‘নখ কাটা ও প্রেম’ কবিতাটি বিশ্লেষণ করেছেন সঞ্জীব নিয়োগী

আমার কবিতাপাঠ- আজ চতুর্থ দিন।। আজকের আলোচনা মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা “নখ কাটা ও প্রেম” নিয়ে।। নীচে দেওয়া মলয়দার কবিতাটা পড়ে নিয়ে আমার উদ্ধারটি পড়তে অনুরোধ।…

‘নখ’ শব্দটির ব্যঞ্জনা ‘পরিপাটি’ সামাজিক ব্যবস্থার বিপরীতে অবস্থান করে। শব্দটি ব্যবহারের ইন্টেনসন থেকে কোনও না কোনও ভাবে, অপরিচর্যায় বেড়ে ওঠা নখ কে অতিক্রম করে, আসলে যৌনমনের আদিমতা, ইনার বিস্টিয়ালিটিই উস্কানি পায়, এক্ষেত্রে। এবার, সে-সবের থেকে একজাতীয় কাব্যিক প্রশমন কবিদের পার্টনারগন দিতে পারেন বলে কবিতাটির কবি মলয় রায়চৌধুরী মনে করতে চেয়েছেন। এই মনে করার মধ্যে নারী-পুরুষের শারীরবিদ্যার সহজপাঠটি প্রচ্ছন্ন। যা, ভেতর-টান হিসেবে কবিতায় কাজ করেছে। ভাবনা হিসেবে এই আয়োজন অসামান্য। যুবক কবিদের ক্ষেত্রে ‘নখ’ কাটার সমস্যা নেই। সে নিজে বা সমবয়সী পার্টনার এই কাজ করে দিতে পারে। কিন্তু বয়সকালে এসে কবি ‘যুবতী’ পার্টনারের অভাব অনুভব করছেন এবং কবিতার বক্তব্য এভাবেও তার গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে।
বরাবরই তাঁর কবিতার বক্তব্য একরোখা, দ্বিধাহীন। শব্দের অর্থ অভেদ্য প্রাচীর হয়ে পাঠকের সামনে থাকে না। তাঁর কবিতা পাঠের ক্ষেত্রে যেটা বেশি করে লাগে তা হচ্ছে ইনফরমেশন। অনেক তথ্য ওয়াকিব থাকা প্রয়োজন হয় পাঠকের। ব্যঞ্জনার হাত ধরার জন্য সচরাচর শব্দের, বাক্যের খোসার পর খোসা ছাড়িয়ে পরতের পর পরতের বহুভাঁজ খুলতে হয় না। আলোচ্য কবিটিও দ্বিমাত্রিকতার সীমায় বোধগম্য হয়।
যদিও এই কবিতার প্রায় প্রতিটি লাইন তাদের স্পষ্ট বক্তব্য সহ সরাসরি আমাদের বোধের মধ্যে গমন করে, তবু, কবিতাটির সামান্য কিছু অংশের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বোঝার অবসর খুঁজতে চাই। …

“…আমার মতন বুড়ো যুবতী-সঙ্গীহীন পদ্যলিখিয়েরা/ জানে; প্রেম যে কখন বয়সের দাবি নিয়ে আসে!”
কবিতায় রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী, সুনীল, শক্তি, জয়, যশোধরা, সুবোধ, মল্লিকা ইত্যাদি নামগুলো এই নখ কাটা প্রসঙ্গে এসেছে। নামগুলো কবিদের, তাই এসেছে। শক্তির চাইবাসা প্রসঙ্গের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন এখানে অবান্তর। কিন্তু সেটা প্রেম নয়। ভোগ। আদিবাসী নিরীহ নারীকে শিক্ষিত বাবুর ভোগ। বাকি নখ-কাটিয়ে জুটিদের সাথে শক্তির প্রসঙ্গ বে মানান। এমনকি, সুনীলের এক একটা নখের জন্য এক একটা উঠতি-কবিনি প্রসঙ্গও এখানে বাকি নাম গুলোর সাথে, যেহেতু নামোল্লেখ করে ইমপ্যাক্ট ও ইম্প্রেশন বানানোর প্রযুক্তি এখানে ব্যবহৃত, কষ্ট করে কিছুটা গলধঃকরণ করতে হয়। আবার অন্য ভাবে দেখলে, আতুপুতু সামাজিকতা নৈতিকতা বাদ দিয়ে নর ও নারীর নিখাদ সম্পর্কের একটা শেড হয়তো কোনও ভাবে আঁকতে চাওয়া হয়েছে। উদ্ধৃত অংশে তেমনই ইঙ্গিত স্পষ্ট। জয় গোস্বামীর প্রসঙ্গ এসেছে প্রায় বিদ্রুপের সুরে। “জয় গোস্বামীরও ছিল, / তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে সমুদ্রের পাঁকে চোখ বুজে।” জয় কোন পত্রিয়ার সাথে যুক্ত ছিলেন, তার একদা সম্পাদকের কী নাম ছিল, ‘সমুদ্র’ শব্দটার সাথে সেই নামের কী মিল, এসব পাঠক ভেবে দেখবেন।
নখ কাটার জন্য যুবতীর অভাব বোধ করছেন কবি। নখ শব্দটির অপরিপাট ও বিস্টিয়ালিটি কেন্দ্রীয় ব্যঞ্জনা হয়ে কবিতার আপাদমস্তক আক্রান্ত করে রাখে।
ইঙ্গিতময় শব্দ, নখ, শরীরে নিয়ত বিদ্যমান ও একটু একটু করে বাড়তে থাকে। তাকে নিয়মিত অন্তরালে প্রশমিত রাখার জন্য উপযুক্ত সাথী, বিশেষত বৃদ্ধকালে, দরকার। নখ কাটার পার্টনার নিয়ে কোথাও ছুঁতমার্গ না থাকাই ‘সভ্যতা’র দাসত্বমুক্ত মানব মানবীর মনোজগতের এঙ্গেল। তাই সুনীলের একটা নখের জন্য এক একজন থাকুক বা জীবনানন্দ হাজার বছর ধরে একজনকেই খুঁজুন, সবই উঠে এসেছে কবিতায়। কবিতাটি বিস্মিত করার চেয়ে বেশি চমৎকৃত করে।

“…যেমন জীবনানন্দ, হাজার বছর / খুঁজে চলেছেন কোনো এক বনলতা নখ কেটে দিয়া যাবে তাঁর…”
এখানে এসে এই কবিতা একলাফে অনেকটা উপরে উঠে যায়। এমন জাম্প মলয়ের বেশিরভাগ কবিতার বৈশিষ্ট্য। একজন দুঁদে কবির এখানেই পরিচয়। রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীকে তীব্র ব্যঙ্গ করে, সুনীল শক্তির প্রায়-কেচ্ছা শুনিয়ে মলয় এখানে এসে এক কবির চিরন্তন (হাজার বছর) হাহাকারে শেষ করছেন মূর্ছনা। হাজার বছর ধরে কোনও কবি যে আসলে অগণিত মানব অবয়বে কল্পনার কোনও একজনকে খুঁজে বেড়ানোর নিয়তি নিয়ে জন্ম নেন। “দু দন্ড শান্তি” র মাধুকরি, তার।
মলয়ের স্বভাবসিদ্ধ, এই কবিতাও নাটকীয়তায় ভরপুর। মল্লিকা ও যশোধরা প্রসঙ্গ না এলে কবিতাটা একটা গুরুতর দায়ে পড়তে পারতো, পুরুষতান্ত্রিকতা। (পুরুষের) শারীরিক তড়পানি মলয়ের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আবার নারী পুরুষ সম্পর্কের চির জাগরিত পরিত্রাণহীন পিপাসার রহস্য তাঁর কবিতাকে শরীরোত্তীর্ণ করে ও শিল্প হিসেবে উপরে উঠতে সাহায্য করে।

114269577_3129128390540524_915068163274617469_o

About Hungryalist Archive

Keep reading and get enlightened
This entry was posted in প্রেমের কবিতা, Malay Roychoudhury and tagged , , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: