাদের জন্য এই বিজলিচুল্লি

প্রতিদিনের রাতকে একটা নাম দিয়ে চিহ্ণিত করে, জীবন্ত জায়গাটা ।

আমার প্রিয়তমা ডাইনি

অদ্য পাইয়াছি তাকে কামরাঙার ডালে গালে রুজ ঠোঁটে লিপ্সটিক

ঝুলিতে ছিল আরও বহু বাদামি বাদুড়ের সাথে, মস্তক নিম্নে ও

উন্মুক্ত ঠ্যাংদুটি বৃক্ষের দোদুল্যমান ডালে । বলিলাম তারে,

হে প্রেয়সী শোনাও তোমার সেই দোতারার গানখানি, যাহা তুমি

কচ্ছপের পিঠ হতে তুলে নিয়েছিলে, অহো, সে কি ল্যাণ্ডমাইন যেন

ছত্তিশগড়ের সিপাহিরা উপজাতি ধর্ষণের পর তাঁবুর হল্লায় মাতিয়াছে–

যেমতো ফুলেরা লজ্জাহীন দিবাদ্বিপ্রহরে সেক্স করে এবং মন্দিরে যায়

সিপাহিরা উপজাতিদের কানের ভিতরে টর্চ ফেলে তদন্ত সারিয়া ফ্যালে

কানের গহ্বরে রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগানের অবশেষ রহিয়া গিয়াছে কিনা–

সিপাহিরা খইনি ঠোকে এবং পারাপারি বন্দুকের নল বুকের উপরে

রাখিয়া হুমকি দ্যায় ধর্ষণ করিতে দাও নতুবা তোমার স্বামীসন্তানের

প্রাণনাশ করিতে হইবেক । আমার প্রিয়তমা ডাইনিটি রাজি হয়–

অকস্মাৎ কোমরের গেঁজ হতে ছুরিটি বাহির করিয়া সিপাহির

লিঙ্গখানি মূল হতে উৎপাটন করে, এবং চিৎকার করে, ইন্ডিয়া জিন্দাবাদ–

অন্য সিপাহিরা দেদ্দৌড় দ্যায়, উত্তেজিত নারীর ন্যায় রাগি গর্ত নাই…

আমার শল্যচিকিৎসক ঠাকুরমাতা

ঠাকুমারে দেখিয়াছি নকশাল যুবকগণের দেহ হতে বুলেট বাহির করিতে

তাঁহার হৃৎস্পন্দন সেসময়ে ৭০ অথবা ৮০ ছিল, যদ্যপি ফুলে-ফুলে

নৃত্যরতা দুর্গা টুনটুনিগণের হৃদয়ের স্পন্দন ছিল মিনিটে ১০০০ বার–

ঠাকুমারে জিজ্ঞাসিলে বলিতেন, হস্তির হৃৎস্পন্দন কতোবার হয়

তাহা কি জানিস ? মিনিটে মাত্র ২৫  । ডুবিতে সবাই পরে

ঠাকুমা কহিতেন, সাঁতরায় কয়জনা ? সমুদ্রে যতোগুলি ভাসমান

লাশ দেখিয়াছিলিস, অনেকেই সাঁতার জানিত, তবুও তাহারা ডুবিয়াছে–

কনভয় বেল্ট হতে অন্যের সুটকেস নিজস্ব হিসাবে তুলিয়াছিলিস

উহা কোনো ভুল নহে, যেমতো ফোড়ার ভিতরে যে যন্ত্রণা থাকে

তাহাকে বাহির করিয়া আনি, তেমতো নকশাল যুবক যুবতীগণের

দেহের বুলেট । উহারা সহ্য করিয়াছে । সহিবার ন্যায় আনন্দ নাই ।

কেন সহ্য করিয়াছে, কেন প্রাণ বাজি রাখিয়াছে, তাহাই জিজ্ঞাসা–

প্রতিটি ব্যাপারে প্রথমবার অসুবিধা থাকে, কষ্টের জুজুভয় থাকে

যেমতো নিত্যযাত্রীর পায়ে দূরপাল্লার ট্রেনও লোকালের রূপ লয়

আমরা সীতা ও দ্রৌপদীর কন্ঠে বাংলা প্রেমালাপ ও বার্তা শুনিতে

ভালোবাসি ; ঠাকুরমাতাও একসাথে দুইজন শাশুড়িকে ফোড়ার

ভিতরে যন্ত্রণার ন্যায় সহ্য করিবার পর বিদায়ের কান্না কাঁদিলেন ।

উওম্যনিয়া

আহা, অদ্য একটি তরতাজা সিঙাড়া খাইলাম

ভিতরে গুলাবিরাঙা চিনাবাদাম , কেবলই একটি–

ফুলকপি ছিল, ইহা যে ছেৎরানো ফুলকপির ঋতু–

জানি না কেন যে সিঙাড়া প্রস্তুতকারক মহারাজ

একদিকে আকর্ষক একটি ছিদ্র রাখিয়াছিলেন

অঙ্গুলি দিয়া সিঙাড়ার ভিতরে চিনাবাদামখানি

অনুভব করি, জিহ্বাগ্র প্রবেশকরতঃ স্বাদ লই

দধিমধু লবণাক্ত, বিজ্ঞানীরা কহিয়াছেন

লবণাক্ত হইবার কারণ রজরসে ইউরিয়া থাকে–

জীবনানন্দ সভাগৃহে কবিতা শুনিবার তরে

আসিয়াছিলাম ; কোনো এক মিহিকন্ঠী-কবি

কবিতা পড়িতেছিলেন ; আমি তাঁকে ধন্যবাদ

মনে-মনে দিই, অহো, বড়োই সুস্বাদু আপনার

তপ্ত সিঙাড়াখানি, সোমালিয়া নিষিদ্ধ করিয়াছে ;

আহা, এই প্রথম নারীবাদী সিঙাড়ার আস্বাদ লই

কালো বিধবা

কালো বিধবার ডাক ফিরাতে পারি না

সঙ্গম করার কালে মনোরম মৃত্যু চাহিয়াছি

যেমত পুংমাকড়ের হয় ; স্ত্রিংমাকড়ানি

থুতুর ঝুলন্ত রেশমে বাঁধি আহ্বান করিবে

আষ্টেপৃষ্টে সবুজ পাতার উপরে ল’য়া গিয়া

মোর পালপাসখানি যোনিদ্বারে লইবে টানিয়া

দশবাহুর আলিঙ্গনে শুষিবে লক্ষ শুক্রাণু

দিবাদ্বিপ্রহরে নিশিডাকে আক্রান্ত থরহরি

ব্যকরণ বিন্যাস গণিত শিখাবে দশ নখে

আমি ক্লান্ত হলে পর ক্রমশ খাইতে থাকিবে

সঙ্গম চলাকালে চাখিবে সুস্বাদু ঝুরিভাজা

উইপোকাসম লিঙ্গখানি কুরিবে প্রথমে

প্রেমিকার উদরে প্রবেশ করিয়া কী আনন্দ

বুঝাইব কেমনে, সমগ্র দেহ যে গান গায়–

আহ্লাদের কর্কটরোগ তোমরা বুঝিবে না

রাষ্ট্রবিরোধিতা

জ্ঞান ফিরিবার পর দেখিলাম, চতুস্পার্শে ছয়ইঞ্চি ক্ষুদ্র যুবতীরা–

দেড়শো বৎসর পর ফিরিয়া আসিল জ্ঞান, ততোদিনে

অতিউন্নত বাকচর্চা প্রয়োগ করতঃ ছয় ইঞ্চির হইয়া গিয়াছে মানুষেরা

সুতা দিয়া আমাকে চতুর্দিক হইতে বাঁধিয়া ফেলিয়াছে

শুইয়া আছি ঘাসের উপরে, কথাবার্তা শুনিয়া বুঝিয়াছি ইহা বঙ্গদেশ

উলঙ্গ উহারা, কেহ বুকের উপরে কেহ পেটে কেহ উরুতে হাঁটিতেছে

উহাদের কথোপকথন হইতে বুঝিলাম এখন এ-রাজ্যের নাম লিলিপুট

কখনও বাকবিপ্লব ঘটিয়াছিল, তাই, মানুষেরা ক্ষুদ্র ও উদার হইয়া গিয়াছে

বেঘোরে যা কহিয়াছিলাম তাহা উহাদের মতে অশ্লীল ও রাষ্ট্রবিরোধী

জানিতে চাহিলাম তাহাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোন কর্ম করিয়াছি আমি

আমার কুঁচকির ভাঁজে জনৈকা যুবতী হয়তো খুঁজিতেছিল স্বর্ণভাণ্ডার

জঙ্গলের বাহিরে আসিয়া যুবতীটি চিৎকার করিয়া সবারে কহিলা

“এই দৈত্যের চাড্ডির ভিতরে ছাগু দেখা যায়, ইহা রাষ্ট্রবিরোধী”

ম্যাডেলিন করিয়েট-এর জন্য প্রেমের কবিতা

খামে-ভরা তোমার স্মৃতিটুকু ভাসানের জগঝম্প ভিড়ে

জুহুর সমুদ্রের ঢেউয়ে শেষ চুমু খেয়ে

বিসর্জন দিয়েলুম ম্যাডি, ম্যাডেলিন করিয়েট

তিরিশ বছরের বেশি অফিসের কলিগেরা

খামের ভেতরের স্মৃতি দেখে যা-যা বলেছি ওনাদের

বিশ্বাস করেছে নির্দ্বিধায়, হা-হা, হা-হা, ম্যাডেলিন–

বাঘিনীর লোম মনে করে হাতে নিয়ে গালে চেপে

মাথার ওপরে ভবিষ্যত উন্নত করবে বলে ঠেকিয়েছে

ভেবে দ্যাখো ম্যাডেলিন, কত্তোজনের সমাদর পেলো

গোলাপি তুলোট যোনি থেকে সংগ্রহ করা

সোনালি ঘুঙুরালি বালগুলো, জয় হোক জয় হোক

তোমার অক্লান্ত প্রেমের, নেশালগ্নে নিশাসঙ্গমের

সিংহের বাঘের টিকটিকি কুমিরের দৈব-আঙ্গিকে

নারীর বুকের মাঝে ঘুমের ওষুধ

ম্যাডেলিন বলেছিল

প্রেমিকের শরীরের

সবকিছু মুখস্হ হয়ে গেলে

অন্য প্রেমিকের প্রয়োজন হয়

তারপর বুড়ো হলে জীবনের সব মিথ্যা

সত্য হয়ে উঁকি মারে বলিরেখা জুড়ে

প্রতিটি যুগের নিজস্ব মিথ্যা হয়

সমস্ত জীবনভর যতো ছায়া মাটিতে ফেলেছ

তাদের একত্র করে শেষ প্রেমিকার বুকে মাথা গুঁজো

শেষতম নারী

দু’বুকের মাঝখানে ইনসমনিয়া সারাবার

ব্যবস্হা করবেই

সেখানে ঘুমের জন্মান্ধ উত্তমপুরুষ

কবিতার অদৃশ্য খাতা খুলে

কয়েক শতক বসে আছে

যতোদিন আছি ততোদিন ভালোবেসে যাবো

আরও কতো কথা বলেছিল ম্যাডি, ম্যাডেলিন

এই যেমন, “সঙ্গম ও শিশুর জন্ম দেয়া ছাড়া

যোনির কোনো ধর্ম নেই ; প্রেমিক ও সন্তানের

মুখে গোঁজা ছাড়া মাইয়ের কোনো ধর্ম নেই

ইন ফ্যাক্ট, দুইটি দেহের মাঝখানে ধর্মের ভূমিকা থাকে না–

দুইটি দেহের মাঝে অনর্থক ভিসা-পাসপোর্ট শুরু করে

মন্দির মসজিদ চার্চ সিনাগগ দুর্বোধ্য ভাষা্য লেখা

ধর্মগ্রন্হ এনে পুরুষেরা প্রেমকে ধ্বংস করেছে

ধর্মকে প্রেমের মাঝে  সীমারক্ষক করে

নারীকে চুবিয়েছে হীনম্মন্যতার রসায়নে

গুহাবাসীদের জান্তব সমাজে ফেরার পথ আমাদের নেই

তাই যতোদিন বেনারসে আছি ভালোবাসাবাসি করে যাই”

আমার মায়ের মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ি

আমার বয়স আমার মায়ের থেকে বেশি

মা মারা গিয়েছিলেন চৌষট্টি বছর বয়সে

আমার বয়স এখন সাতাত্তর

ডাক্তাররা মায়ের রোগ ধরতে পারেনি

ভুল হাসপাতালে ভর্তি করেছিলুম মাকে

মা যখন হাসপাতালে মারা গেলেন তখন আমি

মায়ের বিছানার পাশে ছিলুম না

নাক থেকে আক্সিজেন মাস্ক সরিয়ে মা বলেছিলেন

আমাকে এক কাপ চা খাওয়াবি ?

আমি চা আনতে চারতলা থেকে নেমে ক্যান্টিনে গিয়ে দেখলুম

কেউ নেই, কেই বা থাকবে এতো রাতে

রাস্তায় বেরিয়ে দেখলুম সব দোকানপাট বন্ধ

স্ত্রীকে ফোন করে বললুম, মায়ের জন্য চা বানিয়ে

ফ্লাস্কে করে নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে এসো

চা বানিয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে কোনো রিক্সা পায়নি

আমার স্ত্রী ; ও কাঁদতে-কাঁদতে হাসপাতাল পর্যন্ত

হেঁটে এসে দেখতে পেলো

আমি মায়ের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছি

ডাক্তারকে ডাকা হলো

উনি বললেন, এই রাতদুপুরে রোগিকে

কে বলেছিল চা খাওয়াতে

মায়ের চা খাওয়া হলো না

ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে ফেলে দিলুম ওয়াশবেসিনে

আমার জন্মদিন এলেই কাঁদি

কেন মায়ের পাশ থেকে উঠে চলে গিয়েছিলুম

এতো রাতে যে চা পাওয়া যাবে না

তা কেন মাথায় আসেনি

আজ আমার জন্মদিন. কাঁদবার দিন

মায়ের মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ি

চলুন নরকে নিয়ে যাই

যা ইচ্ছা লিখুন আপনারা, গালমন্দ, খিল্লি, খিস্তোনি

আমি শুধু চাই ব্যাস, লেখা হোক, কিছু লেখা হোক

লিখে যান, আশ মেটান, কিছুটা কুখ্যাতির অংশ

বিলিয়ে তো যাই, নিন, নিন, হাত পাতুন, নতুবা মস্তক

কলমে বা কমপিউটারে

ঝেড়ে দিন সুযোগ পেলেই

আমি জানতে চাইব না, কে আপনার বাবা ছিল

কে ছিল পাথরে বীর্য থেকে জন্মানো দুর্বাসার কাগুজে বিদ্বান

পঞ্চাশ বছরের বেশি লিখে তো যাচ্ছেন

এখন আপনারা, তার আগে আপনার বাবারা মেসোরা

এভাবে চলুক, যতো বছর আপনারা চালিয়ে যাবেন

আরও পঞ্চাশ, আরও একশো, আরও কয়েকশো বছর

কবিতা যখন আপনার বংশে আর কেউ পড়বে না

তবুও আপনাদের বংশধরেরা আমাকে বাঁচিয়ে রাখবেন

খিস্তিয়ে, গালমন্দ করে, খিল্লি উড়িয়ে

ব্যাস, আমি চাই চলতে থাকুক, চলতে থাকুক, চলুক চলুক

জোকারপুঙ্গবদের রঙ্গতামাশা

কাতুকুতু

প্রেমিকার হাসি খেতে আমার চিরটাকাল ভালোলাগে

কোমরে দুদিক থেকে আচমকা প্যাঁক করে তর্জনী টিপে দিতেই

যেই হাসতে আরম্ভ করে তখনই ঠোঁটে ঠোঁট চেপে

আমি ওর হাসি খেতে থাকি ওর কোমরে আমার 

আঙুলের খোঁচা বজায় থাকে, আমারও হাসি খাওয়া বজায় থাকে

ওর কাতুকুতু আর চুমু একই সঙ্গে খেতে ভালোলাগে

তবুও ও বলে ওঠে লম্পট কোথাকার, তার মানে করতে পারি আমি

আমি আরও হাসাই, হাসাতেই থাকি

যতোক্ষণ না হাসতে হাসতে ওর চোখ দিয়ে জল বেরোয়

যে ~ পো্স্টমডার্ন ~ নাতিদীর্ঘ ~ সনেট ~ যে

যে ~ হ্যাঁ, ভাবুন, ভাবুন, বলা হয়েছে ভাবতে, ভাবুন ~ যে

যে ~ আমি বটানিকালের  বটগাছ যার গুঁড়ি খুঁজছেন ~ যে

যে ~ আমি বেসনে ফ্রাই বকফুলের বড়া বাসরঘরে খেয়েছিলেন ~ যে

যে ~ এ তো এখন বুড়ো কুমির, কামড়ে মাংস ছিঁড়ে খাবে এমন নয় ~ যে

যে ~ আমি  কিউরিও-দোকানের দোয়াত, কলমে নিব চেরা ~ যে

যে ~ পিঁপড়ের মৃত্যুতে শোকসভায় কবিতাপাঠ হয় না ~ যে

যে ~ জজসাহেব তো মৃত্যুদণ্ড দিয়েই খালাস ~ যে

যে ~ ফাঁসুড়ে হিসেবে আমার নামডাকে কান দিলেন না ~ যে

যে ~ কাফকা ফ্রায়েড চিকেন আসলে কেএফসি ~ যে

যে ~ নদীর মৃত্যুতে পুরসভায় শোকসভা হয় না ~ যে

যে ~ খেয়েছে সে দুঃখের আরশোলার পেটে জন্মাবার ফলে ~ যে

যে ~ পাঁজর গোনার বয়সে পৌঁছোতে ~ হাঁপায় ~ যে

যে ~ কৌতূহল ~ আর কীই বা জাগাবে ~ যে

যে ~ প্রথমে সামনের পা তারপর পেছনের পা তুলে ধনুকের মতন ~ যে

যে ~ ঘোড়ার মৃত্যুতে সহিসের বাড়িতে শোকসভা ~ যে

যে ~ লাফ দিতে ~ পারবে না সেই কুচকুচে ঘোড়ার ঢঙে ~ যে

যে ~ নিজের ~ পাদপ্রদীপ নিয়ে উড়তে থাকে ~ যে

যে ~  খুরে-খুরে গড় শুনে টের পায় না গাধা গোরু মোষ ঘোড়া ~ যে

যে ~ জীবনে জেব্রার পিঠে চেপে ~ হায়েনার কান্না এড়িয়েছিল ~ যে

যে ~ বাতি আর আগুন নেভানোর সঙ্কটধ্বনির মানে না-বুঝে ~ যে

যে ~ সুমিষ্ট আর সুগন্ধ ভোজনের সবুজ ঘাস খেয়ে ভাবছিল ~ যে

যে ~ ভেবে ভেবে ~ ভবিদের ভোলানো গেল না ~ যে

যে ~ বীর সিংহের কোমরবন্ধে ঝোলানো খাপে ~ যে

যে ~ বাতাসের মৃত্যুতে উড়োজাহাজের শোকসভা ~ যে

যে ~ টেস্টটিউব খোকাখুকুদের জগতসংসারের নোংরামি থেকে ~ যে

যে ~ বাঁচাতে চেয়েছিল ~ উপায় নেই বলে ~ যে

যে ~ মহৎ মানুষ কেবল নিজের কাজের জন্যই জন্মায় ~ যে

যে ~ নিরো কিংবা নিরোনীর হুমকিতে কুঁকড়ে যেতে বাধ্য ~ যে

যে ~ শিল্পী মাত্রেই ~ উন্নতমানের ঝাড়ুদার ~ যে

যে ~ শব্দের পেটে কপচানি ঢুকিয়ে ভয় দেখাতে পারে ~ যে

যে ~ পিতৃতন্ত্র আর মাতৃতন্ত্র লোপাট হয়ে হিজড়েতন্ত্রের বোদ্ধা ~ যে

যে ~ বইয়ের পাতায় দরোজাগুলোয় উই ধরায় ~ যে

যে ~ বনলতা সেনের চেয়ে জাঁ দুভালের পালতোলা টান ~ যে

যে ~ আবসাঁথ না পেলে আর কোনোদিন মদ ছোঁবো না ভাবতেই ~ যে

যে ~ কিসের লোভে কার্ডধারীরা মুখ বুজে সবকিছু মেনে নিতো ~ যে

যে ~ নদীর মিল্কশেক জল চটচটে হয়ে যেতে থাকে ~ যে

যে ~ দেশ মরলে রাজনীতিকদের আনন্দসভা ~ যে

যে ~ বৃষ্টিতে ~ যে ~ টেলিফোন বুথের প্রাগৈতিহাসিক স্মৃতি ~ যে

যে ~ কাগজের কাপে ব্যথার জীবানু ~ চুমুক দিই ~ যে

যে ~ রবিশংকরে শ্রীশ্রী যোগ করে দেখি বীণা বিয়োগ ~ টাকা ~ যে

যে ~ টুথপেস্টগুলোয় ভ্যানগঘের রঙে দাঁত মাজার ~ যে

যে ~ সব্যসাচী নাম হলেও অর্জুন নয় ~ সাক্ষাৎ বকাসুর ~ যে

যে ~ রক্তমাংসের ধুমকেতু ভোটে জিতলে বাজি পোড়ে ~ যে

যে ~ এই বছর প্রতিটি মাসই বৈশাখ ~ পাঁজি ~  দেখতে ~ যে

যে ~ ফুলশয্যার অ্যামেচার প্রেমিক ~  হটেনটট ভেনাস ~ যে

যে ~ পেছন থেকে চোখ টিপে-ধরা রাষ্ট্রের হাত ~ যে

যে ~ কাক মরলে কাকেদের শোকসভায় বিরক্তি ~ যে

যে ~ প্রেমিকার অপেক্ষায় ছুরিতে শান দিয়ে রান্নাঘরে ~ যে

যে ~ ভিতুদের পুরস্কৃত করার প্রকল্পে ~ কাকাতুয়া ~ যে

যে ~ মুখ থুবড়ে পড়ার মেটাফর ~ হামিংবার্ড ~ টুনটুনি নয় ~ যে

যে ~ মানুষের মৃত্যুতে কেউ শোকসভা কেউ মজাসভা ~ যে

যে ~ যে ~ যে ~ যে ~ যেমন চলছে তেমন চলুক ~ যে ~ যে

ঠহর ঠহরকে ঠহর ঠহরকে

ইমলিতলার ধোঁয়ায় সকালের নিমকিন রোদের মিট্টিচুক্কড় তাড়ি

জলে চুবিয়া মারা চাহাপাখির ঝাল ডানার উড়াল দিয়ে মেখে

ঠহর ঠহরকে ঠহর ঠহরকে ঠহর ঠহরকে ঠহর ঠহরকে

এই পাড়ায়  শালা যত্তো ছোটোলোক গু ডিঙিয়ে সাবধানে

টমটমের চারিদিকে খুঁটি বসিয়ে পর্দা ভেতরে চিতচোর চকাচক

খচ্চরের পায়ে ঘুঙুর আর ওই যে পিনাফোর মেয়েগুলো

চাঁদিয়াল পেটকাটি মোমবাতি ময়ূরপঙ্খী ভেড়িয়াল

চাপদাড়িদের কার্বন মাখিয়ে আজকে ঠররা শুয়োরের মাংস

মৌসিজির ভিগি-বিল্লি পয়সাছোড়ো গর্মিতোড়ো

ঠহর ঠহরকে ঠহর ঠহরকে ঠহর ঠহরকে ঠহর ঠহরকে

ঝিঙের ঝাউবন-সবুজ বডির ঢেউগুলো আমি ছোটোবেলায় খেতুম না

সেলাম জানাচ্ছে কপিলের তেলচিটে নানা, জংধরা কালো, ঢেঁকুরে হড়িহঔম

হড়ি দড়শন মনোয়া লাগে ড়েএএএএএএ

ঢোলকপিটুনি চলছে এবার পার্টির লফঙ্গা সাপ্লাই নিয়ে কাজিয়া

কাকেদের জাতিপ্রথার শিকার বিজলি আর কেবল তারে বসে

পলতাশাকের ভেতরে ঘুমন্ত বুড়ির পিচুটি খেতুম না

বড়কি ভৌজাইয়ের চালার ধোঁয়ায় গঞ্জেড়ি হাকিমের সবুজ শিকনির ছিট

কুমড়োর গায়ে নাজিমের বাবার সবুজডোরা লুঙ্গি খেতুম না

কাশার সময়ে ইসকি মাকা চোরি করো ডাকা ডালো পাটিক মারো

চারাপোনা কাচকি মৌরলা বেলে বাচা আমার দিকে তাকায় খেতুম না

জিভের যৌতুকে  রান্না নিয়ে এলো সানাইঅলার বদলে ডলবি ডিজিটাল

ঠহর ঠহরকে ঠহর ঠহরকে ঠহর ঠহরকে ঠহর ঠহরকে

খোঁপা ঝাড়লেই রাজমা লোবিয়া সবুজঅড়র পুদিনার পরৌঁঠা

নিম্বুচিকেন রশুনপেশা কড়ায়ের ডাল হরিয়ানভি পোলাও

গোশ্ত টিক্কা বেবিকর্ণের সঙ্গে তন্দুরি মাশরুম কোলিওয়াডা ঝিংগাফ্রাই

কঢ়াইমুর্গ পায়া-শোরবা শবনম-কারি তাওয়া-ঝিংগা পেশওয়ারি-বটের

ডাইনিং টেবল ছিল না ফ্রিজ ছিল না মেঝেয়ে পিঁড়ি পেতলের বগিথালা

পাড়ার মরদরা শুয়োরের পেটে ভ্রুণ পেয়ে কি আনন্দ কাঠের আগুনে

হোলিকাদহন না ন্যাড়াপোড়া পুড়েছে শুয়োর আর তার ভ্রুণ

খেতে মন্দ নয় কচি অক্টোপাস বেসনে চুবিয়ে ছাঁকা তেলে

জাহাজে ভরে ঘুম নিয়ে গিয়ে খনিজ তেলের পুরু সর সমুদ্রের ওপর

ছোটোবেলায় দুধের সর দু’আঙুলে তুলে খেতুম ওহ ব্লটিংপুরু

ইমলিতলায় ওরা জানে কার নম্বর লেগেছে টেঁটিয়াল মেহরারু

রঙের টিন হাতে হাগতে গিয়েছিল মিথ্যে কথা বকরিয়া পাঁড়ের ছাগলি

রোদ্দুর কেন রক্তে চোবানো কেউ উত্তর দিক হে পরমপূজ্য মৌসিজি

মেঘে কেন পুঁজ মাখানো কেউ উত্তর দিক হে পরমপূজ্য মৌসিজি

সব নর্দমায় সব নর্দমায় সব কেচ্ছা নর্দমায় হে পরমপূজ্য চাচিজি

ঠহর ঠহরকে ঠহর ঠহরকে ঠহর ঠহরকে চিল্লম ডারলিং

ঘোড়ার খুরের টগরবগর টগরবগর ভাআআআগোওওওও

ঠোঁটে এক টিপ চাঁদের গুঁড়ো চেপে নাকি হাগতে গিয়েছিল

গ্র্যানিটের ফাঁক বেয়ে ডেঁয়ো পিঁপড়ের কাতার নর্দমায় ফেলা ভ্রুণে

ঢিল্লা শরীরে টলতে টলতে ফিরেছে মৌসিজির ভাতিজি

হৃদয়-ফ্রিদয় কুমিরের ল্যাজের আছাড় এঁটেল মাটি

ইংরেজরা তো গেছে সেই কবে ওদের কবরের পাথরের ওপরে

খদ্দের ধরতে পারলে ঠহর ঠহরকে ঠহর ঠহরকে ঠহর ঠহরকে

পাথরগুলো তুলে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে ছন্দে লেখা এপিটাফসুদ্দু

তলায় কফিনের জায়গা একশো বছরে ফাঁকা

তাতে অন্ধকারের মৌসিজির ভাতিজি লাল গামছা নাড়ায়

বেচারা সাম্রাজ্যবাদী বউ-বর এক সঙ্গে দুটো মার্বেল পাথর

বাহাদুর শাহ জাফরের ভুত এসে গালিবের গজল শোনে

ভাতিজির সুরেলা গলায় তো কুয়াশার মিউজিক টনটনাটন

ঠহর ঠহরকে ঠহর ঠহরকে ঠহর ঠহরকে ঠহর ঠহরকে…

বাংলা মদের গোপন জীবন

খেয়েছেন, এবার বুঝতে পারছেন, কতো ক্ষতিকর

সময় ব্যাপারটা, এর সংজ্ঞা হলো ‘নেই’

সময় নেমে যাচ্ছে গলার ভেতর দিয়ে, স্রেফ

অভিকর্ষের খেলা, না থাকতো যদি, তাহলে বাংলা মদ

নামতে পারতো না, বাংলা মদ হলো শ্রীঘ্রপতন

কবিতার ছোটো ছেলে, ঢিল ছুঁড়ে যতোই মারুন

উনি শব্দ বাক্য ব্যকরণ অক্ষরের ড্রাগ লর্ড

হ্যাঙোভারে উন্মাদের অ্যানথেম মগজে গাইছেন

পানুসুন্দরী, স্লোমোশান আণবিক মাশরুম

খালাসিটোলার সেই হিসি-গরম বোতল থেকে

ঢোল-তাশার পার্টি, সময় চলিয়া যায়

এবং গোঁফ-দাড়ি গজায় যা গালে ফোটে

তখন শিশুর পোঁদে চুমু খাবার মতন স্বর্গ হয় না !

ব্রেকফাস্টে সালামি আর বিফস্টিক

শালারা কান্না চোলাই করে বিক্রি করে–

হে কালীয়দমনের নীল ঠ্যাঙ ধান্যেশ্বর

আপনার দেহখানা কোথায় রেখে এলেন

শরীরহীন পায়ের শব্দহীন পায়চারি, এর সংজ্ঞা হলো ‘নেই’

কেননা কখন সূর্য ওঠে তা জানা নেই, সূর্য তো মাথার ওপরে ওঠে

যখন ছায়ায় পা রেখে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়

কাকেরা কি কাকভোরে ওঠে ?

তাহলে বুঝতে পারছেন সময় ব্যাপারটা কতো ক্ষতিকর ?

বুঝতে বাধ্য করে যে আপনার রয়েছে

মদ্যপের প্রতিভা, পৃথিবীর কিনার ওব্দি গড়িয়ে যাবার–

আচ্ছা জোকার তো বেশ্যা বলে কি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবে না ?

যতো তরল তোতলামি আপনার মাইনে-করা সন্ধ্যা কি 

আপনার চাকরানি যে বললেই নক্ষত্র ছড়িয়ে দেবে ?

বাংলা মদের জীবন খুবই গোপন, বুঝলেন

বলতে পারেন উর্বশীর যোনির মতন

কখনও দেখার সুযোগ হবে না অথচ

ধান্যেশ্বর হয়ে সেখানে চুমু খেতে পারবেন ।

কারে বোধি কয়

অবন্তিকার পিতৃকুলে কেহ নাই, শৈশবে মরিয়া গেছে মাতা

সংসারত্যাগী পিতা ফেরে নাই

কোথায় গিয়াছে না জানিয়া, কী করিয়া বলেন ফেরে নাই

যাইবে তবে তো ফিরিবে, নৌকায়, ট্রাকে, ট্রেনে, পদব্রজে

পাশে কি যশোধরা নাম্নী স্ত্রী ও সন্তান ছিল

নাকি কাটিয়া পড়িয়াছে কপিলাবস্তুর রাজপুত্রের পিছু

বোধিলাভ ঘটিয়া থাকিবে, হয়তো তিনি জানিতেন

বোধিলাভে আধুনিক জীবনে কোনো লাভ নাই

কিন্তু এও মহা বিড়ম্বনা

বোধিলাভ হইয়াছে কি না, এবং হইয়া থাকিলে

ঢক্কানিনাদসহ জনেজনে প্রচার করার প্রয়োজন

আমরা কি জানি ফুটপাথে দড়িদঙ্কা পড়ে থাকা ভিখারিনী

বোধিপ্রাপ্তির পর পথপার্শে শুইয়া রহিয়াছে

মিউনিসিপালিটির ডোম বুঝিবে কেমনে ? ভিখারিনী

মহাপরিনির্বাণের পর পঞ্চভুতে বিলীন হইতে চাহে নাই !

কিংবা মর্গে রাখা বেওয়ারিশ লাশ যার দেহ বিক্রয়ের জন্য

ডোম ও ডাক্তার দরাদরি করিতেছে

ডাক্তারি শিক্ষার জন্য কঙ্কাল দুষ্প্রাপ্য আজ

হয়তো কোনো ডাক্তারি কলেজে পিতা অবন্তিকার

দণ্ডায়মান কাঠের বেদিতে শ্বেতশুভ্র কঙ্কালরুপে

অবন্তিকা শুনিয়া কহিল, ছ্যাঃ, এখন সেদিন আর নাই

বোধিপ্রাপ্তির মতো মানুষ পয়দা হয় না আর

এখন কেবল সঙ বহুরুপি দলদাস চশমখোরের সমাবেশ

ফর ঠিকেদার অফ ঠিকেদার বাই ঠিকেদার মহাবোধি

বিপ্লবের ভানসহ গদি দখল করে, কোতল উৎসবে মাতে

কেহ বলে পলাইয়া গিয়াছে বাপ, নকশাল দলে

কেহ বলে মৃত, নকশাল দলে মাথায় গামছা বাঁধা

ধরা পড়িয়াছে, কাঁধে সাতচল্লিশ রাইফেল

অগুস্তো পিনোশের সেনা চিলিতে লোপাট করিয়াছে

জেসি ইভান্সের ন্যায় গুড ব্যাড আগলি ফিল্মের

গুড লোকটির মতো স্বর্ণমুদ্রাসহ হারায়ে গিয়াছে

অথবা স্পার্টাকাসের দলে যোগ দিয়াছিল পিতাবাবু

আরজেনটিনার নোংরা যুদ্ধ লড়তে গিয়েছিল নাকি

মেশিনগানের আবিষ্কর্তার মতো নাম পালটায়ে

হিরাম ম্যাক্সিম নামে ফিরিয়াছে, কিন্তু গৃহে ফেরে নাই

আওয়ামি লিগের দলে বিএনপি দলে যোগ দিয়াছিল হয়তো বা

কখন কে উঠে চলে গেছে জানতে পারেনি কেউ

১৮৫৭ সালে নানা সাহেবের সঙ্গে ছিলেন কি তিনি

কাকরূপ পাইয়াছে, কিংবা হায়েনার দলবদ্ধ র‌্যালিতে

মাটিতে নোলা সকসকসহ টাটকা রক্তের গন্ধ খোঁজে

হয়তোবা স্ফিংকসের ঢঙে নাসিকাবিহীন দেহে

কোনো মরুপ্রান্তরে পর্যটকের জন্য যুগযু্গ বালুকাশীতল

মালয়েশিয়ার প্লেনে জলের ভিতরে গিয়া লীলা করিতেছে

রঙিন মৎস্যের ঝাঁকে হাঙরের বাঁকে, পেংগুইন দলে !

এভারেস্টগামী দলে তাঁকে দেখা গিয়েছিল, ডেনিম-পতাকা

পাপারাৎজিগন তাঁকে লিপ্সটিকঠুঁটো হাফনগ্ন ফিল্ল্মিনারীর

কোলে আঙুর খাইতে দেখিয়াছে, কালো আর সবুজাভ

কতো কতো কোলাহল সহ্য করিয়াছে অবন্তিকা

নিরুদ্দেশ পিতার উদ্দেশে

পাড়াপ্রতিবেশীদের মুখগুলি চিরতরে বন্ধ করিবার জন্য

অবন্তিকা গয়ায় শ্রাদ্ধশান্তি করিয়াছে

কহিয়াছে যাইতে দিন, অমন বাপের জন্য শ্রাদ্ধই যথেষ্ট

আমি বলি, যাহা হউক, উনি পিতা, জন্ম দিয়াছেন

আই মিন জন্ম দিতে ওনারও ভূমিকা ছিল

আমি ওর মাতুলালয়েতে যাই, মাউন্ট রোডে, বিশাল বাগানঘেরা

কুকুরের ঘেউ-ঘেউ মুখরিত, বারান্দায় যে বৃদ্ধ ইংরেজি

সংবাদপত্রে নাসিকা ঠেকাইয়া খবরের দুর্গন্ধ আহরণ করিতেছিলেন

তাঁহাকে আত্মপরিচয় দিই; তিনি, হাস্যমুখে আমার পিতা ও

পিতামহ কোথাকার, ঘটি না বাঙাল,

জানিবার পর, কহিলেন, ইলিশ খাই নাই কতোকাল,

জল পান করিবে কি ? স্টেনলেস স্টিলের গেলাসে আপত্তি নাই তো ?

আজকাল পিতলের যুগ নাই, আমাদের কালে ছিল, পুরাতন হইয়া গেলে

চারশো টাকায় কিলো, ব্যবহৃত স্টেনলেস  কেহই কেনে না

ব্যবহার করো আর ত্যাগ করে চলে যাও

কি যে ছিরি আজকালকার প্রেমে, একজন থেকে আরেকে

ছেড়ে যদি চলে গেলি, বোধিপ্রাপ্ত হলি ? বোধিপ্রাপ্ত হলি যদি

চেলা সংগ্রহ করে মঠ খুলে নিজের মূর্তি বসালি ?

বৃদ্ধকে আমি বলি, বিবাহ প্রস্তাব লইয়া আসিয়াছি

সে বিষয়ে আলাপ করিতে চাই, উনি জিজ্ঞাসেন, মাঠেতে বসিয়া

চিনাবাদাম খাইয়াছ ? সিনেমা দেখিয়াছ দুইজনে ? রেস্তরাঁয়

হাসাহাসি করিয়াছ ? কফিহাউসে লইয়া গিয়াছিলে ?

অবন্তিকার মামা দুই হাতে চেনে বাঁধা দুইটি কুকুর সহ

ঠোঁটে চুরুটের ধোঁয়া, প্রবেশ করিয়া বলিলেন,

ও তুমিই বিবাহপ্রার্থী ! শুনিয়াছি, ভালোই রোজগারপাতি ;

অভিভাককে বলি, রোয়াব প্রদর্শন করিব বলিয়া

ইংরেজিতে বলি, আপনার ভাগ্নিকে আমি বিবাহ করিব

অবন্তিকার মায়ের মধ্যম ভাই জিজ্ঞাসা করেন

ভাগ্নি ? কোন ভাগ্নির কথা বলিতেছ ?

যাহাকে আমরা দিব অথবা যাহাকে চয়ন করিয়াছ তুমি নিজে !

মনে মনে দুই-চমক ভাবি, অন্যগণকে দেখিয়া লইব নাকি

কে বেশি সুন্দরী ? মাতুল জানিতে চান, প্রেম করিতে্ছ ?

না না না না, প্রেমে পড়িবার আগে বিবাহ সারিয়া লইতে চাই

অযথা সময় নষ্ট করিতে চাহি না

হাহা-হিহি, চিনাবাদাম, চিংড়ি কাটলেট, ময়দানে পা ব্যথা,

ভিক্টোরিয়ায় গিয়ে ছাতার আড়ালে চুমু খাওয়া

ওসব চাই না আমি, জাস্ট বিয়ে করে ফেলতে চাই

দুজনে দুরকম চিন্তার আগে । মাতুল কহেন, রাইফেল কখনও

চালাইয়া পরখ করিয়াছ, এই দ্যাখো, আমার রাইফেল-স্টক

বুলেট, প্রোজেকটাইল, যা চাই চালিয়ে দেখতে পারো

কই দেখি, ওই উড়ন্ত পায়রাগুলির মাঝে একটাকে মারো দেখি ।

রাইফেল লইয়া আমি দুই চোখ বন্ধ করিয়া

ট্রিগার টিপিলাম । কী ফল হইল জানি না, উনি বলিলেন

গুড, ওয়েল ডান, মা-বাবাকে টেলিফোন করে দাও

আগামী সপ্তাহে বরযাত্রীসহ চলে এসো ।

বিবাহসভায় দেখিলাম, জনৈক ভিখারি, বুঝিলাম

বোধিপ্রাপ্ত ইনি, বলিলেন, আমি অবন্তিকার বাবা

তোমাকে আশীর্বাদ করিতে আসিয়াছি

বিগত কয়েকদিন তোমার উপরে নজর রাখিয়া

বুঝিয়াছি উপযুক্ত পাত্র তুমি

সত্যকার যেদিন মরিব সেদিন খবর পাইবে

সেইদিন আরেকবার শ্রাদ্ধ করিও, হ্যাঁ, আরেকবার

অগুস্তো পিনোশের দেশ হইতে অথবা পলপটের মাটি ফুঁড়ে

সমুদ্রের তলদেশ থেকে, স্পার্টাকাসের দল থেকে

নানা সাহেবের দল থেকে, ফিরিয়া আসিব…..

অবন্তিকার কমপ্লেকসিটি

শ, যে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, অবন্তিকার  প্রেমিক নং ১, ইংলিশ

মিডিয়াম স্কুলে পড়বার সময়ে ওর সঙ্গে ইংরেজিতে

প্রেম করতো ।

শ-এর বাবা জ ( দুই ) ফরাসিদেশ থেকে হটেনটট ভেনাসের যোনি

কিনে এনেছিলেন ( কথিত আছে )।

জ ( এক ) যিনি অবন্তিকার মেশোমশায়, তা জানতে পারেন, শ-এর

বাড়ি যেতে বারণ করে দ্যান।

অলোকনন্দা গোস্বামী দোলের দিন রঙ খেলতে চায়নি বলে শিফন

শাড়ি পরেছিল।

অবন্তিকার খুব ঈর্ষা হল, শিফন শাড়ি দিয়ে অলোকনন্দার মাইয়ের

খাঁজ দেখা যাচ্ছিল ।

জ ( দুই ) নামকরা পেইনটার, উনি কেবল যুবতীদের খাঁজ আঁকেন,

কলকাতার কালবৈশাখিতে অনেকের খাঁজে জল চুয়েছিল

অবন্তিকার মনে হতো প্রেম কেবল মাতৃভাষায় সম্ভব, একদিন

অ্যানাইস নিনকে লেখা হেনরি মিলারের চিঠি পড়ে বুঝতে

পারলো যে শ বই থেকে টুকলিফাই করেছিল ।

ক্লাসটিচার সিসটার ব ( এক ) আয়ারল্যাণ্ডে ফিরে গেলেন, তাঁর

বদলি টিচার কেরালার, সিসটার আইয়াক্কম ।

জ ( দুই ) কেরালার টিচারকে বাইবেল উপহার দিলেন, যাতে কালচে

খাঁজ আঁকতে পারেন ।

অবন্তিকা ২নং প্রেমিক খ ( তিন ) এর দিকে ঝুঁকলো, কেননা

সে স্কুলে বাংলায় প্রথম হতো আর অবন্তিকার মেসোর

ওপন হার্ট সার্জারির খরচ দিয়েছে।

প্রতিদান হিসেবে অবন্তিকা খ ( তিন ) কে ব্লাউজে হাত ঢুকিয়ে

টিপতে অনুমতি দিয়েছিল ( আহা কী আনন্দ )।

মিস্টার শৈলেন বোস মারা গেছেন । মিস্টার অজিত গাঙ্গুলিও।

অবন্তিকা ওনাদের নাম শোনেনি ।

দ ( দুই ) এর দপতরে শ চাকরি করতে গেল ; খ ( তিন )

ইটালির একজন ছাত্রীর সঙ্গে চলে গেল বিদেশে ।

প্রেম সম্পর্কে অনির্বাণের কোনো ধারণা গড়ে ওঠার আগেই র-নামের

স্কুল থেকে সে দ-নামের কলেজে ভর্তি হবার পর অবন্তিকা

যাকে সবাই অবু বলে ডাকতো, পরিচয়ের প্রথম দিনেই বললে

আমি ডেটিং-ফেটিং করি না।

অনির্বাণ, যে জ ( দুই ) এর জারজ ছেলে, উত্তরে বলেছিল, আমিও

ফাকিং-সাকিং করি না । বেচারা ন্যাড়া বোষ্টম হয়ে গেল।

“মেয়েদের মাসিক প্রকাশ করা উচিত নয়”, সাইনবোর্ডে লেখা, তলায়

পেইনটিঙ, জিনস-পরা যুবতীর মাসিক হবার রক্ত লেগে।

পত্রিকার নাম ‘আরেত্তেরি ইস কি মা কা আঁখ’ ।

পড়ার পর অবন্তিকা নিজের পাছায় হাত দিয়ে চেক করে নিল। নেই।

যুবতী সাইনবোর্ড থেকে নেমে জিগ্যেস করল, পাতা ফুঁকবে?

মইনুদ্দিন খানের কাঁধে হাত রেখে জ ( এক ) নির্বাচনে কজন মারা

গেছে তা আলোচনা করতে-করতে গেল।

কালবৈশাখির মেঘ একটু একটু করে জমা হচ্ছে, ছাতা আনেননি

কেরালার টিচার, ওনার খাঁজ অতিপবিত্র, দেখানো যাবে না

বৃষ্টির জল তা মানতে বাধ্য নয় ।

শ একদিন জানতে পারলো তার বাবা জ ( দুই ) যাকে হটেনটট

ভেনাসের যোনি বলে সকলকে ঈর্ষায় পুড়িয়েছেন তা আসলে

ফরম্যালিনে চোবানো বড়ো বাদুড়

খবরের কাগজে সংবাদটা পড়ে ম, যার সঙ্গে স্নাতকোত্তর পড়ার সময়ে

অবন্তিকার পরিচয় হবে, নিজেকে বলেছিল কি লজ্জা কি লজ্জা

মরা বাদুড় দেখেও লিঙ্গোথ্থান হয় ।

অনির্বাণ বোষ্টম হয়ে এক সুন্দরী বোষ্টমীকে ফাঁসিয়েছে, কী কুক্ষণে যে

লটারির টিকিট কিনেছিল দশ লক্ষ টাকা পেয়ে চুল গজালো।

অবন্তিকা একদিন ম-কে কাফে কফি ডে-তে বললে যে ওর একটা মাই

কেউ এখনও টেপেনি ।

ম বলেছিল, চিন্তা করিসনি, আমি টিপে দেবো । ম এমনই চরিত্রহীন যে

তার আগেই শ-এর খুড়তুতো বোনের মাই টেপার অফারের

সদ্ব্যাবহার করে ফেলল।

খবরের কাগজের উত্তর সম্পাদকীয়তে হটেনটট ভেনাসের আসল যোনি

আর জ ( দুই )-এর বাদুড় যোনির তুলনা প্রকাশিত হলো।

পেইনটিঙের সমালোচকরা আবিষ্কার করলেন জ ( দুই ) এর খাঁজের

তেলরঙগুলো আসলে বাদুড়দের ছবি ।

ম একদিন অবন্তিকাকে প্রস্তাব দিল যে পূর্ণিমার রাতে সেন্ট্রাল পার্কের

ঘাসে ফুলশয্যা করা যাক ।

ম-এর মা ট ( দশ ) পার্কে সঙ্গমরত দুজন মানুষকে ভাবলেন ভুত আর

ভুতনির অষ্টাঙ্গদশা, দেখেই দুহাত তুলে দৌড়োলেন ।

ম-এর বড়ো ভাই প ( এক ) মাকে দৌড়ে আসতে দেখে সাপ মারার

লাঠি নিয়ে পার্কে ছোটোভাইকে দেখে চটে গেলেন।

ম-এর মা ট ( দশ ) বড়ো ভাই প ( এক ) কে স্তোক দিলেন যে তোকে

তিনচারটে মেয়ের সঙ্গে একই দিনে বিয়ে দেবো।

ট ( দশ ) এর ছোটোবোন ট ( নয় ) যে জ ( এক )-এর ডিভোর্সি বউ

তা কেবল অবন্তিকা আর ম জানতো।

ট ( নয় ) ম-কে বললেন, ঘাসে লীলেখেলা করিস কেন রে, হাঁটু ছড়ে

যাবে, আমার বাড়ির ব্যবহার-না-করা বিছানা তো ছিলই।

ট ( নয় ) এর ব্যবহার-না-করা বিছানায় লিলেখেলা করার সময়ে ম-কে

অবন্তিকা বললে, তুমি আমার প্রেমিক নং ১৮ ।

ম অবাক হলো যে এর আগে সতেরোজন প্রেমিক কি বিছানার চাদরে

রক্ত মাখাতে পারেনি !

অবন্তিকা ম-কে জানালো যে জ ( এক ) যিনি ওর মেসোমশায় তিনি

এই শহরের ভার্জিনিটি রিপেয়ার বিশেষজ্ঞ ।

শ, যে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, জ ( এক )-এর ভার্জিনিটি রিপেয়ারের

হিসেব রাখে, তার কাছ থেকে ম জানতে পারলো যে এই শহরের

প্রতিটি ভার্জিনের ভার্জিনিটি রিপেয়ার করা ।

জ (এক ) আর জ ( দুই ) দুজনেই তাঁদের স্হাবর-অস্হাবর সম্পত্তি ম

আর অবন্তিকাকে লিখে দিয়ে গেছেন ।

ম আর অবন্তিকা ছেলে মেয়ে বউ জামাই নাতি নাতনি নিয়ে এখন সুখে

থাকার চেষ্টা করে অথচ পারে না ।

মর্ষসমকাম

অন্যকে পিটিয়ে তাকে বশে আনবার জন্য পাতা তত্বফাঁদ

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

বিধবা মায়ের মুখে ছেলের রক্তমাখা ভাত গুঁজে দেয়া

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

মাটির তলায় চাষিদের বাড়ি থেকে তুলে জ্যান্ত পুঁতে দেয়া

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

গাড়িতে বাছুর নিয়ে যাচ্ছে বলে নামিয়ে পেটানো বেদম

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

সেতুর ওপরে গায়ে পেট্রল ঢেলে সন্ন্যাসী দলকে পোড়ানো

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

গরিবের সঞ্চয়ের টাকা মেরে ফুলে-ফেঁপে কাগজ চালানো

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

গোঁজামিলে তৈরি উড়ালপুলের নিচে মানুষ থ্যাঁতলানো

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

একঘরে করে দিয়ে বিরোধী পরিবারদের গাঁ থেকে তাড়ানো

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

বানতলায় জিপ থেকে নামিয়ে ধর্ষণখুন যোনিতে টর্চ গোঁজা

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

যে বাড়ি তুলছে তাকে হুমকি দিয়ে প্রোটেকশান টাকা তোলা

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

চাষির পাকা খেতে নিজের দলের ঝাণ্ডা পুঁতে দখল করে নেয়া

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

অবরোধে অ্যামবুলেন্সের যাওয়া স্লোগান মেরে থমকে দেয়া

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

চটের ফাটকা বাজারে ঢুকে জুটমিল বন্ধ করবার জুয়া

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

সমাবেশে ভিড় বাড়াবার জন্য অভূক্ত মানুষদের জড়ো করা

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

মাঠেতে  হাগেনি যারা তারা  নিজেদের প্রলেতারিয়েত বললে

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

স্ত্রীর সামনে স্বামীকে হত্যা করে আঁজলা ভরে রক্তপান করা

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

পাথরে হাত রেখে বিরোধীর পাঞ্জা কেটে নাচা আর কোদা

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

শ্যাওড়াফুলিতে নাজমা খাতুনকে উলঙ্গ ঘোরানো পথে-পথে

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

যা হচ্ছে হোক, এভরিথিং গোজ, সবকিছু চলবে  ভাবনা

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

নদীতে বর্জ্য ফেলে স্রোত বন্ধ করে জমিকে বাড়িয়ে নেয়া

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

হাসপাতালের কাছে ঈশ্বর-দেবীদেবতার নামে লাউডস্পিকার

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

বিজ্ঞাপন-সুন্দরী দেখাবার জন্য বিষ দিয়ে গাছ মেরে ফেলা

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

দেশভক্তি প্রকাশের জন্য দলিতদের পিটিয়ে হত্যা করা

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

আমি এসব কথা বললেও কারোর কিচ্ছু এসে-যায় না

একে আমি বলি মর্ষসমকাম

কসমোপলিসের আত্মহত্যা

মুম্বাই সেন্ট্রাল স্টেশানে ছাড়তে এসেছিলুম অবন্তিকাকে

ও যাবে ভয়েন্দরে মাছ কিনতে কাৎলা বা রুই

ভালো টাটকা মিষ্টিজলের মাছ ভয়েন্দরে পাওয়া যায়

আমি মাছ তেমন চিনিনা বলে ও-ই যাচ্ছে

ওর মুড়িঘণ্ট খেতে ভাল্লাগে

আমার একেবারে পছন্দ নয় মাছের মুড়ো

মিষ্টিজলের হোক সমুদ্রের হোক

অবন্তিকা এক যুবকের দিকে ইশারা করে বলল

মেয়েদের কমপার্টমেন্টে ওঠার জায়গায় ও কি করছে ?

পকেটমার নির্ঘাৎ !

বললুম, দেখছিস তো লোকটা ফোন করছে

হয়তো পরের ট্রেনে যাবে

লোকাল ট্রেন এসে পড়ল প্রায়

মেয়েদের ঠেলাঠেলি শুরু হল

লোকটা মোবাইলে ব্যস্ত

পায়ের কাছে মোবাইল ফেলে দিয়ে প্ল্যাটফর্ম থেকে ঝাঁপালো

রেললাইনের ওপর পেতে দিলো নিজেকে

কেটে দু’টুকরো জবজবে শার্ট চোখ আকাশে

দেখে বমি পেলো অবন্তিকার

এই ট্রেন আর যাবে না নিত্যযাত্রীরা জানে

প্ল্যাটফর্মের কারোর পরোয়া নেই সবাই দৌড়োলো

অন্য প্ল্যাটফর্মের দিকে পরের লোকাল ট্রেন দাঁড়িয়ে

তাদের পায়ের চাপে লোকটার মোবাইল চুরমার

ভয়েস রেকর্ড-করা আত্মহত্যার ই-চিরকুট মুছে গেলো

আজ আর মাছ কেনা হবে না

মুড়িঘণ্ট আর আত্মহত্যার জন্য কসমোপলিসের খেয়াল নেই

খেলার চাল

সবই মগজের মধ্যে, জিতে যাওয়া, হেরে যাওয়া

ছারপোকার চুলকানি, এগজিমা, কিংবা ডিজেল ধোঁয়ায়

হাঁপানির আস্ত শহর, জানি না কি হয় জিতে গিয়ে

যা হয় মগজে হয়, জানি না কি হয় হেরে গিয়ে

যা হয় মগজে হয়

কবিতার জাতক

ঈগলপাখি হয়ে জন্মেছি, রাক্ষস গণ, সিংহ রাশি

বুড়ো হয়ে গেছি, কেউ-কেউ মরে গেছে

আকাশের বয়স হয় না বলে ওড়ার বয়স হয় না

যতোদিন আকাশ ততোদিন উড়াল

দুচারটে পালক খসে গিয়ে থাকবে

কিন্তু আমাদের যৌথ প্রেমের যৌথ প্রেমিকারা

আমাদের সঙ্গেই উড়তো, এক-এক করে

দীপ্তি-বেবি-মীরা বাংলায় টলমলে

বাসুদেবের জাদুবাস্তব চিঠিতে অমর

টস করে নির্ণয় নিতুম আমরা, আজকে কে

প্রথমে কে যাবে

তারপর আমাদের মাঝখানে সাহিত্য

জোড়ার বদলে দেয়াল তুলল

সাহিত্যের সহিতত্ব ব্যাপারটা চরসের ধোঁয়া

যতো ফোঁকা যায় ততো ঝাপসা হয়

দীপ্তি এখন বুড়ি, বেবি অন্য বাড়িতে

মীরার শরীর ঝরে গেছে

কিন্তু জোড়ার আঠা ছিল বটে তিনজনের

আমাদের সবাইকে একই বিছানায় জুড়ে দিতো

আমি ঈগল থেকে অন্য পাখি হতে পারলুম না

দোষটা আকাশের, রাক্ষস গণ পালটাতে পারলুম না

সিংহ রাশি পালটাতে পারলুম না

কবিতার জাতক

জাদুবাস্তবের অবিশ্বাস্য ফিনফিনে হাওয়ায় আজও

প্রেমিকা যখন ব্যুরোক্র্যাট হয়ে গেল

ফোটোয় যে কোটটা দেখছেন দাদুর, সেই হাতির মাথা কেটে

গণেশের সঙ্গে বদলাবদলি হলো তার পিঠে বসে মুখের ভেতরে

শুকনো কুয়াশার স্বাদ নিয়ে জমিজমা আমার কিছুই ছিল না

ভাড়া নিয়ে ফুল-ফল ফলিয়েছি আমিই আমার গল্প হয়ে গেলুম

জীবনভরের আলিঙ্গনে আটক বুকে হৃৎছন্দের বিজলিমেশিন

রক্তনালিতে দামিধাতুর নল বাবার তোলা ফোটো বলে

তেমন পোজ দিতে পারিনি যেমন ইলিশ কাঁটায় কাঁটা

তবু স্যমানের চেয়ে ভাল্লাগে খুচরো গোনার বাজনার সঙ্গে

ছন্দের কতো মিল বুকের মেশিনে সেই ছন্দ ধরে রেখেছে প্রেমিকা

ব্যুরোক্র্যাটের রক্তে ধাতুর নল

রাঙামাসিমার গোপন ডায়রির শেষ পাতা

“ও চেয়েছিল গায়িকা, ঠোঁট দিয়ে, জিভ দিয়ে, গায়িকারা যা করতে পারে

দাঁত কেমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, শ্বাসটানা, তখন ফুঁ-প্রেম শুনিনি

স্বরলিপিতেই শ্বাস যাবে-আসবে, খানিক ফিসফিসুনি টাকরা-আলজিভে

পুরাণের হিরোদের মতন পাইকারি ভালোবাসা, লোকটা জ্ঞানকুঁজো

কতো বছর যে মায়ের মগজে ঘুমিয়েছিলুম, পাঁচবারের বার জন্মালুম

পালতোলা বাড়ির তিনতলায়, পেটে থাকতে গান প্র্যাকটিস করেছি

ঘরজুড়ে বিকেলের দিকে ছায়াদের অডিশান ছুরি-কাটা আলোয়

চাটা-ফাটলের হাঁ-মুখে রক্ত গরম হতে থাকে, দুঃখের কথা বলতে

পাকস্হলীতে গানের শীতঘুমের ঋতুতে কুমিরদের মেটিং মৌসম

ট্রেনভর্তি মানুষ নামছে বুক চিরে-চিরে ঘেমো মেয়েদের গাদাগাদি

ওদের বংশে পারিবারিক জিভের গপ্পো খুব শুনতুম, ও, এই ব্যাপার

যেন নাক ডাকার সময়ে মুখের ভেতরে ফেলা পাঁচ টাকার কয়েন

সিজারিয়ান করে ঝকঝকে অ্যালুমিনিয়াম পাহাড় প্রসব করল

কথা কইবে যেন অন্ধের ছড়ি ফুটপাথের সঙ্গে আলাপ করছে

বাড়িতে অভিধান বলতে ভাসুরপোর দ্বিতীয় পক্ষের বউ আর

আগের পক্ষের মেয়ে হাতের রেখায় যতোটুকু ব্যকরণ রয়েছে

সিনেমাহলে ফেলে-যাওয়া গাদাগাদি ছোঁড়া-ছুঁড়িদের বদঘাম

বোতাম-সভ্যতা চলছে তখনও জিপসংস্কৃতি বাজারে নামেনি

অমাবস্যার রাতে কাৎলামাছের আঁশে গড়া হাওয়া খাচ্ছিলুম

ও বললে, শরীর একখানা উপমহাদেশ আমার মনে পড়েছে

শীতকালেও গায়ে এমন গ্রীষ্ম ছুঁড়ে মারতো মলম লাগাতুম

এদিকে মাঝরাতই শ্বাসে-শ্বাসে বিছানার অন্ধকার গাঢ় করেছে

ভাগ্যিস শুতে আসার আগে পাকা পেয়ারাখানা খেয়েছিলুম

কি মিষ্টি কি মিষ্টি এই নাহলে ভরাসংসার শশুরবাড়ি…”

অবন্তিকার বিশেখুড়োর অ্যালবাম দ্যাখা

বিশেখুড়ো কোতরঙে চলে যাবার সময়ে ট্রাঙ্ক দুটো নিয়ে যাননি,

চুপচাপ পালিয়েছিলেন, কাকিমাকে নিয়ে

বিশেখুড়োর ছেলেপুলে হয়নি । যাবার সময়ে আকবরের

আমলের রুপোর টাকাগুলো নিয়ে গিয়েছিলেন।

কোতরঙে গিয়ে কাকিমা ৮০ বছরে বিশেখুড়ো ৯০ বছরে

মারা যান । ফোটোর অ্যালবাম নিয়ে যাননি কেন !

অবন্তিকা সকালে এসেছিল, বললে, বিশেখুড়োর ট্রাঙ্কের তালা

ভেঙে দেখা যাক যদি কিছু মোহর থাকে ।

উরিব্বাপ, মহামূল্যবান শাদাকালো অ্যালবামখানা ফেলে গেছেন।

অবন্তিকা পাতা ওল্টায় আর আমার মুখের দিকে তাকায়;

আমি ওর মুখের দিকে তাকাই, গাল গোলাপি হয়ে উঠছে, কান

লাল হয়ে উঠছে।

পাতা ওল্টায়, মুখ থমথমে, আমার মুখভঙ্গী লক্ষ্য করে।

ফোটোগুলো দেখি আর বুকের ভেতরে দামামা  ।

অবন্তিকা ফোটো দ্যাখে, পাতা ওল্টায় আর এক এক করে বলতে

থাকে : গোয়া, মানে, বত্তিচেলি, টিটিয়ান, ডিউরের,

রুবেন্স, রেমব্রাঁ, মদিগলিয়ানি…। বিখ্যাত নিউড আর্ট ।

ছোটো কাকির নানা আঙ্গিকে নিউড ফোটো তুলেছেন

বিশেখুড়ো ; শাড়ির আড়ালে দেখিনি তো অসাধারণ ফিগার

মাংসের প্রতিভা, প্যাথস, আবেগের জটিলতা, যৌনতা ।

অবন্তিকা বলল, তোর ছোটোকাকি এতো সুন্দরী ছিলেন যে

বিশেখুড়ো লুকিয়ে  ওনার নিউড ফোটো তুলতেন।

সম্পূর্ণ নগ্ন ছোটোকাকি, নিজের ছোটোকাকিকে দেখছি, পুরো

পোশকহীন, ওনার ধ্রুপদি যৌবনে ।

অবন্তিকার হাত চেপে বললুম, তুই আমার ছোটোকাকির

সেক্স-অ্যাপিলকে হিংসে করছিস !

অবন্তিকা হঠাৎ আমার ওপর ঝাঁপিয়ে বলে উঠল, কী রে

নিজের কাকির সেক্স অ্যাপিলেও রেসপন্ড করছিস,

লম্পট বিহারি খোট্টা কোথাকার ! নিজেকে সামলা ।

এটা ঘটনা

তারপর বল, কেমন আছিস, কতোকাল পর দেখা

সেরকমই আছিস মেঘ অর্কিড ফানুস দিয়ে গড়া

কিছুটা তন্বীত্ব রয়ে গেছে কোমরের ঝড়ে

–হ্যাঁ, তা পঞ্চাশ বছর তো হবেই

তুইও তো বদলাসনি বিশেষ, সেই একই সূর্যোদয়

সমুদ্রের ফেনার নিঃশ্বাস ডলফিনদের সাথে

এখনও খেলছিস নাকি হাঙরের দলে

তোকে তো তখনও বুঝিনি এখন আরো অবাস্তব

পঞ্চাশ বছর হল মরে গেছি ? কেমন স্ট্রেঞ্জ লাগছে, না !

মরে যাওয়া বেঁচে থাকা কই ফারাক তো নেই

এখনও আমার কঙ্কাল খাদে পড়ে আছে

অতো নীচে নামতে চায়নি কোনো উদ্ধারকারী

আসলে উদ্ধারযোগ্য ছিলুম না কখনও

–না তুই তো পরে মরেছিলি, বোধহয় দুর্ঘটনায়, ঠিক মনে নেই

শব তো দেখিনি, শুধুই কেঁদেছি এই পঞ্চাশ বছর

জানি শোক করে কোনো লাভ নেই, হয়ওনি

তবু নিজের জন্যে তো কাঁদতে ইচ্ছে করে

যাঃ দুর্ঘটনা হবে কেন, আমি তো পাহাড় থেকে

তোর জন্য তোর জন্য তোর জন্য

–হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে, তোর কানে তখনও গানটা বাজছিল

আমারই গাওয়া গান, অথচ জানিস, ভুলে গেছি

তোর মনে আছে ?

আসলে ওই বয়সে গান তো মাথার ভেতরে বাজতো

কান দিয়ে শোন খাদের কঙ্কালের কানে তোর গান

–আমার গান তোর এতো ভালো লাগতো ?

বলিসনি তখন কেন, ওফ, যদি বলতিস

এখনও লাগে রে এখনও তোর গান

আশেপাশে সব স্তব্ধ হয়ে যায়

–তাই ? সেসময়ে তো বলিসনি কোনোদিন

অত্যন্ত লোফার ছিলিস লুচ্চা লম্পট

বলিনি কারণ তোর চেয়ে তোর গানকে ভালোবাসতুম

–চা খাবি ?

না, মরে গেছি বলে তো আর অভ্যাস ছেড়ে যায়নি

–ওঃ এখনও সেই সিঙ্গল মল্ট খেয়ে মাতাল হোস

হ্যাঁ রে, দেহ ছাড়া কিছুই ছাড়িনি

–নিজে কেন মরতে গেলি, তোর সুন্দরী প্রেমিকা তো ছিলই

হ্যাঁ, আমি ওকে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলুম জায়গাটা

যেখানে তুই আমাকে ঠেলে খাদে ফেলে মেরেছিলিস

শুনেই ও আমায় বলল তুমিও তাহলে ওর কাছেই যাও

–আসতে এতো দেরি করলি কেন ?

তুষারের জন্য আমার শব চাপা পড়ে গিয়েছিল

–চল বাইরে কাফেতে গিয়ে দু’কাপ ক্যাপুচিনো খাই

এ-৪ মাপের কাগজে

এ-৪ মাপের কাগজের একেবারে মাঝখানে ইন্সপেক্টর অ. ব্যা.

লিখে রেখেছিলেন, “আমার মৃত্যুর জন্য কেহ…….”

ডাকসাইটে ইন্সপেক্টর বলে বেশিদিন একই পুলিশ স্টেশনে

টিকতেন না

অ. ব্যা. ছিলেন যাকে ভালো বাংলায় বলে অকৃতদার, মানে

যিশুখৃষ্ট টাইপ নয়, চলতি বাংলায় যাকে বলে লুচ্চা

এ-৪ কাগজের পেছনে খুদেখুদে অক্ষরে দেড়-হাজার নাম লেখা ছিল

মেয়েদের নাম, কিন্তু অনুসন্ধানকারী কমিশনার শ. চ্যা.

হদিশ পাচ্ছিলেন না নামগুলোর মালকিনি কারা

অ্যাসিসস্ট্যান্ট ইন্সপেকটরের মতে এই মেয়েগুলোই অ. ব্যা-কে

খুন করেছে, কিন্তু কেন লেখা, “আমার মৃত্যুর জন্য কেহ…”

যতোগুলো থানায় ইন্সপেক্টর অ. ব্যা-এর পোস্টিঙ হয়েছে

কন্সটেবলরা জানতো উনি প্রতিদিন সকালে গায়ত্রীমন্তর

গুজগুজ করে পড়েন

অথচ ইন্সপেক্টর অ. ব্যা-এর বাড়িতে পুজোর ঘর পাওয়া যায়নি

গঙ্গাজল পাওয়া যায়নি, পাঁজিও না

কিন্তু একটা ঘরে রঙিন ফোলানো গ্যাস-ভরা কনডোম পাওয়া

গেছে, সেই ঘরে তারা নিজের ইচ্ছেয় উড়ছিল

বেলুন ফোলাবার সিলিণ্ডারও পাওয়া গেছে, ঘরের ভেতরে ঢুকে

কমিশনার সায়ের লাফিয়ে লাফিয়ে যতোই অন্তত একটা

কনডোমকে নাগালে আনার চেষ্টা করেন, সেগুলো পালিয়ে

সিলিঙে গিয়ে ফিকফিকিয়ে হাসে

মেঝেয় খুঁজে পান একটা গ্যাস-ফুরোনো কনডোম তাতে কালি ওঠে না

এরকম রঙ দিয়ে একজন মেয়ের নাম লেখা

মেয়েটি কে মেয়েটি কে মেয়েটি কে মেয়েটি কে মেয়েটি কে মেয়েটি

যে কে তা একজন কন্সটেবল বলতে পারল

“হুজুর ও তো বেপাড়ার, এ-৪ কাগজে যতো নাম আছে সবই তার মানে

বেপাড়ার”

এ-৪ তালিকা নিয়ে অ. ব্যা-এর পোস্টিঙের শহরে বেপাড়ায় ঢুঁ মেরে

কমিশনার শ. চ্যা. বিশেষকিছু জানতে পারলেন না

তিনি তো আর খদ্দের হয়ে জাননি, পুলিশ হয়ে গিয়েছিলেন, তাঁকে দেখে

মেয়েরা নিজের অন্য নাম বলেছে, কেননা রোজ সন্ধ্যায় ওদের

নামবদল হয়

শেষকালে অ.ব্যা. সম্পর্কে গুজবই কাজে দিল । অ. ব্যা, গায়ত্রীমন্তর

পড়ার সময়ে রগের ওপরে পিস্তলের নল ঠেকিয়ে পড়তেন

তিনি মনে করতেন যে যদি বেপাড়ায় যাওয়া পাপই হয় তাহলে

৯ এমএম গুলি তাঁর মগজ ফুঁড়ে বেরিয়ে যাবে

তবু তেমন সুরাহা হল না কেননা পিস্তলের ট্রিগারে কারোর

আঙুলের ছাপ পাওয়া গেল না । শ. চ্যা. ফাইলে লিখলেন

“কেস ক্লোজড; কনডোমগুলো ভালো কোম্পানির । ৩৫৯৭টা

কনডোম । অফিসারের ভবিষ্যৎ উজ্জল ছিল । মরণোত্তর

সম্বর্ধনা দেয়া হউক ।”

গী এবং আ-এর প্রেম

আ কেন আত্মহত্যা করেছিল তা ওর স্ত্রী গী-এর উথালিপাথালি চিৎকার থেকে

ছেঁকে জানতে পারছিলুম

আমার বয়স তখন যদিও এগারো তবু গী-এর কান্না আর গোঙাকির ফাঁক দিয়ে

টের পাচ্ছিলুম আমি গী-এর ড্যাবড্যাবে চোখ, পাছা পর্যন্ত চুল

পাতলা কোমর, ভারি পাছায় দোল খাচ্ছি

গী বলছিল, ছি ছি ছি ছি প্যাসেঞ্জার ট্রেন ছাড়া কোনো সুপারফাস্ট ট্রেন

পাওনি গো ! তুমি সবেতেই ফেল করে গেলে গোওওওওওও

গী-এর কান্না আমার বেজায় ভালো লাগছিল, মনে মনে বলছিলুম, আরো কাঁদ

কাঁদতেই থাক, তোকে দেখে নিই, তোর ডাঙায় মাছের কাৎরানি,

আঁচলখসা বুকের ধবধবে মাখন, আগে তো দেখিনি, আহা

আ কোনো চিরকুট লিখে যায়নি, বেশ করেছে, গী এখন বুঝুক ঠ্যালা, পুলিশ

গীকে দুঘন্টা জেরা করে যা জানতে পারেনি, আমি তা জানলুম

গী বোধহয় ভাবছিল, এটাতো ছোঁড়া, বিশেষ কিছুই বোঝে না, এর সামনে

কষ্টের যন্ত্রণার দুঃখের পরাজয়বোধের স্টক খালি করি

আমি বোকার ভান করে তাকিয়ে থাকি, গী-এর বুকের খাঁজের দিকে,

বড়ো-বড়ো চোখের দিকে, ধুমসো পাছার দিকে

এই তো সেদিন বিয়ে হল আর ট্রেনের লাইনে গিয়ে শুয়ে পড়ল আ, কেন

তা বলতে লাগল আ, লোকটা কী, ফুলশয্যায় পারল না,

কয়েক রাত চেষ্টা করেও পারল না, কেমনতর পুরুষ

জাহাজঘাটার বদলে খেয়াঘাটে নৌকো ভেড়ায় !

গী অতিসুন্দরী বলে আ কোনো যৌতুক নেয়নি, চাউনিতেই ঘায়েল

হয়ে গিয়েছিল, বিছানায় বিফল হয়ে গেল, কেন !

গী ভার্জিন থেকে গেল । এর পর যদি গী কাউকে বিয়ে করে সে কি

জানতে চাইবে গী ভার্জিন কি না ।

আমি সুযোগ পেয়ে গী-কে সান্ত্বনা দিই, জড়িয়ে ধরে বলি, কেঁদো না গো

সব ঠিক হয়ে যাবে, তোমার তো কোনো দোষ নেই

এতো সুন্দরী তুমি, অনেক ভালো বর পেয়ে যাবে, যে তোমায় খুবখুব

ভালোবাসবে । গী আমার কথা শুনে আমাকে কষে জড়িয়ে ধরে।

আমি গী-এর গাল থেকে লোনা জল ঠোঁটে মেখে নিই, মুখের ভেতরে গিয়ে

গী-এর চোখের জল মিষ্টি হয়ে যেতে থাকে । থ্যাংকিউ গী ।

কেউ কবিতা পড়ে না

এ-টেবিলের মাতাল যেভাবে ওই টেবিলের মাতালের সঙ্গে কথা বলে

তাদের ডেলিকেসি পাঁঠার জিভ, ভেড়ার মগজ, গোরুর সসেজ

৩৭৬৫৩ বাঙালি কবি কবিতা লেখে কিন্তু  কদাচিৎ অন্যের লেখা

কবিতা পড়ে, মাতালের দলাদলি আর কবিদের দলাদলি আলাদা,

পাবলিক তো একেবারেই কবিতা পছন্দ করে না, মঞ্চে দাঁড়িয়ে কোনো

মাতাল খোঁয়ারি শোনালে আধোঘুমে ‘আরেত্তেরি ইস কি মা কা

আঁখ’ বললেও, কবিও সেই কথাই বলছে তা টের পায় না, মানে খুঁজে

পায় না, মাতালরা আর রবীন্দ্রনাথ-নজরুলও পড়ে না, মদ

কবিতার চেয়ে বেশি টানে, কবিরা এ-টেবিল থেকে সে-টেবিল

ঘুরে, বাড়ি যাবার পথে জানতে পারে যে তারা জন্মের সময়ে

দুই কানে দুটো জিভ নিয়ে জন্মেছিল, জনসাধারণও কানের ভিতরে

জিভ নিয়ে জন্মেছিল বলে নিজের দুঃখ-কষ্ট নিজেকে শোনায়।

কেউই আর কবিতা পড়ে না । কেউই আর কবিতা পড়ে না ।

অন্যের যন্ত্রণার আনন্দ

টিভিতে অন্যের যন্ত্রণা দেখতে পেলে

অন্যের থেঁতলে-যাওয়া মাথা দেখতে পেলে

অন্যের কাটা হাত দেখতে পেলে

ছেঁড়া পাঁজরের বইতে-থাকা রক্ত দেখতে পেলে

অন্যের দুঃখ-কষ্ট-মাখা মুখ দেখতে পেলে

দর্শক-শ্রোতার যেমন আনন্দ হয়

তার চেয়ে বেশি আনন্দ হয় ধারাভাষ্যকারের ।

কৌরব-পাণ্ডব ম্যাচ

কুরুক্ষেত্রের গ্যালারির টিকিট পেয়েছিলুম শ্রীকৃষ্ণর গার্লফ্রেণ্ড রাধাকে

ধরাধরি করে। সামনের দিকের সিট পাইনি ।

সূর্য উঠতেই দুদলের রেফারিরা সিটি বাজিয়ে যুদ্ধ শুরু করতে বলল।

ইনডিয়ান ঘোড়ায় টানা রথে চড়ে তীর ছুঁড়ছিল সব্বাই।

দূর থেকে কে যে দূর্যধন আর কে  ধৃতরাষ্ট্র কিছুই টের পাচ্ছিলুম না।

একটা মোটকা লোক গদা চালাচ্ছে দেখে তাকে ভীম মনে হল।

বারীন চেঁচাতে লাগল মার মার পোঁদে মার ওটাই দ্রৌপদীর

শিফনের শাড়ি খুলেছিল।

একটা রথে মেয়েলি টাইপের একজনকে দেখে সুবর্ণ বলে উঠল ওই

লোকটা হোমো, চালু মাল ।

আমি বললুম, কোনো মানে হয় না, এতো টাকা দিয়ে টিকিট কেটে

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ দেখা । তার চেয়ে বেদব্যাস যখন গপ্পো

লিখে ফেলবে তখন পড়ে নেবো।

তরুণ বলল, শালা সংস্কৃততে তো সবাই আমরা ফেকলু । যতোদিন

যুদ্ধটা চলবে জমে যাবে । দ্রৌপদীর শাড়িটা শেষ ওব্দি কী

হল জানিস ? কোথায় আছে ওটা ? পেলে আর যুদ্ধ দেখবো না

ম আর অ-এর স্টকটেকিং

ম, যার কাল্পনিক যুবতীদের ভালো লাগে একদিন এক বাস্তবিক যুবতী

অ-কে দেখতে পেয়ে মত বদলে ফেললো।

অ, ম-কে ওর ব্লাউজে হাত ঢোকাতে দিয়েছিল, বলেছিল কাল্পনিক যুবতী

নিয়ে কী করবি, যা কল্পনা করছিস তা ব্লাউজের ভেতরে আছে।

ক ( তিন ) যে ম-এর উচ্চমাধ্যমিক সহপাঠী, জানতে চাইলো কেমন

হয় রে কচি মাইগুলো ? ক ( এক ), ক ( দুই ) ম-এর বন্ধু নয়।

আসলে অ হল ক ( এক ) এর বোন, জানতে পারলে চূড়ান্ত মারামারি

হবেই । অ-এর বাবা শ বাংলার টিচার । বাংলায় ম একেবারে

গাড্ডুস ।

অ-এর মাইতে হাত দেবার পুরস্কার হিসেবে, বাংলায় ১০০তে ১০০ পেয়ে

ম সেদিন অ-কে ধন্যবাদ দিতে অ বলেছিল, তোর বাবা খ-বাবু

তোর সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন আমাদের বাড়ি।

ম-এর আনন্দ তো হলই, কিন্তু লুকিয়ে ব্লাউজে হাত ঢোকাবার মজা শেষ

হয়ে যাবে বলে কিছুটা মনখারাপ হলো ।

অ বলল, ঘাবড়াচ্ছিস কেন, এখন তো পাকা দেখা আশীর্বাদ সবই বাকি,

ততোদিন তুই যতো ইচ্ছে হাত ঢোকাতে পারবি, শর্ত এই…।

ম আঁৎকে উঠে বলল, না না আমরা যৌতুক নিই না, কোনো শর্ত নেই।

অ ম-কে জড়িয়ে ধরে বলল, দুর বোকা, ততোদিন তুইও

আমাকে হাত ঢোকাতে দিবি

অ তক্ষুনি হাত ঢোকালো আর ভিজে যেতেই বলল, ছি ছি, সবুর করতে

পারিস না ? স্টক খালি হয়ে যায় যদি !

অ বলল, এই স্টক ৮০ বছর পর্যন্ত থাকবে ।

ডিম

দুটো ডিম কিনতে গিয়েছিলুম কুলসুম আপাদের বাড়ি

উনি মুর্গির ঘরে ঢুকলেন, পেছনে আমিও

একটা দিশি মুর্গি কয়েকটা ডিমের ওপর বসেছিল

তাকে হুশ-হুশ করে তাড়িয়ে দুটো ডিম তুলে নিলেন

তা থেকে বাছাই করে মুচকি হেসে দিলেন আমার হাতে

গরম টাটকা ডিম, জিগ্যেস করলেন, ডিম পছন্দ হয়েছে ?

দু’পকেটে দুটো ডিম রেখে ঘাড় নাড়লুম

কুলসুম আপা নিচু হয়ে ঠোঁটে চুমু খেয়ে

বললেন, পয়সা পরে এনে দিস মনে করে

ঠোঁটের থুতু পুঁছে আবার ঘাড় নাড়লুম

টাটকা ডিম পেয়ে নাচতে-নাচতে বাড়ি ফিরছিলুম

পকেটের ডিম দুটোও যেন নাচতে লাগলো

লেংটুতে খোঁচা ফুটছিল

ডিমের আবার খোঁচা হয় নাকি !

দু’পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে বার করে আনলুম

ডিমের খোসাসুদ্দু দুটো জ্যান্ত মুর্গির ছানা

এগুলো বাড়ি নিয়ে গেলে জেঠিমা বকবেন

কুলসুম আপাদের বাড়ি নিয়ে গেলে নির্ঘাৎ

বকুনি খাবেন কুলসুম আপা

চুপি-চুপি কুলসুম আপাদের বাড়ি গিয়ে মুর্গির ঘরে

ছেড়ে দিলুম  ছানাদুটো

বাড়ি ফিরে বললুম, ডিম পাড়েনি এখনও মুর্গিগুলো

বলেছে বিকেলে আসিস

বিকেলে তো যাবোই, কুলসুম আপার থুতুমাখা চুমু খেতে

আরেত্তেরি, ইস কি মাঁ কা আঁখ

“আরেত্তেরি, ইস কি মাঁ কা আঁখ”, আমি এর মানে জানতুম না–

অনেককে বলতে শুনি, প্রায়ই, হিন্দিও ভালো জানি আমি

তাহলে বুঝতে হবে, মানে হয় না এরকম কথা বলে লোকেরা আনন্দ পায়

যেমন সেদিন এক তরুণীর সঙ্গে বাজারে দেখা

সে বললে, “কাকু, কলকাতায় কবে এলেন ?”

কন্ঠস্বরে শাকাহারি ঘুর্ণি

এই কথার মানে আমি জানি কিন্তু তরুণীটিকে চিনতে পারলুম না

মেয়েটি পরিচয় দেবার পরও মনে করতে পারলুম না

বোধহয় এরকম অবস্হার মাকড়জাল কাটানোর জন্যই

ওই উক্তি : “আরেত্তেরি, ইস কি মাঁ কা আঁখ”

ওফ, তরুণীটির সে কি ঘেমোত্বকের স্ফূলিঙ্গ

ওই স্ফূলিঙ্গ আমি চিনি, সে কথায় পরে আসছি

এমন নয় যে আমার চামড়ায় রুই মাছের আঁশ আছে বলে

আমাদের বংশলতায় সব রকমের ফল ধরে : বুনো হোক বা বাগানি

সবাই তো জানে যে মরে যাবার পর সাঁতার কাটা কতো সহজ

বড়দিকে জিগ্যেস করেছিলুম কেননা বড়দি আমাদের বাড়ির

সিস্টার্স রিপাবলিকের আনন্দমাখানো লেকচারার

বড়দি বললে, “আরেত্তেরি, ইস কি মাঁ কা আঁখ” হলো একখানা ঘুষিবাক্য

ক্রিয়াপদের ফুটো গলে পুচুৎ করে বেরিয়ে যেতে পারে

দেখিসনি আজকাল ব্যাটারির দরুণ ঘড়িরা সহজে ক্লান্ত হয় না

তেমনিই রক্ত হলো মহাচালাক, শুকোবেই শুকোবে, যতোই কাঁদো

শান্তিনিকেতনে আঁকিয়েরা আদিবাসি তরুণীদের স্কেচ আঁকতো কেন

বল দিকিনি, এতো তো পড়াশুনার বড়াই করিস

বললুম, “আরেত্তেরি, ইস কি মাঁ কা আঁখ”

এখনকার মতন নগ্নিকা ভাড়া পাওয়া যেতো না সেসময়ে

ওনারা নগ্নিকার খোঁজে গাঁ-গেরামে বেরিয়ে চোখে তুলে নিতেন

তারপর চোখের আলোয় চোখের ভেতরে দেখতে পেতেন

আর বাড়ি ফিরে তাদের স্কেচ আঁকতেন পয়সা খরচ হতো না

রবীন্দ্রনাথ কিন্তু প্যারিসে গিয়ে একজন নগ্নিকার জলরঙ এঁকেছিলেন

সেই নগ্নিকার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল ল্যটিন কোয়ার্টারে

নাম জিগ্যেস করতে ঘেমোত্বকের স্ফূলিঙ্গ উড়িয়ে

ফরাসি ভাষায় বললে, “আরেত্তেরি, ইস কি মাঁ কা আঁখ”

কে না ওকে দাঁড় করিয়ে শুইয়ে বসিয়ে পা ছড়িয়ে বুক চিতিয়ে

ছবি এঁকেছেন : আহা আহা আহা আহা আহা–

সবচেয়ে আকর্ষক গুস্তাভ কোরবেতের কেবল দু’পায়ের ঝোপখাঁজ

তাছাড়া পিকাসো, ফ্রান্সিসকো গোয়া, টিটিয়ান, গুস্তাভ ক্লিম্ট

মিকেলাঞ্জেলো, রুবেন, এদুয়ার্দ মনে, এগোন শেলে

দিয়েগো ভেলাসকোয়েজ এত্তোজন বিরাট বিরাট শিল্পী

রবীন্দ্রনাথের আঁকা জলরঙটা আমায় দিয়ে গালে চুমু খেয়ে

ফরাসি ভাষায় নগ্নিকা যা বললে তা ওই ঘেমোত্বকের

ওড়ানো স্ফূলিঙ্গ : “আরেত্তেরি, ইসকি মাঁ কা আঁখ” ।

ডিসকোর্স

অবন্তিকার সঙ্গে কথা বলা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে

আজকাল ও কথা বলার সময়ে মুখ দিয়ে বলে না

আমি দেখেছি ওর ঠোঁট নড়ে না

মুখ বন্ধ করে রাখে

কিছুদিন আগে টের পেলুম ও মাই দিয়ে কথা বলে

মাই লিখছি কেননা স্তন শব্দটাকে ঘেন্না করে অবন্তিকা

বলে যে স্তন শুনলেই মনে হয় শান্তিনিকেতনের

আঁকিয়েদের তুলিতে আঁকা কোনো আদিবাসী বউয়ের ঝোলা বুক

ওনারা তো প্যারিসে গিয়ে নিউড আঁকার সুযোগ পাননি

বা পেলেও সাহস যোগাতে পারেননি

শ্বেতাঙ্গিনী উলঙ্গ তরুণীকে সামনে দাঁড় করিয়ে শুইয়ে বসিয়ে আঁকা

ফ্রানসিসকো গোয়ার আঁকা নারী

গুস্তাভ ক্লিমেন্টের আঁকা স্বমেহনী যুবতী

মিকেলাঞ্জেলোর আঁকা অপ্সরা

গুস্তাভ করবের আঁকা শুধু মেয়েলি কুঁচকির কালো ঝোপ

এদুয়ার্দ মনের আঁকা লতিয়ে পড়ে থাকা তরুণী

এরকমটা আঁকা আহা আহা আহা আহা

চাড্ডিখানি কথা নয় কখন যে কী হয়ে যাবে তার ঠিক নেই

তার চেয়ে এই ভালো গাঁ-গেরামের বাড়ির বউদের ঝোলাবুক

বললুম তোর তো ঝোলাবুক নয় তাহলে লজ্জা কিসের

নামে কিই বা এসে যায় স্তন বলিস বা মাই একই ব্যাপার

তখন টের পেলুম যে একই ব্যাপার নয়

অবন্তিকার মাইরা কথা বলে

প্রেমের কথা বলতে হলে ও বাঁ-দিকের মাই ব্যবহার করে

আঁচল সরিয়ে মাইটা গান শোনায়

প্যার হুয়া ইকরার হুয়া প্যার সে কিঁউ ঘবরাতা হ্যায় দিল

তুমি যে আমার তুমি যে আমার

সংসারের কথা বলতে হলে ডান দিকের মাই কথা বলে

অড়র ডালের দাম বেড়ে যাচ্ছে

আর ইলিশ খাওয়া যাবে না ২০০০ টাকা কিলো

পিৎজা অর্ডার করলে একটার সঙ্গে আরেকটা ফ্রি দ্যায় না

পটলে ঢ্যাঁড়সে সবুজ রঙ করা থাকে

পাবদা মাছও গোলাপি জলে চুবিয়ে বিক্রি করে

আমি ওর ডান দিকের মাইটাকে বেশি ভালোবাসি

ওটা অনেকক্ষণ ধরে আমার সঙ্গে কথা বলে

ভালোবাসা মানেই তো তাই অনেকক্ষণ ধরে

নিউড যুবতীর সঙ্গে কথা বলা শুয়ে বসে দাঁড়িয়ে

কথা বলাবলি বলাবলি বলাবলি করতে থাকা

যতোক্ষণ না দুজনেরই একই সঙ্গে ক্লান্তির ক্লাইম্যাক্স হয়

কুকুরের খাবার

অবন্তিকার বাড়ি গিয়েছিলুম কাল বিকেলবেলায়

তখন কালবৈশাখী আসার তাল করছে

তাই ভাবলুম ঝড়টা কাটিয়ে তারপর হোটেলে ফিরবো

অবন্তিকার সঙ্গেও দ্যাখা হবে অনেককাল পর

গিয়ে দেখি কুকুর পুষেছে

জিগ্যেস করলুম এটা কোন জাতের কুকুর রে

বুল টেরিয়ার গ্রেট ডেন ডশ্যাণ্ড না বুল ডগ

আমি মানুষ আর কুকুর চিনতে বড্ডো ভুল করি

অবন্তিকা বলল এটা দেশি কুকুর

না খেতে পেয়ে দড়িদঙ্কা হয়ে ফুটপাথে নেতিয়ে পড়েছিল

বাড়ি এনে সেবা করে দাঁড় করিয়েছি

আসলে প্রতিশোধ নিচ্ছি বিদেশি কুকুরদের খাবারের বিরুদ্ধে

একে রোজ পেডিগ্রি কুকুরদের যে সমস্ত খাবার বাজারে বিক্রি হয়

সেগুলো কিনে-কিনে খাওয়াই

বললুম, “সত্যি তোকে আজও চিনতে পারলুম না রে ।”

সোমক দাসের জন্য একটা ছোটো পেগ

সোমক দাস একটা ছোটো কবিতা চেয়েছেন ওনার পত্রিকার জন্য

লিখতে বসে জানলা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি সামনের বিলডিঙে

আলফোনসো আমগুলো পেকে গেছে অথচ কেউ পাড়ছে না

সকালে টিয়াপাখিরা সবুজ আমের ওপরে ব্যালেন্স করে যখন খায়

বুঝতে পারি আমগুলো পেকে গেছে অনেক আগে

বাজারে আলফোনসো আম এখন পাঁচশো টাকা ডজন

বাজার মানে ওদের আবাসনের পেছন দিকে নানারকম বিদেশি ফল বিক্রি হয়

চিনের টক ন্যাসপাতি সাউথ আফ্রিকার শক্ত ন্যাসপাতি নিউজিলভাণ্ডের কিউ্য়ি

আমেরিকার আপেল ইজরায়েলের কমলালেবু তুর্কির পাকাডুমুর

অথচ নিজেদের গাছের আলফোনসো পাড়ছে না কেউ

গাছে বোধহয় তিন ডজন আম হয়ে আছে মানে পনেরোশো টাকা

আবাসনের ফ্ল্যাটের সংখ্যা যদি তিনশো হয়

তাহলে পেড়ে নিয়ে ভাগাভাগি করে নিতে পারতো

সকলেই সমান সংখ্যায় গাছপাকা আলফোনসো খেতে পারতো

আসলে আমগুলো হয়ে আছে মগডালে

আর হয়তো বেশির ভাগ সদস্যের ডায়াবেটিস

সকলেই তো বুড়োবুড়ি ছেলেমেয়েরা বিদেশে

যখন বয়স কম ছিল তখন অনেক আদর করে সবাই মিলে পুঁতেছিল

রত্নাগিরি কিংবা দেওগড় থেকে এনে আলফোনসো আমের চারা

আবাসনের সদস্যদের দেখি বেদানা আপেল সবেদা চেরি কিনতে

আম কিনতে দেখি না

আবেগকে টাকায় বদলাবার আলাদা উপায় আছে ওদের

সবাই গুজরাটি জৈন পরিবারের সদস্য

হিরের কারবারি শেয়ার বাজারের ব্রোকার কারখানার মালিক

ওরা কি জানতো না একদিন বুড়িয়ে যেতে হবে

তখন গাছে ঝোলা অবস্হায় আলফোনসো আম দেখতে ভালো লাগবে

সকালে টিয়াপাখিদের আম খাওয়া দেখতে ভালো লাগবে

যেমন আমার ভালো লাগে

মনে-মনে চাই আমগুলো গাছেই থাকুক

আমাদের আবাসনে দুটো জংলিফুলের বিশার গাছ

একটাকে মেরে ফেলা হয়েছে গাছমারার ঠিকেদার ডেকে

গাড়ি রাখার জায়গা নেই বলে গাছ মেরে ফেলতে হয়েছে

আলফোনসো গাছ থাকলে টিয়াপাখিদের দেখতুম

তবে সেটাও গাছমারার ঠিকেদারকে সোপর্দ করা হতো

চাইলেই বাজারে আলফোনসো পাওয়া যায়

ক্রফোর্ড মার্কেটে টিয়াপাখি কিনতে পাওয়া যায়

গাড়ি পার্ক করার জায়গা কোথাও পাওয়া যায় না

তিরিশতলা-চল্লিশতলা বাড়িগুলোর কমপাউণ্ডে গাছের বালাই নেই

ওদের গাড়ি রাখার জন্য দু-তিন-চার-পাঁচতলায় পার্কিঙের জায়গা

গাড়িও নামে লিফটে চেপে

সবুজ টিয়াপাখির দল কোথা থেকে মুম্বাই কসমোপলিসে আসে জানি না

টিয়াপাখিগুলো কেমন করে টের পেয়েছে যে আম পেকেছে

চলো সবাই দল বেঁধে চলো

সোমক দাসের বাড়িতে এখন বোধহয় ল্যাঙড়া আম খাওয়া হয়

হিমসাগর খাওয়া হয়

উত্তম দাশের বাগানে আম হতো

উত্তম দাশ আলফোনসো আমের গাছ পোঁতেনি

উত্তম চুপচাপ মারা গেল

ডায়াবেটিস ছিল কি উত্তমের

থাকার সম্ভাবনা বেশি কেননা ও বড্ডো মিষ্টি কবিতা লিখতো

একের পর এক মিষ্টি কবিতার বই লিখে গেছে

কেদার ভাদুড়ির খোঁজে গেছে সম্ভবত

টিয়াপাখি আসতো না উত্তমের বাড়ির আম খেতে

সোমক দাসের জানলা দিয়ে টিয়াপাখিদের আলফোনসো খাওয়া দেখা হয় না

উনি কবে শেষ স্বাধীন টিয়াপাখিদের ঝাঁক দেখেছেন জানি না

উনি কবে শেষ স্বাধীন বাঙালির দল দেখেছেন জানি না

উনি কবে শেষ স্বাধীন কবিলেখকদের দেখেছেন জানি না











আমার জন্মদিন নেইআমাদের ইমলিতলার বাড়িতে কারোর জন্মদিন পালন করা হতো নাজেঠা বাবা জেঠিমা মা কারোর জন্মদিন ছিল নাআমার তাই কোনো জন্মদিন নেইবাড়ির কারোরই জন্মদিন ছিল নামায়েরা কাকে কবে প্রসব করেছেন তার তিথির হিসেব ছিলযে জন্মাচ্ছে তার তো কোনো অবদান নেই জন্মানোয়যে পেটে ধরে রাখল এতো মাসযে কষ্ট সহ্য করলো এতো সকাল দুপুর সন্ধ্যাতারই তো অবদানঠাকুমা কবে জেঠা আর বাবাকে প্রসব করেছিলেনতার তিথি ঠাকুমা জানেনপ্রসবদিন পালনের তো কোনো রেওয়াজ নেইতাই মা আমাকে কোন তিথিতে প্রসব করেছিলেন জানিমায়ের কষ্টের গল্প জানিহাসপাতালে ভর্তির গল্প জানিকিন্তু আমার জন্মদিন জানি না
আমি বিষাদে ভুগি নাআমাদের ইমলিতলার বাড়িতেকেউই বিষাদে ভুগতো নামেজদা, যাকে বড়োজেঠা এক বেশ্যার কাছ থেকেদেড়শো টাকায় কিনেছিলেনতা জানতে পারার পরও কোনোদিন বিষাদে ভোগেনিজেঠিমার সঙ্গে মেজদা তুইতোকারি করলেওজেঠিমা বিষাদে ভোগেননিবিষাদ কাকে বলে বাড়ির কেউই জানতুম না
আসলে আমাদের তো মধ্যবিত্ত পরিবারবলতে যা বোঝায় তা ছিল নাগুয়ের নর্দমা থেকে লাট্টু কুড়িয়ে খেলেছিকই নোংরা মনে হয়নি তোবকুনি খেয়ে আবার পরের দিন একই কাজ করেছিযৌবনেও বারণ শুনিনিবারন-করা  কাজ বার-বার করেছিকিন্তু বিষাদে ভুগিনিসত্যি বলতে কি একাকীত্বে ভুগি বটে বুড়ো বয়সেনিঃসঙ্গতায় ভুগে সিঙ্গল মল্ট খাইকিন্তু কখনও বিষাদে আক্রান্ত হই না


ঠাকুমার সঙ্গে ঝমঝম খেলাউত্তরপাড়ার বাড়িতে বুড়ি ঠাকুমাঘুরে বেড়াতেন খালি গায়ে কোমরে একটা গামছাওই ভাবেই গঙ্গায় চান করতে যেতেনকতো বয়সে লজ্জাবোধ চলে যায়ঠাকুমার বয়স তখন পঁচাশি ছুঁইছুঁইঠাকুমা পঁচানব্বুই বছর বয়সে মারা যানছোটোবেলায় উত্তরপাড়ায় গেলেঠাকুমার বুকের ওপরে বসে মাইয়ের বোঁটা দুটোএকটার সঙ্গে আরেকটা জুড়ে ছেড়ে দিতুম আর বলতুমঝমমমমমমমমমমমমমমঠাকুমা বলতেন যখন বে’থা করবি তখন নিজেরবউয়ের মাই নিয়ে ঝমঝম খেলিসবুঝলি তোর দাদুর অনেক গর্ব ছিল আমার মাই নিয়েঠাকুমা তো নেই নয়তো বলতুমআমারও বুড়ি বউয়ের জন্য গর্ব আছে ঠাকুমা










সঙ্গীত

আমি এমনই এক সঙ্গীতকার যার গানের গলা নেই

জীবনে কখনও কোনো গান গাইনি

কোনো বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পরিচয় হয়নি

অথচ যখন বৃষ্টিতে ভিজি কিংবা কোনো যুবতীর সঙ্গে শুই

তখন সঙ্গীত হয়ে উঠি এই কারণেই আমি 

যৌবনে সোনাগাছি যেতুম

ভালোবাসতে আমার আজও ভালো লাগে

কিন্তু সেই সোনাগাছি আর নেই

সবই অবাঙালি যুবতীরা দখল করে নিয়েছে

সঙ্গীত উধাও হয়ে গেছে

অথচ পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছিল সঙ্গীতের জন্যে

এখন সঙ্গীত আমাকে অদৃশ্য করে তোলে

বুঝতে পারি অদৃশ্য হয়ে চলেছি

শিরা বেয়ে বয়ে চলেছে আঘাতের আহ্লাদ

স্বপ্নভঙ্গের টুকরো-টাকরা

ভোগের দুর্ভোগে ভুগে যেনারা ভাগলবা হয়ে এসেছিলেন

ইতিহাসের লাথি খেয়ে তেনারা নতুন ভূগোলে সেঁদিয়ে 

কুষ্ঠরুগিদের সঙ্গে ফোটো তুলিয়ে অমর হবেন ভেবে 

কালো দিনকে রাতারাতি কালা দিবসে পালটে ফেললেন–

বুকনিকোষ ছাড়া  শ্রীমদ্ভাগবত আর বোঝা হল না তাঁদের

টিকটিকির বাসা থেকে পড়ে ডিমফাটা কাঁদোকাঁদো মুখে তাঁরা

চাপিয়ে দিলেন অবক্ষয় সংকট গ্লানি দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা পারক্য পরাজয়

যেন শারদ ধুনিচি নৃত্য কিছু নয় বাসন্তী দোলখেলা খিছু নয়

যেন পয়সার ঝনঝনানি কেবল ভিকিরিরাই শোনে শোনায়

কালো মেঘের কুচি ঠোঁটে নিয়ে সে-সব পঙ্গপালের কঙ্কালি কাতার

সাঁঝবেলায় ধবধবে শাঁখকেও গোঙানিতে বদলে দিয়েছিল

আর বাজে কাগজের ঝুড়ির সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল ছেলেমেয়ের

যাতে রবীন্দ্রনাথের পেইনটিঙ থেকে তেল চুরি করে তাতে ভাজা মাছগুলো

বেঁটে চাষাদের কুঁজো ছায়ায় বসে তারিয়ে তারিয়ে খেতে পারেন

জলভাত

তখনকার দিনে আমি দলাপাকানো কাগজে লুকোনো ফিসফিসে গল্পে

রামধনুর স্কার্ফবাঁধা বিকেলবেলায়

পরীক্ষার খাতায় ঝর্ণাকলমের নার্ভাস নাচ প্র্যাকটিস করতুম

তখনকার দিনে আঙুলের ডগায় কবিতা বয়ে-বেড়ানো খুঁতখুঁতে আলোতে

পানাপুকুরে গোসাপের লিখনভঙ্গীমায়

কতো তরল ছুপা-রুস্তম যে না-জেনে ভাসিয়েছিলুম তার ঠিকঠিকানা নেই

তখনকার দিনে ব্যক্তিগত গোঙানিতে গড়া যৌথ স্লোগানের ইকড়ি-মিকড়িতে

একদিনের শিশুর সঙ্গে যে-ভাষায় কথা বলি

দেখতুম যে হাড়ভাঙা খাটুনির পর বেশ তরতাজা কুঁড়ি ফুটিয়েছে গোলাপ

তখনকার দিনে খাল কাটার পর যখন কুমিরের বদলে ঠিকেদাররা এলো

অধঃপতন টের পেতে যতোটা নামতে হয়

নিজের চামড়া নিয়ে মনসাগাছটাই কতো চিন্তিত তো আমি কোথাকার কে

তখনকার দিনে একটা দুঃখ চাপা দিতে আরেকটা দুঃখ যোগাড় না হলে 

সবকটা মৃত্যুদণ্ডের নিজস্ব রূপকথায়

দেখতুম অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির পর ব্যাঙাচিরা লেজ খসিয়ে ফেলেছে

অথচ এখনকার দিনে যে-বয়সে মনে হয় এবার বড়ো হওয়া থামুক

দাঁড়ি-কমা-সেমিকোলোনে ঘেরাও জীবনে

বসন্তঋতুর সঙ্গে একাত্ম হবার অনৈতিক সম্পর্ক চাগিয়ে ওঠে থেকে থেকে

সব গর্তই ঊর্ধমুখীন, আহা

আজে-বাজে স্বপ্ন যাতে না দেখে ফেলি

তাই স্বপ্ন পাহারা দিচ্ছি এমন এক ভোরে

জলের ঢেউয়ে গড়া অহংকারের পাঁচিল তুলে

ছুঁচসুতো দিয়ে লেখা গল্পের শহিদটাকে

খুঁজে পেলুম জাহাজডুবির লাশেদের সভায়

সে একখানা বোড়ে-ঘেরা রাজার সভা বটে

.

অনেক গাছ তো হয়ে ওঠে কিন্তু কিচ্ছুটি করে না

পালানো বউকে ফেরত নেয়া স্বামীর ঢঙে

যে-উপমা কবিতার লাইনে আটকা পড়েছে

যেন সধবার শব সাজাবার বিউটিশিয়ান

যাঁর কারবার অতীতের বর্তমানটুকু নিয়ে

দিব্বি থাকেন বাকোয়াসের খোশমেজাজি গুলগল্পে

আবার আসবো ফিরে

আবার আসবো ফিরে জানি, কিন্তু কোন বাংলায় ?

দুই বাংলাতেই আসবো ফিরে আমি, বুঝলেন জীবনানন্দ

কাক বা কোকিল হয়ে নয়, ঘাস বা কমলালেবু হয়ে নয়

মানুষের হাল-আমলের রূপে ফেরবার কোনো আশা নেই

কেননা এখন মানুষের সংজ্ঞা বেশ পালটে গিয়েছে

চাকুরির দৌলতে পশ্চিমবাংলার গ্রাম গঞ্জ শহরতলি

ঘুরে ঘুরে, চাষি মাঝি জেলে তাঁতি ছুতোর কামার

শবর সাঁওতাল মাহাতের দাওয়ায় বসে যে-সব দুর্দশার কথা

শুনেছি পঞ্চাশ বছর ধরে, কাটাকাটি, খুনোখুনি

খামার বসতবাড়ি সুখের সংসার পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া

বিরোধ করেছে যারা তাদের গ্রামছাড়া করা

মাটির তলায় সপরিবার জ্যান্ত পুঁতে দেয়া

বুঝলেন জীবনানন্দ, সবই ঘটেছে দেশভাগের বহু পরে

বহু পরে বহু পরে বহু পরে বিশ-ত্রিশ বছর তো হবেই

ফেলানি ঝুলেছে কাঁটাতারে, ইলিশ এসেছে লুকিয়ে-চুরিয়ে

এপার ওপার দুই দেশ থেকে কচি কিশোরীদের মুখচাপা দিয়ে

তুলে এনে প্রতিদিন বিক্রি হয়েছে কুমারীত্ব কেনার বাজারে

পরে তারা গোপন জাহাজে পাচার হয়েছে আরবের আরাম হারামে

তাই আর মানুষের রূপে ফিরতে চাই না আমি

তবু ফিরতে চাই, বুঝলেন জীবনানন্দ, ফিরবোই আমি

বাঙালির মুখের ভাষা হয়ে বেঁচে থাকবো চিরকাল এপার-ওপারে

আভাঁগার্দ কবিতা

উৎসর্গ : গন্ডওয়ানার রানি দুর্গাবতী

  • ছিঁড়ে যাচ্ছে প্রত্যবর্তনহীন গোলকধাঁধায় ফুটকড়াই পূজনীয় ব্যথাগুলো দিলুম গো অশরীরী বীক্ষণ বাড়ে আপা আপনার সাথে যুদ্ধকালীন ঘেমো তৎপরতায় আমি টাশকি খেয়ে হাতড়ে হাতড়ে হাতড়ে হাতড়ে ধর্মের মূল কিতাব লালটুকটুক লালটুকটুক জলের তলায় এতটাই ভয়ঙ্কর, গা থেকে খুলুখুলু সিংহাসনে কিনারা পাচ্ছিলুম না আবার আজকালকার মিচকে গার্লফ্রেন্ড এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফসল আদর রে সবাই যেন কেমন মেদহীন আর মোক্ষম স্মরণীয় প্রসূতি গাভীটি জবরদস্ত  কেই বা বলতে পারে চল মন যমুনাকে তীর ছেড়ে আওয়াজের ফাঁকে ফাঁকে স্বজনের আহাজারি তে যোনির ভিতর অনন্ত মৃত্যুর ঘোরাঘুরি ; তবে, থ্যাংকস, ছিঃ ছিঃ একি বলছেন স্যার বারুদ জমে বেআব্রুভাবেই প্রকট হবার কথা 

দুই

উৎসর্গ : ওয়ারাঙ্গালের রানি রুদ্রামাদেবী

আজ আম্মা অসুস্থ পরানবান্ধা ওহে পবিত্র , ওহে অনিদ্র নাগলিঙ্গম কাজ চলছে…. জোর কদমে আত্মবিধ্বংসী শিউলিতে উৎসব রঙিন আরো কত্ত অজুহাত নোয়াখাইল্যা, বরিশাইল্যা বলে গালি যে তৃপ্তি আছে হে শাসক কাঙ্গালিনী না কচু পরীক্ষার হলে বুকের দুধ গড়িয়ে পড়ে নারীর অতিগভীর ভালোবাসা বিহনে কলকাতা মরে যাচ্ছে তবুও ভোজবাজিতে নিজেই পকেটমানি জমিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে গেলে একটু ভেবো প্লীজ আতিপাতি করে গরররররর ঘাই মেরে পুকুরের বাশঁ বাগানের মাথার উপর নানী তোমার বয়স হইছে তো গুরুঠাকুর রিল্যাপস করেছে আপু শোন! দিশাহীন ও অনির্দিষ্ট প্রেমে  জীবনীমূলক মাল টা কে, জানেন?

তিন

উৎসর্গ : চিত্তোরের রানি পদ্মিনী

আব্বার কাছে ভাতভাজি খাইতে ক্রমশ উজানে যাই পৃথিবী ঘুরতে মুঞ্চায় না সরি… হুম হুম… আচ্ছা… ও! বিপণনের ও কৌতূহলের ওয়াও! কত গর্ব হয়! সিগারেটটা ধরিয়ে ফেলুদার আছড়ে ভেঙে গেল আকাশছোঁয়া শৈশবের প্রিয় নদীতে মৃত শুকনো হলদে পাতার লাইনগুলো নিস্তব্ধে পিতৃপুরুষের নাম ভাঙিয়ে বন্ধুরা আসুন লেজের তুলনায় কুকুর শক্তিশালী কালী, সরস্বতী, লক্ষ্মী, সন্তোষী, শেতলা মনসা হাজির সবাই, শিশু মানেই বিছানায় হিসু অফিস, মিটিঙ, কফিহাউস পাড়ায় পাড়ায় মাইক ঠিক এই বিন্দুতে কালো বৌ ফ্রয়েডের যৌনতার তত্ত্বচিন্তা নি‌য়ে মারামা‌রি করে, গলা টিপে ধরে আর কিছুই নেই এলোমেলো  দীর্ঘ সময় কাটায়া দিলাম 

 চার

উৎসর্গ : মারাঠা মালওয়া রাজত্বের রানি অহিল্যাবাই হোলকর

স্নানাগার নির্মিত অধিকাংশই এলিয়েন তাই ব্রহ্মচর্যের ব্রত শক্তিই শুধু নয় অশ্বিনীতারার চুল ছিঁড়ে শৈলীর গর্ভমুণ্ড ভয়ংকর উল্লসিত মাথা গোঁজে এইটা মোক্ষম কোনো চ্যালেঞ্জ নয়, আমারে নিবা মাঝি? তুমি ভালো থেকো গো ঘটাং ঘটাং করে কপালের উপরে টিকে থাকে না , নেশা অবাক হয়ে বারবার ধাক্কা খাক, চড় থাপ্পড় খাক লিঙ্গে লেখা আছে সেকথা অবিচুয়্যারি মাতিয়ে রেখেছিলেন রতিনিধিত্বমূলক মিথ্যায়, অসততায়, কুচিন্তায় শুধু ছুঁয়ে দেখবে আরে বাবা, এত সুন্দর আকেঁন যে । স্মৃতিচারণে আবির্ভূত হচ্ছেন যুগে যুগে সবাইকে খিস্তোবে এবং পূর্ণ-প্রাণ হয়ে উঠবে আহা আহা আহা ভাবতে ভাবতেই কাটিয়ে ফেলছেন ল্যাটা, গড়াই, বেলে ধরায় প্রবেশ করিবার প্রস্তাব আসিয়াছে? 

পাঁচ

উৎসর্গ: রামনাডের রানি ভেলু নাচিয়ার

নিজে খাই না খাই একসঙ্গে অনেক খাই কেঁপে কেঁপে ধেয়ে আসছে মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ্ রোড গুমনাম ঝুমঝুম.. কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা টুকরো টুকরো দ্যুতিময় যুদ্ধবাজনায় সাজানো ইগো, আত্মগরিমা, মর্মবিদারী বিবাদ নিজের জীবনে কী হবে এই মায়াপ্রপঞ্চে বিলাই বলবে ম্যাঁও, সাপ বলবে ফোঁস, আর ছাগল বলবে ব্যাঁ নাস্তিক্যবাদী ঈশ্বর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জগাখিচুড়ি প্রাগৈতিহাসিকদের জন্য আসবি কাছে খুকি? একবার মুগ্ধ হতে চাই… শুনে এসে আমায় বোলো তোমার এই স্বভাব কি জামাই জানে? বউএর ঠোঁটে সিগারেট তরুণদের ছ্যাঁচড়ামি, বৃদ্ধদের লুইচ্চামি, মধ্যবয়সীর ইতরামি একৈ একৈ বোধিলাভ মই টই পাচ্ছিস না এখন?

ছয়

উৎসর্গ : অবধের রানি বেগম হজরত মহল

নিন্দুকের কাজ মণীষীরা করবে এভাবে ল্যাঙালে ? পাল্লে তুমি পাল্লে? সুগারের বাড়াবাড়ি? এলাকাবাসী আপা ফাঁকে ফাঁকে আমারে ছেঁকে ছেঁকে তুলে বুকে কার্তুজের বেল্ট ছিল টুংটাং বাজনা  এখন নেই মুদি দোকানের হিসেব থেকে গভীর মমত্ববোধ আর ঘেন্না উগরে দিতে স্বস্তির বিষয় এটা যে ঝোলা থেকে বেরিয়েছে ফুলকপির হুবহু মিল থুতু গেলা যত সহজ এসেছি দণ্ডকারণ্যে এই দ্যাখেন ঝালমুড়ি বিক্রেতা চোখে চোখ রেখে রাজদ্বারে শ্মশানে চ যস্তিষ্ঠতি স বান্ধব আরে কিয়জ্জনতন্ত্রের জাঁতাকলে পইড়া যথাবিধি বাইঞ্চোৎরা পলাইসে  হাহা হোহো হিহি সেন্ট পার্সেন্ট দালাল তুমি রামের পোলা কদু পেনিসের মাপহীনতা এমনভাবে রয়েছে হাসে খলখল

সাত

উৎসর্গ : বেলগাঁওয়ের রানি কিত্তুর চেন্নাম্মা

চাই চাই চাই, তার  আফটার এফেক্ট বিটপীলতায়, জলদের গায়, সংকেতস্থলে দাঁত কেলিয়ে হাসে মহাকাল চড়ুইভাতি, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বেশ একটা মারপিট হলো ভীষণ আপ্লুত একদম দমাদম মস্ত কলন্দর রাতদুপুরে কিসের নৌবিহার? কিন্তু কই কি? পাতালপুরীর অজানা কাহিনী কিছুই হচ্ছেনা মাইক বাজিয়ে কেত্তনের আসর গলা টিপে ধরেছে ?? দেখছিলাম বাতাসের তাণ্ডব জটা-টবী-গল-জ্জল- প্রবাহ-পাবি-ত-স্থলে, গলেব-লম্ব লম্বিতাম ভুজঙ্গ-তুঙ্গ-মালিকাম, ডম–ড্ডম-ড্ডম-ড্ডমন্নি– নাদ-বড্ড–মর্বয়ম,চকার চণ্ড-তাণ্ডবম তনোতু নঃ শিবঃ শিবম ইংরাজীটা খায় না মাথায় মাখে মেমের তিতকুটে বুকে প্রকাশ্যে ইঁট ছুঁড়ে মেরে ফেলা যায়

আট

উৎসর্গ : উল্লালের রানি আবাক্কা চৌতা

শ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম দুদিকে ধার দেওয়া তলোয়ার তব ঘৃণা তারে যেন তৃণ সম দহে অবলীলায় ওই মুখরোচক গুজব পায়রা ওড়াবে, বাজি পোড়াবে, বাঈজি নাচাবে কাব্যে ফাটাস চাপা চোপা প্লাতেরো নামের সেই গাধাটার মাংস খুবলে খেয়ে বিয়া না হইলে বাচ্চা হইবোনা ক্যা? আনন্দ ছিলো গলিত জোনাকি পোকায় গালের চামড়া কুঁচকে গেছে, চোখের তলায় কালি এই প্রকল্পের আওতাধীন আর একটু ভাত দিই ঘুরে বেড়ায় গোটা জীবন…শ্যামল শ্যাওলা ও গেঁড়ি ও গুগলি দরজা বন্ধ করে যাও না কেন?….মেরুদণ্ডী প্রাণী থেকে অমেরুদণ্ডী প্রাণীর দিকে সবচেয়ে কর্তৃত্বপ্রধান হলো বিপ্লব নাটুকে কবিতা, গান লিখবেন না তোমারে একটা কথা জিগাই গিলা করা পাঞ্জাবী দ্যাখছো তার সুদ্দা হাতেই গিলা করে যা শুধু আমার জন্য ওগো

নয়

উৎসর্গ : শিবাজীরাজে ভোঁসলের প্রথম স্ত্রী রানি সাইবাই নিম্বলকর

দু:খের মাঝে কিভাবে হাসতে হয় ক্ষুধার্ত হায়নার খাঁচায় চোখ উপড়ানো বোধহয় বাকি আছে প্রশ্নটি ঘিরে রয়েছে বিষ ছড়ানো নাকানিচুবানি খায় পাকনা চুলের কথা আর বলিয়েন না এই যে আগাম বইলা ভাসায়া ফেলতেছেন কীর্তিকলাপের বিষয়ে দেশপ্রেম মাটি, মমতা, মানুষ ইত্যাদি দেখতে দেখতে দুঃসময়ের বিরুদ্ধে আমরা ক্লান্ত, ভীত, অসাড় এই বদবুদ্ধিগুলো কেন উঠে আসবে কথায় ভেজাল আ‌ছে গলায় এইসব শতকৌস্তভ যন্ত্র কেন নয় কেন নয় বড্ড শীত কচ্চে রে মুখ থম থম রাম-নাম সত্য হ্যায় বাদবাকি সমস্তকিছুই বুঝলেন তো ঝুটা হ্যায় স্বমহিমায় বিরল প্রপ্তি কী বলছো ?

দশ

উৎসর্গ : শিবাজীরাজে ভোঁসলের দ্বিতীয় স্ত্রী রানি  সোয়রাবাই মোহিতে

ধামাইল নাচে ক্ষতর দাগ গান,কবিতা, আঁকা, বিপ্লব, প্রতিবাদ, কুঠারাঘাত আবার ব্লা ব্লা ব্লা কী কষ্ট কী কষ্ট বুক চিতিয়ে লজ্জিত বড় কবি বইলা গুলিবিদ্ধ তুলির আঁচড় কালো কলম নীল কলম সন্দেহজনক গো ক্যান্সারের অন্যরকম থুৎকার করে কাস্তে আর নেই আচমকাই এদেরকে চিহ্নিত করা দুর্দান্ত হয়েছে কাঁধ মিলিয়েছেন শীতকালে পাগল হচ্ছেনা কেন প্রচারে বিভ্রান্ত চোদন চেতনায় সব জীবন নয় ছয় ঘুনাক্ষরেও টের পাবেন না আমারে উন্মাদ বানায় ফেলতেসে তাহলে চেপে যাবেন না আস্ত রাক্ষস বেরিয়ে ঘোড়াগুলো ঘাস খায় তেমন ব্যবস্থা অক্ষম,অসহায় অন্ধ তারপরেও নাছোড়বান্দা  দাদু দিদাদের নিদান দেবেন তো?

           চীনা মেয়েবাদুড়খাকি চীনা মেয়ের ঠোঁটেতে তুই চুমু খাবি ?ওই মেয়ে তো কুকুর বেড়াল ঢোঁড়া সাপের মাংসখাকি !প্যাঙ্গোলিনের আঁশের গুঁড়োয় চাগিয়ে তোলে অরগ্যাজম !জেনেশুনে তার ঠোঁটে তুই চুমু খাবি ?খাবো খাবো খাবো । বুকের হলুদ-লালচে বোঁটায় টুসকি দেবো ।.ওর দাদু যে মাও-জে দঙের লম্বা লাফে শামিল ছিল ।মাওয়ের মতন ওর দাদুরও গোটাকতক রাখেল ছিল ।বাবা তো ওর সাম্যবাদী দলের নেতা, অঢেল পুঁজি ।খাবো খাবো খাবো । স্বাদু ঠোঁটে কামড় দিয়ে চিপকে যাবো ।অরগ্যাজমের জোয়ার-রসে যা-হবার-তা-হোকগে বলে চুসকি দেবো ।            

 

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

কায়েস মাহমুদ স্নিগ্ধ নোয়াখালির ভাষায় অনুবাদ করেছেন ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’

“ওরে মারে মরি যাইয়ুম মরি যাইয়ুম মরি যাইয়ুম।

আঁর সামবা জ্বরি যারগই দারুয়ার আগুনে।

আঁই কিত্তাম, কোনায় যাইতাম কইতাম হারি না,

দিলের ভিত্রে শান্তি আইয়ে না এক্কানাও।

এগিন হুঁথি মুঁতিত লাইত্থাই চলি যাইয়ুম রে শুভা।

শুভা আঁরে এক্কানা তোঁর ভিত্রে চলি যাইতে দে,

গেঁডিতে গেঁডিতে আঁডি যাইতে দে।

আন্দারের ভিত্রে রাইত নামাইন্না

আন্দারের ভিত্রে মশাইর টানাইন্না

ছামার মইদ্যে,বেজ্ঞিন নাও চলি গেসে, অন এই নাওগাও চলি

যারগই গাঁডের কিনারের তুন।

উফঃ আর হারি না রে,

লাগে য্যান খালি গেলাস বাংগের।

শুভা ভোদা খুলি আঁর দুয়ারে খাড়া,

সুখ দে শুভা, তোরে সুদি।

গিরার গিরার কান্দন খালি চলি আইয়ের আঁর দিলের গোড়াত।

বিমারে বিমারে হঁসি গেসে আঁর গিলু বরা গরম ঠাডা।

এরে মা, তুঁই আঁরে খালি আড্ডিত কেন হ্যাডে লইলি না?

গোসত দিসত গাত,

নইলে তো দুই কুটি সন ঠাউরের হোন্দে চুম্মাচুম্মি কইতাম,

ওরে মা। আঁর বালা লাগে না, আঁর আর কিছুই বালা লাগে না।

গন গন চুম্মাইলে আঁর গা গিনগিনায়,

সুদতে সুদতে বেডিরে থুই রঙ তামশাত চলি আইসি ম্যালা দিন

আঁর কইবতার ঠকঠকাইন্না খাড়াইন্না হ্যাডায়।এগিন কিয়া অইতে আছে,

কিয়া অইতে আসে আঁর সিনার বিত্রে ওরে ঠাউরবেজ্ঞিন বাংগি গুড়াগুড়া করি হালামু,

বাংগি হালামু এরে মাদারচোতের হুতবাংগি হালামু

তোগো ডঙের নাচন কোন্দনআঁই কইদিলাম উডাই আনমু শুভারে,

আঁর শুভা, আঁর শান্তির শুভা।

হেতিরে গুঞ্জাই থোনের তুই কোনাইগার মাংতার হুত হালা?

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান